📄 খবরে ওয়াহেদ হাদিস কি আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য?
এখানে আরেকটি বিষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করা জরুরি। তা হলো, কোন ধরনের হাদিস আকিদার ক্ষেত্রে দলিল হতে পারে? একদল আলিমের মতে, সব ধরনের বিশুদ্ধ হাদিস। সুতরাং শর্ত হলো হাদিসটি বিশুদ্ধ হওয়া। এর পর সেটা মুতাওয়াতির (অনেকের বর্ণনা) কিংবা ওয়াহিদ (এক/দুই ব্যক্তির বর্ণনা) হোক, তাতে কিছু যায়-আসে না।১ আরেক দল আলিমের মতে, কেবল মুতাওয়াতির হাদিস আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, খবরে ওয়াহিদ আকিদার ক্ষেত্রে দলিল নয়। কারণ, এটা ‘ইলমে ইয়াকিন’ (তথা সুনিশ্চিত জ্ঞান)-এর পর্যায়ে নয়।২
টিকাঃ
১. এগুলোর সংখ্যা অনুপাতে আবার ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। বিস্তারিত দেখতে পারেন: তাইসিরু মুসতালাহিল হাদিস, ড. মাহমুদ তহহান।
২. উসুলুল বাজদাবি (কাশফুল আসরারের মাতন) (২/৩৭০)।
📄 সকল মুমিন আল্লাহর ওলি
সকল মুমিন তার ঈমানের কারণে আল্লাহর বন্ধু, প্রিয় ও অনুগ্রহভাজন। ঈমানের তারতম্যের কারণে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কে তারতম্য ঘটে। কিন্তু ঈমানের বদৌলতে কুরআন-হাদিসে মুমিনদের সামগ্রিকভাবে আল্লাহর বন্ধু বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
আলা ইন্না আউলিয়াআল্লাহি লা খাউফুন আলাইহিম... [ইউনুস: ৬২-৬৪]
আল্লাহ বলেন,
ওয়ামা লাহুম আল্লা ইউআজ্জিবাহুমুল্লাহু... [আনফাল: ৩৪]
অন্য আয়াতে বলেন,
ইন্না অলিয়্যিয়াল্লাহুল্লাজি নাযযালা কিতাবা... [আরাফ: ১৯৬]
অন্য আয়াতে বলেন,
আল্লাহু অলিয়্যুল্লাজিনা আমানু... [বাকারা: ২৫৭]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। ফরজের চেয়ে আর কোনো বিষয়ের মাধ্যমে বান্দা আমার অধিক নিকটবর্তী হতে পারে না...।'১
প্রমাণিত হলো, যারাই আল্লাহকে ভয় করবে, শরিয়তের বিধি-নিষেধ মেনে চলবে, তারাই আল্লাহর ওলি। ইসলামে সবাই সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্রেফ কুরআন-সুন্নাহ মানা, আল্লাহর নির্দেশ পালন করাই বেলায়াতের পথ। প্রত্যেক মুমিন আল্লাহর ওলি হতে পারে। কারামত-সম্পর্কিত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আসবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. বুখারি (৬৫০২); বাইহাকি (সুনানে কুবরা) (৬৪৮৬); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৭০৮৭)।
২. ফাতহুল বারি (১১/৩৪২)।
📄 ইমানের রূপ ছয়টি
ঈমানের সংজ্ঞা বর্ণনার করার পরে ইমাম তহাবি রাহি. ঈমানের রুকন তথা যেসব বিষয়ের উপর ইজমালি ঈমান আনা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য, সেগুলো বর্ণনা করছেন। আর সেগুলো হলো: আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি গ্রন্থ, নবি, রাসুল, আখিরাত, তাকদিরের ভালোমন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে—এ মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।
এটা মূলত কুরআন-হাদিস থেকে উৎসারিত। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,
লাইসাল বিররা আন তুওয়াল্লু উজুহাকুম ক্বিবালিল মাশরিকি ওয়াল মাগরিব ওয়ালাকিননাল বিররা মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়াল মালাইকাতি ওয়াল কিতাবি ওয়ান নাবিয়্যিন। [বাকারা: ১৭৭]
হাদিসে জিবরিলে এসেছে, জিবরিল আলাইহিস সালাম যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাস করা।’১
টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।
📄 নবি-রাসূলগণ মুসলিম জাতির গুরুত্বপূর্ণ রুকন
এটা ইসলামের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আর দ্বীন ও জীবনব্যবস্থার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় মানুষের হাতে ছেড়ে দেবেন, এটা হতেই পারে না। ফলে যখন আমরা জানতে পারি আল্লাহর কাছে জীবনব্যবস্থা ও দ্বীন একটিই, যুগে যুগে সকল সম্প্রদায়ের কাছে তিনি সেই একমাত্র দ্বীন সহকারে বার্তাবাহক প্রেরণ করেছেন, তখন আমরা এর বিশাল বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে পারি।
মানুষের জন্য আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত জগতের একমাত্র ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহ বলেন, ইন্নাদ দ্বীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম। [আলে ইমরান: ১৯]
ইসলামের সূচনা জগতের সূচনা থেকে। প্রথম যুগের সকল মানুষ ছিল মুসলমান। আল্লাহ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে নবি-রাসুল প্রেরণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'নবিগণ একই পিতার সন্তানের মতো; তাদের মা (অর্থাৎ শরিয়ত) ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু সবার দ্বীন এক ও অভিন্ন।'১
মুসলমানরা নবিদের এতটা সম্মান করে, যা তাদের অনুসারী দাবিদাররাও করে না। মুসলিমরা মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালামকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত আবু বকর, উমর ও উসমান রাজি.-কে যেমন ভালোবাসে, তেমন ভালোবাসে আলি, হাসান ও হুসাইন রাজি.-কে। শিয়াদের মতো আমরা নবিদের মাঝে বিভেদ করি না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেন, 'আমি কিয়ামতের দিন সকল আদম সন্তানের নেতা। সর্বপ্রথম আমার কবর বিদীর্ণ হবে।'২ আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা বনু হাশিম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন।'৩ আরেকটি হাদিসে তিনি বলেন, 'যদি মুসা জীবিত থাকতেন, আমার অনুসরণ না করে তার উপায় ছিল না।৪
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৪৪৩); সহিহ ইবনে হিব্বান (৬১৯৪)।
২. মুসলিম (২২৭৮); তিরমিজি (৩১৪৮)।
৩. মুসলিম (২২৭৬); তিরমিজি (৩৬০৬)।
৪. মুসনাদে আহমদ (১৪৮৫৬); মুসনাদে আবু ইয়ালা (২১৩৫)।