📄 শাসকের প্রতি কর্তব্য ও তাদের আনুগত্যের সীমারেখা
কুরআন-সুন্নাহে শাসকের আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَتِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ. অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আল্লাহর রাসুলের আনুগত্য করো, আর তোমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তদের।' [নিসা: ৫৯] কিন্তু তাদের আনুগত্য শর্তহীন নয়। ফলে কুরআন-সুন্নাহের মূলনীতির আলোকে আনুগত্য করতে হবে। এর মাঝে সবচেয়ে বড় মূলনীতি হচ্ছে—যেমনটা ইমাম তহাবি উপরে উল্লেখ করেছেন—'গুনাহের নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আনুগত্য মূলত আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে অনিবার্য (ফরজ) মনে করি।' ফলে আল্লাহ ও দ্বীনের অবাধ্য হয়ে, হালাল-হারামের পরোয়া না করে, আখিরাত জলাঞ্জলি দিয়ে শাসকের আনুগত্য করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'পছন্দ হোক অপছন্দ হোক, সর্বাবস্থায় মুসলমানের কর্তব্য হলো (দায়িত্বশীলদের) কথা শোনা ও তাদের আনুগত্য করা, যতক্ষণ না কোনো গুনাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। যদি গুনাহের নির্দেশ দেওয়া হয়, তা হলে কোনো আনুগত্য নেই।'¹ সুতরাং শাসক যখন প্রকৃত মুসলিম হবে, শরিয়াহ বাস্তবায়নকারী হবে, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শাসন করবে, ইনসাফের ঝান্ডা বুলন্দ রাখবে, মানুষের জন্য কল্যাণকামী হবে, তখন আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকল মুসলিমের উপর এমন শাসকের আনুগত্য ওয়াজিব। কারণ, তখন তার আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের কারও কোনো দ্বিমত নেই। একইভাবে মুসলিম শাসক যদি সুস্পষ্ট কুফরে লিপ্ত হয়—কিছু শর্তসাপেক্ষে যেগুলো সামনে আসবে—তার বিরুদ্ধে সকল মুসলমানদের সাধ্যমতো বিদ্রোহ করা এবং তাকে অপসারণ জরুরি। এ ব্যাপারেও মুসলমানদের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই।
টিকাঃ
১. জামে তিরমিজি (১০১৮); সুনানে ইবনে মাজা (১৬২৮)। ২. সহিহ বুখারি (৩৬৬৭); মুসনাদে আহমদ (৩৯৮)। ৩. বুখারি (৩০৯২); সহিহ মুসলিম (১৭৫৯); সুনানে আবু দাউদ (২৯৬৮)। ৪. বুখারি (৭২৮৪); মুসলিম (২০); তিরমিজি (২৬০৭)। ৫. বুখারি (৩৭০০); সহিহ ইবনে হিব্বান (৬৯১৭); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৬৬৭৬)। ৬. এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী দেখুন: ইবনে হিব্বান (৬৭৩৫); আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাকেম (৫৭৪০); আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির (৭/২৮১); এই কিতাবের শেষাংশে বিস্তারিত দেখুন।
📄 জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিষিদ্ধ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও তাদের আনুগত্য করতে বলেছেন এবং বিদ্রোহ করতে নিষেধ করেছে। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে জানতেন ভবিষ্যতে এমনই হবে। ফলে তিনি আগে থেকেই মুসলমানদের জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে নিষেধ করেন। একাধিক হাদিস দেখে মনে হবে, তিনি সাহাবায়ে কেরামকে জুলুম সহ্য ও সবরের জন্য একরকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলেন। এটা ধর্ম হিসেবে ইসলামের উপযোগিতা ও ভারসাম্যের প্রমাণ। জগৎ ও জীবনের প্রতি বাস্তবোচিত দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, দমন-পীড়ন, জুলুম-নিষ্পেষণ, সাধারণের অধিকার হরণ, স্বেচ্ছাচারিতা ও রাজনৈতিক স্বার্থপরতা ইত্যাদি প্রাচীন কাল থেকেই শাসন ও শাসকের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আল্লাহর রাসুল ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়টা হবে ব্যতিক্রম। তারা চলে যাবার পরে শাসন ব্যবস্থা আবার ঘুরে যাবে। সময় যত গড়াবে অত্যাচার ও অত্যাচারীর সংখ্যা বাড়বে। ফলে তরবারিকেই যদি অত্যাচার প্রতিহতের একমাত্র সমাধান মনে করা হয়, তবে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। এ কারণে যথাসম্ভব সবর করা, ব্যক্তি ও দলগত পর্যায়ে অত্যাচার সহ্য করে গোটা উম্মাহ ও মানুষকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা শ্রেয়।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'শীঘ্রই তোমাদের মাঝে এমন আমির নিয়োগ দেওয়া হবে, যাদের তোমরা চিনবে এবং যাদের চিনবে না। যে ব্যক্তি (তাদের কৃতকর্ম) অপছন্দ করবে, সে দায়মুক্ত থাকবে। আর যে প্রতিবাদ করবে, সে (আল্লাহর অসন্তোষ থেকে) নিরাপদে থাকবে। আর যে সন্তুষ্ট হবে এবং অনুসরণ করবে সে (ধ্বংস হয়ে যাবে)।' সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নামাজ কায়েম করে।'¹
আরেকটি হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের সর্বোত্তম শাসক হচ্ছে তারা, যাদের তোমরা ভালোবাসো, তারাও তোমাদের ভালোবাসে; যাদের জন্য তোমরা দোয়া করো, তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসক হচ্ছে যাদের তোমরা অপছন্দ করো, তারাও তোমাদের অপছন্দ করে। যাদের তোমরা অভিশাপ দাও, তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব না? তখন তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে নামাজ কায়েম করে। আর তোমরা যদি শাসকের মাঝে আল্লাহর অবাধ্য কোনোকিছু দেখো, তবে তার কাজ ঘৃণা করো। কিন্তু আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করো না।'²
সহিহাইনে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি শাসকের মাঝে অপছন্দনীয় কিছু দেখে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কারণ, যে ব্যক্তি মুসলমানদের জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করল, সে যেন জাহিলি মৃত্যুবরণ করল।'³
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানের সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমার পরে এমন শাসকরা আসবে যারা আমার বাতলে দেওয়া সুপথ গ্রহণ করবে না, আমার সুন্নাহর অনুসরণ করবে না। তাদের মাঝে এমন সব ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটবে, যারা দেখতে মানুষের মতো হবে, কিন্তু তাদের হৃদয় হবে শয়তানের মতো' (অর্থাৎ মানবরূপী শয়তান)। হুজাইফা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তখন থাকলে কী করব? তিনি বললেন, 'শাসকের কথা শুনবে, আনুগত্য করবে। যদি সে তোমার পিঠের চামড়া উঠিয়ে ফেলে, তোমার ধন-সম্পদ কেড়ে নেয়, তবুও তার কথা শুনবে, মানবে।'⁴
সালামা ইবনে ইয়াজিদ বলেন, হে আল্লাহর নবি, আমাদের মাঝে যদি এমন শাসক আসে, যারা আমাদের থেকে তাদের হক ঠিকই বুঝে নেয়, কিন্তু আমাদের হক থেকে বঞ্চিত করে, তা হলে এ ব্যাপারে আপনি কী নির্দেশ দেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো জবাব দিলেন না। তিনি দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করেন। রাসুলুল্লাহ তখনও চুপ থাকেন। তখন সাহাবি আশআস ইবনে কায়স তাকে টান দিয়ে বলেন (অন্য বর্ণনায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ বলেন), 'তাদের কথা শুনবে ও আনুগত্য করবে। কেননা তাদের হিসাব তাদের দিতে হবে। তোমাদের হিসাব তোমাদের দিতে হবে।'⁵
টিকাঃ
১. মুসলিম (১৮৫৪); আবু দাউদ (৪৭৬০); তিরিমিজি (২২৬৫)। ২. মুসলিম (১৮৫৫); তিরমিজি (২২৬৪); ইবনে হিব্বান (৪৫৮৯)। ৩. বুখারি (৭০৫৪, ৭১৪৩); মুসলিম (১৮৪৯)। ৪. মুসলিম (১৮৪৭); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৬৭১৪)। ৫. মুসলিম (১৮৪৬); তিরমিজি (২১৯৯)।
📄 শাসকের সঙ্গে সালাফের কর্মপদ্ধতি
মূলত এসব নসের কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফ সবরের পথ অবলম্বন করেছেন। ফলে শাসক যদি জালেম ও পাপী হয়, মুসলমানদের উপর অত্যাচারী ও তাদের হক বিনষ্টকারী হয়, তবু তারা নীরব থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হ্যাঁ, কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে গেলে তখন সর্বসম্মতিক্রমে বিদ্রোহ বৈধ হবে। কিন্তু জুলুম যতই হোক, বিদ্রোহকে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠজন বৈধ বলেননি। এখানে প্রথমে আমরা ইমামদের কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করব, এরপর এ ব্যাপারে পর্যালোচনা তুলে ধরব।
• ইমাম আবুল হাসান আশআরি লিখেন, 'আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, শাসকের কল্যাণের জন্য দোয়া করা, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করা, ফিতনার সময় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করা।'¹
• বাকিল্লানি লিখেন, 'সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাত এবং মুহাদ্দিসের মতে, জুলুমের কারণে শাসককে পদচ্যুত করা কিংবা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ নয়; বরং তাকে নসিহত করা এবং অন্যায় কাজে তার আনুগত্য বর্জন করা ওয়াজিব।'²
• ইমাম তহাবিও জালেমের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বৈধ মনে করতেন না, যা তার উপরের বক্তব্যে সুস্পষ্ট: 'আমাদের শাসক ও নেতৃবৃন্দ জালেম হলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ মনে করি না। তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করি না। তাদের আনুগত্য লঙ্ঘন করি না। গুনাহের নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আনুগত্য মূলত আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে অনিবার্য (ফরজ) মনে করি। আমরা তাদের শুদ্ধি এবং সংশোধনের জন্য দোয়া করি।'
• ইমাম আবুল ইউসর বাজদাবি বলেন, 'শাসক ফাসেক হলে তার জন্য তাওবার দোয়া করা ওয়াজিব। বিদ্রোহ বৈধ নয়। এটা ইমাম আবু হানিফার মাজহাব। কারণ, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।'³
• ইমাম নববি লিখেন, 'ফিসক ও জুলুমের কারণে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হারাম। এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আর এ কারণে ফুকাহা, মুহাদ্দিসিন, মুতাকাল্লিমিন এক কথায় সকল আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মত হলো, ফিসক, জুলুম ও অপরাধের কারণে শাসককে অপসারণ করা যাবে না, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা জায়েজ হবে না। হাজ্জাজ-সহ অন্যান্য জালিমের উপর তাবেয়িদের বিদ্রোহ কেবল জুলুমের কারণে ছিল না; বরং তারা আল্লাহর শরিয়তকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল, এ জন্য তারা বিদ্রোহ করেছেন। আমাদের কিছু আলিম থেকে এটা বৈধ প্রমাণিত আছে, কিন্তু সেটা ইজমার বিপরীত। তাই জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ প্রমাণিত হলো।'⁴ অর্থাৎ নববির কাছে এটা ইজমা।
ইবনে হাজার আসকালানি ইবনে বাত্তালের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, 'এর মাধ্যমে জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা প্রমাণিত হয়। সকল ফকিহ জবরদখলকারী শাসকের আনুগত্য ও তার সঙ্গে জিহাদ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে একমত। এমন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেয়ে তার আনুগত্য করাই উত্তম। কারণ, তাতে মুসলমানদের রক্তপাত রক্ষা করা যায়।'
শামসুদ্দিন রমলিও জালেম শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করাকে আহলে সুন্নাতের ইজমা বলেছেন। কারণ তাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি।
আকহাসারি লিখেন, 'শাসকের বিরুদ্ধে জুলুমের কারণে বিদ্রোহ করা যাবে না। কারণ, জুলুমের ভিতরে যত ক্ষতি, বিদ্রোহের ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে সবর করতে হবে। মনে করতে হবে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের কর্মফলে তাকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। জনগণ যদি শাসকের জুলুম থেকে রক্ষা পেতে চায়, আগে নিজেদের মাঝে জুলুম পরিত্যাগ করতে হবে।'⁵
ফলে বড় বড় সাহাবা ও তাবেয়িদের দেখি জুলুমের সময় শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতে। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে উমর, সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব, আলি ইবনুল হুসাইন হাররার ঘটনার সময় ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বারণ করেন। আবার যখন হুসাইন রাজি. কুফার দিকে অগ্রসর হন, তখন ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাসের মতো সাহাবাগণ তাকে বারণ করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। একইভাবে ইবনে আশআসের বিদ্রোহের সময় হাসান বসরি, মুজাহিদ প্রমুখ তার সঙ্গে যোগদান করতে নিষেধ করেন। শাবি বলতেন, এ এক এমন ফিতনা যাতে আমরা ডানে-বামে কোনো দলেই নই। হাজ্জাজের ব্যাপারে হাসান বসরি বলতেন, হাজ্জাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আজাব। ফলে সেটাকে তোমাদের হাত দ্বারা ঠেলতে যেয়ো না; বরং তোমরা আল্লাহর কাছে এটাকে সরিয়ে নেওয়ার দোয়া করো। তলক ইবনে হাবিব বলতেন, ফিতনাকে তাকওয়া দ্বারা মোকাবিলা করো।
• ইবনে কাসির লিখেন, হুসাইন রাজি. যখন কুফার দিকে বের হচ্ছিলেন, তখন তার পছন্দের ও জ্ঞানী মানুষজন সবাই তাকে যেতে না করেন। ইবনে আব্বাস রাজি. তাকে অনেকভাবে বোঝান, কিন্তু তিনি যাওয়াকেই অগ্রাধিকার দেন।
টিকাঃ
১. মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, আশআরি (২৯৫)। ২. তামহিদ, বাকিল্লানি (৪৭৮)। ৩. উসুলুদ্দিন, বাজদাবি (১৯৮)। ৪. শরহে মুসলিম, নববি (১২/২২৯)। ৫. আকহাসারি (২০৩)।
📄 সন্দেহের অপনোদন
উপরের হাদিসগুলো এবং সালাফের বক্তব্য থেকে কী বোঝা যায়? একদল আলিম বুঝেছেন, সালাফ সর্বসম্মতিক্রমে জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে সুস্পষ্ট হারাম, অবৈধ ও বিশৃঙ্খলা মনে করতেন। ফলে শাসক যত বড় জালেমই হোক, যত অত্যাচার করুক, যত অন্যায় ও অনাচার করুক, সুস্পষ্ট কুফর পাওয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। এক্ষেত্রে তারা এতটাই অতিরঞ্জিত করেন যে, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মতো কুরআন-সুন্নাহর অমোঘ নীতিও তথাকথিত শান্তিনীতির কাছে লঘু ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কারণ, তারা সামান্য অন্যায়ের প্রতিবাদকেও বিদ্রোহ মনে করেন, শাসকের অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে একটু আওয়াজ উঠলেই খারেজি আখ্যা দেন।
বাস্তবেও কি তা-ই? প্রকৃতপক্ষেই কি শাসকের প্রতি সালাফের সবার এক ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল? জালেমের জুলুমের প্রতিবাদ মানেই কি খারেজিপনা? সালাফের কেউ কি জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি? সহজে উত্তর, না; বরং পিছনে অন্যান্য জায়গায় যেভাবে নিজেদের মতকে সালাফের সবার মত বলে দাবি করা হয়েছে, এখানেও তা-ই হয়েছে। এটা ঈমানের কোনো মৌলিক বিষয় নয়, প্রতিনিয়ত চর্চিত কোনো ইবাদত নয়; বরং এটা দুনিয়া পরিচালনা ও রাজনীতি। ফলে এখানে মতভেদ হবেই। বরং উম্মতে মুহাম্মাদির সর্বোত্তম প্রজন্মের মাঝেও এগুলো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেখানে পরবর্তী যুগে তো আরও বেশি হয়েছে। ফলে হাজার হাজার সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি সবাই একইরকম রাজনীতিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতেন—এটা বলা দুঃসাহসিকতা। আর শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দূরের কথা, বরং তার অন্যায়ের বৈধ সমালোচনা (নাহি আনিল মুনকার) যা কুরআন-সুন্নাহে অপরিহার্য করা হয়েছে, সেটাকেও বিদ্রোহ বলে আখ্যা দেওয়া এবং খারেজিদের কাজ বলা মূলত মুরজিয়াদের মতাদর্শ। সালাফের অনুসরণের দাবিদার অনেকেই এমন অসুস্থ মতাদর্শে আক্রান্ত।
ইবনে হাজাম লিখেন, 'কেউ কেউ এটাকে (জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করাকে) ইজমা বলেছেন; অথচ এটা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কারণ, সালাফের অনেকেই এর বিরোধিতা করেছেন। হাররার ঘটনার দিন শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ও তাঁর সঙ্গে থাকা বড় বড় সাহাবাও ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। হাসান বসরি ও প্রথম সারির তাবেয়িগণ হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন। সুতরাং এটা ইজমা হয় কী করে?'¹ বরং ইবনে হাজাম এটাকে আলি, আয়েশা, তালহা, জুবাইর, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর, মুহাম্মাদ ইবনে হাসান ইবনে আলি, হাররার ঘটনায় যোগদানকারী সাহাবি ও তাবেয়ি, হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগদানকারী সকল সাহাবি ও তাবেয়ি কিংবা তাদের সমর্থনকারী, যেমন: আনাস ইবনে মালিক, আবু হানিফা, মালেক ও শাফেয়ির মাজহাব বলেছেন। তারা কেউ কথার মাধ্যমে আবার কেউ সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিদ্রোহ করেছেন।²
কেবল ইবনে হাজাম নয়, অনেকেই এ মত সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ শাসক জালেম হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যায়। তবে কেউ কেউ স্রেফ জালেম নয়, বরং প্রচণ্ড জালেম হওয়ার শর্ত দিয়েছেন। যেমন: ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া ও হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের জুলুম ছিল সীমাছাড়া। ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে সালাফ জুলুমের পরিমাণ-সহ বিদ্রোহের জন্য কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু কেউ বলেননি যে, ইয়াজিদ ঠিক ছিল আর হুসাইন রাজি. তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী (বাগি) ছিলেন।
এমন আরেকজন সালাফ হলেন ইবনে আব্বাস রাজি.-এর মাওলা ইকরিমা রাহি.। শাসক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সালাফের অনেকে তার ব্যাপারে কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি সিকাহ ও নির্ভরযোগ্য তাবেয়ি। ফলে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের মতো ইমামরাও তার বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করেছেন। সমকালীন কিছু লোক ইকরিমার হাদিসে সন্দেহ করেন। কারণ, তিনি মুরতাদ হত্যা-সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। এদের ধারণা, তিনি যেহেতু খারেজি মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন, তাই এমন হাদিস বর্ণনা করেছেন। এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এই ইমামের প্রতি অপবাদ, ইকরিমার ব্যাপারে সালাফের কথার অপব্যাখ্যা। ইবনে হাজার আসকালানি ও জাহাবি-সহ সকল মুহাক্কিক সেটার সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসলে এদের কাছে তাঁর অপরাধ হলো তিনি জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে সমর্থন করতেন।³
আবু বকর জাসসাস এ ব্যাপারে আবু হানিফা রাহি.-এর মাজহাব প্রসঙ্গে বলেন, 'জালেমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার মাজহাব প্রসিদ্ধ।' বরং তিনি সক্রিয়ভাবে মুহাম্মাদ আন-নাফসুজ জাকিয়্যাহ-সহ বিভিন্ন বিদ্রোহ ও বিদ্রোহকারীকে সহায়তা করেন। জাসসাস মনে করেন, যারা ইমাম আবু হানিফার নামে ভিন্ন কোনো মত প্রচার করেছে, তারা হয়তো ভুল করেছে, নতুবা মিথ্যা বলেছে।⁴ কিন্তু পরবর্তীকালে হানাফিদের মাঝে এই ধারা অব্যাহত থাকেনি। পিছনে আমরা ইমাম তহাবি ও বাজদাবির বক্তব্য উল্লেখ করেছি। তাতে সেটা স্পষ্ট হওয়ার কথা। এর কারণ একটু পরে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ইমাম মালেকের কথা দ্বারা বোঝা যায়, তিনি জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা পছন্দ করতেন না, আবার নাজায়েজও মনে করতেন না। কিন্তু তিনি প্রত্যাশা করতেন আল্লাহ যেন তাকে সরিয়ে দেন। তিনি বলতেন, শাসক যদি উমর ইবনে আবদুল আজিজের মতো হয়, তবে তাকে সাহায্য করতে হবে, তার পক্ষে যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু তেমন না হলে তাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহ অন্য কোনো জালেমের মাধ্যমে এই জালেমকে শায়েস্তা করবেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইমাম মালেক জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীকেও জালেম বুঝতেন। পরবর্তীকালে সম্ভবত তিনি জালিমের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় হন। ফলে যখন মুহাম্মাদ আন-নাফসুজ জাকিয়্যাহ আবু জাফর মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তখন তিনি তার হাতে বাইয়াত নেওয়ার ফাতাওয়া দেন। কেউ বলল, 'আমরা তো মানসুরের হাতে বাইয়াত নিয়েছি।' তিনি বলেন, 'সেটা জোরজবরদস্তি ছিল। আর জোর করে বাইয়াত হয় না।' এভাবে দেখা যাচ্ছে, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালেক দুজনই মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সমর্থন করেন।
যখন ইবনে আশআস হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তার সঙ্গে এক-দুইজন নয়, চার হাজার তাবেয়ি সে বিদ্রোহে শরিক হন। তাদের মাঝে প্রথম সারির তাবেয়ি, যেমন: সাইদ বিন জুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা প্রমুখ, ছিলেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের বিরুদ্ধেও তাবেয়িরা যুদ্ধ করেন।
সুতরাং সকল সালাফ জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার বিপক্ষে এমন বলার সুযোগ নেই। বরং তারা দুটি মতের উপর ছিলেন: একদল জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জায়েজ মনে করতেন। তারা এটাকে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার হিসেবে দেখতেন। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফ এটাকে নাজায়েজ মনে করতেন। তারা মূলত রাসুলুল্লাহর নিষেধাজ্ঞা, বিদ্রোহপরবর্তী বিশৃঙ্খলা, মুসলমানদের বিভক্তি ও পারস্পরিক হানাহানির সুযোগে কাফেরদের আগ্রাসন ইত্যাদি আশঙ্কা সামনে রেখে নিষেধ করতেন।
টিকাঃ
১. মারাতিবুল ইজমা, ইবনে হাজাম (১৭৮)। ২. আল-ফাসল, ইবনে হাজাম (৪/১৩২)। ৩. ফাতহুল বারি (১/৪২৮); সিয়ারু আলামিন নুবালা (রিসালা) (৫/৩৪)। ৪. আহকামুল কুরআন, জাসসাস (১/৮৬-৮৭)।