📄 দ্বিতীয় দলের মত
দ্বিতীয় দলের মত
দ্বিতীয় মত পোষণকারীরা বলেন, নবিগণ কবিরা গুনাহের মতো সব ধরনের সগিরা গুনাহ থেকেও পবিত্র। কারণ আল্লাহ তাদের গোটা সৃষ্টির উপর মনোনীত করেছেন। তারা মানুষের জন্য সামগ্রিক আদর্শ। ফলে তাদের দ্বারা সগিরা গুনাহও হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি আদর্শ হতে পারেন না। তা ছাড়া তাদের মতে, নবিগণ ইনসানে কামেল তথা পূর্ণাঙ্গ মানব; আর সগিরা গুনাহ সেই পূর্ণাঙ্গতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক, তাওবা করা হলেও। ফলে নবিগণ সগিরা গুনাহ থেকে পবিত্র। এই দলের প্রথমে আছেন ইমাম আবু হানিফা (১৫০ হি.)। তিনি নবিদের সগিরা, কবিরা-সহ সব ধরনের কুফর ও মানহানিকর বিষয় থেকে মাসুম বলেন। তবে তাদের ভুল ও বিচ্যুতি (যাল্লাত/খাতায়া) হয়ে থাকতে পারে।২ আবু ইসহাক ইসফারায়েনি (৪১৮ হি.) এই মতকে অগ্রাধিকার দেন এবং এটাকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মত হিসেবে বর্ণনা করেন। পাশাপাশি প্রথম মতকে ‘কারও কারও মত বলে’ ভিত্তিহীন আখ্যা দেন।৩ ইমাম আবুল ইউসর (সদরুল ইসলাম) বাজদাবি (৪৯৩ হি.) নবিগণকে সগিরা ও কবিরা সব ধরনের গুনাহ থেকে মাসুম বলেছেন।৪ মুফাসসির ইবনে আতিয়্যাহও (৫৪২ হি.) মতানৈক্যের কথা বর্ণনা করে সব ধরনের গুনাহ থেকে মাসুম হওয়ার মতকে অগ্রাধিকার দেন।১ ইমাম নববি (৬৭৬ হি.) লিখেন, আমাদের ইমামদের মাঝ থেকে একদল মুহাক্কিক ফকিহ ও মুতাকাল্লিমিন এই মত পোষণ করেন। তাদের মতে, নবুওতের মসনদের সঙ্গে এ ধরনের গুনাহও শোভনীয় নয়। তারা এ ব্যাপারে বর্ণিত কুরআনের আয়াতগুলোকে তাবিল করেন। এগুলো বলার পরে ইমাম নববি এটাকেই গ্রহণযোগ্য বলে মত দেন।২ বদরুদ্দিন আইনি (৮৫৫ হি.) মতভেদ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার মাজহাব হলো, নবিগণ নবুওতের আগে-পরে সগিরা- কবিরা সব ধরনের গুনাহ থেকে মাসুম। তাদের কারও কারও কাছ থেকে সগিরা গুনাহ- সদৃশ যে সামান্য কিছু বিষয় প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো গুনাহ নয়; বরং উত্তমের বদলে অনুত্তম বলা যায়।’৩ ইবনে হাজার আসকালানিও (৮৫২ হি.) এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।৪ হজরত থানভিরও এই মত।৫
প্রথম দলের উলামায়ে কেরাম তাদের তাবিলকে বর্জন করেন। তাদের মতে, এসব তাবিল আর রাফেজ-বাতেনি সম্প্রদায়ের তাবিলের মাঝে পার্থক্য নেই। ইবনে তাইমিয়া মনে করেন, ইসমাতে মুতলাক (অর্থাৎ সগিরা ও কবিরা সব ধরনের গুনাহ থেকে পবিত্রতার) ধারণা সূচিত হয় রাফেজিদের হাতে। তারা তাদের ইমামের ব্যাপারে এসব আকিদার সূচনা করে। নতুবা আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি আহমদ-সহ আহলে সুন্নাতের কোনো ইমাম কিংবা তাদের অনুসারী, এমনকি ইবনে কুল্লাব, আবুল হাসান আশআরি, ইবনে কাররাম-সহ বড় বড় মুতাকাল্লিম থেকেও এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। তাই এ ব্যাপারে মুসলমানদের কাফের কিংবা ফাসেক বলা জায়েজ নেই। হ্যাঁ, ভুল-শুদ্ধ বললে সেটা ভিন্ন কথা।৬ আমেদিও বলেছেন, শিয়ারা তাদের সগিরা থেকেও নিষ্পাপ ভাবে।৭ রাজিও বলেছেন, শিয়ারা রাসুলদের (জ্ঞাতসারে- অজ্ঞাতসারে) সম্পূর্ণরূপে সব ধরনের গুনাহ থেকে মুক্ত মনে করে।৮
এর পর তারা তাদের যুক্তির জবাব দেন। তাদের মতে, আদর্শ হওয়ার জন্য সগিরা গুনাহ থেকেও পবিত্র হওয়া জরুরি নয়। হ্যাঁ, তাদের কথা সঠিক হতো, যদি গুনাহ করার পরে তারা সেটার উপর অবিচল থাকতেন। তাহলে গুনাহের ক্ষেত্রেও তাদের আদর্শ হতে হতো। কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। বরং নবিগণ কোনো গুনাহ করে ফেললে দ্রুত তাওবা করে ফেলেন। সেটা বরং মুমিনদের জন্য আদর্শ। আর দ্বিতীয় যুক্তির জবাবে বলেন, সগিরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া মানুষের কামালতকে নষ্ট করে না; মানুষের মর্যাদা ও স্তরকে নিচু করে না; বরং অনেক সময় তাওবা মানুষের কামালতকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কখনও কখনও গুনাহের মাধ্যমে মানুষ গুনাহের আগের অবস্থার চেয়ে আল্লাহর আরও বেশি কাছাকাছি চলে যেতে পারে তাওবা, ইস্তিগফার ও আমলের মাধ্যমে, যেমনটা আদম আলাইহিস সালামের সঙ্গেও হয়েছিল।১
টিকাঃ
২. আল-ফিকহুল আকবার (৩৭) ।
৩. তাফসিরে কুরতুবি (১/৩০৯) ।
৪. উসুলুদ্দিন, বাজদাবি (১৭২) ।
১. তাফসিরে ইবনে আতিয়্যাহ (১/২১১) ।
২. শরহে মুসলিম, নববি (৩/৫৪) ।
৩. উমদাতুল কারি, আইনি (১৮/৯) ।
৪. ফাতহুল বারি (১১/১০১) ।
৫. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৪১২-৪১৩) ।
৬. মাজমুউল ফাতাওয়া (৪/৩২১) ।
৭. আল-ইহকাম, আমেদি (১/১৭১) ।
৮. ইসমাতুল আম্বিয়া, রাজি (৪০) ।
১. মাজমুউল ফাতাওয়া (১০/৩০৯) ।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
অধমের পর্যবেক্ষণ
উভয় দলের বক্তব্য পর্যবেক্ষণের পরে অধমের মনে হয়েছে, যারা নবিগণকে সগিরা গুনাহ থেকেও পবিত্র বলেছেন, তারা সগিরা গুনাহের নিচে (যাল্লাত/সাহু) সামান্য ভুল-বিচ্যুতি ইত্যাদি হয়ে থাকতে পারে বলে মত দিয়েছেন, যেমনটা ইমাম আবু হানিফা রাহি.-এর কথাতে স্পষ্ট। তিনি নবিদের সগিরা, কবিরা-সহ সব ধরনের কুফর ও মানহানিকর বিষয় থেকে মাসুম বললেও তাদের ভুল ও বিচ্যুতি (যাল্লাত/খাতায়া) হয়ে থাকতে পারে বলেন।১ একইভাবে ইমাম সদরুল ইসলাম বাজদাবির কথা দ্বারাও অভিন্ন বিষয় বুঝে আসে। তিনি বলেন, ‘আম্বিয়াগণ ইচ্ছাকৃত কবিরা ও সগিরা সকল গুনাহ থেকে মুক্ত। তবে ভুলে সংঘটিত বিচ্যুতি (জাল্লাত) থেকে মুক্ত নন।’২ খুব সম্ভবত সগিরা গুনাহ এবং এই সামান্য ভুল-বিচ্যুতির সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকার ফলেই আলিমদের মাঝে এ মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ফলে কেউ ওটাকে সগিরা গুনাহ ধরেছেন। কেউ গুনাহ নয়, বরং সামান্য বিচ্যুতি কিংবা এটি উত্তম-অনুত্তম ধরেছেন। তবে এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, নবিগণ কোনো ধরনের সগিরা গুনাহ কিংবা ভুল-বিচ্যুতির উপরও অটল থাকেন না। ফলে এটি তাদের মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর নয়।
আরও একটি ব্যাপার এখানে উল্লেখযোগ্য; তা হলো, পাঠকের কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়েছে যে, ব্যাপারটি মতভেদপূর্ণ। ফলে কেবল আবেগ দিয়ে এটাকে বিচার করা ঠিক হবে না। কারণ, প্রত্যেক আবেগের বিষয় বাহ্যিকভাবে সুন্দর হলেও ভিতরে তেমন নাও হতে পারে। যেমন: ভ্রান্ত শিয়া সম্প্রদায় নবিদের কবিরা, সগিরা, ইচ্ছাকৃত/অনিচ্ছাকৃত সব ধরনের ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করে।৩ উৎসুক পাঠক জিজ্ঞাসা করতে পারেন, শিয়া সম্প্রদায় নবিদের এত শ্রদ্ধা করে কীভাবে? বাস্তবতা হলো, তারা নবিদের জন্য নয়, বরং তাদের ইমামদের জন্য এই নীতি অবলম্বন করেছে। কারণ, তারা ইমামদের মাসুম মনে করে।৪ সুতরাং তিনি নবিদের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের ভুল সাব্যস্ত করতে গেলে তাদের মতাদর্শই ভেঙে পড়বে। তাই বিষয়গুলো আবেগ নয়, নস দিয়ে বুঝতে হবে।
টিকাঃ
১. আল-ফিকহুল আকবার (৩৭) ।
২. উসুলুদ্দিন, বাজদাবি (১৭২) ।
৩. মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়া (১/৪৭২) ।
৪. ইসমাতুল আম্বিয়া, রাজি (৪০) ।