📄 সামগ্রিকভাবে জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দিতে হবে
পূর্বের কথায় ফিরে আসি, সাধারণ মুসলমানদের কারও ব্যাপারে যেমন জান্নাতের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না, তেমনই কাউকে জাহান্নামিও বলা যাবে না। হ্যাঁ, কুরআন-সুন্নাহে যাদের জান্নাতি বলা হয়েছে তাদের যেমন জান্নাতি বলতে হবে, তেমনই কুরআন-সুন্নাহে যাদের জাহান্নামি বলা হয়েছে তাদের জাহান্নামি হিসেবে বিশ্বাস করতে হবে। যেমন: ইবলিস, ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহল, আবু লাহাব, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল, আমর ইবনে লুহাই আল-খুজায়ি প্রমুখ। তারা জাহান্নামি—এটা শরিয়ত দ্বারা প্রমাণিত। তাই উদারতা প্রকাশ করতে গিয়ে তাদের যেমন ‘জাহান্নামি নয়’ বলা যাবে না, আবার কাফের ও অমুসলিমমাত্রই জাহান্নামি আখ্যা দেওয়া যাবে না। কারণ, কেউ হয়তো গোপনে ঈমান এনেছে যা আপনি জানেন না। কারও কাছে হয়তো ইসলামের সঠিক পয়গাম পৌঁছয়নি এবং সে হয়তো মাজুর। কাফের-মুশরিকদের নাবালেগ মৃত সন্তানদের ব্যাপারেও এই বিধান। তাই ব্যক্তিবিশেষের উপর (শরিয়ত যাদের ব্যাপারে কিছু বলেনি) জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না।
সামগ্রিকভাবে জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দিতে হবে: উপরের মূলনীতি ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা জান্নাতে যাবে আর কাফেররা জাহান্নামে যাবে—এটা বলা যাবে; বরং এটা বলা আবশ্যক। সাম্প্রতিক সময়ে উদারতার নামে তথাকথিত প্রগতিশীল দাবিদার মুসলিমদের মাঝে একধরনের বিচ্যুতি দেখা যায়। তারা কাফেরদের কাফের বলতে চায় না, ‘অমুসলিম’ বলে। ‘কাফেররা জাহান্নামে যাবে’—এটা বলা অভদ্রতা ও গোঁড়ামি মনে করে। তাদের ধারণা, ইহুদি-খ্রিষ্টান ও হিন্দু-বৌদ্ধরাও জান্নাতে (স্বর্গে) যেতে পারে। কারণ, তাদের অনেকে স্রষ্টাতে বিশ্বাস করে, ভালো কাজ করে, মানুষকে সহায়তা করে ইত্যাদি। এটা হলো ইসলামি শরিয়ত-সম্পর্কে চরম অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। কিংবা জেনেবুঝে শরিয়তের মূলনীতি বাতিল করে দেবার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম। ইসলাম ছাড়া জগতের সকল ধর্ম প্রত্যাখ্যাত। আল্লাহ বলেন,
ইন্নাদ দ্বীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম। অর্থ: ‘আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।’ [আলে ইমরান: ১৯]
ওয়ামাই ইয়াবতাগি গাইরাল ইসলামি দ্বীনান ফালাই ইউক্ববালা মিনহু ওয়া হুয়া ফিল আখিরাতি মিনাল খাসিরিন। অর্থ: ‘আর যে ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু সন্ধান করবে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গৃহীত হবে না। সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ [আলে ইমরান: ৮৫]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে কোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি আমার কথা শুনতে পায়, তদুপরি আমার উপর ঈমান না আনে, তবে সে জাহান্নামে যাবে।”১ একইভাবে অন্যান্য পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারী, মূর্তিপূজারী, মুশরিকরাও চিরস্থায়ীরূপে জাহান্নামে থাকবে। আল্লাহ বলেন,
ইন্নাল্লাজিনা কাফারু মিন আহলিল কিতাবি ওয়াল মুশরিকিনা ফি নারি জাহান্নামা খালিদিনা ফিহা উলাইকা হুম শাররুল বারিয়্যাহ।
অর্থ: 'আহলে-কিতাব ও মুশরিকদের মাঝে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির সবচেয়ে অধম'। [বাইয়িনাহ: ৬]
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কিয়ামতের দিন এক ঘোষক ঘোষণা করবে, প্রত্যেক জাতি যেন তাদের অনুসরণ করে দুনিয়াতে যাদের উপাসনা করত। তখন আল্লাহ ছাড়া যারা মূর্তি ও পাথরের পূজা করত, সকলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। বাকি থাকবে কেবল মুসলমানগণ যারা আল্লাহর ইবাদত করত আর আহলে কিতাবের কিছু দল। তাদের মাঝে ইহুদিদের ডেকে বলা হবে, তোমরা কার ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উজাইরের ইবাদত করতাম। আল্লাহ বলবেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোনো স্ত্রী-সন্তান নেই। তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা তৃষ্ণার্ত, আমাদের পানি পান করান। তখন তাদের বলা হবে, ওই ওখানে গিয়ে পান করো। জাহান্নামকে তখন তাদের সামনে তরঙ্গোদ্বেল মরীচিকারূপে তুলে ধরা হবে। তারা সবাই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এরপর খ্রিষ্টানদের ডেকে বলা হবে, তোমরা কার ইবাদত করতে? তারা বলবে, আল্লাহর পুত্র ঈসার। তাদের বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহ কোনো স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করেননি। তখন তাদের বলা হবে, তোমরা কী চাও? তারাও আগের মতো জবাব দেবে। তাদের সঙ্গেও একই আচরণ করা হবে।'
সুতরাং পথ ভিন্ন হলেও সবার গন্তব্য একই—এমন কথা বলার অর্থ পুরো শরিয়তের ভিত্তিকে বাতিল করে দেওয়া। হ্যাঁ, সকল ধর্মের কাফেরের গন্তব্য একটাই, জাহান্নাম। তা ছাড়া, কাফেরদের চরিত্র ভালো, পুণ্যের কাজ করে, তাই জান্নাতে যাবে—এমন বক্তব্যও অজ্ঞতাপ্রসূত। আল্লাহ দুনিয়াতেই তাদের ভালো কাজের বিনিময় দান করবেন। পরকালে তাদের জন্য কিছু নেই।
টিকাঃ
১. মুসলিম (১৫৩); সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর (১০৮৪); বাজ্জার (৩০৫০); তয়ালিসি (৫১১)।
১. বুখারি (৪৫৮১)।
📄 কাফের-মুশরিকদের ভালো কাজের বিনিময়?
এখানে প্রথমেই একটি বিষয় উল্লেখ্য, তা হলো—ভালো চরিত্র আর মন্দ চরিত্রের মানদণ্ড কী? ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষের মানদণ্ড আমাদের কাছে যেমন, আল্লাহর কাছে কি তেমন? আমরা যেভাবে এগুলো দেখি, ইসলাম কি সেভাবে দেখে? একজন অমুসলিম যখন পরোপকারী হয়, দরিদ্রের সহায়ক হয়, আমরা তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিই; ভালো মানুষ ভাবি। এটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা ঠিক আছে। কিন্তু আল্লাহর কাছে কি সে ভালো মানুষ? সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আদম সন্তান আমার উপর মিথ্যাচার করে, অথচ তার জন্য এটা করা শোভনীয় নয়। আদম সন্তান আমাকে গালি দেয়, অথচ তার জন্য এটা করা শোভনীয় নয়। আমাকে মিথ্যাচার করার অর্থ হলো, সে বলে, তাকে পুনরুত্থিত করা হবে না, অথচ প্রথম সৃষ্টির চেয়ে পুনরুত্থান অধিক সহজ। আমাকে গালি দেওয়ার অর্থ হলো, সে বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি এক এবং অমুখাপেক্ষী। আমি কাউকে জন্ম দিইনি, কেউ আমাকে জন্ম দেয়নি। আমার সমকক্ষ কেউ নেই।” এখানে অমুসলিমদের ধর্মবিশ্বাসকে আল্লাহকে গালি দেওয়া, তাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করার সমকক্ষ ধরা হয়েছে। এবার ভাবুন, যে লোক তার সৃষ্টিকর্তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তার পালনকর্তা ও রিজিকদাতাকে গালি দেয়, তার সঙ্গে বেয়াদবি করে, অনুগ্রহকারীর অকৃতজ্ঞ হয়, মানুষের প্রতি তার মমত্ববোধ ও দরিদ্রের সহায়তার কী মূল্য? যে নিজের পিতা-মাতার অকৃতজ্ঞ হয়, তাদের প্রতি অন্যায়কারী ও কৃতঘ্ন হয়, ঘরের বাইরে তার ভালো মানুষির কতটুকু দাম থাকে?
এ জন্য কাফের-মুশরিকের ভালো কাজগুলো পরকালে তাদের কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ উহিয়া ইলাইকা ওয়া ইলাল্লাজিনা মিন ক্বাবলিকা লা ইন আশরাকতা লাইয়াহবাতান্না আমালুকা ওয়া লাতাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থ: 'আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আপনি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার স্থির করেন, তবে আপনার আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।' [জুমার: ৬৫] অন্যত্র বলেন,
ওয়ামাই ইয়ারতাদিদ মিনকুম আন দ্বীনিহি ফায়ামুত ওয়া হুয়া কাফিরুন ফাউলাইকা হাবিতাত আমালুহুম ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাতি... [বাকারা: ২১৭]
অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো জাহান্নামি। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।' [বাকারা: ২১৭] আরেক জায়গায় বলেন,
ওয়ামাই ইয়াকফুর বিল ইমানি ফাক্বাদ হাবিতা আমালুহু ওয়া হুয়া ফিল আখিরাতি মিনাল খাসিরিন।
অর্থ: 'যে ব্যক্তি ঈমানকে অবিশ্বাস করবে, তার আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' [মায়িদা: ৫]
আয়েশা রাজি. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইবনে জুদআনের পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। মানুষকে খাবার দিতেন। এগুলো কি পরকালে তাকে উপকৃত করবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'না, এগুলো তাকে কোনো উপকার করবে না। কারণ, সে কোনোদিন বলেনি হে প্রভু, বিচার দিবসে আমার অপরাধগুলো ক্ষমা করে দিন।'১ অর্থাৎ সে ঈমান আনেনি। অথচ ভালো কাজগুলো আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার এবং পরকালে সেগুলোর মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার সর্বপ্রথম শর্ত হলো ইসলাম। আল্লাহ বলেন,
ওয়া মা মানাআহুম আন তুউক্ববালা মিনহুম নাফাক্বাতুহুম ইল্লা আন্নাহুম কাফারু বিল্লাহি ওয়া বিরাসুলিহি... [তাওবা: ৫৪]
অর্থ: 'তাদের অর্থব্যয় কবুল না হওয়ার এ ছাড়া আর কোনো কারণ নেই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অবিশ্বাস করেছে। আর তারা নামাজে আসে অলসতার সাথে, ব্যয় করে সংকুচিত মনে।' [তাওবা: ৫৪] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'মুসলিম ছাড়া আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
বরং গোটা পৃথিবী দিলেও রক্ষা পাবে না। আল্লাহ বলেন,
ইন্নাল্লাজিনা কাফারু ওয়া মাতু ওয়া হুম কুফফারুন ফালাই ইউক্ববালা মিন আহাদিহিম মিলউল আরদি জাহাবাওঁ ওয়া লাউই ফতাদা বিহি... [আলে ইমরান: ৯১]
অর্থ: 'যারা কাফের হয়েছে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তারা মুক্তির জন্য যদি সারা পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণও দেয়, তবুও তা গ্রহণ করা হবে না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই।' [আলে ইমরান: ৯১]
হ্যাঁ, আল্লাহ চাইলে কোনো কাফেরকে তাঁর কোনো কর্মের বিনিময় দিতে পারেন। যেমন: রাসুলুল্লাহর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে শক্তিশালী সূত্রে এবং আবু লাহাবের ব্যাপারে দূর্বল সূত্রে কিছু ব্যতিক্রম কথা এসেছে। আবু তালিবের ব্যাপারে এসেছে- তার শাস্তি কমিয়ে জাহান্নামের সবচেয়ে লঘু শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু সেই লঘু শাস্তি কী? তাকে জাহান্নামের জুতা পরিয়ে দেওয়া হবে আর তাতে তার মগজ ফুটতে থাকবে।১ আবু লাহাব যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুগ্ধমাতা সুয়াইবিয়াকে আজাদ করে দিয়েছিলেন, তাই জাহান্নামে প্রতি সোমবার তার শাস্তি কিছুটা কম করা হবে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির এক ছিদ্র দিয়ে কিছু পানি পান করতে দেওয়া হবে। আবু লাহাব-সম্পর্কে বর্ণনাটি সস্পষ্টভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, বরং স্বপ্নের কথা।২ আর স্বপ্ন কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বর্ণনার সামনে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, কুরআনে আবু লাহাবের উপর অভিসম্পাত করে বলা হয়েছে,
তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবিওঁ ওয়া তাত্ত... [মাসাদ: ১-৩]
অর্থ: 'ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত। ধ্বংস হোক সে নিজে। কোনো কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ কিংবা তার উপার্জন। শীঘ্রই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে।' [মাসাদ: ১-৩] তা ছাড়া, যদি এগুলো বিশুদ্ধ ধরাও হয়, তথাপি কেবল এই দুজনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ, অন্যদের ব্যাপারে এমন বর্ণনা আসেনি। আর সেটাও এমন ব্যতিক্রম, যা উল্লেখ করার মতো নয়। জাহান্নামের শাস্তির সামনে এমন ছাড় কিছুই নয়। কারণ, তারা জাহান্নামের আগুন থেকে কখনোই মুক্তি পাবে না।
তাই সাধারণভাবে নিয়ম হলো, ভালো কাফেরদের ভালো আমলের বিনিময় দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হবে। পরকালে তাদের জন্য কিছু নেই। আল্লাহ বলেন,
মান কানা ইউরিদুল হায়াতাদ দুনিয়া ওয়া জিনাতাহা নুওয়াফফি ইলাইহিম আমালাহুম ফিহা... [হুদ: ১৫]
অর্থ: 'যারা পার্থিব জীবন এবং এ জীবনের চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদের দুনিয়াতেই আমলের প্রতিফল পূর্ণ করে দেবো এবং তাতে তাদের প্রতি একটুও হ্রাস করা হবে না।' [হুদ: ১৫] অন্যত্র বলেন,
মান কানা ইউরিদুল আজিলাতা আজ্জালনা লাহু ফিহা মা নাশাু লিমান নুরিদু... [ইসরা: ১৮]
অর্থ: 'যে ব্যক্তি ইহকাল কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা ইহকালেই দিয়ে দিই। অতঃপর তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি। তারা সেখানে নিন্দিত-বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে।' [ইসরা: ১৮] আরেক জায়গায় বলেন,
মান কানা ইউরিদু হারছাল আখিরাতি নাযিদ লাহু ফি হারছিহি... [শুরা: ২০]
অর্থ: 'যে ব্যক্তি পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সে ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে কিছু দিয়ে দিই, কিন্তু পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না।' [শুরা: ২০] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কাফের যখন কোনো ভালো কাজ করে, দুনিয়াতে তাকে সেটার বিনিময় দিয়ে দেওয়া হয়। আর মুমিন যখন ভালো কাজ করে, দুনিয়ার পাশাপাশি পরকালের জন্যও সেটার পুণ্য রেখে দেওয়া হয়।'১
টিকাঃ
১. বুখারি (৪৯৭৪)।
১. মুসলিম (২১৪); ইবনে হিব্বান (৩৩১)।
২. বুখারি (৩০৬২); মুসলিম (১১১)।
১. বুখারি (৬৫৬১); মুসলিম (২১৩)।
২. বুখারি (৫১০১)।
১. মুসলিম (২৮০৮); বাজ্জার (৭০২২)।
📄 ইমানের ছয় রুকনের শর্ত লঙ্ঘন কুফর
পিছনে আমরা ঈমান ও কুফরের কয়েকটি মূলনীতি তুলে ধরেছি। তন্মধ্যে তৃতীয় মূলনীতিটি এখানে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি। পাশাপাশি এটি সংক্ষেপে বললে ভুল বোঝার ব্যাপক আশঙ্কা থাকে। ফলে ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি।
মূলনীতিটি ইমাম তহাবি উপরে উল্লেখ করেছেন। তা হলো, মানুষ যে বিষয়ে ঈমান আনার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে, যতক্ষণ না সেগুলোর কিছু অস্বীকার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে। সুতরাং সে ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেসব বিষয়কে অস্বীকার না করে, যেগুলো স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছিল। যখনই এগুলোর কোনো একটা অস্বীকার করবে, ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।
ইমাম তহাবির উপরের কথার বাহ্যিক মানে দাঁড়ায়, প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু ছয়টি বিষয়ের সাক্ষ্য দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে, যথা: আল্লাহ, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, কিতাব, তাকদির ও পরকাল, ফলে কেউ যদি এগুলোর কোনোটা অস্বীকার করে, তবেই সে কাফের হবে। এর আগ পর্যন্ত যতকিছুই করুক, কাফের হবে না। অথবা আরও সীমিত করে বলা যায়, মানুষ যেহেতু স্রেফ কালিমা (তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য) দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে, সুতরাং এই দুটো অস্বীকার না করলে কখনও ইসলাম থেকে বের হবে না।
যদি প্রশ্ন করা হয়, এর বাইরের কোনো বিষয় অস্বীকার কিংবা কোনো কাজই কি তা হলে মানুষকে কাফের বানায় না? উত্তর হচ্ছে— হ্যাঁ, বানায়। বরং যেসব বিষয় মানুষকে ঈমান থেকে বের করে বেঈমান বানিয়ে দেয়, ইমাম তহাবির উল্লেখ করা মূলনীতি সেগুলোর নিতান্তই সামান্য অংশ। এ কারণেই আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর অনেক ব্যাখ্যাতা এখানে ইমামের উপর আপত্তি তুলেছেন। তাদের কথা, এই বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, এর মাধ্যমে কুফরকে কেবল দু-একটা কারণের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। অথচ এসব বিষয় অস্বীকারের বাইরে কুফরের অনেক কারণ রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, তহাবির কথার বাহ্যিক অর্থ ধরা হলে ভুল মনে হবে। কিন্তু আমরা যদি তাঁর কথার গভীরে যাই, তবে দেখব, তার কথা ঠিকই আছে এবং তাঁর বর্ণিত মূলনীতি যথাযথই আছে। কীভাবে? নিচে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে:
দুটি বা ছয়টি বিষয়ের স্বীকৃতি মানুষকে মুমিন বানায়। কিন্তু এই স্বীকৃতির তাৎপর্য কী? কেউ স্রেফ বলল ‘আল্লাহ এক’, তাতেই হয়ে যাবে, নাকি ‘আল্লাহ এক’ শব্দটার সকল মর্ম ও মাআনি, জরুরিয়্যাত ও লাওয়াজিমগুলোও তাতে প্রবেশ করবে? সবাই বলবেন, স্রেফ শব্দটা নয়; বরং এর মর্ম ও তাৎপর্য, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল্লাহর সত্তা, সিফাত (গুণাবলি), হুকুক (অধিকার) ইত্যাদি-সম্পর্কিত সকল আকিদার ইজমালি স্বীকৃতি এতে অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেউ যখন বলে, ‘আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম’ কিংবা ‘আল্লাহ এক’, তখন এর মাঝে আল্লাহ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, একমাত্র রিজিকদাতা, তিনিই জন্ম ও মৃত্যুদাতা, তিনিই ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত এই সবগুলো সাক্ষ্য ঢুকে যাবে। যদিও প্রত্যেক ব্যক্তির এটা মুখে উল্লেখ করা প্রয়োজন নেই, কিংবা সকলের আল্লাহর সবগুলো সিফাত সম্পর্কে সবিস্তার জানাও প্রয়োজন নেই। কিন্তু এগুলো তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে ঈমানে ঢুকতে হলে এগুলোর তফসিলি সাক্ষ্য না দেওয়া লাগলেও কোনো সাক্ষ্যে ব্যাঘ্যাত ঘটলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।
আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আল্লাহ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, আল্লাহই জীবন ও মৃত্যুদাতা, আল্লাহ সবকিছু জানেন— ইসলামে প্রবেশের জন্য একজন মানুষের এতগুলো স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি নয়; বরং ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই’— এটুকু বলাই যথেষ্ট। কিন্তু কেউ ইসলামে প্রবেশ করার পরে যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ ছাড়া আরও কোনো সৃষ্টিকর্তা আছেন, কিংবা আল্লাহ কোনো বিষয় জানেন না, সে মুমিন থাকবে? যদি আল্লাহকে ইলাহ মানে, কিন্তু তাঁর সঙ্গে অন্যকে শরিক করে, সে মুমিন থাকবে? সবাই এক বাক্যে উত্তর দেবেন, 'না, কখনোই মুমিন থাকবে না।' হ্যাঁ, সেই ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলা হবে কি না সেটা ভিন্ন বিষয়, কিন্তু কেউ এমন বিশ্বাস রাখলে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে। একই কথা প্রযোজ্য নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, পরকাল ও তাকদির-সংক্রান্ত আকিদার ক্ষেত্রেও। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল-এতটুকু সাক্ষ্য দেওয়াই ঈমানে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু 'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল' কথাটা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনি কে? কোথায় ছিলেন? কোন যুগে ছিলেন? তিনি কেন রাসুল? তাঁর ব্যাপারে কী বিশ্বাস রাখতে হবে? তাঁর মর্যাদা কেমন? তাঁর পরিবারের ব্যাপারে কী আকিদা রাখতে হবে-সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেউ 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল' এতটুকু সাক্ষ্য দিয়ে ঈমানে ঢুকতে পারলেও ঢোকার পরে যদি বলে-মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি নবি-রাসুল হিসেবে মানি, কিন্তু তাঁর চরিত্রের অমুক অমুক দিকগুলো আমার পছন্দ নয়; তাঁর এতগুলো বিয়ে আমার ভালো লাগে না; ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তাঁর আচরণ সঠিক ছিল না; তিনি যুদ্ধবাজ ছিলেন; কুরআন ঠিকই আল্লাহর বাণী, কিন্তু তিনি নিজে তাতে কিছু যোগ করেছেন; তাঁর আনীত ইসলাম আমি মানি, কিন্তু তাঁর শরিয়ত ও সুন্নাত কেবল আরবদের জন্য, আমরা বাঙালিদের জন্য হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিই অধিকতর সুন্দর ও উপযোগী ইত্যাদি, নাউজুবিল্লাহ, সে মুমিন থাকবে? সবাই এক বাক্যে বলবেন, কখনও না। কারণ কী? কারণ 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল' এই মর্মবাণী কিংবা স্বীকৃতির যে দাবি রয়েছে, সেগুলো সে সংরক্ষণ করেনি। সুতরাং সে কোনোভাবেই মুমিন থাকবে না। এই একই কথা ঈমানের অন্যান্য রুকনের বেলাতেও প্রযোজ্য।
উপরের কথার সারাংশ হচ্ছে, ঈমানের সাক্ষ্যটা বেশ ইজমালি ও সংক্ষিপ্ত হলেও এর মর্ম, তাৎপর্য, প্রভাব ও পরিধি অনেক বিস্তৃত। কথাটা উলটো করে এভাবেও বলা যায়, ঈমানের স্বীকৃতির ক্ষেত্র ও বিষয়বস্তু অনেক বেশি প্রশস্ত, গভীর ও বিস্তৃত হলেও কয়েকটা মূলনীতির ভিতরেই সবগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংক্ষেপে সেসব বিষয়ের স্বীকৃতি দিলেই সবগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে যায়। কিন্তু বিস্তৃত পরিসরে কোনো একটাকে অস্বীকার করলে মূল স্বীকৃতিও অস্বীকৃত হয়ে যায়। অন্য কথায়, ইসলামে প্রবেশের রাস্তা সরু। বের হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত। ঈমানে ঢোকার পথ ছয়টা, কিন্তু বের হওয়ার পথ ষাটটা কিংবা ততোধিক। ফলে ষাটটা হোক কিংবা শতটা হোক, মৌলিক স্বীকৃতি এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ। ফলে ইমাম তহাবির বক্তব্য, একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয় না, ততক্ষণ না সে সেসব মূলনীতি অস্বীকার করে, যেসবের স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে ঈমানে প্রবেশ করেছিল' এভাবেই বুঝতে হবে। কারণ, ঈমানে সে সংক্ষিপ্ত পথ দিয়ে প্রবেশ করেছিল ঠিকই, কিন্তু বের হওয়ার পথ এতটা সংক্ষিপ্ত নয়। বরং অন্যান্য বিস্তারিত সকল ব্যাখ্যা এসব মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। ফলে কুফরের যেকোনো কারণের মূল এগুলো অস্বীকারের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যাবে। ইসলামের যেকোনো বিষয় অস্বীকার এগুলোর যেকোনো একটাকে অস্বীকার পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন হতে পারে, এমন কেন করা হলো? উত্তর হলো, বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই এমন করা হয়েছে। আল্লাহ মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ মানুষের জন্য ঈমানের পথ কঠিন করতে চান না। যদি শর্ত দেওয়া হতো—ঈমান আনার জন্য কেবল কালিমা শাহাদাহ নয়, কিংবা এই ছয়টি মূলনীতি নয়; বরং এগুলোর অন্তর্ভুক্ত সবকিছু বিস্তারিত জানতে ও সাক্ষ্য দিতে হবে, আল্লাহর সকল গুণ, সকল নবি-রাসুল, পরকালের বিস্তারিত বিবরণ, তাকদিরের বিস্তারিত ব্যখ্যা জানতে হবে, ক-জন মানুষের পক্ষে ঈমানে প্রবেশ করা সম্ভব হতো? তাই সবার জন্য বলে দেওয়া হয়েছে, 'বলুন, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল।' এতটুকু সত্য জেনে ও মেনে ঘোষণা দিলেই আল্লাহ মুমিনদের তালিকায় নাম লিখে দেবেন। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে সহজ সাক্ষ্য। কিন্তু এই সাক্ষ্য দেওয়ার পরে অবস্থাভেদে প্রত্যেকের উপর অন্যান্য দায়িত্ব আসবে। কেউ যদি সাক্ষ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেউ যদি আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, তবে তাকে সিফাতগুলো জেনে নিতে হবে। কেউ যদি রাসুলের ব্যাপারে, পরকালের ব্যাপারে, তাকদিরের ব্যাপারে সন্দেহে কিংবা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, তবে সেগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জানা ও সন্দেহ দূর করা সেই ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব হবে। এটা না করলে সে নিজেই এর জন্য দায়ী থাকবে। হতে পারে একপর্যায়ে ঈমানহারা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু কেউ যদি এসব বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে ফিতরতের উপর সারা জীবন কাটিয়ে দেয়, তবে সেই সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্যই তার মুক্তির সনদ হিসেবে দাঁড়াবে। ফলে এটা বান্দার উপর বোঝা নয়; বরং আল্লাহর অনুগ্রহ।
টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (১১৪)।
১. আকহাসারি (১৯২); তুর্কিস্তানি (১৩২)।
১. তিরমিজি (২৬৩৯); ইবনে মাজা (৪৩০০); ইবনে হিব্বান (২২৫)।
📄 কর্মগত কুফর
পিছনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, ঈমান সুরক্ষিত রাখার জন্য কালিমা বা ছয়টি রুকনের প্রত্যেকটির বিস্তারিত দাবি ও শর্তগুলো সুরক্ষিত রাখা জরুরি। কেউ যদি সেসব দাবির কোনোটা না মানে, কিংবা কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে। ইমাম তহাবি সেটাকেই 'যতক্ষণ না সে সেসব মূলনীতি অস্বীকার করে' শব্দে ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এখানেও কেউ কেউ তাকে ভুল বুঝেছেন এবং তার কথার উপর আপত্তি তুলেছেন। তাদের যুক্তি, ঈমানের এসব শর্ত ও দাবি কেবল অন্তরে বা মুখে অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হবে এমন নয়, বরং কাজের মাধ্যমেও যদি সেগুলো অস্বীকার করে, তবে সে বেঈমান হয়ে যাবে। আমরা এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু ইমাম তহাবির কথার গভীরে গেলে দেখব, তার কথার উপর কোনো আপত্তি করা যায় না। কারণ, তিনিও এগুলোই বলেছেন।
ইমাম তহাবি এখানে 'জুহুদ' তথা অস্বীকারের কথা বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈমানের এসব শর্ত ও দাবি প্রত্যাখ্যান। সুতরাং অন্তরে, মুখের বক্তেব্য কিংবা কাজে, যেভাবেই প্রত্যাখ্যান হোক, সেটা 'জুহুদ' হিসেবে গণ্য হবে এবং সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে। ফলে ইমাম তহাবির কথা আর সকল আলিমের কথা একই হলো। কারণ, অস্বীকার/প্রত্যাখ্যান কেবল অন্তর বা মুখের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। বরং কাজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। মুখে কেউ আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলি, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, কুরআন, তাকদির, পরকাল ইত্যাদি অস্বীকার করলে যেমন কাফের হবে, তেমনই মুখে অস্বীকার না করেও এমন কোনো কাজ করলে, যে কাজের মাধ্যমে অন্তরের অস্বীকার/প্রত্যাখ্যান স্পষ্ট বোঝা যায়, ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে। যেমন: কেউ বলল, আমি আল্লাহর উপর ঈমান রাখি, রাসুলুল্লাহর উপর ঈমান রাখি, কিন্তু * কাজে-কর্মে সে আল্লাহ ও রাসুলকে নিয়ে উপহাস করে * আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে গালি-গালাজ কিংবা তাদের সমালোচনা করে * দ্বীনের বিভিন্ন বিধান (যেমন রোজা, কুরবানি, পর্দা ইত্যাদি) নিয়ে ঠাট্টা করে * সাহাবাদের কাফের বা ফাসেক বলে * শরিয়তের হালালকে হারাম বলে * হারামকে হালাল বলে * মদ্যপানকে ফ্যাশন এবং এটা হারাম বলাকে গোঁড়ামি মনে করে * বিবাহ-পূর্ব প্রেম ভালোবাসা, বিবাহ-পরবর্তী পরকিয়া, পরনারীগমন এবং পরপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ককে হালাল ভাবে * এগুলো হারাম হওয়াকে পশ্চাৎপদতা মনে করে * ব্যভিচারকে বৈধ মনে করে এবং এটার বৈধতার পক্ষে আন্দোলন করে * আল্লাহর বিধানকে এই যুগের জন্য অচল মনে করে এবং মানবরচিত বিধানকে অধিক উপযোগী ও উত্তম মনে করে * শরিয়তের শাস্তিকে যেমন: হুদুদ ও কিসাস— বর্বর মনে করে * কুরআনের সঙ্গে বেয়াদবি করে * কুরআনের ভাষা হওয়ায় আরবিকে ঘৃণা করে * আল্লাহর ঘর মসজিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে * আলিম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ইসলাম মানার কারণে ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে * মসজিদ-মাদ্রাসাসহ ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রতি বিদ্বেষ রাখে * জীবনে কখনও নামাজ-রোজা, হজ-জাকাত ও কোনো প্রকারের ইবাদতের ধার ধারে না; বরং সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে * বিপরীতে শিরকের নিদর্শনগুলোকে পছন্দ করে * কাফের-মুশরিকদের সঙ্গে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসে অন্তরঙ্গতা রাখে এবং এক্ষেত্রে ইসলামের ওয়ালা-বারার মূলনীতিকে প্রাচীন আরব সংস্কৃতির মেয়াদোত্তীর্ণ উত্তরাধিকার ভাবে * নাস্তিক-মুরতাদ ও পৌত্তলিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে আলিম ও তালিবুল ইলমদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে * শাতিমদের নিরাপত্তা দিয়ে নবি প্রেমিকদের বুকে গুলি চালায়, তবে সে ঈমানের দাবি সত্ত্বেও কাফের হয়ে যাবে। কারণ, সে মুখে যা দাবি করছে অন্তরে সেটা নেই। কাজে যা প্রকাশ করছে সেটাই ধর্তব্য হবে। তার মুখের দাবির কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: কেউ মুখে কাউকে ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু তার কাজেকর্মে স্রেফ ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে, তবে তার মুখের কথার কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ বলেন, ওয়া লা ইন সাআলতাহুম লাইয়াকুলুন্না ইন্নামা কুন্না নাখুজু ওয়া নালআবু... [তাওবা: ৬৫-৬৬] অর্থ: 'যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা বলবে—আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং মজা করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর আয়াতের সাথে এবং তাঁর রাসুলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? কোনো অজুহাত দিয়ো না। তোমরা তো কাফের হয়ে গেছ ঈমান আনার পরে।...' [তাওবা: ৬৫-৬৬]
কাজি ইয়াজ লিখেছেন, আহলে সুন্নাতের সকল আলিমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, যদি কেউ কুরআনের কোনো আয়াত প্রত্যাখ্যান করে, কিংবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ও সর্বসম্মত কোনো হাদিস অস্বীকার করে, যেমন: রজমকে অস্বীকার করা, অন্য ধর্মকে বিশুদ্ধ মনে করা ইত্যাদি, তবে সে মুখে ইসলাম দাবি করা সত্ত্বেও কাফের হয়ে যাবে। একইভাবে যদি কেউ মুখে মুসলিম দাবি সত্ত্বেও কাফেরদের কাজ করে, যেমন: মূর্তি বা সূর্য-চন্দ্র, ক্রুশের সামনে সিজদা করে, অথবা এমন কোনো কাজ করে যা সুস্পষ্টভাবে কাফেরদের কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়, কিংবা মানব হত্যা, মদ ও ব্যভিচারকে হালাল মনে করে, অথবা শরিয়তের সুস্পষ্ট কোনো বিধানকে, যেমন: নামাজের ওয়াক্ত বা রাকাআত সংখ্যা ইত্যাদি অস্বীকার করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। মোেট কথা, কেবল মুখে ইসলাম দাবি কর্মগত কুফরের প্রতিবন্ধক নয়।
টিকাঃ
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৩৯৮); কিফায়াতুল মুফতি (১/৪৫-৫৬); ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২/৪৮১-৫৩৮); ফাতঙ্কল মুলহিম (২/৫৮-৫৯); আরও দেখুন: কাশ্মীরিকৃত ইকফারুল মুলহিদিন।
২. শিফা, কাজি ইয়াজ (২/২৮৬-২৮৭)।