📄 ইমানের ছয় রুকনের শর্ত লঙ্ঘন কুফর
পিছনে আমরা ঈমান ও কুফরের কয়েকটি মূলনীতি তুলে ধরেছি। তন্মধ্যে তৃতীয় মূলনীতিটি এখানে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি। পাশাপাশি এটি সংক্ষেপে বললে ভুল বোঝার ব্যাপক আশঙ্কা থাকে। ফলে ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি।
মূলনীতিটি ইমাম তহাবি উপরে উল্লেখ করেছেন। তা হলো, মানুষ যে বিষয়ে ঈমান আনার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে, যতক্ষণ না সেগুলোর কিছু অস্বীকার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে। সুতরাং সে ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেসব বিষয়কে অস্বীকার না করে, যেগুলো স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছিল। যখনই এগুলোর কোনো একটা অস্বীকার করবে, ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।
ইমাম তহাবির উপরের কথার বাহ্যিক মানে দাঁড়ায়, প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু ছয়টি বিষয়ের সাক্ষ্য দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে, যথা: আল্লাহ, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, কিতাব, তাকদির ও পরকাল, ফলে কেউ যদি এগুলোর কোনোটা অস্বীকার করে, তবেই সে কাফের হবে। এর আগ পর্যন্ত যতকিছুই করুক, কাফের হবে না। অথবা আরও সীমিত করে বলা যায়, মানুষ যেহেতু স্রেফ কালিমা (তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য) দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে, সুতরাং এই দুটো অস্বীকার না করলে কখনও ইসলাম থেকে বের হবে না।
যদি প্রশ্ন করা হয়, এর বাইরের কোনো বিষয় অস্বীকার কিংবা কোনো কাজই কি তা হলে মানুষকে কাফের বানায় না? উত্তর হচ্ছে— হ্যাঁ, বানায়। বরং যেসব বিষয় মানুষকে ঈমান থেকে বের করে বেঈমান বানিয়ে দেয়, ইমাম তহাবির উল্লেখ করা মূলনীতি সেগুলোর নিতান্তই সামান্য অংশ। এ কারণেই আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর অনেক ব্যাখ্যাতা এখানে ইমামের উপর আপত্তি তুলেছেন। তাদের কথা, এই বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, এর মাধ্যমে কুফরকে কেবল দু-একটা কারণের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। অথচ এসব বিষয় অস্বীকারের বাইরে কুফরের অনেক কারণ রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, তহাবির কথার বাহ্যিক অর্থ ধরা হলে ভুল মনে হবে। কিন্তু আমরা যদি তাঁর কথার গভীরে যাই, তবে দেখব, তার কথা ঠিকই আছে এবং তাঁর বর্ণিত মূলনীতি যথাযথই আছে। কীভাবে? নিচে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে:
দুটি বা ছয়টি বিষয়ের স্বীকৃতি মানুষকে মুমিন বানায়। কিন্তু এই স্বীকৃতির তাৎপর্য কী? কেউ স্রেফ বলল ‘আল্লাহ এক’, তাতেই হয়ে যাবে, নাকি ‘আল্লাহ এক’ শব্দটার সকল মর্ম ও মাআনি, জরুরিয়্যাত ও লাওয়াজিমগুলোও তাতে প্রবেশ করবে? সবাই বলবেন, স্রেফ শব্দটা নয়; বরং এর মর্ম ও তাৎপর্য, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল্লাহর সত্তা, সিফাত (গুণাবলি), হুকুক (অধিকার) ইত্যাদি-সম্পর্কিত সকল আকিদার ইজমালি স্বীকৃতি এতে অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেউ যখন বলে, ‘আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম’ কিংবা ‘আল্লাহ এক’, তখন এর মাঝে আল্লাহ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, একমাত্র রিজিকদাতা, তিনিই জন্ম ও মৃত্যুদাতা, তিনিই ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত এই সবগুলো সাক্ষ্য ঢুকে যাবে। যদিও প্রত্যেক ব্যক্তির এটা মুখে উল্লেখ করা প্রয়োজন নেই, কিংবা সকলের আল্লাহর সবগুলো সিফাত সম্পর্কে সবিস্তার জানাও প্রয়োজন নেই। কিন্তু এগুলো তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে ঈমানে ঢুকতে হলে এগুলোর তফসিলি সাক্ষ্য না দেওয়া লাগলেও কোনো সাক্ষ্যে ব্যাঘ্যাত ঘটলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।
আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আল্লাহ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, আল্লাহই জীবন ও মৃত্যুদাতা, আল্লাহ সবকিছু জানেন— ইসলামে প্রবেশের জন্য একজন মানুষের এতগুলো স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি নয়; বরং ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই’— এটুকু বলাই যথেষ্ট। কিন্তু কেউ ইসলামে প্রবেশ করার পরে যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ ছাড়া আরও কোনো সৃষ্টিকর্তা আছেন, কিংবা আল্লাহ কোনো বিষয় জানেন না, সে মুমিন থাকবে? যদি আল্লাহকে ইলাহ মানে, কিন্তু তাঁর সঙ্গে অন্যকে শরিক করে, সে মুমিন থাকবে? সবাই এক বাক্যে উত্তর দেবেন, 'না, কখনোই মুমিন থাকবে না।' হ্যাঁ, সেই ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলা হবে কি না সেটা ভিন্ন বিষয়, কিন্তু কেউ এমন বিশ্বাস রাখলে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে। একই কথা প্রযোজ্য নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, পরকাল ও তাকদির-সংক্রান্ত আকিদার ক্ষেত্রেও। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল-এতটুকু সাক্ষ্য দেওয়াই ঈমানে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু 'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল' কথাটা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনি কে? কোথায় ছিলেন? কোন যুগে ছিলেন? তিনি কেন রাসুল? তাঁর ব্যাপারে কী বিশ্বাস রাখতে হবে? তাঁর মর্যাদা কেমন? তাঁর পরিবারের ব্যাপারে কী আকিদা রাখতে হবে-সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেউ 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল' এতটুকু সাক্ষ্য দিয়ে ঈমানে ঢুকতে পারলেও ঢোকার পরে যদি বলে-মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি নবি-রাসুল হিসেবে মানি, কিন্তু তাঁর চরিত্রের অমুক অমুক দিকগুলো আমার পছন্দ নয়; তাঁর এতগুলো বিয়ে আমার ভালো লাগে না; ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তাঁর আচরণ সঠিক ছিল না; তিনি যুদ্ধবাজ ছিলেন; কুরআন ঠিকই আল্লাহর বাণী, কিন্তু তিনি নিজে তাতে কিছু যোগ করেছেন; তাঁর আনীত ইসলাম আমি মানি, কিন্তু তাঁর শরিয়ত ও সুন্নাত কেবল আরবদের জন্য, আমরা বাঙালিদের জন্য হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিই অধিকতর সুন্দর ও উপযোগী ইত্যাদি, নাউজুবিল্লাহ, সে মুমিন থাকবে? সবাই এক বাক্যে বলবেন, কখনও না। কারণ কী? কারণ 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল' এই মর্মবাণী কিংবা স্বীকৃতির যে দাবি রয়েছে, সেগুলো সে সংরক্ষণ করেনি। সুতরাং সে কোনোভাবেই মুমিন থাকবে না। এই একই কথা ঈমানের অন্যান্য রুকনের বেলাতেও প্রযোজ্য।
উপরের কথার সারাংশ হচ্ছে, ঈমানের সাক্ষ্যটা বেশ ইজমালি ও সংক্ষিপ্ত হলেও এর মর্ম, তাৎপর্য, প্রভাব ও পরিধি অনেক বিস্তৃত। কথাটা উলটো করে এভাবেও বলা যায়, ঈমানের স্বীকৃতির ক্ষেত্র ও বিষয়বস্তু অনেক বেশি প্রশস্ত, গভীর ও বিস্তৃত হলেও কয়েকটা মূলনীতির ভিতরেই সবগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংক্ষেপে সেসব বিষয়ের স্বীকৃতি দিলেই সবগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে যায়। কিন্তু বিস্তৃত পরিসরে কোনো একটাকে অস্বীকার করলে মূল স্বীকৃতিও অস্বীকৃত হয়ে যায়। অন্য কথায়, ইসলামে প্রবেশের রাস্তা সরু। বের হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত। ঈমানে ঢোকার পথ ছয়টা, কিন্তু বের হওয়ার পথ ষাটটা কিংবা ততোধিক। ফলে ষাটটা হোক কিংবা শতটা হোক, মৌলিক স্বীকৃতি এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ। ফলে ইমাম তহাবির বক্তব্য, একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয় না, ততক্ষণ না সে সেসব মূলনীতি অস্বীকার করে, যেসবের স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে ঈমানে প্রবেশ করেছিল' এভাবেই বুঝতে হবে। কারণ, ঈমানে সে সংক্ষিপ্ত পথ দিয়ে প্রবেশ করেছিল ঠিকই, কিন্তু বের হওয়ার পথ এতটা সংক্ষিপ্ত নয়। বরং অন্যান্য বিস্তারিত সকল ব্যাখ্যা এসব মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। ফলে কুফরের যেকোনো কারণের মূল এগুলো অস্বীকারের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যাবে। ইসলামের যেকোনো বিষয় অস্বীকার এগুলোর যেকোনো একটাকে অস্বীকার পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন হতে পারে, এমন কেন করা হলো? উত্তর হলো, বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই এমন করা হয়েছে। আল্লাহ মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ মানুষের জন্য ঈমানের পথ কঠিন করতে চান না। যদি শর্ত দেওয়া হতো—ঈমান আনার জন্য কেবল কালিমা শাহাদাহ নয়, কিংবা এই ছয়টি মূলনীতি নয়; বরং এগুলোর অন্তর্ভুক্ত সবকিছু বিস্তারিত জানতে ও সাক্ষ্য দিতে হবে, আল্লাহর সকল গুণ, সকল নবি-রাসুল, পরকালের বিস্তারিত বিবরণ, তাকদিরের বিস্তারিত ব্যখ্যা জানতে হবে, ক-জন মানুষের পক্ষে ঈমানে প্রবেশ করা সম্ভব হতো? তাই সবার জন্য বলে দেওয়া হয়েছে, 'বলুন, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল।' এতটুকু সত্য জেনে ও মেনে ঘোষণা দিলেই আল্লাহ মুমিনদের তালিকায় নাম লিখে দেবেন। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে সহজ সাক্ষ্য। কিন্তু এই সাক্ষ্য দেওয়ার পরে অবস্থাভেদে প্রত্যেকের উপর অন্যান্য দায়িত্ব আসবে। কেউ যদি সাক্ষ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেউ যদি আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, তবে তাকে সিফাতগুলো জেনে নিতে হবে। কেউ যদি রাসুলের ব্যাপারে, পরকালের ব্যাপারে, তাকদিরের ব্যাপারে সন্দেহে কিংবা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, তবে সেগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জানা ও সন্দেহ দূর করা সেই ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব হবে। এটা না করলে সে নিজেই এর জন্য দায়ী থাকবে। হতে পারে একপর্যায়ে ঈমানহারা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু কেউ যদি এসব বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে ফিতরতের উপর সারা জীবন কাটিয়ে দেয়, তবে সেই সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্যই তার মুক্তির সনদ হিসেবে দাঁড়াবে। ফলে এটা বান্দার উপর বোঝা নয়; বরং আল্লাহর অনুগ্রহ।
টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (১১৪)।
১. আকহাসারি (১৯২); তুর্কিস্তানি (১৩২)।
১. তিরমিজি (২৬৩৯); ইবনে মাজা (৪৩০০); ইবনে হিব্বান (২২৫)।
📄 কর্মগত কুফর
পিছনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, ঈমান সুরক্ষিত রাখার জন্য কালিমা বা ছয়টি রুকনের প্রত্যেকটির বিস্তারিত দাবি ও শর্তগুলো সুরক্ষিত রাখা জরুরি। কেউ যদি সেসব দাবির কোনোটা না মানে, কিংবা কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে। ইমাম তহাবি সেটাকেই 'যতক্ষণ না সে সেসব মূলনীতি অস্বীকার করে' শব্দে ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এখানেও কেউ কেউ তাকে ভুল বুঝেছেন এবং তার কথার উপর আপত্তি তুলেছেন। তাদের যুক্তি, ঈমানের এসব শর্ত ও দাবি কেবল অন্তরে বা মুখে অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হবে এমন নয়, বরং কাজের মাধ্যমেও যদি সেগুলো অস্বীকার করে, তবে সে বেঈমান হয়ে যাবে। আমরা এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু ইমাম তহাবির কথার গভীরে গেলে দেখব, তার কথার উপর কোনো আপত্তি করা যায় না। কারণ, তিনিও এগুলোই বলেছেন।
ইমাম তহাবি এখানে 'জুহুদ' তথা অস্বীকারের কথা বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈমানের এসব শর্ত ও দাবি প্রত্যাখ্যান। সুতরাং অন্তরে, মুখের বক্তেব্য কিংবা কাজে, যেভাবেই প্রত্যাখ্যান হোক, সেটা 'জুহুদ' হিসেবে গণ্য হবে এবং সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে। ফলে ইমাম তহাবির কথা আর সকল আলিমের কথা একই হলো। কারণ, অস্বীকার/প্রত্যাখ্যান কেবল অন্তর বা মুখের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। বরং কাজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। মুখে কেউ আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলি, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, কুরআন, তাকদির, পরকাল ইত্যাদি অস্বীকার করলে যেমন কাফের হবে, তেমনই মুখে অস্বীকার না করেও এমন কোনো কাজ করলে, যে কাজের মাধ্যমে অন্তরের অস্বীকার/প্রত্যাখ্যান স্পষ্ট বোঝা যায়, ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে। যেমন: কেউ বলল, আমি আল্লাহর উপর ঈমান রাখি, রাসুলুল্লাহর উপর ঈমান রাখি, কিন্তু * কাজে-কর্মে সে আল্লাহ ও রাসুলকে নিয়ে উপহাস করে * আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে গালি-গালাজ কিংবা তাদের সমালোচনা করে * দ্বীনের বিভিন্ন বিধান (যেমন রোজা, কুরবানি, পর্দা ইত্যাদি) নিয়ে ঠাট্টা করে * সাহাবাদের কাফের বা ফাসেক বলে * শরিয়তের হালালকে হারাম বলে * হারামকে হালাল বলে * মদ্যপানকে ফ্যাশন এবং এটা হারাম বলাকে গোঁড়ামি মনে করে * বিবাহ-পূর্ব প্রেম ভালোবাসা, বিবাহ-পরবর্তী পরকিয়া, পরনারীগমন এবং পরপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ককে হালাল ভাবে * এগুলো হারাম হওয়াকে পশ্চাৎপদতা মনে করে * ব্যভিচারকে বৈধ মনে করে এবং এটার বৈধতার পক্ষে আন্দোলন করে * আল্লাহর বিধানকে এই যুগের জন্য অচল মনে করে এবং মানবরচিত বিধানকে অধিক উপযোগী ও উত্তম মনে করে * শরিয়তের শাস্তিকে যেমন: হুদুদ ও কিসাস— বর্বর মনে করে * কুরআনের সঙ্গে বেয়াদবি করে * কুরআনের ভাষা হওয়ায় আরবিকে ঘৃণা করে * আল্লাহর ঘর মসজিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে * আলিম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ইসলাম মানার কারণে ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে * মসজিদ-মাদ্রাসাসহ ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রতি বিদ্বেষ রাখে * জীবনে কখনও নামাজ-রোজা, হজ-জাকাত ও কোনো প্রকারের ইবাদতের ধার ধারে না; বরং সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে * বিপরীতে শিরকের নিদর্শনগুলোকে পছন্দ করে * কাফের-মুশরিকদের সঙ্গে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসে অন্তরঙ্গতা রাখে এবং এক্ষেত্রে ইসলামের ওয়ালা-বারার মূলনীতিকে প্রাচীন আরব সংস্কৃতির মেয়াদোত্তীর্ণ উত্তরাধিকার ভাবে * নাস্তিক-মুরতাদ ও পৌত্তলিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে আলিম ও তালিবুল ইলমদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে * শাতিমদের নিরাপত্তা দিয়ে নবি প্রেমিকদের বুকে গুলি চালায়, তবে সে ঈমানের দাবি সত্ত্বেও কাফের হয়ে যাবে। কারণ, সে মুখে যা দাবি করছে অন্তরে সেটা নেই। কাজে যা প্রকাশ করছে সেটাই ধর্তব্য হবে। তার মুখের দাবির কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: কেউ মুখে কাউকে ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু তার কাজেকর্মে স্রেফ ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে, তবে তার মুখের কথার কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ বলেন, ওয়া লা ইন সাআলতাহুম লাইয়াকুলুন্না ইন্নামা কুন্না নাখুজু ওয়া নালআবু... [তাওবা: ৬৫-৬৬] অর্থ: 'যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা বলবে—আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং মজা করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর আয়াতের সাথে এবং তাঁর রাসুলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? কোনো অজুহাত দিয়ো না। তোমরা তো কাফের হয়ে গেছ ঈমান আনার পরে।...' [তাওবা: ৬৫-৬৬]
কাজি ইয়াজ লিখেছেন, আহলে সুন্নাতের সকল আলিমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, যদি কেউ কুরআনের কোনো আয়াত প্রত্যাখ্যান করে, কিংবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ও সর্বসম্মত কোনো হাদিস অস্বীকার করে, যেমন: রজমকে অস্বীকার করা, অন্য ধর্মকে বিশুদ্ধ মনে করা ইত্যাদি, তবে সে মুখে ইসলাম দাবি করা সত্ত্বেও কাফের হয়ে যাবে। একইভাবে যদি কেউ মুখে মুসলিম দাবি সত্ত্বেও কাফেরদের কাজ করে, যেমন: মূর্তি বা সূর্য-চন্দ্র, ক্রুশের সামনে সিজদা করে, অথবা এমন কোনো কাজ করে যা সুস্পষ্টভাবে কাফেরদের কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়, কিংবা মানব হত্যা, মদ ও ব্যভিচারকে হালাল মনে করে, অথবা শরিয়তের সুস্পষ্ট কোনো বিধানকে, যেমন: নামাজের ওয়াক্ত বা রাকাআত সংখ্যা ইত্যাদি অস্বীকার করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। মোেট কথা, কেবল মুখে ইসলাম দাবি কর্মগত কুফরের প্রতিবন্ধক নয়।
টিকাঃ
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৩৯৮); কিফায়াতুল মুফতি (১/৪৫-৫৬); ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২/৪৮১-৫৩৮); ফাতঙ্কল মুলহিম (২/৫৮-৫৯); আরও দেখুন: কাশ্মীরিকৃত ইকফারুল মুলহিদিন।
২. শিফা, কাজি ইয়াজ (২/২৮৬-২৮৭)।
📄 মুরজিয়াদের সংশয় নিরসন
কেউ কেউ এখানে সেসব হাদিস তুলে ধরতে পারেন, যেগুলোতে কেবল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার মাধ্যমেই জান্নাতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; কিংবা 'বিন্দু পরিমাণ ঈমান' থাকার কারণে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভের কথা বলা হয়েছে। তাদের কথা—পিছনে যেসব উদাহরণ উল্লেখ করা হলো—সেগুলোর মাধ্যমে কাউকে কাফের বলা কি বাড়াবাড়ি বা চরমপন্থা নয়? কারণ, অসংখ্য হাদিসে এসেছে, কারও অন্তরে দানা পরিমাণ ঈমান থাকলেও সে জান্নাতে যাবে। কেউ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বললে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন, তা হলে উপরে যাদের কথা বলা হলো, মুখে তারা ইসলাম নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করলেও, অন্তরে ও কাজেকর্মে ইসলাম ও শরিয়তের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা থাকলেও, দ্বীনদার মুসলিমদের প্রতি তারা বিদ্বেষ রাখলেও নিজেদের তো মুসলিম দাবি করে, এক আল্লাহকে মানে। তা হলে তাদের কেন কাফের-মুরতাদ বলা হবে? অথচ হাদিসে তাদের জান্নাতিই বলা হচ্ছে।
এটা মূলত মুসলিম উম্মাহর উপর মুরজিয়া সম্প্রদায়ের চিন্তাধারার প্রভাব। সালাফের বুঝে বোঝা ইসলাম ও ঈমানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। অনেকের ধারণা, মুরজিয়া সম্প্রদায় হাজার বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, মুরজিয়াদের উত্তরাধিকার আজও, বরং আরও সুন্দর রূপে আধুনিকতা, উদারতা ও প্রগতিশীলতার মোড়কে বিকিয়ে চলেছে নব্য মুতাজিলা ও মুরজিয়ারা। তাদের কাছে ইসলাম ও ঈমান অন্যান্য ধর্মের মতোই, যেমন হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম। আপনি নিজেকে হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ পরিচয় দিলে এবং তেমন একটি নাম বহন করলেই যথেষ্ট। বাস্তবে আপনি কী করেন, কী বিশ্বাস রাখেন এসব তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইহুদি-খ্রিষ্টান-সহ জগতের অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের অবস্থাও তথৈবচ। ফলে তাদের সংস্পর্শে এসে কিছু মুসলিম ইসলামকেও এমন ভাবতে শুরু করে। যেহেতু প্রবৃত্তির প্রবঞ্চনার ফলে আগে থেকেই তারা ইসলাম-সম্পর্কে মনে একটা ফ্রেম বানিয়ে রাখে, পরবর্তী সময়ে গবেষণার নামে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে কেবল সেসব আয়াত ও হাদিস কেটেকুটে বের করে, যেগুলো তাদের মতাদর্শকে আপাতদৃষ্টিতে সমর্থন করে। এরপর জোড়াতালি দিয়ে সেগুলোকে কোনোরকম একটা গ্রহণোগ্য সুরতে মুসলমানদের সামনে পেশ করে। এভাবে তারা নিজেদের কুরআন-সুন্নাহের অনুসারী হিসেবে পেশ করতে চায়, তাদের গোমরাহিকে কুরআন-সুন্নাহ ও গবেষণার মোড়কে মুসলমানদের গেলাতে চায়। অথচ কুরআন-সুন্নাহ তাদের সকল বিচ্যুতি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
মুরজিয়াদের সকল সন্দেহের অপনোদন এই গ্রন্থে সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা সংক্ষিপ্ত কিছু কথা তুলে ধরছি। সর্বপ্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হতে হবে, তা হলো— কুরআন-সুন্নাহর মূল ম্যাসেজ বিশেষ এক-দুটি আয়াত বা হাদিস দিয়ে বোঝা যায় না। বরং সবগুলো আয়াত ও হাদিস একত্র করে এরপর মর্ম বুঝতে হয়। সকল বিভ্রান্ত সম্প্রদায় প্রথম কাজটি করার ফলে বিভ্রান্ত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে সুপথপ্রাপ্ত। তাই প্রথমেই কুরআন-সুন্নাহ কাটাকাটি ও জোড়াতালি দেওয়া বর্জন করতে হবে। সবগুলো আয়াত ও হাদিসকে সামনে রেখে ফয়সালা দিতে হবে। মুরজিয়াদের খণ্ডনে এই একটা মূলনীতিই যথেষ্ট।
তারা তাদের পক্ষে যেসব দলিল পেশ করে, তার কয়েকটি এমন-
এক. হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানের হাদিস। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ইসলাম ক্ষয়ে যেতে থাকবে যেভাবে সুন্দর কাপড় ক্ষয়ে যায়। একপর্যায়ে রোজা, নামাজ, অন্য কোনো ইবাদত, সদকা বাকি থাকবে না। কোনো এক রাতে কুরআন উঠিয়ে নেওয়া হবে। ফলে ভূপৃষ্ঠে কুরআনের কোনে আয়াত বাকি থাকবে না। কেবল কিছু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকবে। তারা বলবে- আমরা আমাদের পূর্বপুরুষকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই কালিমার উপর পেয়েছি। আমরা সেটাই বলব।' বর্ণনাকারী সিলাহ হুজাইফাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটুকু তাদের রক্ষা করবে, অথচ তাদের কাছে নামাজ-রোজা কিছু নেই? তিনবার জিজ্ঞাসা করার পরে হুজাইফা বললেন, 'হ্যাঁ, এটা তাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে।'
এই হাদিসটি পড়লেই, যাদের চোখ আছে, তাদের বোঝার কথা এটা মুরজিয়াদের পক্ষে দলিল হতে পারে না। কারণ, এটা একটা বিশেষ অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটা জনবিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপের অধিবাসী কিংবা কিয়ামতের আগমুহূর্তের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে, যখন কুরআন-সুন্নাহ কিছু থাকবে না। এটার জন্য তো বিদ্যমান লোকেরা দায়ী হতে পারে না। কারণ, তারা কালিমা পড়েছে এবং এটাই তাদের একমাত্র সামর্থ্যের বিষয় ছিল। সবকিছু থাকতে কালিমা কীভাবে যথেষ্ট হবে?
দুই. ‘হাদিসুল বিতাকাহ’ বা পত্রের হাদিস নামে প্রসিদ্ধ একটি বর্ণনা, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, কিয়ামতের দিন একব্যক্তির আমলনামা পুরোটাই গুনাহ এবং অপরাধে ভরপুর থাকবে। কিন্তু তার কাছে একটি কাগজের টুকরা থাকবে, যেটাতে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’ লেখা থাকবে। আর এই কাগজের টুকরাটি তার সকল (খারাপ) আমলনামার চেয়ে ভারী হয়ে যাবে এবং সে মুক্তি পাবে।
তিন. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এ অবস্থায় যে, সে জানে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
চার. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি বলবে—আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরিক নেই। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর বান্দা, তার দাসী (মারইয়ামের) পুত্র এবং তাঁর কালিমা যা তিনি মারইয়ামের উপর ঢেলে দিয়েছেন। আরও সাক্ষ্য দেবে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য। আল্লাহ তাকে জান্নাতের আটটি দরজার যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করাবেন।’
পাচ. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল’, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।
ছয়. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তির উপর জান্নাত হারাম করে দেবেন, যে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।
উপরের দুই থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত পাঁচটি হাদিস দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, কালিমা পড়াই মুক্তির জন্য যথেষ্ট, আমল আবশ্যক নয়। আমরা এর উপর কয়েকটি কথা বলব। প্রথমেই মনে রাখতে হবে, কালিমার গুরুত্ব অস্বীকারের সুযোগ নেই। নিঃসন্দেহে কালিমা গুরুত্বপূর্ণ এবং মুসলিম ও কাফেরের মাঝে পার্থক্যকারী। কিন্তু এসব হাদিসের কোথাও কি বলা হয়েছে-কালিমা পড়ে বসে থাকবে আর কোনো আমল করবে না? না, কোথাও এই কথা বলা হয়নি। বরং হাদিসের ভাষ্য দেখলে বোঝা যায়, স্রেফ কালিমার কথা বলা হয়নি। যেমন: শেষ হাদিসে বলা হয়েছে 'আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য'। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কালিমা পড়ে সারা জীবন সব ধরনের ইবাদত বর্জন করতে পারে? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কালিমা পড়ে, সে আল্লাহ কিংবা আল্লাহর রাসুলের প্রতি, দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষ রাখতে পারে?
বাস্তবে উক্ত হাদিসগুলোর মর্ম হলো, কাফের থেকে মুমিনকে আলাদা করা, কাফেরের উপর মুমিনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা এবং মুমিন ব্যক্তি একদিন-না-একদিন জান্নাতি সেটা প্রমাণ করা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কালিমা পড়ে এই দ্বীনে প্রবেশ করবে, সে কিছু ভুল-বিচ্যুতি করলেও আল্লাহ তায়ালা তাকে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে দেবেন না; বরং এই কালিমার বরকতে সে জান্নাতি হবে। ফলে এই কালিমা আমলের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণে সহায়ক হবে, কুফর ও রিদ্দতের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না। বরং এই কালিমা তো কুফরের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। যে ব্যক্তি অন্তর থেকে এই কালিমা পাঠ করে ও এতে বিশ্বাস রাখে, সে দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করতে পারে? দ্বীনের বিরোধিতা করতে পারে? যে ব্যক্তি আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে, সে আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানকে মধ্যযুগীয় বর্বর শাসন বলতে পারে? আল্লাহর বিধানকে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার সঙ্গে অচল বলতে পারে? মানব রচিত শাসনকে আল্লাহর শাসনের চেয়ে উত্তম ভাবতে পারে? বোঝা গেল, এটা পড়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে সে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে, কিংবা এটা মুখে আওড়ালেও এর প্রতি আত্মসমর্পণ করেনি। আর সকল আলেমের মতে, কালিমা কেবল মুখে পড়া যথেষ্ট নয়; বরং অন্তরে বিশ্বাস করতে হবে এবং আমলে পরিণত করতে হবে। সুতরাং এ ধরনের ব্যক্তি যদি তাওবা করে কালিমার ছায়াতলে আশ্রয় না নেয়, তবে কেবল মুসলিম পরিবারে জন্ম, ইসলামি নাম বা পরিচয় বহন তাকে পরকালে উদ্ধার করতে পারবে না। এ জন্য সহিহ মুসলিমে বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং আল্লাহ ছাড়া যা-কিছুর উপাসনা করা হয় সবগুলোকে প্রত্যাখ্যান করবে'..., তার জন্য উপরের সুসংবাদগুলো প্রযোজ্য হবে। কেবল মুখে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে জীবনভর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহ করলে পরকালে এটা কোনো উপকারে আসবে না। ইবলিস কাফের কেন? সে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে, সে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান, সৃষ্টিকর্তা ও জীবনদাতা মানে। তার পরেও সে কাফের তার অহংবোধ থেকে আল্লাহর নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার কারণে।
কর্মের মাধ্যমে কুফরের প্রমাণ কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের কালেই পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে আবু বকর রাজি.-এর শাসনামলে আরবের বেশ কিছু গোেত্র পরিপূর্ণরূপে ইসলাম থেকে বেরিয়ে মুরতাদ হয়ে যায়। কোনো কোনো গোেত্র ইসলামে থাকে, কিন্তু জাকাত দিতে অস্বীকার করে। তখন আবু বকর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তারা যেহেতু ইসলামের কালিমাকে অস্বীকার করত না, নামাজ অস্বীকার করত না, কিংবা অন্যান্য বিধানকে অস্বীকার করত না, শুধু জাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, এ জন্য অনেক সাহাবির কাছে ব্যাপারটা খটকা লাগল যে, তারা তো মুসলমান। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কীভাবে যুদ্ধ করা যায়? স্বয়ং উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি, আপত্তি তুললেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যতক্ষণ না তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। কিন্তু যখন তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র সাক্ষ্য দেবে, তখন তারা নিজেরা ও তাদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।” সুতরাং যারা জাকাত দিতে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কতটুকু সমীচীন হবে? আবু বকর রাজি. বললেন, 'আল্লাহর শপথ! রাসুলের যুগে যে ব্যক্তি একটি ছাগলের বাচ্চা জাকাত দিত, এখন যদি তা দিতে অস্বীকার করে, তা হলে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।' পরবর্তীকালে উমর-সহ অন্য সাহাবারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, সে সময়ে আবু বকরের সিদ্ধান্তই সঠিক ও যথাযথ ছিল। আল্লাহ তায়ালা তাঁর হৃদয় খুলে দিয়েছিলেন।
কারণ, জাকাত ইসলামের একটি ভিত্তি; কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। আর এটাকে তারা অস্বীকার করে মূলত কুরআন-সুন্নাহকেই অস্বীকার করল। যদি তারা জাকাতকে ফরজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আদায়ে গাফিলতি কিংবা গড়িমসি করত, সেটাকে কবিরা গুনাহ কিংবা অপরাধ হিসেবে দেখা হতো; কিন্তু তারা এটাকে অস্বীকার করে বসে। ফলে বোঝা যায়, আল্লাহ ও রাসুলকে মেনে নেওয়ার এবং তাদের নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণের যে ঘোষণা তারা দিয়েছে, সেটা নির্ভেজাল নয়। কারণ, তাদের কর্মই প্রমাণ করছে—তারা আল্লাহ ও রাসুলকে মানে না; তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি তারা শাসক হিসেবে আবু বকর রাজি.-এর আনুগত্যও অস্বীকার করে। এভাবে দ্বীন ও রাষ্ট্র দুটোর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহে জড়ায়। ফলে সাহাবাগণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
হাফেজ হাকামি লিখেন, কর্মগত কুফরকে এ কারণে কর্মগত বলা হয়, কারণ সেটা মানুষের সামনে কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। নতুবা সেটা বিশ্বাসগত কুফরের একধরনের বহিঃপ্রকাশ। এটা তখনই একজন মানুষ থেকে প্রকাশ পায়, যখন তার অন্তর থেকে ঈমান, ইখলাস, আনুগত্য—সবকিছু দূরীভূত হয়ে যায়, ঈমানের ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে না। প্রথমে অন্তরে এগুলো তৈরি হয়, এর পর একসময় কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সুতরাং কর্মগত কুফর সন্দেহাতীতভাবে অন্তরের কুফরকে প্রমাণ করে। অন্তরে কুফর না থাকলে কেউ এমন কাজ করতে পারে না।
টিকাঃ
১. সুনানে ইবনে মাজা (৪০৪৯); মুসতাদরাকে হাকেম (৮৫৫৪)।
১. তিরমিজি (২৬৩৯); ইবনে মাজা (৪৩০০); ইবনে হিব্বান (২২৫)।
২. মুসলিম (২৬)।
৩. বুখারি (৩৪৩৫); মুসলিম (২৮)।
৪. মুসলিম (২৯)।
১. বুখারি (৪২৫); মুসলিম (৩৩)।
২. মাদারিসজুস সালেকিন, ইবনুল কাইয়িম (১/৩৪৬)।
১. বুখারি (৪২৫); মুসলিম (৩৩)।
২. আল-ফাসল (২/৬৬-৬৭); ফয়জুল বারি (৩/৯০-৯২)।
৩. বুখারি (১৩৯৯, ৬৯২৪); মুসলিমের বর্ণনায় ছাগলের বাচ্চার বদলে রশির কথা এসেছে (২০)।
১. আল-ফাসল (২/৬৬-৬৭); ফয়জুল বারি (৩/৯০-৯২)।
২. আলামুস সুন্নাহ, হাকামি (১০০)।