📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 গুনাহগার মুসলিমের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের ভারসাম্যপূর্ণ আকিদা

📄 গুনাহগার মুসলিমের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের ভারসাম্যপূর্ণ আকিদা


ইমাম তাহাবির উক্ত আলোচনা মূলত গুনাহগার মুসলমানের ক্ষেত্রে আমাদের আকিদা কী হবে সে ব্যাপারে। এটা সেই প্রাচীন মাসআলা, যাকে কেন্দ্র করে প্রথম যুগ থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং বেশ কিছু সম্প্রদায় এতে প্রান্তিকতার শিকার হয়ে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে।

এদের মাঝে সর্বপ্রথম খারেজি সম্প্রদায়-এর নাম উল্লেখ করা যায়। তারা মনে করত, যে ব্যক্তি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হবে, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। দুনিয়াতে কাফের গণ্য হবে এবং পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অধিবাসী হবে। অতঃপর আসে মুতাজিলা সম্প্রদায়। তারা কিছু ক্ষেত্রে খারেজিদের থেকে সামান্য ভিন্ন মতামত দিলো, কিন্তু মূলনীতিতে তাদের সঙ্গেই থাকল। তারা বলল, যে ব্যক্তি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে, কিন্তু কুফরের মাঝে প্রবেশ করবে না। অর্থাৎ মুসলিম থাকবে না আবার কাফেরও হবে না; বরং ইসলাম এবং কুফরের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকবে। আর যদি কবিরা গুনাহের উপরে মৃত্যুবরণ করে, তবে এক্ষেত্রে মুতাজিলাদের মতামত খারেজিদের মতোই, অর্থাৎ সে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে।

তাদের এই মতাদর্শ গ্রহণের কারণ হলো, তারা কুরআনে বিদ্যমান জাহান্নাম, শাস্তি ও ভীতিপ্রদর্শন-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনের শিকার হয়েছে। ফলে আল্লাহর অনুগ্রহের আশা থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অথচ তাদের এই মতাদর্শ সর্বৈব ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। খোদ কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا.

অর্থ: 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না যে তাঁর সাথে শরিক করে। এতদ্ব্যতীত সকল পাপ তিনি ক্ষমা করে দেন, যার জন্য ইচ্ছা করেন। আর যে লোক আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করল, সে যেন (তাঁর উপর) ভয়ংকর অপবাদ আরোপ করল।' [নিসা: ৪৮] এখানে স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা শিরক ব্যতীত যেকোনো অপরাধ চাইলে তাওবা ছাড়াও ক্ষমা করে দিতে পারেন। কারণ, তাওবা করলে শিরক থেকেও ক্ষমা পাওয়া যাবে। তা ছাড়া কুরআনে আল্লাহ তায়ালা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদেরও মুমিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَلَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّরَ عَنْكُمْ سَيَأْتِكُمْ وَ يُدْخِلَكُمْ جَنَّتٍ.

অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ তাওবা করো। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন আর তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন...'। [তাহরিম: ৮] এখানে আল্লাহ গুনাহগারদের মুমিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একইভাবে স্বেচ্ছায় মানুষ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকেও মুমিন আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى

অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর নিহতদের ব্যাপারে কিসাস ফরজ করা হয়েছে। [বাকারা: ১৭৮] মুমিনদের পরস্পর বিবাদ গুনাহের কাজ। আল্লাহ তায়ালা তাদেরও মুমিন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

وَإِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهুমَا

অর্থ: 'আর যদি মুমিনদের দুটো দল হানাহানিতে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মাঝে মীমাংসা করে দাও...।' [হুজুরাত: ৯]

হাদিসে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। উবাদা ইবনুস সামিত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহর কাছে ছিলাম। তিনি বললেন, 'তোমরা আমার কাছে এই মর্মে বাইয়াত গ্রহণ করছ যে, তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কোনোকিছু শরিক করবে না, ব্যভিচার করবে না, চুরি করবে না; অন্যায়ভাবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করবে না... অতঃপর বললেন, তোমাদের যে ব্যক্তি এই অঙ্গীকার পূর্ণ করবে, আল্লাহর কাছে সে এর প্রতিদান পাবে। আর যে এগুলোর মাঝে কোনো অন্যায়ে লিপ্ত হবে এবং পৃথিবীতে তার শাস্তি হয়ে যাবে, তা হলে সে শাস্তি কাফফারা হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কেউ অন্যায় করে এবং আল্লাহ তায়ালা সেটা ঢেকে রাখেন, সেটার ফয়সালা আল্লাহর হাতে থাকবে। চাইলে তিনি শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করে করবেন।'

রাসুলের যুগে আবদুল্লাহ নামে একজন সাহাবি ছিলেন। তাকে মদ্যপানের অভিযোগে বেশ কয়েকবার শাস্তি দেওয়া হয়। একবার শাস্তি দেওয়ার জন্য তাকে আল্লাহর রাসুলের সামনে নিয়ে আসা হলে কেউ একজন বলল, তার উপর আল্লাহর অভিশাপ। তাকে কতবার শাস্তি দেওয়া লাগে! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা তাকে অভিসম্পাত করো না। আল্লাহর শপথ, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে।' মদ্যপান হারাম ও কবিরা গুনাহ। উক্ত হাদিসে কবিরা গুনাহকারী এই ব্যক্তিকে কাফের তো বলাই হয়নি; বরং বলা হয়েছে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে। এর দ্বারা খারেজি সম্প্রদায়ের ভ্রান্তি প্রমাণিত হয়।

তাদের ভ্রান্তির আরও একটি কারণ হচ্ছে, কুরআন-হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা, প্রকৃত মর্ম অনুধাবন না করা। সালাফের বুঝে সেগুলো না বুঝে নিজেদের বুঝে বোঝা। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহে কিছু কাজের উপর 'কুফর' শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। তারা সেগুলো বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করেছে, অথচ সেক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থ উদ্দিষ্ট নয়; অথবা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে উদ্দিষ্ট। কিন্তু তারা সেগুলো উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করেছে। ফলে তারা মুসলমানদের গুনাহের কারণে কাফের বলা শুরু করেছে। যেমন: কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكُفِرُوْنَ

অর্থ: 'আর যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসন করে না তারা কাফের।' [মায়িদা: ৪৪]

একাধিক হাদিসে মুসলমানকে হত্যা করা কুফর বলা হয়েছে। আরেকটি হাদিসে কাউকে কাফের বলে ডাকাকে কুফর বলা হয়েছে। মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, গাদ্দারি করা ও গালি দেওয়াকে প্রকৃত মুনাফিকি বলা হয়েছে। জিনা, চুরি ও মদ্যপান করার সময় কেউ মুমিন থাকে না বলা হয়েছে। নামাজ পরিত্যাগকারীকে কাফের বলা হয়েছে। গণকের কাছে গমন, স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে সহবাস করাকে কুফর সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নামে শপথ করাকে কুফর বলা হয়েছে। কারও বংশ তুলে অপবাদ দেওয়াকে, মৃত ব্যক্তির উপর কাঁদাকে কুফর বলা হয়েছে!

তারা এসব আয়াত ও হাদিসকে বাহ্যিক অর্থে বুঝেছে। অথচ আহলে সুন্নাতের সকল ইমামের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, এসব নুসুসকে বাহ্যিক অর্থে কিংবা শর্তহীনভাবে বোঝা যাবে না। কুরআনের অন্যান্য আয়াত ও হাদিস দেখলেই এ কথা বুঝে আসে। যদি এসব গুনাহ কুফর হতো, তবে তাতে লিপ্ত ব্যক্তি মুরতাদ হিসেবে গণ্য হতো এবং তার শাস্তি হতো হত্যা। অন্যান্য শাস্তির বিধান রাখা হতো না। অথচ আমরা দেখতে পাই, উপরের অনেক অপরাধ (যেমন মদ্যপান, ব্যভিচার) ইত্যাদির জন্য ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি রাখা হয়েছে। তা ছাড়া অনেকগুলোর কোনো ফৌজদারি শাস্তিই নেই। একইভাবে যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসন করে না, কুরআনের তিনটি আয়াতে একবার তাদের জালেম বলা হয়েছে, একবার ফাসেক বলা হয়েছে, একবার কাফের বলা হয়েছে। প্রত্যেকটির প্রয়োগক্ষেত্র ভিন্ন। নির্ধারিত কিছু পরিস্থিতিতে এমন লোক জালেম ও ফাসেক বিবেচিত হবে, কিছু অবস্থাতে কাফের বিবেচিত হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকটি বিষয় ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। ফলে কুফর শব্দ দেখেই মুসলমানদের কাফের বানিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (২৯৮-২৯৯)।
১. বুখারি (৪৮৯৪); মুসলিম (১৭০৯)।
২. বুখারি (৬৭৮০)।
১. বুখারি (৪৮, ৭০৭৬); মুসলিম (৬৪)।
২. বুখারি (৬১০৩); মুসলিম (৬০)।
৩. বুখারি (৩৪); ইবনে হিব্বান (২৫৪)।
৪. বুখারি (২৪৭৫); মুসলিম (৫৭)।
৫. তিরমিজি (২৬২১); ইবনে মাজা (১০৭৯)।
৬. তিরমিজি (১৩৫); মুসনাদে দারেমি (১১৭৬)।
৭. তিরমিজি (১৫৩৫); আবু দাউদ (৩২৫১); মুসতাদরাকে হাকেম (৪৬)।
৮. মুসলিম (৬৭); মুসনাদে আহমদ (১০৫৭৮)।
৯. মুসলিম (৬৭); মুসনাদে আহমদ (১০৫৭৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 বাহ্যিক অবস্থার উপর ফয়সালা

📄 বাহ্যিক অবস্থার উপর ফয়সালা


ইসলাম আমাদের মানুষের বাহ্যিক অবস্থার উপর ফয়সালা দিতে বলেছে; আর ভিতরের অবস্থা আল্লাহর কাছে সমর্পিত থাকবে। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে স্বীকৃতি দেবে, ইসলাম ও ঈমানের যাবতীয় বিষয়ের উপর বিশ্বাস রাখবে, আমরা তাকে মুসলিম ও মুমিন আখ্যা দেবো। ভিতরে আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক কীরূপ, পরকালে তার কী হবে, সেটা আল্লাহর কাছে সমর্পিত থাকবে। কোনো ধ্যান-ধারণা, অনুমান, পূর্ব-বিশ্বাস ইত্যাদির উপর নির্ভর করে কারও ব্যাপারে ফয়সালা দেওয়া যাবে না। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُوْلُوْا لِمَنْ الْقَى إِلَيْكُمُ السَّلْمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا .

অর্থ: 'হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন আল্লাহর পথে সফর করো, তখন যাচাই করে নাও। আর যে ব্যক্তি তোমাদের সালাম করে, তাকে বলো না যে, তুমি মুসলমান নও।' [নিসা: ৯৪] অর্থাৎ যদি কোনো কাফের ব্যক্তি মুসলিম বাহিনী দেখে তাদের সালাম দেয়, কিংবা ইসলাম গ্রহণের উপর ইঙ্গিতবাহী কিছু করে, তবে তাকে অমুসলিম মনে করে হত্যা করা যাবে না; বরং বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে তাকে মুসলিম গণ্য করে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল। নামাজ আদায় করে, জাকাত প্রদান করে যখন তারা এগুলো করবে, তাদের রক্ত ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। তবে ইসলামের কোনো হক থাকলে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের হিসাব থাকবে আল্লাহর উপর।' উসামা ইবনে জায়দ রাজি. একবার এক কাফেরের সম্মুখীন হন। হত্যার আগমুহূর্তে সে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে। উসামা রাজি. মনে করেন, সে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে এটা বলেছে। তাই তাকে হত্যা করে ফেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই কথা জানানোর পরে তিনি বলেন, সে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করে ফেললে? তিনি বললেন, আমি মনে করেছি সে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে বলেছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন, তুমি কি তার হৃদয় চিরে দেখেছ? তুমি কি তার হৃদয় ফেড়ে দেখেছ? শব্দটা তিনি এতবার বললেন যে, উসামা বলেন, আমার কাছে মনে হলো, আমি যদি সেদিন মুসলমান হতাম (অর্থাৎ তা হলে সেদিনের এই ঘটনা ঘটত না)।

টিকাঃ
১. বুখারি (২৫); মুসলিম (২২); দারাকুতনি (৮৯৮)।
২. বুখারি (৬৮৭২); মুসলিম (৯৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মুসলিম ও মুমিন

📄 মুসলিম ও মুমিন


ইসলাম ও ঈমান শব্দ দুটোর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। ইসলাম শব্দের অর্থ হচ্ছে দ্বীনের বাহ্যিক ইবাদত-বন্দেগি, যেমন: নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। আর ঈমান হচ্ছে অন্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেমন: আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসুল, পরকাল, তাকদিরে বিশ্বাস করা। সে হিসেবে মুসলিম হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে বাহ্যিক ইবাদতগুলো ঠিকভাবে পালন করে। আর মুমিন হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে প্রকৃত অর্থেই অন্তরে আল্লাহকে বিশ্বাস করে আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাবান থাকে। তবে ইমাম তহাবি একত্রে দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন। এতে বোঝা যায়, সামগ্রিকভাবে মুসলিম ও মুমিন সমার্থক শব্দ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ইসলামের বিধি-বিধান পালন করবে, সে যেমন মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে, মুমিন হিসেবেও গণ্য হবে। কারও অন্তরের অবস্থা নিয়ে অমূলক সন্দেহ করা উচিত হবে না।

টিকাঃ
৩. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ

📄 দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ


এখানে ইমাম তহাবি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা সাধারণ মুসলমান তো বটেই, আলিম ও আহলুল ইলমের জন্যও সমানভাবে সংবেদনশীল। মূলত ইমাম তহাবি এ ধরনের পয়গাম তার বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় দিয়েছেন, যা পিছনে আমরা উল্লেখ করেছি। তিনি এখানে বলতে চেয়েছেন, আমরা আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তাভাবনায় নিজেদের ব্যস্ত করব না। কারণ, পিছনে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি নিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিভিন্ন ধারার মতভেদ উল্লেখ করেছি। আমরা দেখেছি, এসব মতভেদকে কেন্দ্র করে কীভাবে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন দল অন্তর্দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। কীভাবে এমন অনেক বিষয় যা দ্বীনের কোনো মৌলিক মাসআলা নয়, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় নয়, দুনিয়া, কবর কিংবা হাশরে যা সম্পর্কে কাউকে প্রশ্ন করা হবে না, আমরা দেখেছি কীভাবে মুসলিম উম্মাহ সেসবকে কেন্দ্র করে পরস্পরের বিভীষণ শত্রুতে পরিণত হয়েছে; অথচ আল্লাহ আমাদের ভাই ভাই হয়ে থাকতে বলেছেন। দ্বীনের ক্ষেত্রে বিবাদ করতে বারণ করেছেন। তাই ইমাম তহাবি এখানে বলতে চেয়েছেন যে, কুরআন ও সুন্নাহে আল্লাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও জরুরি যেসব মাসআলা এসেছে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুর ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকব। আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তাভাবনায় আমরা নিজেদের ব্যস্ত করব না এবং এ ব্যাপারে সব ধরনের বাড়াবাড়ি পরিত্যাগ করব। ইবনে আব্বাস রাজি.-এর সূত্রে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে, تَفَكَّرُوا فِي كُلِّ شَيْءٍ وَلَا تَفَكَّرُوا فِي ذَاتِ اللَّهِ অর্থ: ‘তোমরা সবকিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করো, কিন্তু আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করো না।’ যেখানে সালাফ আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তাভাবনা পর্যন্ত করতে নিষেধ করেছেন, সেখানে এগুলো নিয়ে নিজেদের ভিতরে বিবাদ ও বিভেদ কতটুকু শরিয়তসম্মত? মুসলমানদের নিদারুণ দুরবস্থার সময় নিজেদের এগুলোর মাঝে ব্যস্ত রাখা কতটুকু যৌক্তিক?

মোট কথা, আল্লাহ-সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে শুরু করে দ্বীনের কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি কিংবা বিবাদ করা যাবে না। হ্যাঁ, যারা দ্বীনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা প্রচার করে, তাদের প্রতিবাদ ও খণ্ডন করতে দোষ নেই। কিংবা যারা আহলুল ইলম, তাদের মাঝে আল্লাহর সিফাত-কেন্দ্রিক মাসআলা নিয়ে মুবাহাসা-মুনাকাশা হতে পারে। কারণ, তা কুরআন-সুন্নাহ চর্চা ও আল্লাহর গুণাবলি বোঝার পদ্ধতি; কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা কুরআন-সুন্নাহের ন্যূনতম জ্ঞান রাখে না, তাদের সামনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, অন্য ধারার আলিমদের বিরুদ্ধে তাদের উসকে দেওয়া একধরনের ইলমি খেয়ানত। কারণ, একজন আলিম হিসেবে আপনার দায়িত্ব ছিল একজন সাধারণ মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কল্যাণকর ও প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দেওয়া; কিন্তু আপনি তাকে শিক্ষা দিয়েছেন এমনসব বিষয়, যেগুলো তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়; বরং তার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর। তাই আহলুল ইলমের জন্য এমন কাজ কখনোই গবেষণাসম্মত নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মুসলমানরা যেন নিজেরা নিজেরা দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি-মারামারি না করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে সত্য জেনেও বিতর্ক পরিহার করবে, তার জন্য জান্নাতের মধ্যখানে একটি ঘর বানানো হবে।

টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (২/৪৬)।
২. তিরমিজি (১৯৯৩); ইবনে মাজা (৫১)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px