📄 কুরআন নিয়ে বিতর্ক বর্জন
একদিন কিছু সাহাবা কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে বিতর্ক করছিলেন। এমন অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখমণ্ডল ক্রোধে বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, থামো তোমরা। এভাবেই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগুলো ধ্বংস হয়েছে। তারা নবিদের ব্যাপারে মতভেদ করেছে। কিতাবের একটা আয়াতকে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। কুরআনের এক আয়াত অন্য আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না; বরং এক আয়াত অন্য আয়াতকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা জানো সেটার উপর আমল করো। আর যা জানো না, তা যিনি জানেন তাঁর কাছে সঁপে দাও।'
আমাদের সালাফ কুরআন নিয়ে যেকোনো বিতর্ক এডিয়ে চলতেন। ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ইমাম আবু হানিফার কাছে একদল লোক দুইজনকে ধরে নিয়ে এসে বলল, তাদের একজন বলে কুরআন মাখলুক, অন্যজন তার সঙ্গে বিবাদ করে বলে মাখলুক নয়। ইমাম বললেন, তাদের দুজনের কারও পিছনে নামাজ পড়ো না। আমি বললাম, যে কুরআনকে মাখলুক বলে, তার পিছনে নামাজ না পড়ার কারণ স্পষ্ট। কিন্তু যে কুরআনকে মাখলুক বলে না, তার পিছনে কেন নামাজ পড়া হবে না? ইমাম বললেন, তারা দুজনেই দ্বীন নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছে। আর দ্বীন নিয়ে বিবাদে জড়ানো বিদআত।
ইমাম তহাবি যে যুগে বেঁচে ছিলেন, সে যুগে কুরআন-কেন্দ্রিক বিতর্ক অনেক বেশি ছিল। এ জন্য তিনি এই সংক্ষিপ্ত আকিদার গ্রন্থেও বিভিন্ন জায়গায় বারবার কুরআনের ব্যাপারে বিশুদ্ধ আকিদা তুলে ধরেছেন। বিশেষত এক্ষেত্রে মুতাজিলাদের বিভ্রান্তি খণ্ডন করেছেন। পিছনে আমরা বলেছি, গোটা মুসলিম উম্মাহর বিপরীতে মুতাজিলারা মনে করত কুরআন মাখলুক তথা সৃষ্টি। অথচ কুরআন আল্লাহর কালাম ও তাঁর গুণ; সৃষ্টি নয়। কুরআনকে যদি সৃষ্টি বলা হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে, আল্লাহ নিজের মাঝে নিজে কিছু সৃষ্টি করেছেন। অথচ আল্লাহর গুণাবলি তাঁর সত্তার মতোই আজালি ও আবাদি—সবসময় ছিল এবং সবসময় থাকবে। এটাই সকল মুসলমানের আকিদা। সুতরাং এটাকে মাখলুক বলা মুসলমানদের আকিদার বিরোধিতা করার নামান্তর। আর সকল মুসলমানের (আমজনতা নয়; উলামা ও ফুকাহার) আকিদা ভুল হতে পারে না। বোঝা গেল, যারা মুসলমানদের আকিদা-বিরোধী কথা বলবে বরং তাদেরটা ভুল। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
অর্থ: 'যে ব্যক্তি সরল পথ স্পষ্ট হওয়ার পরেও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুসলমানের অনুসৃত পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে, আমি তাকে ওই দিকেই ফেরাব যে দিকে সে গিয়েছে (অর্থাৎ বক্র করে দেবো)। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। সেটা কতই না নিকৃষ্টতর গন্তব্য!' [নিসা: ১১৫] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতকে কখনোই গোমরাহির উপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না। এরপর—দুই হাত উঁচু করে দেখিয়ে—বললেন, জামাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
ইমাম তহাবি মুসলমানদের সেই সর্বসম্মত আকিদার উপরই তাগিদ দিয়ে বলেছেন, কুরআন আল্লাহর কালাম। আল্লাহ তায়ালা লাওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এই গ্রন্থ দীর্ঘ প্রায় তেইশ বছর ধরে প্রয়োজন অনুপাতে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ
অর্থ: 'এটা আপনার পালনকর্তার কাছ থেকে রুহুল কুদস (জিবরাইল) সত্য-সহ অবতীর্ণ করেছেন।' [নাহল: ১০২]
কুরআন যেহেতু আল্লাহর কালাম তথা তাঁর একটি গুণ, আর আল্লাহর কোনো গুণ সৃষ্টির গুণের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرুর
অর্থ: 'তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।' [শুরা: ১১] অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَلَمْ يَكُنْ لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ অর্থ: 'তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।' সুতরাং কুরআন কোনো মানুষের কথার সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। মানুষের মতো মানুষের কথাও মাখলুক। কুরআন মাখলুক নয়। মক্কার কাফেররা বলত, কুরআন মুহাম্মাদের নিজের রচনা। কখনও বলত, তিনি অন্যদের কাছ থেকে এটা শিখেছেন ইত্যাদি। তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের খণ্ডনে অবতীর্ণ করলেন,
إِنْ هَذَا إِلَّا قَوْلُ الْبَشَرِ. سَأَصْلِيْهِ سَقَرَ.
অর্থ: 'সে বলে, এটা তো নিছক মানুষের কথা। আমি শীঘ্রই তাকে সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' [মুদ্দাস্সির: ২৫-২৬]
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (৬৮১৭); খালকু আফআলিল ইবাদ, বুখারি (৬৩)
২. শাইবানি (২৭); ময়দানি (৯৫)।
৩. মিরকাতুল মাফাতিহ, আলি কারি (১/২৬০)।
১. তিরমিজি (২১৬৭); মুসতাদরাকে হাকেম (৭৯৩)।
১. তাফসিরে ইবনে কাসির (৮/২৭৬, ৪/৫১৮)।
📄 কুরআনের সাত কিরাআত কি কুরআন নিয়ে বিতর্ক?
কুরআন নিয়ে বিতর্ক বর্জন-প্রসঙ্গে কুরআনের একাধিক কিরাআত নিয়ে কয়েকটা কথা বলা জরুরি। বিশেষত নাস্তিকদের প্ররোচনায় অনেক তরুণ-তরুণী কুরআন নিয়ে সন্দেহ করছে। তাদের ধারণা, কুরআন যদি একটাই হয়, সুপ্রমাণিত হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়, তবে মুসলমানদের কুরআন পড়া নিয়ে মতভেদ কেন? কেন তারা কুরআনকে সাত কিরাআত কিংবা দশ কিরাআতে পড়ে? এসব প্রশ্ন মূলত কুরআন সম্পর্কে অজ্ঞতার ফল কিংবা বিদ্বেষপ্রসূত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নতুবা ওহি ও কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস সম্পর্কে যার ন্যূনতম ধারণা আছে, সে এমন কথা বলতে পারে না। কারণ, সকল মুসলমান জানে কিরাআতের এই বিভিন্নতা কুরআন নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং রাসুলুল্লাহর উপর কুরআন এভাবেই একাধিক হরফে (অক্ষরে/পাঠে/শব্দে) অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের আঞ্চলিক আরবি যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন ছিল, উচ্চারণ ভিন্ন ভিন্ন ছিল, যেমন কোনো কোনো অঞ্চলের লোকেরা 'আইন'কে 'হা'র মতো করে উচ্চারণ করতেন। এ জন্য আল্লাহ অনুগ্রহ করে এভাবে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কুরআন সাত অক্ষরে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের যেভাবে সহজ লাগে সেভাবে পড়ো।' বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে আল্লাহর কাছ থেকে এ-রকম একাধিক পাঠ-পদ্ধতি চেয়ে নিয়েছেন। ফলে অক্ষরে ও উচ্চারণে (এমনকি শব্দে) ভিন্নতা থাকলেও অর্থের মাঝে কোনো পার্থক্য ছিল না। এ কারণে প্রত্যেকটি পাঠই বিশুদ্ধ ছিল।
পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লে এসব পাঠ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তাই উসমান রাজি, কুরাইশের পাঠকে মূল ধরে কুরআন সংকলন করেন। তখন যেহেতু আরবি অক্ষরে নুকতা ছিল না, ফলে সাত পাঠের মধ্য থেকে যেগুলো কুরাইশের পাঠের কাছাকাছি ছিল (অর্থাৎ একই রসম বা শব্দরূপে যেগুলো লেখা যেত) সেগুলো থেকে যায়। বাকিগুলো বাদ পড়ে যায়। এভাবে সাত অক্ষরের কিছু অক্ষর বাদ পড়ে যায়, আর কিছু অক্ষর থেকে যায়। উসমানি কুরআনে বিদ্যমান এসব শব্দকে আবার বিভিন্নভাবে পাঠ করার কারণে এখান থেকে তৈরি হয় কিরাআতের ভিন্নতা, যা তাজবিদের কায়দা থেকে উৎসারিত এবং শেষে সাত ও দশ কিরাআতে এসে দাঁড়ায়। এই দশ কিরাআতের মাঝেই মূলত 'সাত অক্ষরে অবতীর্ণ' কুরআন মিশে আছে। তবে এখানে যে বিষয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এগুলোর একটাও কারও ইচ্ছামতো বানানো নয়। এমন নয় যে, মুসলমানরা পাথরে লেখা কুরআনের কিছু নকশা পেয়েছে, এর পর যার যেভাবে মনে চায় পড়েছে; বরং মুসলমানগণ এগুলো রাসুলুল্লাহর মুখ থেকে তাওয়াতুরসূত্রে গ্রহণ ও সংরক্ষণ করেছেন। ফলে কুরআন নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিরাআতের ভিন্নতাকে কুরআন নিয়ে বিতর্ক ভাবার সুযোগ নেই।
টিকাঃ
১. বুখারি (২৪১৯, ৪৯৯১)।
২. বিস্তারিত দেখুন: জুরকানিকৃত 'মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন; ইবনুল জাজারিকৃত 'আন নাশর ফিল কিরাআতিল আশর'; মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-হাদ্দাদকৃত 'আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ ফি মা ওয়ারাদা ফি ইনজালিল কুরআন আলা সাবআতি আহরুফ মিনাল আহাদিসিন নাবাবিয়্যাহ'।
📄 তাকফিরের তিনটি মূলনীতি
আলো বুঝতে অন্ধকার বোঝা জরুরি; কালো জানতে সাদা জানা জরুরি। নতুবা আলো-অন্ধকার বা সাদা-কালোকে কেউ গুলিয়ে ফেলতে পারে। অন্ধকারকে আলো আর কালোকে সাদা বলে চালিয়ে দিতে পারে। এ কারণে ঈমানকে গভীরভাবে জানার জন্য ঈমানের বিপরীত বস্তু কুফর কী সেটাও জানা জরুরি। তাই আকিদার গ্রন্থগুলোতে আমাদের উলামায়ে কেরাম প্রথমে ঈমানের রুকন ও মৌলিক বিষয়গুলো বর্ণনার পরে কুফর নিয়ে আলোচনা করেন। অর্থাৎ প্রথমে ঈমানের দুর্গ গড়ে তোলেন। এর পর এই দুর্গকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে, কী কী ভুল করলে এই দুর্গ ভেঙে পড়বে, সেসব বিষয়ে সতর্ক করেন।
কারণ, ঈমান ও আকিদা কোনো দাবি-দাওয়ার বিষয় নয়। ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো নয়। কেউ যাচ্ছেতাই বিশ্বাস কিংবা কাজ করে এই দাবি করতে পারবে না যে, আমার ঈমান ঠিক আছে, যেহেতু আমার নাম মুসলিম কিংবা আমি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছি। কারণ, জন্ম নেওয়া কিংবা নামের সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক নেই। ঈমানের সম্পর্ক অন্তর, মুখ ও কাজের সঙ্গে। তাই এখনকার একজন মুমিন এক মুহূর্ত পরে কাফেরে পরিণত হতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা দ্রুত আমল করে নাও। অতি শীঘ্রই অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা ঘনিয়ে আসছে। তখন সকালে এক ব্যক্তি মুমিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে; সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে। সামান্য দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীন বিক্রি করে দেবে। তাই নিজের এবং অন্যদের ঈমান রক্ষার জন্য, কুফর থেকে নিজে বাঁচা এবং অন্যকে বাঁচানোর জন্য কুফর-সম্পর্কে জানা আবশ্যক। পাশাপাশি কোনো মুমিনকে যেন কাফের বলা না হয়, কিংবা কোনো কাফেরকে যেন মুমিন ভাবা না হয়, সে জন্য তাকফির (কাউকে কাফের বলা) সম্পর্কে কিছু মূলনীতি জানা আবশ্যক।
ইমাম তহাবি রাহি. এই গ্রন্থে ঈমান ও কুফরের সীমারেখা নির্ধারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। এসব মূলনীতির মাধ্যমে খুব সহজেই ঈমান ও কুফর এবং মুমিন ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য করা যায়। এ-রকম একটি মূলনীতি পিছনে অতিবাহিত হয়েছে। সেটা হলো, কবিরা গুনাহের মাধ্যমে কেউ কাফের হয় না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি ঈমানের মৌলিক বিষয়ের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বড় ধরনের কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়, তবে তার ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু সে কাফের হবে না। গুনাহগার ব্যক্তিকে কাফের বলা খারেজি সম্প্রদায়ের মতাদর্শ, আহলে সুন্নাতের নয়।
ঈমান ও কুফরের দ্বিতীয় একটি মূলনীতি যা ইমাম উপরে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ কেউ যদি কেবল গুনাহ করার ভিতরেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সুস্পষ্ট কোনো গুনাহকে হালাল মনে করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। অন্য কথায়, শরিয়তের সুস্পষ্ট কোনো হারামকে হালাল মনে করলে, হালালকে হারাম মনে করলে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, এর মাধ্যমে সে আল্লাহর শরিয়তের মাঝে অনধিকার চর্চা করছে, নিজেকে সে নিজের রব বানিয়ে আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যান করছে। অথচ হালাল-হারাম নির্ধারণ আল্লাহর কাজ। ফলে এর মাধ্যমে সে প্রকারান্তরে আল্লাহর উপর অপবাদ দিচ্ছে। আর এগুলো সব কুফরি কাজ। ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মে পাদ্রি-পুরোহিতরা এগুলো করত। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলেন,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ
অর্থ: 'তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পাদ্রি-পুরোহিতদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছিল।' [তাওবা: ৩১] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা হালালকে হারাম বানাত আর হারামকে হালাল বানাত, মানুষ এতে তাদের অনুসরণ করত।
ঈমান ও কুফরের তৃতীয় আরেকটি মূলনীতি, যা ইমাম তহাবি সামনে উল্লেখ করবেন, তা হলো, মানুষ যে বিষয়ে ঈমান আনার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছে, যতক্ষণ না সেগুলোর কিছু অস্বীকার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে, তাই ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেসব বিষয় অস্বীকার না করে, যেসব বিষয় স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছিল। যখনই এগুলোর কোনো একটা অস্বীকার করবে, ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।
টিকাঃ
১. মুসলিম (১১৮); তিরমিজি (২১৯৫)।
১. আকহাসারি (১৮৮); তুর্কিস্তানি (১২৮)।
২. তিরমিজি (৩০৯৫)।
📄 তাকদিরের ক্ষেত্রে সতর্কতা
সুতরাং কেউ ইসলাম-বিধ্বংসী কোনো বাতিল আকিদা রাখলে যেমন মুরতাদ হয়ে যাবে, একইভাবে যদি এমন কোনো কথা বলে বা এমন কোনো কাজ করে যা বাতিল আকিদার নির্দেশক, তখনও দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তবে এটা হলো কুফর বর্ণনার স্বাভাবিক নীতি। কিন্তু তাকফিরে মুআইয়ান তথা ব্যক্তিবিশেষকে এভাবে কাফের সাব্যস্ত করা যাবে না। সেক্ষেত্রে বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন অপরিহার্য। কারণ, কোন বিষয় অস্বীকার করছে, কী পরিস্থিতিতে করছে, তাকফিরের শর্তগুলো পাওয়া যাচ্ছে কি না, প্রতিবন্ধকতাগুলো অনুপস্থিত কি না—এসব বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি। একইভাবে দ্বীনের কোন বিষয়গুলো লঙ্ঘন করছে সেটাও বোঝা জরুরি। কেউ যদি দ্বীনের কোনো সুস্পষ্ট ও সরিহ বিষয় অস্বীকার করে, অথবা অস্বীকারের মতো কাজ করে বা কথা বলে এবং সেক্ষেত্রে তাকে মাজুর ধরা না যায়, তখন সে মুরতাদ হয়ে যাবে। কিন্তু যেগুলো মতভেদপূর্ণ বিষয়, কিংবা যেগুলোতে ইজতিহাদ ও ইখতিলাফের সুযোগ রয়েছে, অথবা যাতে জাহালত/শুবুহাত ইত্যাদির অবকাশ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে কাউকে হুট করেই কাফের ফাতাওয়া দেওয়া যাবে না; বরং এটা বিজ্ঞ আলিমসমাজ ও ফকিহদের উপর ছেড়ে দিতে হবে। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের স্পর্শকাতরতা, ব্যক্তির অবস্থা, পারিপার্শ্বিকতা—সবকিছু যাচাই-বাছাই করে ফয়সালা দেবেন। যেমন: খারেজি, কাদারিয়্যাহ, মুতাজিলা, জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া, শিয়া, বিভিন্ন কবর-পূজারী বিদআতি সম্প্রদায় এবং সমকালীন বিভিন্ন মতবাদ, যেমন: সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদির অনুসারী। তারা প্রত্যেকেই অসংখ্য দল-উপদলে বিভক্ত এবং তাদের আকিদা-আচারও ভিন্ন ভিন্ন। ফলে সবাইকে একযোগে কাফের বলা যাবে না। আবার যে সম্প্রদায় সুস্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত, যেমন: কাদিয়ানি ও বাতেনি সম্প্রদায় প্রভৃতি, তাদেরও প্রত্যেক সদস্যকে নাম ধরে ধরে কাফের বলা যাবে না। কারণ অনেকে শুবহাত/তাবিলাত/জাহালত ইত্যাদির কারণে তাদের অনুসরণ করতে পারে। ফলে সেক্ষেত্রে তারা মাজুর গণ্য হবে।
অতএব, নির্দিষ্ট কাউকে কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে সরাসরি কাফের বলা জটিল ও ভয়াবহ ব্যাপার। উদাহরণস্বরূপ: খারেজিদের ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদিস এসেছে, তারা জাহান্নামের কুকুর। তাদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের নিহতদের পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট নিহত বলা হয়েছে। অন্য হাদিসে তাদের ব্যাপারে দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পেলে আদ জাতির মতো হত্যা করার কথা বলেছেন। ইসলামের সঙ্গে তাদের সকল সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কথা বলেছেন। এতকিছু সত্ত্বেও আমাদের সালাফ (সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িন) তাদের পাইকারিভাবে কাফের বলেননি। তা হলে মুতাজিলা, মুরজিয়া ও শিয়াদের আমভাবে কাফের বলা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ সহজে অনুমেয়। আলি রাজি.-কে খারেজিদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'তারা কি মুশরিক?' তিনি বললেন, 'শিরক থেকে তো তারা পলায়ন করেছে।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'মুনাফিক?' তিনি বললেন, 'মুনাফিকরা খুব কমই আল্লাহকে স্মরণ করে।' বলা হলো, 'তা হলে তারা কী?' তিনি বললেন, 'তারা বাগি (বিদ্রোহী) সম্প্রদায়, আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।' সাহাবাদের ইনসাফের স্তর দেখুন। আলি রাজি.-কে খারেজিদের বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও ভয়ংকর যুদ্ধ করতে হয়েছে, তাদের কারণে তিনি সীমাহীন মুসিবতের সম্মুখীন হয়েছেন; বরং শেষ পর্যন্ত এই খারেজিদের হাতেই তিনি শহিদ হয়েছেন; অথচ তাদের ব্যাপারে বক্তব্যের ক্ষেত্রে তিনি কী বিরল ও বিপুল ইনসাফের পরিচয় দিয়েছেন!
ইবনে হাজার খাত্তাবির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে সকল ইমাম একমত যে, খারেজিরা তাদের ভ্রান্তি-সহ মুসলমানদের একটি সম্প্রদায়। তাদের সঙ্গে বিয়ে-শাদি বৈধ। তাদের জবাই করা প্রাণী খাওয়া বৈধ। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো আঁকড়ে ধরে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাফের বলা বৈধ হবে না। তাকফিরের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। আবু মাআলিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অসম্মতি জানান। কারণ, কোনো কাফেরকে ইসলামে ঢোকানো কিংবা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার। গাজালি লিখেন, মানুষকে তাকফির করা থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকা উচিত। কারণ, তাওহিদের স্বীকৃতিদানকারী ও নামাজ আদায়কারীদের রক্ত হালাল বানানো অত্যন্ত জঘন্য ব্যাপার। বরং ভুলে একজন মুসলিমের রক্তপাতের চেয়ে এক হাজার কাফেরকে ছেড়ে দেওয়া উত্তম।
টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন: আল-ইসতিজকার (৮/২৬৮); মাজমুউল ফাতাওয়া (৩/৩৫৩-৩৫৪); আত তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম (১৪৬); আল-ইনসাফ, মারদাভি (১২/৪৮)।
২. সুনানে ইবনে মাজা (১৭৬); হাকেম (২৬৬৯); হুমাইদি (৯৩২); ইবনে আবি শাইবা (৩৯০৫১)।
৩. বুখারি (৩৩৪৪); মুসলিম (১০৬৪); আবু দাউদ (৪৭৬৫)।
৪. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৬৮২০); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৯০৯৭); ফাতহুল বারি (১২/৩০০)।
১. ফাতহুল বারি (১২/৩০০)।