📄 খিজির আলাইহিস সালাম কি জীবিত?
খিজির আলাইহিস সালাম কি জীবিত?
একইভাবে খিজির আলাইহিস সালামের ব্যাপারে সেসব বাড়াবাড়ি করা যাবে না, যেসব বাড়াবাড়ি কিছু মুসলিম ঘরানাতে পাওয়া যায়। যেমন: খিজির ও ইলিয়াস আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত, তারা পাহাড়ে সাগরে জঙ্গলে থাকেন, ওলি-আউলিয়াদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তাদের সহায়তা করেন—এ জাতীয় বক্তব্য। ইমাম কুরতুবি, নববি, ইরাকি, ইবনুস সালাহ-সহ১ অনেক মুহাক্কিক আলিম ও তাসাউফের মোটামুটি অধিকাংশ বুজুর্গই এ কথা বলেছেন। মাশায়েখে দেওবন্দ খিজির আলাইহিস সালামকে জীবিত মানেন। কিন্তু তারা যেসব দলিল পেশ করেন, সেগুলো দ্বারা আদৌ তারা দুজন জীবিত সেটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় না। বরং কুরআন-হাদিসের সকল দলিল তাদের মৃত্যুকে নিশ্চিত করে। যেমন: কুরআনে বর্ণিত মানবজীবনের চিরন্তন রীতি:
কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাওত
অর্থ: ‘প্রত্যেক নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’। [আম্বিয়া: ৩৫]
রাসুলকে লক্ষ্য করে আল্লাহর বাণী,
ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন
অর্থ: ‘আপনি মৃত্যুবরণ করবেন যেমন তারা মৃত্যুবরণ করবেন।’ [জুমার: ৩০]
অন্যত্র রাসুলুল্লাহকে বলেন,
ওয়া মা জাআলনা লিবাশারিন মিন ক্বাবলিকাল খুলদা আফায়িন মিত্তাহ ফাহুমুল খালিদুন
অর্থ: আমি আপনার পূর্বে কোনো মানুষকে চিরঞ্জীব করিনি। সুতরাং আপনি যদি মৃত্যুবরণ করেন, তারা কি চিরকাল থাকবে? [আম্বিয়া: ৩৪]
এ কারণে আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের কাছে গ্রহণযোগ্য মত হলো, খিজির ও ইলিয়াস মৃত্যুবরণ করেছেন।১ কেউ ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত থাকার যুক্তি দেখাতে পারে। অথচ দুটো কোনোভাবেই এক নয়। ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশে রয়েছেন। আর আকাশের জীবন দুনিয়ার জীবন থেকে ভিন্ন; বরং আকাশে তো অন্যান্য রাসুলও রয়েছেন। তাছাড়া ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত থাকার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য রয়েছে। বিপরীতে তাদের দুজনের ব্যাপারে এমন কিছুই নেই। সুতরাং ঈসা আলাইহিস সালামের উপর কিয়াস করে খিজির ও ইলিয়াসকে জীবিত বলা সঠিক নয়।
একইভাবে রাসুলুল্লাহর হাদিস, যেখানে এক রাতে তিনি সাহাবাদের লক্ষ্য করে বলেছেন, আজ যারা দুনিয়ার বুকে আছে, একশো বছর পরে কেউ থাকবে না।২ এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তারা কেউ জীবিত নন। ইমাম নববি-সহ কেউ কেউ এখান থেকে খিজিরকে ব্যতিক্রম ধরার কথা বলেন। দাজ্জাল (জাসসাসাহ) ও ইয়াজুজ- মাজুজের উপর কিয়াস করে। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কারণ, তাদের জীবিত থাকা নস দ্বারা প্রমাণিত। ফলে তাদের ব্যতিক্রম ধরা হবে। কিন্তু খিজির আলাইহিস সালামের জীবন প্রমাণিতই নয়; ব্যতিক্রম তো পরের বিষয়।
বিপরীতে তাদের জীবিত থাকার যেসব দলিল পেশ করা হয়, তার অনেকগুলো বানোয়াট বাকিগুলো দুর্বল, অজ্ঞাত ব্যক্তির বর্ণনা, স্বপ্নের দর্শন, কল্পনা ও যুক্তি ইত্যাদি, যেগুলোর মাধ্যমে আকিদা প্রমাণিত হয় না। ইমাম বুখারি, ইমাম আহমদ এমন আকিদা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইবনুল জাওজি শক্তভাবে এটা খণ্ডন করেছেন।৩ ইমাম নববি খিজির জীবিত থাকাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মত বলেছেন।৪ কিন্তু ইবনে হাজার আসকালানি সেটাকে খণ্ডন করেছেন। ইবনে কাসিরও খিজির জীবিত থাকার মত খণ্ডন করেছেন এবং তারা যেসব দলিল দেন, সেগুলোকে অশুদ্ধ বলেছেন। আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহতে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, খিজির এবং ইলিয়াস দুজনই মৃত্যুবরণ করেছেন।৫ তাদের জীবিত থাকার ব্যাপারে যেসব দলিল দেওয়া হয়, সেগুলো সহিহ নয়। হজরত থানভি খিজির জীবিত থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এটা বুজুর্গদের মাধ্যমে মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত।৬
তর্কের খাতিরে যদি মেনে নেওয়া হয়, খিজির ও ইলিয়াস আলাইহিমাস সালাম জীবিত, প্রশ্ন ওঠে, এমন জীবনের সার্থকতা ও যৌক্তিকতা কী? ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে এসে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবেন, দাজ্জাল-সহ দ্বীনের শত্রুদের পরাভূত করবেন। ইসলামের পতাকা বুলন্দ করবেন, রণাঙ্গণে মুজাহিদদের নেতৃত্ব দেবেন। ফলে এমন প্রত্যাবর্তন দ্বীনের জন্যই। বিপরীতে হাজার বছর ধরে খিজির ও ইলিয়াস বেঁচে আছেন, মুসলিম উম্মাহ অধঃপতনের অতলে তলিয়ে গেছে, শিরক-বিদআত উম্মাহকে গ্রাস করে নিয়েছে, বারবার ইসলামের দুশমনের হাতে বিধ্বস্ত হয়েছে, মুসলমানদের খেলাফত লুপ্ত হয়েছে, ইহুদি-খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে, মুসলিম উম্মাহ দাওয়াত ও জিহাদ ভুলে দুনিয়াদারির মাঝে মেতে আছে, তবুও খিজির ও ইলিয়াস একটি বারের জন্য জঙ্গল থেকে বের হলেন না; মুসলিম দাঈদের এই বিপদ থেকে উত্তরণের পরামর্শ দিলেন না; মুজাহিদদের ময়দানে নেমে সহায়তা করলেন না; কেবল মাঝে মাঝে জঙ্গলে গেলে কিছু সুফি-সাধকের সামনে তারা ধরা দেন, দু-একটি কথা বলে আবার মুহূর্তেই নাই হয়ে যান। এমন জীবন থেকে তাহলে কে উপকৃত হচ্ছে? তারা নিজে? নাকি ইসলাম ও মুসলমান? শরয়ি এবং আকলি কোনোভাবেই এমন বেঁচে থাকার সার্থকতা নেই। এ জন্য রাজিউদ্দীন বোস্তামি, ইবনে সিনা, আবু বকর তর্তুশি, ইবনুল আরাবি, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম-সহ সকল বড় ইমাম ও ফকিহগন খিজির আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পক্ষে মত দিয়েছেন এবং যারা তাঁর জীবিত থাকার দাবি করেছেন তাদের মতামতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লাহ বাস্তবায়নের মালিক।
টিকাঃ
১. শরহে মুসলিম, নববি (১৫/১৩৬); তাহজিবুল আসমা, নববি (১/১৭৭) ।
১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১/৩৯৪) ।
২. বুখারি (১১৬); মুসলিম (২৫৩৭) ।
৩. বিস্তারিত দেখুন আল-মানারুল মুনিফ...
৪. তাহজিবুল আসমা, নববি (১/১৭৭) ।
৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১/৩৯৪) ।
৬. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৫৪১-৫৪২) ।
📄 নবিদের উপর ইমানের জরুরত
নবিদের উপর ঈমানের স্তরভেদ
ঈমান আনার প্রশ্নে নবিদের মাঝে কোনোরূপ পার্থক্য না করা গেলেও ঈমান আনার পরিমাণের ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে। একটা হলো ঈমানে মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত ঈমান। এটা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। আরেকটা ঈমানে মুফাসসাল তথা বিস্তারিত ঈমান। এটা সবার উপর ওয়াজিব নয়, বরং কিছু মানুষ করলে অন্যদের উপর থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে।
সকল নবি-রাসুলের উপর ইজমালিভাবে ভাবে ঈমান আনা ওয়াজিব। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা মানুষের হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে অনেক নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, যারা আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের উপর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের হাতে মুজিজা প্রকাশিত হয়েছে। আমরা তাদের জানি বা না জানি, সবার উপর সংক্ষিপ্ত ঈমান রাখতে হবে। তাই প্রত্যেক নবি-রাসুলের নাম, তাদের বিস্তারিত পরিচয়, সময় ও ঠিকানা, সেসব শরিয়তের আসমানি গ্রন্থ, বিধি-বিধান, হালাল-হারাম ইত্যাদি জানা সবার উপর ওয়াজিব নয়। তবে সকল নবি-রাসুলকে ভালোবাসতে হবে। তাদের সম্মান করতে হবে। তাদের কারও ব্যাপারে বেয়াদবি কিংবা অসম্মান হয় এমন কিছু বলা যাবে না। তাদের সমালোচনা করা যাবে না; বরং প্রত্যেক মুসলিমকে সকল নবির সম্মান ও মর্যাদার অতন্দ্র প্রহরী হতে হবে। তাদের অনুসারী দাবিদার কিংবা অন্য যে-কেউ যাতে কোনো নবির শানে অমূলক কিছু বলতে না পারে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।
আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর শেষ নবি ও রাসুল এতটুকু ঈমান প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। এটুকু ঈমান না থাকলে সে ব্যক্তি মুসলমানই হতে পারবে না। কিন্তু কেবল মুখে এতটুকু ঈমান আনলেই হবে না; বরং রাসুলুল্লাহর শরিয়তের প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান জানতে হবে এবং সেগুলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে পালন করতে হবে। হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহর বংশপরিচয়, বাবা-মায়ের নাম ইত্যাদি জানা দরকার নেই, কিন্তু তিনি শেষ নবি ও রাসুল, তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে ইত্যাদি দ্বীনসংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলো জানতে হবে।১ পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের জীবনের চেয়ে, পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা- মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হবো।১ তাই কেবল নামকাওয়াস্তে কিংবা বংশসূত্রে মুসলমান ব্যক্তি স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে লাপাত্তা থাকলে যেকোনো সময় ঈমানহারা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন হলো, তাঁর আনীত জীবনবিধান, শরিয়ত ও হালাল-হারাম মেনে চলা এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার অতন্দ্র প্রহরী হওয়া। সুতরাং কেউ যেন আল্লাহর রাসুলকে গালি দিতে না পারে কিংবা তাঁর সমালোচনা করতে না পারে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে; কিংবা করলে সেটা থেকে তাকে নিবৃত্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। রাসুলের স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজন সবাইকে ভালোবাসতে হবে; তাদের জন্য দোয়া করতে হবে; তাদের সম্মান সুরক্ষিত রাখতে হবে।
টিকাঃ
১. তাতারখানিয়া (৭/৩০১) ।
১. বুখারি (১৪, ১৫) ।
📄 নবিদের মিশন
নবিদের মিশন
এক. জগতের সকল নবি-রাসুলের দাওয়াতের মূল কথা ছিল তাওহিদ ও ইসলাম। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
ওয়া মা আরসালনা মিন ক্বাবলিকা মির রাসুলিন ইল্লা নুহি ইলাইহি আন্নাহু লা ইলাহা ইল্লা আনা ফা’বুদুন।
অর্থ: ‘আমি আপনার পূর্বে যত রাসুল পাঠিয়েছি, সবাইকে এই প্রত্যাদেশ করেছি যে, আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।’ [সুরা আম্বিয়া: ২৫]
অপর একটি আয়াতে বলেন,
ওয়া লাক্বাদ বাআছনা ফি কুল্লি উম্মাতিন রাসুলান আনাবুদুল্লাহা ওয়াজতানিবুত ত্বাগুত।
অর্থ: ‘আর আমি প্রত্যেক জাতির মাঝেই রাসুল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত বর্জন করো।’ [নাহল: ৩৬]
জগতের সকল নবি-রাসুলের ধর্ম ছিল ইসলাম। নুহ আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেন,
ওয়া উমিরতু আন আকুনা মিনাল মুসলিমিন
অর্থ: ‘আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হতে আদিষ্ট হয়েছি।’ [ইউনুস: ৭২]
ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম হতে নির্দেশ দেওয়ায় তিনি মুসলিম হন। আল্লাহ বলেন,
ইয ক্বালা লাহু রাব্বুহু আসলিম ক্বালা আসলামতু লিরাব্বিল আলামিন।
অর্থ: “যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, ‘ইসলাম গ্রহণ করো’, তখন তিনি বললেন, ‘আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করলাম’।” [বাকারা: ১৩১]
ইবরাহিম ও তার পৌত্র ইয়াকুব তাদের সন্তানদেরও মুসলিম হওয়ার ওসিয়ত করেছেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
ওয়া ওয়াছছা বিহা ইবরাহিমু বানিহি ওয়া ইয়াক্বুবু ইয়াবানিয়া ইন্নাল্লাহাছ ত্বাফা লাকুমুদ দ্বীনা ফালা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমুন।
অর্থ: ‘আর ইবরাহিম এবং ইয়াকুব তাদের সন্তানদের ওসিয়ত করেছিলেন, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা মুসলমান হওয়া ব্যতীত মৃত্যুবরণ করো না।’ [বাকারা: ১৩২]
এই ওসিয়তের ফলাফল ছিল ইয়াকুবের সন্তানগণ সবাই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
আম কুনতুম শুহাদাআ ইয হাজারা ইয়াক্বুবাল মাওতু ইয ক্বালা লিবানিহি মা তা’বুদুনা মিম বা’দি ক্বালু না’বুদু ইলাহাকা ওয়া ইলাহা আবাইকা ইবরাহিমা ওয়াসমাঈলা ওয়া ইসহাক্বা ইলাহান ওয়াহিদান ওয়া নাহনু লাহু মুসলিমুন।
অর্থ: ‘আর তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের কাছে মৃত্যু হাজির হয়েছিল, যখন তিনি তার সন্তানদের বলেছিলেন তোমরা আমার মৃত্যুর পরে কার ইবাদত করবে? তখন তারা বলল, আমরা আপনার এবং আপনার বাপ-দাদা ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহের ইবাদত করব। তিনি এক ইলাহ। আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারী মুসলমান।’ [বাকারা: ১৩৩]
বনি ইসরাইলের ধর্মও ছিল ইসলাম। মুসা আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেন,
ওয়া ক্বালা মুসা ইয়া ক্বাওমি ইন কুনতুম আমানতুম বিল্লাহি ফাআলাইহি তাওয়াক্কালু ইন কুনতুম মুসলিমিন।
অর্থ: ‘আর মুসা তার সম্প্রদায়কে বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো, তবে তার উপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলমান হও।’ [ইউনুস: ৮৪]
ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্মও ছিল ইসলাম। তিনি ইসলামের দিকেই তার উম্মতকে দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ফালাম্মা আহাসসা ঈসা মিনহুমুল কুফরা ক্বালা মান আনছারি ইলাল্লাহ ক্বালুল হাওয়ারিয়্যুনা নাহনু আনছারুল্লাহি আমান্না বিল্লাহি ওয়াশহাদ বিআন্না মুসলিমুন।
অর্থ: ‘অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম যখন তাদের (বনি ইসরাইলের) কুফর উপলব্ধি করতে পারলেন তখন বললেন, কারা আছে আল্লাহর পথে আমাকে সাহায্য করবে? তখন হাওয়ারিগণ (সাহাবা) বললেন, আমরা রয়েছি আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আর আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলমান।’ [আলে ইমরান: ৫২]
দুই. মানুষের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ কাফেররা যাতে পরকালে আল্লাহর উপর দায় চাপাতে না পারে, যেমনটা পিছনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা রুহের জগতে আমাদের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিয়েছেন যে, তিনি আমাদের প্রভু কি না। তখন আমরা সবাই সাক্ষ্য দিয়েছিলাম, ‘হ্যাঁ, আপনি আমাদের প্রভু।’ আল্লাহ চাইলে সেই সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে আমাদের কাছ থেকে হিসাব নিতে পারতেন। কিন্তু তাতে কাফেররা বলত, আমাদের তো সেই সাক্ষ্যের কথা মনে নেই। সুতরাং আমাদের কেন শাস্তি দিচ্ছেন? এ জন্য আল্লাহর ইনসাফের দাবি হচ্ছে, রাসুল পাঠানো হোক। এর পর যারা তাদের কথা শুনবে, তারা মুক্তি পাবে; আর যারা শুনবে না, তারা ধ্বংস হবে। এভাবে আল্লাহ তায়ালা মানুষের উপকার করতে এবং কাফেরদের লা জওয়াব করে দিতে রাসুল প্রেরণ করেন। আল্লাহ বলেছেন,
ওয়া মা কুন্না মুআজ্জিবিনা হাত্তা নাবআছা রাসুলান
অর্থ: ‘আমি রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।’ [ইসরা: ১৫]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
রুসুলান মুবাশশিরিনা ওয়া মুনজিরিনা লিআল্লা ইয়াকুনা লিননাছি আলাল্লাহি হুজ্জাতুম বা’দার রুসুলি ওয়া কানাল্লাহু আজিজান হাকিমা।
অর্থ: (আমি প্রেরণ করেছি) রাসুলগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে, যাতে রাসুলদের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [নিসা: ১৬৫]
তিন. দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও দুনিয়া পরিচালনা। এটা নবিদের আগমনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ইসলাম পরকাল গড়তে গিয়ে দুনিয়া ধ্বংস করতে হবে এমন বিশ্বাস করে না। বরং এটা মানুষের ইহকাল ও পরকাল দুটোই গড়তে এসেছে। উভয় জগতে মানুষকে কল্যাণের পথে নিতে এসেছে। এ জন্য নবিগণ শুধু আখিরাত নয়; ইহকালীন জীবনেরও নেতৃত্ব দিতেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ওয়া আ’দাল্লাহুল্লাজিনা আমানু মিনকুম ওয়া আমিলুছ ছালিহাতি লাইয়াসতাখলিফাননাহুম ফিল আরদি কামাসতাখলাফাল্লাজিনা মিন ক্বাবলিহিম ওয়া লাইউমাক্কিনান্না লাহুম দ্বীনাহুমুল্লাজির তাদা লাহুম ওয়া লাইউবাদ্দিলাননাহুম মিম বা’দি খাউফিহিম আমনান ইয়া’বুদুনানি লা ইউশরিকুনা বি শাইআন ওয়ামান কাফারা বা’দা যাালিকা ফাউলাইকা হুমুল ফাসিকুন।
অর্থ: ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাদের অবশ্যই পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করবেন, যেমন তিনি কর্তৃত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববতীদের। আর তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন। আর তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদের শান্তি দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। এর পর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।’ [নুর: ৫৫]
বনি ইসরাইলের নবিগণ ছিলেন পরকালের সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়া আবাদের অন্যতম দৃষ্টান্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বনি ইসরাইলকে নবিগণ নেতৃত্ব দান করতেন। যখন এক নবি মৃত্যুবরণ করতেন, অন্যজন তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। কিন্তু আমার পরে কোনো নবি নেই। তাই খলিফারা আমার স্থলাভিষিক্ত হবে।১
চার. পূর্ণাঙ্গ আদর্শের বাস্তবোচিত উদাহরণ। নবি-রাসুলগণ পৃথিবীর সর্বোত্তম প্রজন্ম। অথচ তারা রক্ত-মাংসের মানুষ। তারা হাঁটতেন, বাজারে যেতেন, সংসার করতেন। রক্তমাংসের একজন মানুষ হয়েও কীভাবে মানবিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণাঙ্গতার শিখরে পৌঁছে যাওয়া যায়, নবিগণ তার জীবন্ত উদাহরণ। মানুষ যেন দুনিয়ার জীবনের ঘোরে পথচ্যুত না হয়, শয়তানের দলের ভার ও বড়ত্বে আদর্শ-সংকটে না ভোগে, তাই আল্লাহ তাদের পাঠিয়েছেন। ফলে যে নবিদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে, সে পূর্ণতার পথের দিশা পাবে।
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৪৫৫); মুসলিম (১৮৪২) ।
📄 নবি-রাসূলগণ নিষ্পাপ (ইসমতে আম্বিয়া)
নবি-রাসুলগণ নিষ্পাপ (ইসমতে আম্বিয়া)
নবি-রাসুলগণ মানুষের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। ফলে তারা সকল অন্যায় ও অপরাধ থেকে পবিত্র। ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা নবি রাসুলদের ব্যাপারে তাদের পবিত্র (!) গ্রন্থে যেসব অপবাদ আরোপ করে, নবি-রাসুলগণ সেগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। পৃথিবীর মানুষের উপর আল্লাহর পরে নবিগণই সবচেয়ে অনুগ্রহশীল। তারা মানুষের কল্যাণের জন্য সারা জীবন কাজ করেছেন; ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কুরবানি করেছেন। অনেকে দাওয়াতের এ পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ফলে নবিগণ আমাদের ঈমান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দোয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত।
প্রশ্ন হচ্ছে, নবি-রাসুলগণ গুনাহ করেন কি না? হকপন্থি সকল মুসলমান এ ব্যাপারে একমত যে, নবিগণ সব ধরনের কুফর থেকে মুক্ত—সেটা নবুওতের আগেও নয়; পরে তো নয়ই। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদামতে, (এক) নবিগণ কবিরা গুনাহ থেকে পবিত্র। (দুই) দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ—যার জন্য তারা মনোনীত ও প্রেরিত হন—করার ক্ষেত্রেও তারা পরিপূর্ণ ও সকল বিচ্যুতি থেকে পবিত্র। (তিন) একইভাবে তারা পবিত্র সেসব সগিরা গুনাহ থেকে যা উত্তম চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। কিন্তু লঘুতর সগিরা গুনাহ—যা চারিত্রিক শোভন কিংবা ব্যক্তিত্বের জন্য হানিকর নয়—থেকে নবিগণ পবিত্র কি না, এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের মাঝে মতভেদ রয়েছে।১
টিকাঃ
১. শিফা, কাজি ইয়াজ (২/১৪৫); শরহে মুসলিম, নববি (৩/৫৪); হারারি (৫৫) ।