📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ

📄 দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ


এখানে ইমাম তহাবি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা সাধারণ মুসলমান তো বটেই, আলিম ও আহলুল ইলমের জন্যও সমানভাবে সংবেদনশীল। মূলত ইমাম তহাবি এ ধরনের পয়গাম তার বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় দিয়েছেন, যা পিছনে আমরা উল্লেখ করেছি। তিনি এখানে বলতে চেয়েছেন, আমরা আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তাভাবনায় নিজেদের ব্যস্ত করব না। কারণ, পিছনে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি নিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিভিন্ন ধারার মতভেদ উল্লেখ করেছি। আমরা দেখেছি, এসব মতভেদকে কেন্দ্র করে কীভাবে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন দল অন্তর্দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। কীভাবে এমন অনেক বিষয় যা দ্বীনের কোনো মৌলিক মাসআলা নয়, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় নয়, দুনিয়া, কবর কিংবা হাশরে যা সম্পর্কে কাউকে প্রশ্ন করা হবে না, আমরা দেখেছি কীভাবে মুসলিম উম্মাহ সেসবকে কেন্দ্র করে পরস্পরের বিভীষণ শত্রুতে পরিণত হয়েছে; অথচ আল্লাহ আমাদের ভাই ভাই হয়ে থাকতে বলেছেন। দ্বীনের ক্ষেত্রে বিবাদ করতে বারণ করেছেন। তাই ইমাম তহাবি এখানে বলতে চেয়েছেন যে, কুরআন ও সুন্নাহে আল্লাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও জরুরি যেসব মাসআলা এসেছে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুর ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকব। আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তাভাবনায় আমরা নিজেদের ব্যস্ত করব না এবং এ ব্যাপারে সব ধরনের বাড়াবাড়ি পরিত্যাগ করব। ইবনে আব্বাস রাজি.-এর সূত্রে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে, تَفَكَّرُوا فِي كُلِّ شَيْءٍ وَلَا تَفَكَّرُوا فِي ذَاتِ اللَّهِ অর্থ: ‘তোমরা সবকিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করো, কিন্তু আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করো না।’ যেখানে সালাফ আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তাভাবনা পর্যন্ত করতে নিষেধ করেছেন, সেখানে এগুলো নিয়ে নিজেদের ভিতরে বিবাদ ও বিভেদ কতটুকু শরিয়তসম্মত? মুসলমানদের নিদারুণ দুরবস্থার সময় নিজেদের এগুলোর মাঝে ব্যস্ত রাখা কতটুকু যৌক্তিক?

মোট কথা, আল্লাহ-সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে শুরু করে দ্বীনের কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি কিংবা বিবাদ করা যাবে না। হ্যাঁ, যারা দ্বীনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা প্রচার করে, তাদের প্রতিবাদ ও খণ্ডন করতে দোষ নেই। কিংবা যারা আহলুল ইলম, তাদের মাঝে আল্লাহর সিফাত-কেন্দ্রিক মাসআলা নিয়ে মুবাহাসা-মুনাকাশা হতে পারে। কারণ, তা কুরআন-সুন্নাহ চর্চা ও আল্লাহর গুণাবলি বোঝার পদ্ধতি; কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা কুরআন-সুন্নাহের ন্যূনতম জ্ঞান রাখে না, তাদের সামনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, অন্য ধারার আলিমদের বিরুদ্ধে তাদের উসকে দেওয়া একধরনের ইলমি খেয়ানত। কারণ, একজন আলিম হিসেবে আপনার দায়িত্ব ছিল একজন সাধারণ মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কল্যাণকর ও প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দেওয়া; কিন্তু আপনি তাকে শিক্ষা দিয়েছেন এমনসব বিষয়, যেগুলো তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়; বরং তার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর। তাই আহলুল ইলমের জন্য এমন কাজ কখনোই গবেষণাসম্মত নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মুসলমানরা যেন নিজেরা নিজেরা দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি-মারামারি না করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে সত্য জেনেও বিতর্ক পরিহার করবে, তার জন্য জান্নাতের মধ্যখানে একটি ঘর বানানো হবে।

টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (২/৪৬)।
২. তিরমিজি (১৯৯৩); ইবনে মাজা (৫১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কুরআন নিয়ে বিতর্ক বর্জন

📄 কুরআন নিয়ে বিতর্ক বর্জন


একদিন কিছু সাহাবা কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে বিতর্ক করছিলেন। এমন অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখমণ্ডল ক্রোধে বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, থামো তোমরা। এভাবেই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগুলো ধ্বংস হয়েছে। তারা নবিদের ব্যাপারে মতভেদ করেছে। কিতাবের একটা আয়াতকে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। কুরআনের এক আয়াত অন্য আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না; বরং এক আয়াত অন্য আয়াতকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা জানো সেটার উপর আমল করো। আর যা জানো না, তা যিনি জানেন তাঁর কাছে সঁপে দাও।'

আমাদের সালাফ কুরআন নিয়ে যেকোনো বিতর্ক এডিয়ে চলতেন। ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ইমাম আবু হানিফার কাছে একদল লোক দুইজনকে ধরে নিয়ে এসে বলল, তাদের একজন বলে কুরআন মাখলুক, অন্যজন তার সঙ্গে বিবাদ করে বলে মাখলুক নয়। ইমাম বললেন, তাদের দুজনের কারও পিছনে নামাজ পড়ো না। আমি বললাম, যে কুরআনকে মাখলুক বলে, তার পিছনে নামাজ না পড়ার কারণ স্পষ্ট। কিন্তু যে কুরআনকে মাখলুক বলে না, তার পিছনে কেন নামাজ পড়া হবে না? ইমাম বললেন, তারা দুজনেই দ্বীন নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছে। আর দ্বীন নিয়ে বিবাদে জড়ানো বিদআত।

ইমাম তহাবি যে যুগে বেঁচে ছিলেন, সে যুগে কুরআন-কেন্দ্রিক বিতর্ক অনেক বেশি ছিল। এ জন্য তিনি এই সংক্ষিপ্ত আকিদার গ্রন্থেও বিভিন্ন জায়গায় বারবার কুরআনের ব্যাপারে বিশুদ্ধ আকিদা তুলে ধরেছেন। বিশেষত এক্ষেত্রে মুতাজিলাদের বিভ্রান্তি খণ্ডন করেছেন। পিছনে আমরা বলেছি, গোটা মুসলিম উম্মাহর বিপরীতে মুতাজিলারা মনে করত কুরআন মাখলুক তথা সৃষ্টি। অথচ কুরআন আল্লাহর কালাম ও তাঁর গুণ; সৃষ্টি নয়। কুরআনকে যদি সৃষ্টি বলা হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে, আল্লাহ নিজের মাঝে নিজে কিছু সৃষ্টি করেছেন। অথচ আল্লাহর গুণাবলি তাঁর সত্তার মতোই আজালি ও আবাদি—সবসময় ছিল এবং সবসময় থাকবে। এটাই সকল মুসলমানের আকিদা। সুতরাং এটাকে মাখলুক বলা মুসলমানদের আকিদার বিরোধিতা করার নামান্তর। আর সকল মুসলমানের (আমজনতা নয়; উলামা ও ফুকাহার) আকিদা ভুল হতে পারে না। বোঝা গেল, যারা মুসলমানদের আকিদা-বিরোধী কথা বলবে বরং তাদেরটা ভুল। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন,

وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.

অর্থ: 'যে ব্যক্তি সরল পথ স্পষ্ট হওয়ার পরেও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুসলমানের অনুসৃত পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে, আমি তাকে ওই দিকেই ফেরাব যে দিকে সে গিয়েছে (অর্থাৎ বক্র করে দেবো)। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। সেটা কতই না নিকৃষ্টতর গন্তব্য!' [নিসা: ১১৫] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতকে কখনোই গোমরাহির উপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না। এরপর—দুই হাত উঁচু করে দেখিয়ে—বললেন, জামাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

ইমাম তহাবি মুসলমানদের সেই সর্বসম্মত আকিদার উপরই তাগিদ দিয়ে বলেছেন, কুরআন আল্লাহর কালাম। আল্লাহ তায়ালা লাওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এই গ্রন্থ দীর্ঘ প্রায় তেইশ বছর ধরে প্রয়োজন অনুপাতে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ

অর্থ: 'এটা আপনার পালনকর্তার কাছ থেকে রুহুল কুদস (জিবরাইল) সত্য-সহ অবতীর্ণ করেছেন।' [নাহল: ১০২]

কুরআন যেহেতু আল্লাহর কালাম তথা তাঁর একটি গুণ, আর আল্লাহর কোনো গুণ সৃষ্টির গুণের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেন:

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرুর

অর্থ: 'তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।' [শুরা: ১১] অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَلَمْ يَكُنْ لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ অর্থ: 'তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।' সুতরাং কুরআন কোনো মানুষের কথার সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। মানুষের মতো মানুষের কথাও মাখলুক। কুরআন মাখলুক নয়। মক্কার কাফেররা বলত, কুরআন মুহাম্মাদের নিজের রচনা। কখনও বলত, তিনি অন্যদের কাছ থেকে এটা শিখেছেন ইত্যাদি। তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের খণ্ডনে অবতীর্ণ করলেন,

إِنْ هَذَا إِلَّا قَوْلُ الْبَشَرِ. سَأَصْلِيْهِ سَقَرَ.

অর্থ: 'সে বলে, এটা তো নিছক মানুষের কথা। আমি শীঘ্রই তাকে সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' [মুদ্দাস্সির: ২৫-২৬]

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (৬৮১৭); খালকু আফআলিল ইবাদ, বুখারি (৬৩)
২. শাইবানি (২৭); ময়দানি (৯৫)।
৩. মিরকাতুল মাফাতিহ, আলি কারি (১/২৬০)।
১. তিরমিজি (২১৬৭); মুসতাদরাকে হাকেম (৭৯৩)।
১. তাফসিরে ইবনে কাসির (৮/২৭৬, ৪/৫১৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কুরআনের সাত কিরাআত কি কুরআন নিয়ে বিতর্ক?

📄 কুরআনের সাত কিরাআত কি কুরআন নিয়ে বিতর্ক?


কুরআন নিয়ে বিতর্ক বর্জন-প্রসঙ্গে কুরআনের একাধিক কিরাআত নিয়ে কয়েকটা কথা বলা জরুরি। বিশেষত নাস্তিকদের প্ররোচনায় অনেক তরুণ-তরুণী কুরআন নিয়ে সন্দেহ করছে। তাদের ধারণা, কুরআন যদি একটাই হয়, সুপ্রমাণিত হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়, তবে মুসলমানদের কুরআন পড়া নিয়ে মতভেদ কেন? কেন তারা কুরআনকে সাত কিরাআত কিংবা দশ কিরাআতে পড়ে? এসব প্রশ্ন মূলত কুরআন সম্পর্কে অজ্ঞতার ফল কিংবা বিদ্বেষপ্রসূত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নতুবা ওহি ও কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস সম্পর্কে যার ন্যূনতম ধারণা আছে, সে এমন কথা বলতে পারে না। কারণ, সকল মুসলমান জানে কিরাআতের এই বিভিন্নতা কুরআন নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং রাসুলুল্লাহর উপর কুরআন এভাবেই একাধিক হরফে (অক্ষরে/পাঠে/শব্দে) অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের আঞ্চলিক আরবি যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন ছিল, উচ্চারণ ভিন্ন ভিন্ন ছিল, যেমন কোনো কোনো অঞ্চলের লোকেরা 'আইন'কে 'হা'র মতো করে উচ্চারণ করতেন। এ জন্য আল্লাহ অনুগ্রহ করে এভাবে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কুরআন সাত অক্ষরে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের যেভাবে সহজ লাগে সেভাবে পড়ো।' বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে আল্লাহর কাছ থেকে এ-রকম একাধিক পাঠ-পদ্ধতি চেয়ে নিয়েছেন। ফলে অক্ষরে ও উচ্চারণে (এমনকি শব্দে) ভিন্নতা থাকলেও অর্থের মাঝে কোনো পার্থক্য ছিল না। এ কারণে প্রত্যেকটি পাঠই বিশুদ্ধ ছিল।

পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লে এসব পাঠ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তাই উসমান রাজি, কুরাইশের পাঠকে মূল ধরে কুরআন সংকলন করেন। তখন যেহেতু আরবি অক্ষরে নুকতা ছিল না, ফলে সাত পাঠের মধ্য থেকে যেগুলো কুরাইশের পাঠের কাছাকাছি ছিল (অর্থাৎ একই রসম বা শব্দরূপে যেগুলো লেখা যেত) সেগুলো থেকে যায়। বাকিগুলো বাদ পড়ে যায়। এভাবে সাত অক্ষরের কিছু অক্ষর বাদ পড়ে যায়, আর কিছু অক্ষর থেকে যায়। উসমানি কুরআনে বিদ্যমান এসব শব্দকে আবার বিভিন্নভাবে পাঠ করার কারণে এখান থেকে তৈরি হয় কিরাআতের ভিন্নতা, যা তাজবিদের কায়দা থেকে উৎসারিত এবং শেষে সাত ও দশ কিরাআতে এসে দাঁড়ায়। এই দশ কিরাআতের মাঝেই মূলত 'সাত অক্ষরে অবতীর্ণ' কুরআন মিশে আছে। তবে এখানে যে বিষয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এগুলোর একটাও কারও ইচ্ছামতো বানানো নয়। এমন নয় যে, মুসলমানরা পাথরে লেখা কুরআনের কিছু নকশা পেয়েছে, এর পর যার যেভাবে মনে চায় পড়েছে; বরং মুসলমানগণ এগুলো রাসুলুল্লাহর মুখ থেকে তাওয়াতুরসূত্রে গ্রহণ ও সংরক্ষণ করেছেন। ফলে কুরআন নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিরাআতের ভিন্নতাকে কুরআন নিয়ে বিতর্ক ভাবার সুযোগ নেই।

টিকাঃ
১. বুখারি (২৪১৯, ৪৯৯১)।
২. বিস্তারিত দেখুন: জুরকানিকৃত 'মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন; ইবনুল জাজারিকৃত 'আন নাশর ফিল কিরাআতিল আশর'; মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-হাদ্দাদকৃত 'আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ ফি মা ওয়ারাদা ফি ইনজালিল কুরআন আলা সাবআতি আহরুফ মিনাল আহাদিসিন নাবাবিয়্যাহ'।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 তাকফিরের তিনটি মূলনীতি

📄 তাকফিরের তিনটি মূলনীতি


আলো বুঝতে অন্ধকার বোঝা জরুরি; কালো জানতে সাদা জানা জরুরি। নতুবা আলো-অন্ধকার বা সাদা-কালোকে কেউ গুলিয়ে ফেলতে পারে। অন্ধকারকে আলো আর কালোকে সাদা বলে চালিয়ে দিতে পারে। এ কারণে ঈমানকে গভীরভাবে জানার জন্য ঈমানের বিপরীত বস্তু কুফর কী সেটাও জানা জরুরি। তাই আকিদার গ্রন্থগুলোতে আমাদের উলামায়ে কেরাম প্রথমে ঈমানের রুকন ও মৌলিক বিষয়গুলো বর্ণনার পরে কুফর নিয়ে আলোচনা করেন। অর্থাৎ প্রথমে ঈমানের দুর্গ গড়ে তোলেন। এর পর এই দুর্গকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে, কী কী ভুল করলে এই দুর্গ ভেঙে পড়বে, সেসব বিষয়ে সতর্ক করেন।

কারণ, ঈমান ও আকিদা কোনো দাবি-দাওয়ার বিষয় নয়। ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো নয়। কেউ যাচ্ছেতাই বিশ্বাস কিংবা কাজ করে এই দাবি করতে পারবে না যে, আমার ঈমান ঠিক আছে, যেহেতু আমার নাম মুসলিম কিংবা আমি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছি। কারণ, জন্ম নেওয়া কিংবা নামের সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক নেই। ঈমানের সম্পর্ক অন্তর, মুখ ও কাজের সঙ্গে। তাই এখনকার একজন মুমিন এক মুহূর্ত পরে কাফেরে পরিণত হতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা দ্রুত আমল করে নাও। অতি শীঘ্রই অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা ঘনিয়ে আসছে। তখন সকালে এক ব্যক্তি মুমিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে; সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে। সামান্য দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীন বিক্রি করে দেবে। তাই নিজের এবং অন্যদের ঈমান রক্ষার জন্য, কুফর থেকে নিজে বাঁচা এবং অন্যকে বাঁচানোর জন্য কুফর-সম্পর্কে জানা আবশ্যক। পাশাপাশি কোনো মুমিনকে যেন কাফের বলা না হয়, কিংবা কোনো কাফেরকে যেন মুমিন ভাবা না হয়, সে জন্য তাকফির (কাউকে কাফের বলা) সম্পর্কে কিছু মূলনীতি জানা আবশ্যক।

ইমাম তহাবি রাহি. এই গ্রন্থে ঈমান ও কুফরের সীমারেখা নির্ধারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। এসব মূলনীতির মাধ্যমে খুব সহজেই ঈমান ও কুফর এবং মুমিন ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য করা যায়। এ-রকম একটি মূলনীতি পিছনে অতিবাহিত হয়েছে। সেটা হলো, কবিরা গুনাহের মাধ্যমে কেউ কাফের হয় না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি ঈমানের মৌলিক বিষয়ের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বড় ধরনের কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়, তবে তার ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু সে কাফের হবে না। গুনাহগার ব্যক্তিকে কাফের বলা খারেজি সম্প্রদায়ের মতাদর্শ, আহলে সুন্নাতের নয়।

ঈমান ও কুফরের দ্বিতীয় একটি মূলনীতি যা ইমাম উপরে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ কেউ যদি কেবল গুনাহ করার ভিতরেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সুস্পষ্ট কোনো গুনাহকে হালাল মনে করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। অন্য কথায়, শরিয়তের সুস্পষ্ট কোনো হারামকে হালাল মনে করলে, হালালকে হারাম মনে করলে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, এর মাধ্যমে সে আল্লাহর শরিয়তের মাঝে অনধিকার চর্চা করছে, নিজেকে সে নিজের রব বানিয়ে আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যান করছে। অথচ হালাল-হারাম নির্ধারণ আল্লাহর কাজ। ফলে এর মাধ্যমে সে প্রকারান্তরে আল্লাহর উপর অপবাদ দিচ্ছে। আর এগুলো সব কুফরি কাজ। ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মে পাদ্রি-পুরোহিতরা এগুলো করত। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলেন,

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ

অর্থ: 'তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পাদ্রি-পুরোহিতদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছিল।' [তাওবা: ৩১] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা হালালকে হারাম বানাত আর হারামকে হালাল বানাত, মানুষ এতে তাদের অনুসরণ করত।

ঈমান ও কুফরের তৃতীয় আরেকটি মূলনীতি, যা ইমাম তহাবি সামনে উল্লেখ করবেন, তা হলো, মানুষ যে বিষয়ে ঈমান আনার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছে, যতক্ষণ না সেগুলোর কিছু অস্বীকার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে, তাই ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেসব বিষয় অস্বীকার না করে, যেসব বিষয় স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছিল। যখনই এগুলোর কোনো একটা অস্বীকার করবে, ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।

টিকাঃ
১. মুসলিম (১১৮); তিরমিজি (২১৯৫)।
১. আকহাসারি (১৮৮); তুর্কিস্তানি (১২৮)।
২. তিরমিজি (৩০৯৫)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px