📄 আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমানের মতামত
তিন ইমাম তথা মালেক, শাফেয়ি, আহমদ বিন হাম্বল-সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিসের মতে, ঈমান তিনটি বিষয়ের সমষ্টি-হৃদয়ের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং আমলের মাধ্যমে সেই বিশ্বাসের পরিণতি।
ইমাম শাফেয়ি থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, সাহাবায়ে কেরাম এবং যে তাবেয়িদের আমরা পেয়েছি, তারা সবাই এই ব্যাপারে একমত ছিলেন যে, ঈমান হলো মুখে স্বীকৃতি (কওল), কাজে পরিণতি (আমল) ও অন্তরের সত্যায়ন (নিয়ত)। একটি ছাড়া অপরটি পূর্ণ হবে না।১ ইমাম তিরমিজি তার সুনানে উমর ইবনে হারুন থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলতেন, ঈমান হচ্ছে মুখের স্বীকৃতি (কওল) ও আমল।২ বোঝা যায়, ইমাম তিরমিজি উক্ত মত সমর্থন করেন। ইমাম বাইহাকি তার সুনানে কুবরাতে সালাফের অনেক ইমামের নাম উল্লেখ করেছেন, যারা আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন। তাদের মাঝে আনাস ইবনে মালেক, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ফুজাইল ইবনে ইয়াজ, হাফস ইবনে গিয়াস, ওয়াকি, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইয়াজিদ ইবনে হারুন, আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, বুখারি, মুসলিম, আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লামের মতো ইমামগণ রয়েছেন।৩ হুমাইদি তাঁর মুসনাদে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ থেকে উক্ত আকিদা বর্ণনা করেছেন এবং নিজেও সেটা সমর্থন করেছেন।৪ লালাকায়ি বুখারির সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি হিজাজ, মক্কা, মদিনা, কুফা, ওয়াসেত, ইরাক, বাগদাদ, শাম ও মিশরের হাজারের অধিক আলিমের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাদের কাউকে এই বিষয়ে আমি মতভেদ করতে দেখিনি যে, দ্বীন (তথা ঈমান) হলো মুখের স্বীকারোক্তি ও আমল।৫
টিকাঃ
১. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৫/৯৫৬)।
২. তিরমিজি (২৭৬২)।
৩. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (২০৯৫০)।
৪. মুসনাদে হুমাইদি (উসুলুস সুন্নাহ; ১৩৩৩)।
৫. লালাকায়ি (১/১৯৩)।
📄 খারোজি ও মুতাজিলাদের মত
খারেজি ও মুতাজিলারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের ইমামদের মতো ঈমানকে অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং কাজের পরিণতি-এই তিনের সমন্বয় বলে। তাদের দলিল সেগুলোই যেগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের দলিল। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা আমলের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, যা আমরা পিছনে বর্ণনা করে এসেছি। তাদের মতে, কেউ কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলে কাফের হয়ে যায়। মুতাজিলাদের মতবাদও এমন। তারা কবিরা গুনাহকারীকে শুধু পৃথিবীতে কাফের বলে না। খারেজিদের মতো তারাও তাকে পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে।
📄 কাররামিয়াহ ও জাহমিয়াহদের মত
কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, ঈমান কেবল মুখের স্বীকারোক্তি। ফলে তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী মুনাফিকরাও মুমিন হয়ে যায়। আর জাহমিয়্যাহ তথা চরমপন্থি মুরজিয়াদের মতে, ঈমান হচ্ছে জানা। সুতরাং কেউ ‘আল্লাহ আছেন’ জানলেই মুমিন। এ হিসেবে পৃথিবীর অধিকাংশ কাফেরই মুমিন। কারণ, প্রত্যেকেই জানে একজন স্রষ্টা আছেন। মানা-না মানা সমান।
টিকাঃ
১. শুআইবি (২০৪-২০৫)।
📄 ইমাম আবু হানিফা-আশআরি-মাতুরিদিদের মত
ইমাম আবু হানিফা, তার শাগরিদ এবং পরবর্তী হানাফি ইমামগণ, যেমন সারাখসি ও (সদরুল ইসলাম) বাজদাবির মতে, ঈমানের দুটো রুকন। এক. হৃদয়ের বিশ্বাস (তাসদিক); দুই. মুখের স্বীকারোক্তি (ইকরার)। আমল ঈমানের অংশ নয়। ইমাম মাতুরিদিও উক্ত আকিদা রাখেন।২ ইমাম তহাবি রাহি. উক্ত মতই পোষণ করেন। তবে পরবর্তী হানাফিদের অনেকের ব্যাখ্যা দ্বারা বোঝা যায়, তারা ঈমানের রুকন বলেন কেবল অন্তরের সত্যায়নকে। মুখের স্বীকারোক্তি বাহ্যিক বিধি-বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রুকন; আসল রুকন নয়। ফলে সেটা মৌলিক ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, দেখা যায়, অনেক সময় মুখে কেউ ঈমানের স্বীকারোক্তি দেয়, অথচ বাস্তবে সে মুমিন নয়। আর তাদের সকলের মতে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম আবুল হাসান আশআরির এক্ষেত্রে একাধিক মত পাওয়া যায়। কোনোটাতে বোঝা যায় তিনি ঈমান বলতে কেবল হৃদয়ের সত্যায়ন বুঝতেন; আবার কোনো গ্রন্থে তিনি জমহুরের মতো সত্যায়ন, স্বীকারোক্তি ও আমল তিনটাই বুঝতেন এবং সম্ভবত এটা তার সর্বশেষ মত।৫ কিন্তু পরবর্তীকালে আশআরিদের মাজহাব হয় প্রথমটা, অর্থাৎ হৃদয়ের সত্যায়ন; আর স্বীকারোক্তি বাহ্যিক বিধান প্রয়োগের শর্ত। ফলে কেউ হৃদয়ে স্বীকার করে মুখে স্বীকারোক্তি না দিলেও আল্লাহর কাছে মুমিন হিসবে গণ্য হবে।
টিকাঃ
২. উসুলুদ্দিন, সারাখসি (১/৬০); উসুলুদ্দিন, বাজদাবি (১৪৮-১৫১); তাওহিদ, মাতুরিদি (৩৭৩-৩৮০); শরহুল আকাইদ, নাসাফি (৮০)।
৫. গজনবি (১১৯); আকহাসারি (১৯৪); শুনাইমি (৯৮-৯৯); সাইদ ফুদাহ (৯৬৪)।