📄 দ্বিতীয় দলের বক্তব্যের পর্যালোচনা
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, তারা খবরে ওয়াহিদকে অস্বীকার করেন না।১ একইভাবে তারা যখন বলেন, খবরে ওয়াহিদ ইয়াকিনের স্তরে নয়, বরং 'জন্ন'-এর স্তরে, তাদের এই 'জন্ন'-এর অর্থ স্রেফ ধারণা উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের উদ্দেশ্য হলো, খবরে ওয়াহিদ দ্বারা সেই ইয়াকিন অর্জিত হয় না যা 'মুতাওয়াতির' হাদিস দ্বারা অর্জিত হয়।২
আফসোস! তাদের আপত্তি রাসুলের উপর নয়, বরং দীর্ঘ মানব-লাইনের উপর। মুতাওয়াতির যেখানে ইয়াকিন ও ইসমাতের প্রমাণ, ওয়াহিদ সেটার প্রমাণ নয়। বর্ণনাকারী এখানে নিষ্পাপ নন। তারা বলেন, আকিদার ক্ষেত্রে আমরা এই বর্ণনাকে সে পর্যায়ে রাখব না, যে পর্যায়ে কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিসকে রাখব।৩
উক্ত কথার কারণে কাউকে হাদিস অস্বীকারকারী বলা যায় না। তারা এ ব্যাপারে যুক্তি দেন, সাহাবাগণ আমলের হাদিস গ্রহণ করে আকিদার হাদিস বর্জন করতেন না। উপরন্তু সাহাবাগণ 'খবরে ওয়াহিদ প্রত্যাখ্যান করতেন না'-এমন বক্তব্যও সঠিক নয়। যেমন: আবু বকর রাজি.-এর কাছে এক নারী মিরাসে দাদির অংশের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সাহাবাদের জিজ্ঞাসা করেন। মুগিরা ইবনে শুবা ও মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামার সাক্ষ্য সাপেক্ষে তিনি তা গ্রহণ করেন।১ একইভাবে উমর রাজি. আবু মুসা আশআরির বর্ণনার জন্য আবু সাঈদ খুদরি রাজি.-এর সাক্ষ্য চেয়েছিলেন।২
ইতবান ইবনে মালেকের একটি হাদিস মাহমুদুল ইবনুর রবি' বর্ণনা করলে আবু আইউব আনসারি প্রতিবাদ করেছিলেন।৩ শুধু এতটুকু নয়, সাহাবায়ে কেরামও মানবিক ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. সুরা ফালাক ও নাসকে কুরআনের অংশ মনে করতেন না।৪ আয়েশা রাজি. বড় মানুষকে দুগ্ধ পান করিয়ে দুধের সন্তানের সম্পর্ক গড়া বৈধ ভেবেছিলেন।৫ মুতআ বিয়ের ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস রাজি. ভুল করেছিলেন।৬ গারানিকের ঘটনায়ও একাধিক সাহাবির ইজতিহাদি ভুল হয়েছিল।৭
তা হলে সাহাবায়ে কেরামের কেউ পরবর্তীকালে কোনো হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজের অজান্তে ও অজ্ঞাতসারে ভুল করতে পারেন না—এমন গ্যারান্টি নেই। তবে দ্বিতীয় ধারার আলিমগণ এগুলোকে অজুহাত বানিয়ে হাদিস প্রত্যাখ্যান করেন না। বরং তারা বলেন, আমরা এটাকে ইয়াকিনের সেই পর্যায়ে রাখব না, যে পর্যায়ে কুরআন ও মুতাওয়াতিরকে রাখি।৮ সদরুল ইসলাম বাজদাবি রাহি. লিখেন, আমরা হাদিস খবরে ওয়াহিদ হলেও প্রত্যাখ্যান করা বৈধ মনে করি না।৯
টিকাঃ
১. তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ, মাতুরিদি (৫/৫১০); শরহে নুখবাতিল ফিকার, আলি কারি (২১৮)।
২. ফাতহুল মুলহিম, শাব্বির আহমদ উসমানি (১/২৩)।
৩. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১৭১)।
১. মুসনাদে আহমদ (১৮২৬৩)।
২. মুসলিম (২১৫৩)।
৩. বুখারি (১১৮৫); মুসলিম (৩৩)।
৪. বুখারি (৪৯৭৭)।
৫. সুনানে ইবনে মাজা (১৯৪৭); মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (১৩৮৮৬)।
৬. তিরমিজি (১১২১)।
৭. শিফা, কাজি ইয়াজ (২/১২৬); তাফসিরে ইবনে কাসির (৫/৩৮৭)।
৮. দেখুন: উসুলুস সারাখসি (১৫৩-১৫৮); মারিফাতুল হুজাজিশ শরইয়্যাহ, বাজদাবি (১২৩-১২৫)।
৯. উসুলুদ্দিন, বাজদাবি (৩৯)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হচ্ছে দুটোর মাঝামাঝি। একদিকে যেমন খবরে ওয়াহেদ ও মুতাওয়াতিরকে এক ভাবা এবং এক স্তরে রাখা যৌক্তিক নয়, অপরদিকে অযথা হাদিস বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে সন্দেহ করাও উচিত নয়। কারণ, ইসলামের ইতিহাসে মুহাদ্দিসগণ হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যে বিরল নজির স্থাপন করেছেন, তা মানুষের ইতিহাসে আর কোথাও নেই। বর্তমানেও অনেক শাইখ মানুষ ফিতান ও মালাহিম-সংক্রান্ত হাদিস এবং মুরতাদ হত্যার হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তাদের যুক্তিও একই—খবরে ওয়াহেদ দিয়ে আকিদা সাব্যস্ত করা যাবে না।
আমরা খবরে ওয়াহিদের মাধ্যমে প্রমাণিত আকিদাকে কুরআন কিংবা তাওয়াতুরের পর্যায়ে রাখব না, আবার বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হলে এবং কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে সেগুলোতে অযথা সন্দেহও করব না, অস্বীকার করব না। মুতাওয়াতির সনদে প্রমাণিত কোনো মৌলিক আকিদা অস্বীকার করা কুফর। বিপরীতে খবরে ওয়াহিদের মাধ্যমে প্রমাণিত কোনো আকিদায় কেউ সন্দেহ করলে সেটাকে কুফর বলা যাবে না। তাই বিপরীত মানহাজের ব্যাপারে কথা বলার সময় এসব পার্থক্য আমাদের মাথায় রাখতে হবে। যেন কারও লঘু অপরাধের কারণে তাকে কাফের-মুশরিক কিংবা গোমরাহ ফাতাওয়া দেওয়া থেকে বাঁচা যায়।