📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইমাম আবু হানিফা কি মুরজিয়া?

📄 ইমাম আবু হানিফা কি মুরজিয়া?


যখন এটা প্রমাণিত হলো যে, ঈমানের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের সঙ্গে আশআরি-মাতুরিদিদের মতপার্থক্য শাব্দিক, মৌলিক নয়; আরও প্রমাণিত হলো যে, তাদের সবাই সর্বসম্মতিক্রমে আমলের উপর জোর দেন; আমলকে একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন; তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক সংজ্ঞা, যেখানে জমহুরের সঙ্গে তাদের দ্বিমত কেবল শাব্দিক, মৌলিক নয়। ফলে এমন একটু ভিন্নতার ফলে তাদের মুরজিয়া বলা অনেক বড় জুলুম এবং অনেক বড় অপবাদ। কারণ, মুরজিয়া হলো একটি ভ্রান্ত সম্প্রদায়, যারা আমলকে কোনো পাত্তাই দেয় না। কেউ সারা জীবন কোনো আমল না করলেও তাকে পূর্ণ ঈমানদার ভাবে, তার ঈমানকে আবু বকর ও জিবরাইলের ঈমানের মতো মনে করে। তাদের সঙ্গে ইমাম আবু হানিফার মতো মানুষকে তুলনা করে মুরজিয়া বলা কতটুকু ইনসাফ? বরং পিছনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, ইমাম আবু হানিফার মাজহাব আর জমহুরের মাজহাবের মাঝে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। একই কথা প্রযোজ্য আশআরি ও মাতুরিদিদের ক্ষেত্রেও। আশআরি-মাতুরিদিরা অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রে জমহুরের সঙ্গে একমত। কেবল আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করেন না, তাও একেবারেই করেন না এমন নয়, বরং সত্যায়ন ও বিশ্বাসের অর্থে করেন না, আত্মসমর্পণের অর্থে করেন। ফলে এই দুই ধারায় আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত বড় বড় ইমাম, যারা আমলের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন এবং এই ধারার সাধারণ মুসলমানরা যারা আমলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত যত্নবান, তাদের মুরজিয়াদের কাতারে ফেলা মোটেই ইনসাফ নয়।

হ্যাঁ, পূর্ববর্তী আলিমদের কারও কারও কলমে ইমাম আবু হানিফাকে মুরজিয়া বলা হয়েছে, যেমন: ইমাম আবুল হাসান আশআরি। তিনি আবু হানিফাকে মুরজিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।২ কিন্তু আজ যেমন গালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সালাফের ইমামগণ আবু হানিফাকে মুরজিয়া গালি অর্থে, কিংবা ভ্রান্ত ফিরকা মুরজিয়াদের সঙ্গে তুলনা করে বলেননি; বরং ইমাম আবু হানিফা কবিরা গুনাহকারীর বিধানকে ‘ইরজা’ করতেন, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে সঁপে দিতেন। সেই কারণে মুরজিয়া বলা হয়েছে। শাহরাস্তানি লিখেন, ‘কেউ কেউ ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীদের মুরজিয়াতুস সুন্নাহ বলেছেন। এর কারণ, তিনি ঈমান বলতে কেবল সত্যায়নকে বুঝতেন। তারা বুঝেছেন, তিনি আমলকে গুরুত্ব দিতেন না; অথচ আমলের ক্ষেত্রে তিনি হাদিসও বর্ণনা করেছেন। তা হলে তিনি কীভাবে আমল ছেড়ে দেবেন? তাকে মুরজিয়া বলার আরেকটি রহস্য আছে। তা হলো, তার যুগে যারাই মুতাজিলা ও খারেজিদের বিরোধিতা করত, তারা তাকে মুরজিয়া হিসেবে আখ্যা দিত। ফলে সম্ভবত তারাই তাকে মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে।’১ ইমাম তাফতাজানি লিখেন, ‘কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার মতে হচ্ছে, সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে—চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, চাইলে ক্ষমা করতে পারেন; আর এটা হচ্ছে হকপন্থিদের মাজহাব, যেটিকে ইরজা বলা হয়। অর্থাৎ কবিরা গুনাহকারীর ফয়সালা আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। আর এ কারণে ইমাম আবু হানিফাকে মুরজিয়া বলা হয়েছে।

ফলে ইমাম আবু হানিফাকে বাতিল মুরজিয়াদের মতো মনে করা কিংবা খোঁচা দেওয়া অসততা ও অনৈতিকতা চর্চা। পূর্ববর্তী আলিমদের যারা ইমাম আবু হানিফাকে মুরজিয়া বলেছেন, উপরের অর্থে বলেছেন। যদিও এটা অনুচিত হয়েছে, তথাপি অপবাদ নয়। যেমন: উসমান রাজি.-এর শাহাদাতের পরে যখন সাহাবাদের মাঝে জটিলতা তৈরি হলো, বিভিন্ন দলে তারা ভাগ হয়ে পড়লেন, তখন কিছু সাহাবি কোনো দলে না গিয়ে চুপ থাকলেন, অপেক্ষা করলেন। এটাকেও ইতিহাসে ইরজা হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে।৩ শাইখ ইবনে আবিল ইজ লিখেন, এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা এবং আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ইমামের মাঝে যে মতবিরোধ রয়েছে, সেটা মৌলিক মতভেদ নয়, বরং শাব্দিক মতভেদ। কারণ, উভয় দলই বলেন, ঈমানের সঙ্গে আমল জরুরি।১ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভিও এটাকে স্রেফ শাব্দিক মতভেদ আখ্যা দিয়েছেন।২ কাশ্মীরি এটাকে 'জুলুম' সাব্যস্ত করেছেন।৩

টিকাঃ
২. মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, আশআরি (১৩৮)।
১. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, শাহরাস্তানি (১/১৪১)।
২. শরহুল মাকাসিদ, তাফতাজানি (২/২৩৮)।
৩. তাহজিবুল আসার, তাবারি (২/৬৫৯)।
১. ইবনে আবিল ইজ (৩১৫-৩২০)।
২. আত-তাফহিমাত (১/২৮)।
৩. ফয়জুল বারি (১২৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইমান কি বাড়ে-কমে?

📄 ইমান কি বাড়ে-কমে?


এটা মূলত পিছনের মাসআলা অর্থাৎ ঈমানের সংজ্ঞার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি মাসআলা। ফলে ওখানে যে মতানৈক্য ছিল, এখানেও একই মতানৈক্য দেখা যাবে। জমহুর সালাফ, ইমাম আশআরি এবং অনেক আশআরিগণ মনে করেন, ঈমান বাড়ে ও কমে। যেমন: সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ফুজাইল ইবনে ইয়াজ, হাফস ইবনে গিয়াস, ওয়াকি, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইয়াজিদ ইবনে হারুন, আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, বুখারি, মুসলিম, আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম, হুমাইদি, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াই প্রমুখ।৪ সহিহ মুসলিমের একটি অধ্যায়ের শিরোনামই এমন: 'ঈমান বাড়ে ও কমে'।৫ বরং সুনানে ইবনে মাজাতে এটা ইবনে আব্বাস, আবু হুরাইরা ও আবুদ দারদার বক্তব্য বলা হয়েছে।৬ ইবনে হাজার এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে, বড় বড় ইমামদের মতামত উল্লেখ করে জমহুরের মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।৭

এক্ষেত্রে তাদের দলিল কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন হাদিসের বাহ্যিক অর্থ। যেমন,

ওয়া ইজা মা উনজিলাত সুরাতুন ফামিনহুম মাই ইয়াকুলু আইয়্যুকুম যাদাতহু হাজিহি ইমানা... [তাওবা: ১২৪]

অন্যত্র বলেন:

হুওয়াল্লাজি আনযালাস সাকিনাতা ফি কুলুবিল মুমিনিনা লিইয়াযদাদু ইমানাম মাআ ইমানিহিম। [ফাতহ: ৪]

অন্য জায়গায় বলেন,

আল্লাজিনা ক্বলা লাহুমুন নাসু ইন্নান নাসা ক্বাদ জামাউ লাকুম ফাখশাউহুম ফাযাদাহুম ইমানা... [আলে ইমরান: ১৭৩]

অন্যত্র বলেন,

ইন্নামাল মুমিনুনাল্লাজিনা ইজা জুকিরাল্লাহু ওয়াজিলাত কুলুবুহুম... [আনফাল: ২]

হাদিসের ক্ষেত্রে তারা সেসব হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করেন, যেসব হাদিসে হৃদয়ে বিন্দু পরিমাণ ঈমান থাকার কথা বলা হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, এক সরষেদানা পরিমাণ থাকার অর্থ হলো, এভাবে ঈমান কমে গিয়েছে। আর যে বস্তু কমে, তা বাড়েও। যেমন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার অন্তরে সরষেদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর যার অন্তরে সরষেদানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।'১ শাফায়াত-সংক্রান্ত লম্বা হাদিসে এসেছে, যখন আল্লাহর রাসুল এক শ্রেণির এমন মুমিনের জন্য সুপারিশ করবেন, যাদের আল্লাহ তায়ালা ইতোমধ্যে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছেন। আল্লাহ তাকে বলবেন, ঠিক আছে, যান। আপনি সেখান থেকে যার হৃদয়ে বিন্দু থেকে বিন্দু, বিন্দু থেকে বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে, তাকেও বের করে নিয়ে আসুন।১ প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখে, তখন সেটা যেন হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি হাত দ্বারা প্রতিহত করতে না পারে, তবে যেন মুখ দিয়ে প্রতিহত করে। আর যদি তাও না পারে, তবে যেন হৃদয় দিয়ে প্রতিবাদ করে। আর এটাই হল সর্বনিম্ন ঈমান।২

অপরদিকে ইমাম আবু হানিফা, মাতুরিদি ও কিছু আশআরি মনে করেন, মূল ঈমান কমা-বাড়ার সুযোগ নেই।৩ মুমিনের আমল ও তাকওয়ার ভিত্তিতে তাদের মর্যাদা, আল্লাহর নৈকট্য কমে-বাড়ে; কিন্তু মূল ঈমান কমে-বাড়ে না। তাদের দলিল: কারণ ন্যূনতম যেসব বিষয়ে ঈমান আনা অপরিহার্য, যেসব বিষয়ে ঈমান না আনলে কাউকে মুমিন বলা যায় না এবং যেসব বিষয়ে ঈমান আনামাত্রই কাউকে মুমিন বলা যায়, সেসব বিষয়ে একজন নবির যেমন ঈমান আনতে হয়, একজন সাধারণ মানুষেরও ঈমান আনতে হয়; আর তা হলো কালিমা বা ঈমানের ছয় রুকন।

হ্যাঁ, সাক্ষ্যের মান ও গভীরতা তো সমান হবে না। ফলে ঈমানের মূল বিষয়ে সব মানুষ সমান হলেও শক্তি-সামর্থ্য ও নুরের ক্ষেত্রে সমান নয়। রাসুলদের ঈমানের ধারেকাছেও সাধারণ মানুষের ঈমান পৌঁছতে পারে না। ইবাদত, আনুগত্য ও তাকওয়ার ভিত্তিতে মুমিনদের মর্যাদা কমেবাড়ে। এটাকেই ইমাম তহাবি বলেছেন, 'ঈমান একটি একক। মূল ঈমানের ক্ষেত্রে সকল মুমিন অভিন্ন স্তরে। তবে তাদের মাঝে স্তরভেদ ঘটে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সর্বাবস্থায় উত্তম পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে।'

এই মতভেদের ফলাফল কী? প্রকৃতপক্ষে এটাও প্রথম মতভেদের মতো শাব্দিক, মৌলিক মতভেদ নয়। জমহুর উলামায়ে কেরাম ঈমানকে শরীরী বস্তু মনে করেন না; বরং এটা বিমূর্ত ও অশরীরী অবস্থা। ফলে ঈমান বাড়া ও কমার যে ব্যাখ্যা তারা দেন, সেটার মাঝে আর আশআরি-মাতুরিদিদের ব্যাখ্যার মাঝে মৌলিক তফাত নেই। সাহাবি উমাইর ইবনে হাবিব ইবনে খুমাশা রাজি. ঈমান বাড়াকমার ব্যাখ্যায় বলেছেন, যখন আমরা আল্লাহর জিকির করি, তাকে ভয় পাই, সেটাকে ঈমান বাড়া বলে। আর যখন তাকে ভুলে যাই, গাফেল থাকি, সেটাকে ঈমান কমা বলে।৩ ইবনে মাসউদ-সহ কয়েকজন সাহাবি থেকে বর্ণিত আছে, তারা দোয়া করতেন-হে আল্লাহ, আমার ঈমান বাড়িয়ে দিন।৪

ইমাম আবু হানিফা বলেন, বিশ্বের সকল মুমিন ঈমান ও তাওহিদের ক্ষেত্রে এক। তাদের মাঝে পার্থক্য আমলের ক্ষেত্রে।'১ মোল্লা আলি কারিও এটাকে ইমাম রাজির উদ্ধৃতি দিয়ে শাব্দিক মতপার্থক্য বলেছেন।২ জফর আহমদ উসমানিও একই কথা বলেন।৩ কাশ্মীরি বলেন, উভয় পক্ষের বক্তব্যই নিজস্ব জায়গায় সঠিক। কিন্তু ইখতিলাফ-পাগল মানুষজন এসে দুই দলকে দুই প্রান্তে নিয়ে যায় এবং বিভেদ ঘটায়।৪ শাব্বির আহমদ উসমানি বলেন, ন্যায়নিষ্ঠ মুহাক্কিকমাত্রই উক্ত মাসআলাতে গভীর দৃষ্টি দিলে অনুভব করবেন, তাতে বিবাদের পরিমাণটা বেশি নয় এবং সেটাও শাব্দিক।৫

টিকাঃ
৪. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (২০৯৫০); মুসনাদে হুমাইদি (উসুলুস সুন্নাহ; ১৩৩৩); আল ইবানাহ, আশআরি (২৭)।
৫. সহিহ মুসলিম (৪৯)।
৬. সুনানে ইবনে মাজা (৭৪, ৭৫)।
৭. ফাতহুল বারি (১/৪৭)।
১. আবু দাউদ (৪০৯১)।
১. বুখারি (৭৫১০)।
২. মুসলিম (৪৯); ইবনে হিব্বান (৩০৬)।
৩. গুনাইমি (৯৯-১০০)।
৩. মুসন্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩০৯৬৩)।
৪. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (৬৬৬২); ইবনে আবিল ইজ (৩২৭)।
১. ফিকহুল আকবার (৫৫)।
২. শরহে ফিকহিল আকবার, আলি কারি (২৫৭-২৫৮)।
৩. ইলাউস সুনান (১৯/২৩৫)।
৪. ফয়জুল বারি (১/১৩৮-১৪০)।
৫. ফাতহুল মুলহিম (১/৪০৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 হাদিস অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সতর্কবাণী

📄 হাদিস অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সতর্কবাণী


মুসলিম বিশ্বে সম্প্রতি একটি ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যারা আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ অস্বীকার করে, কিন্তু মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য আল্লাহর কুরআনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ মুসলমানরা যেহেতু সুন্নাহকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে তাদের প্রত্যাখ্যান করবে, এ জন্য তারা সুন্নাহকে সরাসরি নিশানা বানায় না, বরং কুরআন আঁকড়ে ধরার প্রতি গুরুত্ব দেয়। অথচ সুন্নাহ ছাড়া কেবল কুরআনের মাধ্যমে ইসলাম দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ দুটোই আল্লাহর ওহি। কুরআন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলছে,

ওয়া মা ইয়ানতিক্বু আনিল হাওয়া... [নাজম: ৩]

কুরআনের অপর আয়াতে এসেছে,

ওয়া মা আতাকুমুর রাসুলু ফাখুজুহু... [হাশর: ৭]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাহ অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে সতর্ক করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেন, 'মনে রেখো, আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং কুরআনের সঙ্গে সমপরিমাণ দেওয়া হয়েছে। সাবধান! অতি শীঘ্রই এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা পেট পুরে খেয়ে চেয়ারে চিত হয়ে বলবে, তোমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট।'১ এ কারণে ইমাম তহাবি তাদের খণ্ডনে বলেছেন, 'হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যত বক্তব্য ও বিধি-বিধান বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত, সবকিছুই সত্য।' এগুলোকে অস্বীকার করা যাবে না।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এ সম্প্রদায় অসংখ্য মানুষকে গোমরাহ করছে। তারা কুরআন মানে, অথচ কুরআন তাদের কাছে অবতীর্ণ হয়নি, আল্লাহর রাসুলের মাধ্যমেই এসেছে। একটাকে গ্রহণ করে আরেকটা অস্বীকার করার মানে কী? কুরআন আকাশ থেকে ছাপা হয়ে আসেনি। সাহাবায়ে কেরাম কুরআন সংকলন করেছেন। হাদিসও তারা বর্ণনা করেছেন। একটাকে স্বীকার করে আরেকটা অস্বীকার করা বৈপরীত্য। আল্লাহ তাদের হিদায়াতের আলো দিন। কুরআন ও সুন্নাহ দুটোকেই গ্রহণ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের রাজপথে ওঠার তাওফিক দিন।

টিকাঃ
১. আবু দাউদ (৪৬০৪); মুসনাদে আহমদ (১৭৪৪৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 খবরে ওয়াহেদ হাদিস কি আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য?

📄 খবরে ওয়াহেদ হাদিস কি আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য?


এখানে আরেকটি বিষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করা জরুরি। তা হলো, কোন ধরনের হাদিস আকিদার ক্ষেত্রে দলিল হতে পারে? একদল আলিমের মতে, সব ধরনের বিশুদ্ধ হাদিস। সুতরাং শর্ত হলো হাদিসটি বিশুদ্ধ হওয়া। এর পর সেটা মুতাওয়াতির (অনেকের বর্ণনা) কিংবা ওয়াহিদ (এক/দুই ব্যক্তির বর্ণনা) হোক, তাতে কিছু যায়-আসে না।১ আরেক দল আলিমের মতে, কেবল মুতাওয়াতির হাদিস আকিদার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, খবরে ওয়াহিদ আকিদার ক্ষেত্রে দলিল নয়। কারণ, এটা ‘ইলমে ইয়াকিন’ (তথা সুনিশ্চিত জ্ঞান)-এর পর্যায়ে নয়।২

টিকাঃ
১. এগুলোর সংখ্যা অনুপাতে আবার ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। বিস্তারিত দেখতে পারেন: তাইসিরু মুসতালাহিল হাদিস, ড. মাহমুদ তহহান।
২. উসুলুল বাজদাবি (কাশফুল আসরারের মাতন) (২/৩৭০)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px