📄 কাররামিয়াহ ও জাহমিয়াহদের মত
কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, ঈমান কেবল মুখের স্বীকারোক্তি। ফলে তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী মুনাফিকরাও মুমিন হয়ে যায়। আর জাহমিয়্যাহ তথা চরমপন্থি মুরজিয়াদের মতে, ঈমান হচ্ছে জানা। সুতরাং কেউ ‘আল্লাহ আছেন’ জানলেই মুমিন। এ হিসেবে পৃথিবীর অধিকাংশ কাফেরই মুমিন। কারণ, প্রত্যেকেই জানে একজন স্রষ্টা আছেন। মানা-না মানা সমান।
টিকাঃ
১. শুআইবি (২০৪-২০৫)।
📄 ইমাম আবু হানিফা-আশআরি-মাতুরিদিদের মত
ইমাম আবু হানিফা, তার শাগরিদ এবং পরবর্তী হানাফি ইমামগণ, যেমন সারাখসি ও (সদরুল ইসলাম) বাজদাবির মতে, ঈমানের দুটো রুকন। এক. হৃদয়ের বিশ্বাস (তাসদিক); দুই. মুখের স্বীকারোক্তি (ইকরার)। আমল ঈমানের অংশ নয়। ইমাম মাতুরিদিও উক্ত আকিদা রাখেন।২ ইমাম তহাবি রাহি. উক্ত মতই পোষণ করেন। তবে পরবর্তী হানাফিদের অনেকের ব্যাখ্যা দ্বারা বোঝা যায়, তারা ঈমানের রুকন বলেন কেবল অন্তরের সত্যায়নকে। মুখের স্বীকারোক্তি বাহ্যিক বিধি-বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রুকন; আসল রুকন নয়। ফলে সেটা মৌলিক ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, দেখা যায়, অনেক সময় মুখে কেউ ঈমানের স্বীকারোক্তি দেয়, অথচ বাস্তবে সে মুমিন নয়। আর তাদের সকলের মতে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম আবুল হাসান আশআরির এক্ষেত্রে একাধিক মত পাওয়া যায়। কোনোটাতে বোঝা যায় তিনি ঈমান বলতে কেবল হৃদয়ের সত্যায়ন বুঝতেন; আবার কোনো গ্রন্থে তিনি জমহুরের মতো সত্যায়ন, স্বীকারোক্তি ও আমল তিনটাই বুঝতেন এবং সম্ভবত এটা তার সর্বশেষ মত।৫ কিন্তু পরবর্তীকালে আশআরিদের মাজহাব হয় প্রথমটা, অর্থাৎ হৃদয়ের সত্যায়ন; আর স্বীকারোক্তি বাহ্যিক বিধান প্রয়োগের শর্ত। ফলে কেউ হৃদয়ে স্বীকার করে মুখে স্বীকারোক্তি না দিলেও আল্লাহর কাছে মুমিন হিসবে গণ্য হবে।
টিকাঃ
২. উসুলুদ্দিন, সারাখসি (১/৬০); উসুলুদ্দিন, বাজদাবি (১৪৮-১৫১); তাওহিদ, মাতুরিদি (৩৭৩-৩৮০); শরহুল আকাইদ, নাসাফি (৮০)।
৫. গজনবি (১১৯); আকহাসারি (১৯৪); শুনাইমি (৯৮-৯৯); সাইদ ফুদাহ (৯৬৪)।
📄 শাব্দিক মতপার্থক্য, বাস্তবিক নয়
অধমের কাছে দীর্ঘ তুলনামূলক অধ্যয়নের পরে মনে হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমদের সঙ্গে হানাফি ও কালামি ধারার ঈমানকেন্দ্রিক মতপার্থক্য কেবল শাব্দিক মতপার্থক্য, মৌলিক নয়। কারণ, জমহুরের মতে যেমন আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত, তাদের মতেও তেমন। ইমাম হালিমি বলেন, ঈমানকে যখন আনুগত্য এবং আত্মসমর্পণের অর্থ ধরা হবে, তখন আমল তার অন্তর্ভুক্ত হবে।১ আর যখন ঈমানকে কেবল সত্যায়ন ও বিশ্বাসের অর্থে ধরা হবে, তখন আমল তাতে প্রবেশ করবে না। অনেকটা ইসলাম ও ঈমানের মতো। একদিক থেকে ভিন্ন, অন্যদিক থেকে অভিন্ন। একইভাবে এখানেও। একসঙ্গে ঈমান ও আমল উল্লেখ করা হলে দুটোর অর্থ ভিন্ন হবে, কিন্তু আলাদা উল্লেখ করা হলে অভিন্ন হবে। আমরা গভীরভাবে দেখলে উপলব্ধি করব, জমহুরের মাজহাবও এমন। কারণ, জমহুরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কেউ যদি কোনো সাধারণ আমল ছেড়ে দেয়, তা হলে ঈমান নষ্ট হবে কি না? তারা বলবেন, 'না, ঈমান নষ্ট হবে না; তবে কমে যাবে, দুর্বল হয়ে যাবে।' অথচ তাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কেউ যদি ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর ভিতর থেকে কোনো বিষয় অস্বীকার করে, তা হলে কি সে মুমিন থাকবে? তারা বলবেন, 'অবশ্যই নয়।' যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কেউ কোনো কারণে মুখে আল্লাহকে এক বলে ঘোষণা দিলো না, কিন্তু হৃদয়ে তাকে এক বিশ্বাস করে, সে মুমিন কি না? তারা বলবেন, 'হ্যাঁ, মুমিন।' তা হলে দেখা যাচ্ছে, তারা তিনটাকে ঈমান বললেও মূল ঈমান মানেন হৃদয়েরটা। বাকি দুটোকে পরিপূরক বলেন। আবার যদি তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, একলোক দিন-রাত ইবাদত করে, কিন্তু অন্তরে আল্লাহকে অস্বীকার করে, কিংবা মুখে (ইকরাহ ছাড়া) অস্বীকার করে, তা হলে তার বিধান কী? তারা বলবেন, 'মুরতাদ।' তা হলে বোঝা গেল, তারা মুখের স্বীকারোক্তি ও আমলকে ঈমানের দুটি রুকন বললেও তিনটির মাঝে পার্থক্য করেন, ঠিক যেমন আশআরি-মাতুরিদিরা করেন। অর্থাৎ মূল ঈমান অন্তরের বিশ্বাস। মুখের স্বীকারোক্তি দুনিয়া ও মানুষকে জানানোর উদ্দেশ্যে। আর আমল ঈমানের পূর্ণাঙ্গতা। ফলে মূল ঈমানের ক্ষেত্রে আশআরি-মাতুরিদিদের সঙ্গে জমহুরের মৌলিক বিরোধ নেই।
ইমাম ইবনে হাজার লিখেন, ঈমানের ক্ষেত্রে সালাফের বক্তব্য হৃদয়ের বিশ্বাস, মুখের স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল; এখানে সালাফ আমলকে ঈমানের বিশুদ্ধতার শর্ত ধরেননি, বরং ঈমানের পূর্ণাঙ্গতার শর্ত বলেছেন। আর এ কারণেই মূলত তারা ঈমান বাড়ে-কমে বলেছেন। মুতাজিলাদের মতে, ঈমান সালাফের কথার মতোই তিন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো। কিন্তু মুতাজিলা ও সালাফের মাঝে পার্থক্য হলো, মুতাজিলারা আমলেরর ভিত্তিতে ঈমানের বিশুদ্ধতার শর্ত মনে করে, অপরদিকে সালাফ স্রেফ পূর্ণাঙ্গতার শর্ত মনে করেন।
টিকাঃ
১. সাইদ ফুদাহ (৯৬৬-৯৬৭)।
১. ফাতহুল বারি (১/৪৬)।
📄 ইমাম আবু হানিফা কি মুরজিয়া?
যখন এটা প্রমাণিত হলো যে, ঈমানের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের সঙ্গে আশআরি-মাতুরিদিদের মতপার্থক্য শাব্দিক, মৌলিক নয়; আরও প্রমাণিত হলো যে, তাদের সবাই সর্বসম্মতিক্রমে আমলের উপর জোর দেন; আমলকে একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন; তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক সংজ্ঞা, যেখানে জমহুরের সঙ্গে তাদের দ্বিমত কেবল শাব্দিক, মৌলিক নয়। ফলে এমন একটু ভিন্নতার ফলে তাদের মুরজিয়া বলা অনেক বড় জুলুম এবং অনেক বড় অপবাদ। কারণ, মুরজিয়া হলো একটি ভ্রান্ত সম্প্রদায়, যারা আমলকে কোনো পাত্তাই দেয় না। কেউ সারা জীবন কোনো আমল না করলেও তাকে পূর্ণ ঈমানদার ভাবে, তার ঈমানকে আবু বকর ও জিবরাইলের ঈমানের মতো মনে করে। তাদের সঙ্গে ইমাম আবু হানিফার মতো মানুষকে তুলনা করে মুরজিয়া বলা কতটুকু ইনসাফ? বরং পিছনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, ইমাম আবু হানিফার মাজহাব আর জমহুরের মাজহাবের মাঝে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। একই কথা প্রযোজ্য আশআরি ও মাতুরিদিদের ক্ষেত্রেও। আশআরি-মাতুরিদিরা অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রে জমহুরের সঙ্গে একমত। কেবল আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করেন না, তাও একেবারেই করেন না এমন নয়, বরং সত্যায়ন ও বিশ্বাসের অর্থে করেন না, আত্মসমর্পণের অর্থে করেন। ফলে এই দুই ধারায় আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত বড় বড় ইমাম, যারা আমলের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন এবং এই ধারার সাধারণ মুসলমানরা যারা আমলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত যত্নবান, তাদের মুরজিয়াদের কাতারে ফেলা মোটেই ইনসাফ নয়।
হ্যাঁ, পূর্ববর্তী আলিমদের কারও কারও কলমে ইমাম আবু হানিফাকে মুরজিয়া বলা হয়েছে, যেমন: ইমাম আবুল হাসান আশআরি। তিনি আবু হানিফাকে মুরজিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।২ কিন্তু আজ যেমন গালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সালাফের ইমামগণ আবু হানিফাকে মুরজিয়া গালি অর্থে, কিংবা ভ্রান্ত ফিরকা মুরজিয়াদের সঙ্গে তুলনা করে বলেননি; বরং ইমাম আবু হানিফা কবিরা গুনাহকারীর বিধানকে ‘ইরজা’ করতেন, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে সঁপে দিতেন। সেই কারণে মুরজিয়া বলা হয়েছে। শাহরাস্তানি লিখেন, ‘কেউ কেউ ইমাম আবু হানিফা ও তার সঙ্গীদের মুরজিয়াতুস সুন্নাহ বলেছেন। এর কারণ, তিনি ঈমান বলতে কেবল সত্যায়নকে বুঝতেন। তারা বুঝেছেন, তিনি আমলকে গুরুত্ব দিতেন না; অথচ আমলের ক্ষেত্রে তিনি হাদিসও বর্ণনা করেছেন। তা হলে তিনি কীভাবে আমল ছেড়ে দেবেন? তাকে মুরজিয়া বলার আরেকটি রহস্য আছে। তা হলো, তার যুগে যারাই মুতাজিলা ও খারেজিদের বিরোধিতা করত, তারা তাকে মুরজিয়া হিসেবে আখ্যা দিত। ফলে সম্ভবত তারাই তাকে মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে।’১ ইমাম তাফতাজানি লিখেন, ‘কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার মতে হচ্ছে, সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে—চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, চাইলে ক্ষমা করতে পারেন; আর এটা হচ্ছে হকপন্থিদের মাজহাব, যেটিকে ইরজা বলা হয়। অর্থাৎ কবিরা গুনাহকারীর ফয়সালা আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। আর এ কারণে ইমাম আবু হানিফাকে মুরজিয়া বলা হয়েছে।
ফলে ইমাম আবু হানিফাকে বাতিল মুরজিয়াদের মতো মনে করা কিংবা খোঁচা দেওয়া অসততা ও অনৈতিকতা চর্চা। পূর্ববর্তী আলিমদের যারা ইমাম আবু হানিফাকে মুরজিয়া বলেছেন, উপরের অর্থে বলেছেন। যদিও এটা অনুচিত হয়েছে, তথাপি অপবাদ নয়। যেমন: উসমান রাজি.-এর শাহাদাতের পরে যখন সাহাবাদের মাঝে জটিলতা তৈরি হলো, বিভিন্ন দলে তারা ভাগ হয়ে পড়লেন, তখন কিছু সাহাবি কোনো দলে না গিয়ে চুপ থাকলেন, অপেক্ষা করলেন। এটাকেও ইতিহাসে ইরজা হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে।৩ শাইখ ইবনে আবিল ইজ লিখেন, এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা এবং আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ইমামের মাঝে যে মতবিরোধ রয়েছে, সেটা মৌলিক মতভেদ নয়, বরং শাব্দিক মতভেদ। কারণ, উভয় দলই বলেন, ঈমানের সঙ্গে আমল জরুরি।১ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভিও এটাকে স্রেফ শাব্দিক মতভেদ আখ্যা দিয়েছেন।২ কাশ্মীরি এটাকে 'জুলুম' সাব্যস্ত করেছেন।৩
টিকাঃ
২. মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, আশআরি (১৩৮)।
১. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, শাহরাস্তানি (১/১৪১)।
২. শরহুল মাকাসিদ, তাফতাজানি (২/২৩৮)।
৩. তাহজিবুল আসার, তাবারি (২/৬৫৯)।
১. ইবনে আবিল ইজ (৩১৫-৩২০)।
২. আত-তাফহিমাত (১/২৮)।
৩. ফয়জুল বারি (১২৯)।