📄 হাদিস অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সতর্কবাণী
মুসলিম বিশ্বে সম্প্রতি একটি ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যারা আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ অস্বীকার করে, কিন্তু মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য আল্লাহর কুরআনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ মুসলমানরা যেহেতু সুন্নাহকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে তাদের প্রত্যাখ্যান করবে, এ জন্য তারা সুন্নাহকে সরাসরি নিশানা বানায় না, বরং কুরআন আঁকড়ে ধরার প্রতি গুরুত্ব দেয়। অথচ সুন্নাহ ছাড়া কেবল কুরআনের মাধ্যমে ইসলাম দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ দুটোই আল্লাহর ওহি। কুরআন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলছে,
ওয়া মা ইয়ানতিক্বু আনিল হাওয়া... [নাজম: ৩]
কুরআনের অপর আয়াতে এসেছে,
ওয়া মা আতাকুমুর রাসুলু ফাখুজুহু... [হাশর: ৭]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাহ অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে সতর্ক করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেন, 'মনে রেখো, আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং কুরআনের সঙ্গে সমপরিমাণ দেওয়া হয়েছে। সাবধান! অতি শীঘ্রই এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা পেট পুরে খেয়ে চেয়ারে চিত হয়ে বলবে, তোমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট।'১ এ কারণে ইমাম তহাবি তাদের খণ্ডনে বলেছেন, 'হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যত বক্তব্য ও বিধি-বিধান বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত, সবকিছুই সত্য।' এগুলোকে অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এ সম্প্রদায় অসংখ্য মানুষকে গোমরাহ করছে। তারা কুরআন মানে, অথচ কুরআন তাদের কাছে অবতীর্ণ হয়নি, আল্লাহর রাসুলের মাধ্যমেই এসেছে। একটাকে গ্রহণ করে আরেকটা অস্বীকার করার মানে কী? কুরআন আকাশ থেকে ছাপা হয়ে আসেনি। সাহাবায়ে কেরাম কুরআন সংকলন করেছেন। হাদিসও তারা বর্ণনা করেছেন। একটাকে স্বীকার করে আরেকটা অস্বীকার করা বৈপরীত্য। আল্লাহ তাদের হিদায়াতের আলো দিন। কুরআন ও সুন্নাহ দুটোকেই গ্রহণ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের রাজপথে ওঠার তাওফিক দিন।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ (৪৬০৪); মুসনাদে আহমদ (১৭৪৪৯)।
📄 খবরে ওয়াহেদ হাদিস কি আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য?
এখানে আরেকটি বিষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করা জরুরি। তা হলো, কোন ধরনের হাদিস আকিদার ক্ষেত্রে দলিল হতে পারে? একদল আলিমের মতে, সব ধরনের বিশুদ্ধ হাদিস। সুতরাং শর্ত হলো হাদিসটি বিশুদ্ধ হওয়া। এর পর সেটা মুতাওয়াতির (অনেকের বর্ণনা) কিংবা ওয়াহিদ (এক/দুই ব্যক্তির বর্ণনা) হোক, তাতে কিছু যায়-আসে না।১ আরেক দল আলিমের মতে, কেবল মুতাওয়াতির হাদিস আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, খবরে ওয়াহিদ আকিদার ক্ষেত্রে দলিল নয়। কারণ, এটা ‘ইলমে ইয়াকিন’ (তথা সুনিশ্চিত জ্ঞান)-এর পর্যায়ে নয়।২
টিকাঃ
১. এগুলোর সংখ্যা অনুপাতে আবার ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। বিস্তারিত দেখতে পারেন: তাইসিরু মুসতালাহিল হাদিস, ড. মাহমুদ তহহান।
২. উসুলুল বাজদাবি (কাশফুল আসরারের মাতন) (২/৩৭০)।
📄 সকল মুমিন আল্লাহর ওলি
সকল মুমিন তার ঈমানের কারণে আল্লাহর বন্ধু, প্রিয় ও অনুগ্রহভাজন। ঈমানের তারতম্যের কারণে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কে তারতম্য ঘটে। কিন্তু ঈমানের বদৌলতে কুরআন-হাদিসে মুমিনদের সামগ্রিকভাবে আল্লাহর বন্ধু বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
আলা ইন্না আউলিয়াআল্লাহি লা খাউফুন আলাইহিম... [ইউনুস: ৬২-৬৪]
আল্লাহ বলেন,
ওয়ামা লাহুম আল্লা ইউআজ্জিবাহুমুল্লাহু... [আনফাল: ৩৪]
অন্য আয়াতে বলেন,
ইন্না অলিয়্যিয়াল্লাহুল্লাজি নাযযালা কিতাবা... [আরাফ: ১৯৬]
অন্য আয়াতে বলেন,
আল্লাহু অলিয়্যুল্লাজিনা আমানু... [বাকারা: ২৫৭]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। ফরজের চেয়ে আর কোনো বিষয়ের মাধ্যমে বান্দা আমার অধিক নিকটবর্তী হতে পারে না...।'১
প্রমাণিত হলো, যারাই আল্লাহকে ভয় করবে, শরিয়তের বিধি-নিষেধ মেনে চলবে, তারাই আল্লাহর ওলি। ইসলামে সবাই সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্রেফ কুরআন-সুন্নাহ মানা, আল্লাহর নির্দেশ পালন করাই বেলায়াতের পথ। প্রত্যেক মুমিন আল্লাহর ওলি হতে পারে। কারামত-সম্পর্কিত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আসবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. বুখারি (৬৫০২); বাইহাকি (সুনানে কুবরা) (৬৪৮৬); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৭০৮৭)।
২. ফাতহুল বারি (১১/৩৪২)।
📄 ইমানের রূপ ছয়টি
ঈমানের সংজ্ঞা বর্ণনার করার পরে ইমাম তহাবি রাহি. ঈমানের রুকন তথা যেসব বিষয়ের উপর ইজমালি ঈমান আনা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য, সেগুলো বর্ণনা করছেন। আর সেগুলো হলো: আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি গ্রন্থ, নবি, রাসুল, আখিরাত, তাকদিরের ভালোমন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে—এ মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।
এটা মূলত কুরআন-হাদিস থেকে উৎসারিত। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,
লাইসাল বিররা আন তুওয়াল্লু উজুহাকুম ক্বিবালিল মাশরিকি ওয়াল মাগরিব ওয়ালাকিননাল বিররা মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়াল মালাইকাতি ওয়াল কিতাবি ওয়ান নাবিয়্যিন। [বাকারা: ১৭৭]
হাদিসে জিবরিলে এসেছে, জিবরিল আলাইহিস সালাম যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাস করা।’১
টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।