📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইমানের সংজ্ঞা

📄 ইমানের সংজ্ঞা


ঈমান কী? সচরাচর আমরা ঈমান বলতে বুঝি বিশ্বাস, সত্যায়ন ইত্যাদি। কোনোকিছু হৃদয়ে গভীরভাবে বিশ্বাস করা এবং মুখে তার স্বীকৃতি দেওয়ার নাম ঈমান। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর সত্তা, তাঁর সকল নাম, গুণ ও কর্ম, তাঁর রবুবিয়্যাহ, উলুহিয়্যাহ ও হাকিমিয়্যাহ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওত ও রিসালাত, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর আনীত ইসলামের সকল গায়েবি বিষয়, শরিয়তের সকল বিধি-বিধান হৃদয়ের গভীর থেকে সুদৃঢ় ও সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করা, মুখে সেগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া এবং কাজে পরিণত করাকে ঈমান বলা হয়।

কুরআনের অসংখ্য আয়াত এবং অগণিত হাদিসে এসব বক্তব্য বিদ্যমান। যেমন: হৃদয়ের বিশ্বাস-সংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহ বলেন,

ক্বলাতিল আরাবু আমান্না ক্বুল্লাম তু’মিনু... [হুজুরাত: ১৪]

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

লা তাজিদু ক্বাওমান ইউ’মিনুনা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি... [মুজাদালা: ২২]

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

ইয়া আইয়্যুহার রাসুলু লা ইয়াহযুনকাল্লাজিনা ইউসারিউনা ফিল কুফরি... [মায়িদা: ৪১]

কুরআনের পাশাপাশি অসংখ্য হাদিসে হৃদয়কে ঈমানের আধার সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিশেষত সেসব হাদিস যেখানে পরকালে সামান্য পরিমাণ ঈমানের বিনিময়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ এসেছে। যেমন: একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'জান্নাতবাসী যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে আর জাহান্নামবাসী জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নাম থেকে সেসব লোকদের বের করে আনো যাদের হৃদয়ে এক সরষেদানা পরিমাণ ঈমান রয়েছে।১ আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যার হৃদয়ে সরষেদানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যার হৃদয়ে সরষেদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।'২

টিকাঃ
১. বুখারি (২২); ইবনে হিব্বান (২২২)।
২. মুসলিম (৯১); ইবনে হিব্বান (২২৪)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমানের মতামত

📄 আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমানের মতামত


তিন ইমাম তথা মালেক, শাফেয়ি, আহমদ বিন হাম্বল-সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিসের মতে, ঈমান তিনটি বিষয়ের সমষ্টি-হৃদয়ের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং আমলের মাধ্যমে সেই বিশ্বাসের পরিণতি।

ইমাম শাফেয়ি থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, সাহাবায়ে কেরাম এবং যে তাবেয়িদের আমরা পেয়েছি, তারা সবাই এই ব্যাপারে একমত ছিলেন যে, ঈমান হলো মুখে স্বীকৃতি (কওল), কাজে পরিণতি (আমল) ও অন্তরের সত্যায়ন (নিয়ত)। একটি ছাড়া অপরটি পূর্ণ হবে না।১ ইমাম তিরমিজি তার সুনানে উমর ইবনে হারুন থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলতেন, ঈমান হচ্ছে মুখের স্বীকৃতি (কওল) ও আমল।২ বোঝা যায়, ইমাম তিরমিজি উক্ত মত সমর্থন করেন। ইমাম বাইহাকি তার সুনানে কুবরাতে সালাফের অনেক ইমামের নাম উল্লেখ করেছেন, যারা আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন। তাদের মাঝে আনাস ইবনে মালেক, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ফুজাইল ইবনে ইয়াজ, হাফস ইবনে গিয়াস, ওয়াকি, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইয়াজিদ ইবনে হারুন, আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, বুখারি, মুসলিম, আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লামের মতো ইমামগণ রয়েছেন।৩ হুমাইদি তাঁর মুসনাদে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ থেকে উক্ত আকিদা বর্ণনা করেছেন এবং নিজেও সেটা সমর্থন করেছেন।৪ লালাকায়ি বুখারির সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি হিজাজ, মক্কা, মদিনা, কুফা, ওয়াসেত, ইরাক, বাগদাদ, শাম ও মিশরের হাজারের অধিক আলিমের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাদের কাউকে এই বিষয়ে আমি মতভেদ করতে দেখিনি যে, দ্বীন (তথা ঈমান) হলো মুখের স্বীকারোক্তি ও আমল।৫

টিকাঃ
১. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৫/৯৫৬)।
২. তিরমিজি (২৭৬২)।
৩. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (২০৯৫০)।
৪. মুসনাদে হুমাইদি (উসুলুস সুন্নাহ; ১৩৩৩)।
৫. লালাকায়ি (১/১৯৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 খারোজি ও মুতাজিলাদের মত

📄 খারোজি ও মুতাজিলাদের মত


খারেজি ও মুতাজিলারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের ইমামদের মতো ঈমানকে অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং কাজের পরিণতি-এই তিনের সমন্বয় বলে। তাদের দলিল সেগুলোই যেগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের দলিল। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা আমলের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, যা আমরা পিছনে বর্ণনা করে এসেছি। তাদের মতে, কেউ কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলে কাফের হয়ে যায়। মুতাজিলাদের মতবাদও এমন। তারা কবিরা গুনাহকারীকে শুধু পৃথিবীতে কাফের বলে না। খারেজিদের মতো তারাও তাকে পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কাররামিয়াহ ও জাহমিয়াহদের মত

📄 কাররামিয়াহ ও জাহমিয়াহদের মত


কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, ঈমান কেবল মুখের স্বীকারোক্তি। ফলে তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী মুনাফিকরাও মুমিন হয়ে যায়। আর জাহমিয়্যাহ তথা চরমপন্থি মুরজিয়াদের মতে, ঈমান হচ্ছে জানা। সুতরাং কেউ ‘আল্লাহ আছেন’ জানলেই মুমিন। এ হিসেবে পৃথিবীর অধিকাংশ কাফেরই মুমিন। কারণ, প্রত্যেকেই জানে একজন স্রষ্টা আছেন। মানা-না মানা সমান।

টিকাঃ
১. শুআইবি (২০৪-২০৫)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px