📄 আসমানি গ্রন্থসমূহে ইমান আনার স্বরূপ
একজন মুসলিমকে সকল আসমানি গ্রন্থে ঈমান আনতে হবে। তবে সকল গ্রন্থের ব্যাপারে ঈমান একই স্তরের নয়। কারণ, আমরা সবার গ্রন্থের ব্যাপারে জানি না। কুরআন-সুন্নাহে মাত্র কয়েকটা গ্রন্থের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: মুসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাওরাত দিয়েছেন; দাউদ আলাইহিস সালামকে জাবুর দিয়েছেন; ঈসা আলাইহিস সালামকে ইনজিল দিয়েছেন; মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন দিয়েছেন। এই চারটি গ্রন্থ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এর বাইরে আরও কিছু নবিকে গ্রন্থ দেওয়ার কথা রয়েছে। যেমন: মুসা আলাইহিস সালাম ও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুহুফ (পুস্তিকাসমূহ)। সবগুলোর উপর ঈমান আনতে হবে।
এক্ষেত্রে ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা অনেক নবির উপর অনেক কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আমরা সেসব কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বাস করি। এটুকু সংক্ষিপ্ত ঈমান যথেষ্ট। সেসব কিতাবের বিস্তারিত বিষয়বস্তুর উপর ঈমান আনা প্রয়োজন নেই বরং সুযোগই নেই। কারণ, সেগুলো আমরা জানি না। সেসব কিতাবের মাঝ থেকে যেগুলো আজও বিদ্যমান রয়েছে এবং অভিন্ন শিরোনাম বহন করছে, সেগুলোকে আসমানি গ্রন্থ বলার সুযোগ নেই, যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের গ্রন্থগুলো। আল্লাহ তায়ালা এগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব নেননি। ফলে এগুলো সংরক্ষিত থাকেনি, যা উপরে বিস্তারিত সপ্রমাণ বলা হয়েছে। সুতরাং তাওরাত (বাইবেলের পুরাতন নিয়মের প্রথম পাঁচ পুস্তক), জাবুর (পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত) ও ইনজিল (নতুন নিয়মের প্রথম চার পুস্তক) নামে বাজারে যেসব বই প্রচলিত রয়েছে, সেগুলোকে আল্লাহর বাণী মনে করার কোনো সুযোগ নেই: বরং ওগুলো মানুষের লেখা। হ্যাঁ, অসম্ভব নয় যে, তাতে দু-একটি সত্য বাক্য ও আল্লাহর ওহি থাকতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ওগুলো মানবরচিত গ্রন্থ। তাই আমরা যখন তাওরাত, জাবুর ও ইনজিলের উপর ঈমানের কথা বলি, তখন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের হাতে থাকা প্রচলিত বাইবেল উদ্দেশ্য নয়; বরং আল্লাহ মুসা, দাউদ ও ঈসা আলাইহিস সালামের উপর যে তাওরাত, জাবুর ও ইনজিল অবতীর্ণ করেছিলেন সেগুলো উদ্দেশ্য। তাদের হাতে বিদ্যমান গ্রন্থগুলোর ব্যাপারে আমাদের তিনটি কর্মপদ্ধতি হবে। এক, যেগুলো কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেগুলো গ্রহণ করব। দুই. যেগুলো কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে, সেগুলো প্রত্যাখ্যান করব। তিন. এর বাইরে যেসব ঘটনা, বিবরণ ইত্যাদি থাকবে, সে ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর মতো আমরাও নীরব থাকব। সত্য বলব না, মিথ্যাও বলব না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের আহলে কিতাবরা যা বলে, সেগুলো সত্য হিসেবে গ্রহণ করো না, মিথ্যা প্রতিপন্নও করো না; বরং বলো, আমরা আল্লাহর ফেরেশতা, কিতাব এবং রাসুলদের উপর ঈমান এনেছি। তাহলে তাদের কথা যদি সত্য হয়, সেটা তোমরা মিথ্যা বললে না; আর যদি মিথ্যা হয়, সেটা সত্য বললে না...।’১
টিকাঃ
১. সহিহ ইবনে হিব্বান (৬২৫৭); মুসনাদে আহমদ (১৭৪৯৮)।
📄 বেদ ও ত্রিপিটক কি আসমানি কিতাব?
যেমনইভাবে এগুলোর বাইরে যেসব গ্রন্থ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহে কোনো বর্ণনা নেই, অথচ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে সেগুলো আসমানি কিংবা পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত সেগুলোকেও আসমানি গ্রন্থ বলা যাবে না। যেমন: বৌদ্ধ ধর্মের ‘ত্রিপিটক’, হিন্দুদের ‘বেদ’, পারসি ধর্মের ‘জিন্দাবেস্তা’ ইত্যাদি। অথবা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মে বিদ্যমান অন্যান্য নবির নামে প্রচলিত গ্রন্থ। এগুলোকে আসমানি গ্রন্থ বলার সুযোগ নেই। এমনকি যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ওগুলো মূলত একসময় আসমানি গ্রন্থ ছিল, বিশেষত হিন্দুধর্মের কিছু প্রাচীন গ্রন্থ, যেখানে তাওহিদের কথা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-সম্পর্কিত সুসংবাদ রয়েছে, তথাপি সেগুলো অক্ষত থাকেনি; বরং বিকৃতির শিকার হয়েছে। তাই ত্রিপিটক, বেদ-পুরাণে কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো কথা পাওয়া গেলেই বিনা প্রমাণে ওগুলোকে আসমানি গ্রন্থ বলা যাবে না। আমরা সকল নবি-রাসুলের উপর অবতীর্ণ সকল গ্রন্থে সাধারণভাবে বিশ্বাস রাখি। সেখানে বেদ-বাইবেল থাকতে পারে; কিন্তু আছে কি না সেটা আমাদের কাছে অজ্ঞাত।
📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ পড়ার বিধান
অন্য ধর্মের গ্রন্থ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশেষ কোনো মূলনীতি বেঁধে দেয়নি। বরং যে কোনো সাধারণ গ্রন্থ পড়ার ক্ষেত্রে যে মূলনীতি, এখানেও সেটা প্রযোজ্য। সাধারণ গ্রন্থ পড়ার ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো, ভালো বিষয়বস্তুর বই পড়া যাবে, মন্দ বিষয়বস্তুর বই পড়া যাবে না। যেহেতু পৃথিবীতে শিরকের চেয়ে মন্দ কোনো কিছু নেই; আর ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে প্রচলিত সেসব গ্রন্থে যেহেতু প্রচুর শিরকি কথা-বার্তা বিদ্যমান, তাই ওগুলো এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভালো বিষয়বস্তুর বই নয়। ফলে ওগুলো পড়াও উচিত নয়। বিশেষত সাধারণ মানুষের ওসব গ্রন্থ পড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে। উপরন্তু জ্ঞানের জন্য ওগুলোর চেয়ে ভালো বই আছে। দুঃখজনকভাবে তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত অনেক মুসলিম দাবিদার নিয়মিত স্রেফ কৌতূহল কিংবা স্টাইল হিসেবে বেদ-বাইবেল পড়েন, কিন্তু কুরআন খুলে দেখার সুযোগ পান না। এটা সুস্পষ্ট গোমরাহি ও দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর ইবনুল খাত্তাবের হাতে ইহুদিদের কিতাবের কিছু অংশ দেখে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন, তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায় এবং এগুলো পড়তে বারণ করে দেন।১ তাহলে সাধারণ মানুষ এগুলো পড়তে পারে কী করে? ইবনে আব্বাসও আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গ্রন্থ পড়া কিংবা তাদের কাছে ধর্মীয় বিষয় জানতে চাওয়া কঠোরভাবে বারণ করতেন।২
হ্যাঁ, আলিম ও দাঈগণ দাওয়াতের উদ্দেশ্যে, খণ্ডনের উদ্দেশ্যে, সেসব গ্রন্থের অনুসারীদের সামনে সেগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরে তাদের কুরআনের দিকে আহ্বানের লক্ষ্যে সেগুলো পড়তে পারেন, অধ্যয়ন করতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন। তবে এর আগে কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন এবং নিজের ঈমানের উপর ব্যাপক আস্থা তৈরি করে তবেই শুরু করা যেতে পারে। পাশাপাশি দিনরাত সেগুলো নিয়ে পড়ে থাকলে ঈমানের ক্ষতি হতে পারে। তাই কুরআন-সুন্নাহকে মূল রেখে প্রয়োজন অনুপাতে দেখার সুযোগ থাকবে।৩
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (১৫৩৮৮); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (২৬৯৪৯)।
২. বুখারি (২৬৮৫, ৭৩৬৩)।
৩. দেখুন: ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার (১৩/৫২৫)।