📄 নবি-রাসূলগণ মুসলিম জাতির গুরুত্বপূর্ণ রুকন
এটা ইসলামের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আর দ্বীন ও জীবনব্যবস্থার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় মানুষের হাতে ছেড়ে দেবেন, এটা হতেই পারে না। ফলে যখন আমরা জানতে পারি আল্লাহর কাছে জীবনব্যবস্থা ও দ্বীন একটিই, যুগে যুগে সকল সম্প্রদায়ের কাছে তিনি সেই একমাত্র দ্বীন সহকারে বার্তাবাহক প্রেরণ করেছেন, তখন আমরা এর বিশাল বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে পারি।
মানুষের জন্য আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত জগতের একমাত্র ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহ বলেন, ইন্নাদ দ্বীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম। [আলে ইমরান: ১৯]
ইসলামের সূচনা জগতের সূচনা থেকে। প্রথম যুগের সকল মানুষ ছিল মুসলমান। আল্লাহ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে নবি-রাসুল প্রেরণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'নবিগণ একই পিতার সন্তানের মতো; তাদের মা (অর্থাৎ শরিয়ত) ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু সবার দ্বীন এক ও অভিন্ন।'১
মুসলমানরা নবিদের এতটা সম্মান করে, যা তাদের অনুসারী দাবিদাররাও করে না। মুসলিমরা মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালামকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত আবু বকর, উমর ও উসমান রাজি.-কে যেমন ভালোবাসে, তেমন ভালোবাসে আলি, হাসান ও হুসাইন রাজি.-কে। শিয়াদের মতো আমরা নবিদের মাঝে বিভেদ করি না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেন, 'আমি কিয়ামতের দিন সকল আদম সন্তানের নেতা। সর্বপ্রথম আমার কবর বিদীর্ণ হবে।'২ আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা বনু হাশিম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন।'৩ আরেকটি হাদিসে তিনি বলেন, 'যদি মুসা জীবিত থাকতেন, আমার অনুসরণ না করে তার উপায় ছিল না।৪
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৪৪৩); সহিহ ইবনে হিব্বান (৬১৯৪)।
২. মুসলিম (২২৭৮); তিরমিজি (৩১৪৮)।
৩. মুসলিম (২২৭৬); তিরমিজি (৩৬০৬)।
৪. মুসনাদে আহমদ (১৪৮৫৬); মুসনাদে আবু ইয়ালা (২১৩৫)।
📄 কবিরা ও সগিরা গুনাহের পরিচয় ও বিধান
কবিরা শব্দের অর্থ হল বড়। কবিরা গুনাহ হলো শিরকের চেয়ে ছোট আর সগিরার চেয়ে বড়। মুহাক্কিক আলিমদের বক্তব্য অনুযায়ী, কবিরা গুনাহ হচ্ছে সেসব গুনাহ, যেগুলোর ব্যাপারে শরিয়তে নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে, অথবা যেগুলোর ব্যাপারে জাহান্নামের হুমকির কথা এসেছে।১ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।'২
কিছু কবিরা গুনাহ হলো: * আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। * মানুষ হত্যা করা। * জাদু করা। * নামাজ পরিত্যাগ করা। * জাকাত পরিত্যাগ করা। * সুদ খাওয়া। * জুলুম করা। * ব্যভিচার করা। * মদ্যপান করা। * মিথ্যা কসম খাওয়া। * অহংকার করা। * ওজনে কম দেওয়া। * কোনো সাহাবিকে গালি দেওয়া।১
ইমাম হালিমি বলেন, প্রত্যেকটি গুনাহের সগিরা এবং কবিরা দুটি রূপ রয়েছে।২ আহলে সুন্নাতের মতে কবিরা গুনাহ একটা বড় অপরাধ, কিন্তু কুফর নয়। তবে হালাল মনে করলে কুফর। কবিরা গুনাহ থেকে মুক্তির উপায় হলো একনিষ্ঠ হয়ে তাওবা করা। আল্লাহ বলেন, 'তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।' [শুরা: ২৫]
সগিরা গুনাহ অনেক বেশি; আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে পুণ্য ও ভালো কাজে সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ বলেন, 'যদি তোমরা সেসব বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো, তবে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেবো।' [নিসা: ৩১] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এক জুমা থেকে আরেক জুমার মধ্যবর্তী সকল গুনাহের কাফফারাস্বরূপ, কবিরা গুনাহ না করার শর্তে।'২
টিকাঃ
১. ফাতহুল বারি (১২/১৮৪)।
২. মুসলিম (১০১); ইবনে মাজা (২২২৫)।
১. সকল কবিরা গুনাহ কুরআন-সুন্নাহর দলিলসহ দেখুন: আল-কাবায়ের, ইমাম জাহাবি।
২. আল-মিনহাজ, হালিমি (১/৩৯৬-৩৯৯)।
২. মুসলিম (২২৮); ইবনে হিব্বান (১০৪৪)।
📄 পৃথিবীতে মুমিন ও কাফেরের পার্থক্য
কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি শাস্তিযোগ্য হলেও ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় না, যদি না এটাকে হালাল মনে করে। আহলে সুন্নাত কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে কাফের বলেন না; বরং তাকে ফাসেক তথা গুনাহগার বিবেচনা করেন। খারেজি ও মুতাজিলা সম্প্রদায় কবিরা গুনাহকে কুফরের মতো মনে করে। খারেজিরা তাকে সরাসরি কাফের বলে। মুরজিয়া সম্প্রদায় মনে করে, গুনাহ কোনো সমস্যা নয়। আহলে সুন্নাতের অবস্থান এই দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি। তারা বলেন—কবিরা গুনাহ ঈমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যদি তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে পরকালে সে ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে। এটি সকল নবির মুমিন উম্মতের জন্য প্রযোজ্য।
📄 পরকালে মুমিন ও কাফেরের পার্থক্য
পরকালে গুনাহগার মুসলিম আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি ক্ষমা করতে পারেন, চাইলে শাস্তিও দিতে পারেন; কিন্তু শাস্তির ক্ষেত্রে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হতে হবে না। তার কাছে এমন একটি সম্পদ রয়েছে, যা কাফের ও মুশরিকদের কাছে নেই—আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি। আল্লাহ কুরআনের একাধিক আয়াতে বলেছেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন না যে তাঁর সাথে কাউকে শরিক করে। এ ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।' [নিসা: ১১৬]
আল্লাহ তায়ালা তাঁর মারিফাতপ্রাপ্ত বান্দাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা তাদের মতো হতে পারে না যারা তাঁকে চেনে না। জাবের রাজি. থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদিস বর্ণিত আছে, 'আমার শাফায়াত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্য।'১ উবাদা ইবনুস সামিত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, '...যদি কেউ অন্যায় করে এবং আল্লাহ তায়ালা সেটাকে ঢেকে রাখেন, তা হলে এর ফয়সালা আল্লাহর হাতে থাকবে। চাইলে তিনি শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করে করবেন।'১
টিকাঃ
১. সহিহ ইবনে হিব্বান (৬৪৬৭); আবু দাউদ (৪৭৩৯); তিরমিজি (২৪৩৫)।
১. বুখারি (৪৮৯৪); মুসলিম (১৭০৯)।