📄 সন্দেহের অপনোদন
উপরের হাদিসগুলো এবং সালাফের বক্তব্য থেকে কী বোঝা যায়? একদল আলিম বুঝেছেন, সালাফ সর্বসম্মতিক্রমে জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে সুস্পষ্ট হারাম, অবৈধ ও বিশৃঙ্খলা মনে করতেন। ফলে শাসক যত বড় জালেমই হোক, যত অত্যাচার করুক, যত অন্যায় ও অনাচার করুক, সুস্পষ্ট কুফর পাওয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। এক্ষেত্রে তারা এতটাই অতিরঞ্জিত করেন যে, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মতো কুরআন-সুন্নাহর অমোঘ নীতিও তথাকথিত শান্তিনীতির কাছে লঘু ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কারণ, তারা সামান্য অন্যায়ের প্রতিবাদকেও বিদ্রোহ মনে করেন, শাসকের অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে একটু আওয়াজ উঠলেই খারেজি আখ্যা দেন।
বাস্তবেও কি তা-ই? প্রকৃতপক্ষেই কি শাসকের প্রতি সালাফের সবার এক ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল? জালেমের জুলুমের প্রতিবাদ মানেই কি খারেজিপনা? সালাফের কেউ কি জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি? সহজে উত্তর, না; বরং পিছনে অন্যান্য জায়গায় যেভাবে নিজেদের মতকে সালাফের সবার মত বলে দাবি করা হয়েছে, এখানেও তা-ই হয়েছে। এটা ঈমানের কোনো মৌলিক বিষয় নয়, প্রতিনিয়ত চর্চিত কোনো ইবাদত নয়; বরং এটা দুনিয়া পরিচালনা ও রাজনীতি। ফলে এখানে মতভেদ হবেই। বরং উম্মতে মুহাম্মাদির সর্বোত্তম প্রজন্মের মাঝেও এগুলো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেখানে পরবর্তী যুগে তো আরও বেশি হয়েছে। ফলে হাজার হাজার সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি সবাই একইরকম রাজনীতিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতেন—এটা বলা দুঃসাহসিকতা। আর শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দূরের কথা, বরং তার অন্যায়ের বৈধ সমালোচনা (নাহি আনিল মুনকার) যা কুরআন-সুন্নাহে অপরিহার্য করা হয়েছে, সেটাকেও বিদ্রোহ বলে আখ্যা দেওয়া এবং খারেজিদের কাজ বলা মূলত মুরজিয়াদের মতাদর্শ। সালাফের অনুসরণের দাবিদার অনেকেই এমন অসুস্থ মতাদর্শে আক্রান্ত।
ইবনে হাজাম লিখেন, 'কেউ কেউ এটাকে (জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করাকে) ইজমা বলেছেন; অথচ এটা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কারণ, সালাফের অনেকেই এর বিরোধিতা করেছেন। হাররার ঘটনার দিন শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ও তাঁর সঙ্গে থাকা বড় বড় সাহাবাও ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। হাসান বসরি ও প্রথম সারির তাবেয়িগণ হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন। সুতরাং এটা ইজমা হয় কী করে?'¹ বরং ইবনে হাজাম এটাকে আলি, আয়েশা, তালহা, জুবাইর, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর, মুহাম্মাদ ইবনে হাসান ইবনে আলি, হাররার ঘটনায় যোগদানকারী সাহাবি ও তাবেয়ি, হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগদানকারী সকল সাহাবি ও তাবেয়ি কিংবা তাদের সমর্থনকারী, যেমন: আনাস ইবনে মালিক, আবু হানিফা, মালেক ও শাফেয়ির মাজহাব বলেছেন। তারা কেউ কথার মাধ্যমে আবার কেউ সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিদ্রোহ করেছেন।²
কেবল ইবনে হাজাম নয়, অনেকেই এ মত সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ শাসক জালেম হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যায়। তবে কেউ কেউ স্রেফ জালেম নয়, বরং প্রচণ্ড জালেম হওয়ার শর্ত দিয়েছেন। যেমন: ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া ও হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের জুলুম ছিল সীমাছাড়া। ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে সালাফ জুলুমের পরিমাণ-সহ বিদ্রোহের জন্য কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু কেউ বলেননি যে, ইয়াজিদ ঠিক ছিল আর হুসাইন রাজি. তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী (বাগি) ছিলেন।
এমন আরেকজন সালাফ হলেন ইবনে আব্বাস রাজি.-এর মাওলা ইকরিমা রাহি.। শাসক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সালাফের অনেকে তার ব্যাপারে কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি সিকাহ ও নির্ভরযোগ্য তাবেয়ি। ফলে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের মতো ইমামরাও তার বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করেছেন। সমকালীন কিছু লোক ইকরিমার হাদিসে সন্দেহ করেন। কারণ, তিনি মুরতাদ হত্যা-সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। এদের ধারণা, তিনি যেহেতু খারেজি মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন, তাই এমন হাদিস বর্ণনা করেছেন। এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এই ইমামের প্রতি অপবাদ, ইকরিমার ব্যাপারে সালাফের কথার অপব্যাখ্যা। ইবনে হাজার আসকালানি ও জাহাবি-সহ সকল মুহাক্কিক সেটার সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসলে এদের কাছে তাঁর অপরাধ হলো তিনি জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে সমর্থন করতেন।³
আবু বকর জাসসাস এ ব্যাপারে আবু হানিফা রাহি.-এর মাজহাব প্রসঙ্গে বলেন, 'জালেমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার মাজহাব প্রসিদ্ধ।' বরং তিনি সক্রিয়ভাবে মুহাম্মাদ আন-নাফসুজ জাকিয়্যাহ-সহ বিভিন্ন বিদ্রোহ ও বিদ্রোহকারীকে সহায়তা করেন। জাসসাস মনে করেন, যারা ইমাম আবু হানিফার নামে ভিন্ন কোনো মত প্রচার করেছে, তারা হয়তো ভুল করেছে, নতুবা মিথ্যা বলেছে।⁴ কিন্তু পরবর্তীকালে হানাফিদের মাঝে এই ধারা অব্যাহত থাকেনি। পিছনে আমরা ইমাম তহাবি ও বাজদাবির বক্তব্য উল্লেখ করেছি। তাতে সেটা স্পষ্ট হওয়ার কথা। এর কারণ একটু পরে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ইমাম মালেকের কথা দ্বারা বোঝা যায়, তিনি জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা পছন্দ করতেন না, আবার নাজায়েজও মনে করতেন না। কিন্তু তিনি প্রত্যাশা করতেন আল্লাহ যেন তাকে সরিয়ে দেন। তিনি বলতেন, শাসক যদি উমর ইবনে আবদুল আজিজের মতো হয়, তবে তাকে সাহায্য করতে হবে, তার পক্ষে যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু তেমন না হলে তাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহ অন্য কোনো জালেমের মাধ্যমে এই জালেমকে শায়েস্তা করবেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইমাম মালেক জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীকেও জালেম বুঝতেন। পরবর্তীকালে সম্ভবত তিনি জালিমের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় হন। ফলে যখন মুহাম্মাদ আন-নাফসুজ জাকিয়্যাহ আবু জাফর মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তখন তিনি তার হাতে বাইয়াত নেওয়ার ফাতাওয়া দেন। কেউ বলল, 'আমরা তো মানসুরের হাতে বাইয়াত নিয়েছি।' তিনি বলেন, 'সেটা জোরজবরদস্তি ছিল। আর জোর করে বাইয়াত হয় না।' এভাবে দেখা যাচ্ছে, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালেক দুজনই মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সমর্থন করেন।
যখন ইবনে আশআস হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তার সঙ্গে এক-দুইজন নয়, চার হাজার তাবেয়ি সে বিদ্রোহে শরিক হন। তাদের মাঝে প্রথম সারির তাবেয়ি, যেমন: সাইদ বিন জুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা প্রমুখ, ছিলেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের বিরুদ্ধেও তাবেয়িরা যুদ্ধ করেন।
সুতরাং সকল সালাফ জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার বিপক্ষে এমন বলার সুযোগ নেই। বরং তারা দুটি মতের উপর ছিলেন: একদল জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জায়েজ মনে করতেন। তারা এটাকে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার হিসেবে দেখতেন। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফ এটাকে নাজায়েজ মনে করতেন। তারা মূলত রাসুলুল্লাহর নিষেধাজ্ঞা, বিদ্রোহপরবর্তী বিশৃঙ্খলা, মুসলমানদের বিভক্তি ও পারস্পরিক হানাহানির সুযোগে কাফেরদের আগ্রাসন ইত্যাদি আশঙ্কা সামনে রেখে নিষেধ করতেন।
টিকাঃ
১. মারাতিবুল ইজমা, ইবনে হাজাম (১৭৮)। ২. আল-ফাসল, ইবনে হাজাম (৪/১৩২)। ৩. ফাতহুল বারি (১/৪২৮); সিয়ারু আলামিন নুবালা (রিসালা) (৫/৩৪)। ৪. আহকামুল কুরআন, জাসসাস (১/৮৬-৮৭)।
📄 সালাফ ও খালাফ
প্রশ্ন আসতে পারে, ইমাম আবু হানিফার মানহাজ যদি হয় জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা—যেমনটা জাসসাস বলেছেন—তা হলে ইমাম তাহাবি কীভাবে বললেন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না? উত্তর দুইভাবে দেওয়া যেতে পারে: এক. এখানে জুলুম বলতে ইমাম তাহাবি লঘু জুলুম উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর ইমাম আবু হানিফা যে জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলেছেন, সেটা প্রচণ্ড জুলুম। ফলে দুই কথায় কোনো সংঘাত নেই। দুই. সময়ের ব্যবধান। ইমাম আবু হানিফা যে শতাব্দে ছিলেন, সেটা ছিল দ্বন্দ্বমুখর এক শতাব্দ। উমাইয়া-আব্বাসীয়দের টানাপোড়েন একদিকে, অপরদিকে শিয়া-সুন্নি জটিলতা, অধিকন্তু নবি-পরিবারের সদস্যদের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, কিছু শাসক ও তাদের গভর্নরের সীমাহীন জুলুম গোটা পরিবেশকে অশান্ত করে রেখেছিল। ফলে মুসলিমগণ স্বভাবতই এই জুলুম থেকে মুক্তি চাইতেন সেটা কঠিন পথে হলেও। কিন্তু ফলাফল কী হয়েছে? বিদ্রোহ কি ভালো ফল বয়ে এনেছে?
আমরা দেখি, জালিমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে একাধিক হাদিস ও সতর্কবাণী থাকতেও তাদের কাছে বিদ্যমান দলিলের মাধ্যমে তারা বিদ্রোহ করেছেন। মূলত তারা জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে 'নাহি আনিল মুনকার' হিসেবে গণ্য করতেন। ফলে এটা তাদের ইজতিহাদ, যেটাকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই। কিন্তু তা উম্মাহর জন্য এবং তাদের নিজেদের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে? আনেনি। আমরা দেখেছি, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর, হুসাইন ইবনে আলির মতো সাহাবাদের চরম বেদনাদায়কভাবে হত্যা করা হয়েছে। মদিনাবাসী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে সাহাবি ও তাবেয়ি-সহ সেখানে গণহত্যা চালানো হয়েছে। ইরাকে আবদুল মালিক ও হাজ্জাজের উপর বিদ্রোহকারী ইবনুল আশআস ও তাঁর সঙ্গে বিদ্যমান সবাই, খোরাসানে বিদ্রোহকারী ইবনুল মুহাল্লাব ও তার সঙ্গে বিদ্যমান সবাই করুণভাবে পরাজিত ও নিহত হয়েছেন। জায়দ ইবনে আলিকে মাঝপথে ছেড়ে গিয়েছে তাঁর সঙ্গীরা। উমাইয়াদের সরিয়ে আব্বাসীয়রা এসেছে, কিন্তু জুলুম বন্ধ হয়নি। মদিনা ও বসরাতে যারা খলিফা আবু জাফর মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তারা সবাই পরাজিত হন। এসব বিদ্রোহে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। ফলে তাদের মাধ্যমে—ইবনে তাইমিয়ার ভাষায়—দ্বীন ও দুনিয়ার কেউ উপকৃত হয়নি।¹
বরং ইমাম আবু হানিফা রাহি.-এর বক্তব্যে গভীর দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়, জাসসাসের কথা সঠিক নয়; কিংবা প্রথমদিকে ইমামের মাজহাব ছিল সেটা। পরবর্তী সময়ে ইমামও পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছিলেন। আবু মুতি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যেসব মানুষ সৎ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজের নিষেধ করে এবং সেটার জন্য জামাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাদের কাজ কি সঠিক মনে করেন? ইমাম বললেন—না। কারণ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ওয়াজিব হলেও তারা যেটা করে তাতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। তাতে রক্ত ঝরে; হারামকে হালাল বানানো হয়; মানুষের ধন-সম্পদ নষ্ট হয়। এ কারণে আল্লাহ বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, وَإِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا * إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ. অর্থ: 'যদি মুমিনদের দুটি দল পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর আক্রমণ করে, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।' [হুজুরাত: ৯] ফলে মুসলমানদের জামাতের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করবে, তাদের তরবারি দিয়ে শায়েস্তা করা হবে। শাসক যদি জালেমও হয়, নিজেরা ন্যায়ের উপর থাকবে, ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত দলের সঙ্গে থাকবে (বিদ্রোহীদের সঙ্গে থাকবে না)। কারণ, রাসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাদের (শাসকদের) কেউ ইনসাফ করুক কিংবা জুলুম করুক, তোমাদের তাতে ক্ষতি নেই। তোমাদের পুণ্য তোমাদের জন্য, তাদের জুলুম তাদের কাঁধে।²
এভাবে একদিকে প্রথম সময়ের বিদ্রোহগুলো যখন ব্যর্থ হয়, এর ক্ষতি, অনিষ্ট এবং অপকারিতা সামনে আসে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীর সার্থকতা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়, অপরদিকে আব্বাসীয় খেলাফত সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ইমামগণ জুলুম ইসুতে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করাকেই অগ্রাধিকারযোগ্য মনে করেন। এ কারণেই ইমাম তহাবি, বাজদাবি-সহ পরবর্তী সময়ে হানাফি-মাতুরিদি ধারার সকল আলিম বিদ্রোহ না করার পক্ষে। ইমাম মাতুরিদি তো জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে খারেজিদের সিফাত হিসেবে অভিহিত করেছেন।³ ইবনে আবদুল বার বলেন, বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। তবে শাসক জালেম হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা চাই। কারণ, তাতে নিরাপত্তা ভীতিতে পরিণত হয়, মুসলমানের রক্তপাত ঘটে, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। এর চেয়ে জুলুম ও অন্যায় সহ্য করাই উত্তম। অভিজ্ঞতাও বলে, দুটো অপছন্দের বিষয় সামনে থাকলে যেটা বেশি ক্ষতিকর সেটাকেই বর্জন করা উচিত। ইমাম নববি বলেন, ওটা প্রথম যুগে ছিল। পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাত জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার ব্যাপারে একমত হয়।
মোট কথা, জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ কি না ব্যাপারটি প্রথম যুগে মতভেদপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ি জালিমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সঠিক মনে করতেন না। তবে অনেকে সরাসরি বিদ্রোহ করেছেন। হুসাইন, ইবনুজ জুবাইর-সহ নবি-পরিবারের সকলের কর্ম উক্ত দৃষ্টিতে দেখা হবে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন দেখা গেল এগুলো ভালো কোনো ফলাফল বয়ে আনে না, তখন সালাফের সর্বসম্মত মত হলো জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা। এভাবেই বুঝতে হবে ইমাম তহাবি-সহ অন্যদের মতামত। কারণ, সময়ের ফারাকটা অনেক। ফলে যদি রক্তপাত ও বড় ধরনের ফিতনা ছাড়া জালেমকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেটা করা উচিত। আর যদি রক্তপাত ছাড়া সম্ভব না হয়, তবে জমহুরের মতে থাকা উচিত। কারণ, তাতে প্রচুর রক্তপাত হয় এবং উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হয়। উপরন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকালেও জমহুরের মতকেই সর্বাধিক সঠিক, সবেচেয় যুক্তিযুক্ত এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণকর মনে হবে। হানাফি ও মাতুরিদি আলিম আবু হাফস গজনবি লিখেন, 'শাসক হওয়ার জন্য নিষ্পাপ হওয়া শর্ত নয়। ফলে জুলুম করলেই শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। কারণ, এর ফলে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, মুসলমানদের মাঝে অনিষ্ট ও হানাহানির সূচনা হয়। এটা বরং খারেজিদের মাজহাব।' ইবনে হাজার আসকালানি লিখেন, 'জালেমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা সালাফের একটি প্রাচীন মাজহাব। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন দেখা গেল এতে হিতে বিপরীত হয়, তখন সেটা বর্জন করার উপর সবাই একমত হয়েছেন। হাররা ও ইবনুল আশআস-সহ অন্যান্য বিদ্রোহের ঘটনায় চিন্তাশীলদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।'
টিকাঃ
১. মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়া (৪/৫২৮)। ২. আল ফিকহুল আবসাত (৪৪); বিস্তারিত দেখুন অধমকৃত ইমাম আবু হানিফার আকিদা গ্রন্থে। ৩. তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ, মাতুরিদি (১/১০৪)।