📄 নবি-রাসূলের সংখ্যা
নবি-রাসুলের সংখ্যা
আদম আলাইহিস সালাম হলেন সর্বপ্রথম নবি। আর সর্বশেষ নবি হচ্ছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাদের মাঝে কতজন নবি-রাসুল ছিলেন? কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানায়নি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন,
ওয়া রুসুলান ক্বাদ ক্বছাছাহুম আলাইকা মিন ক্বাবলু ওয়া রুসুলান লাম নাক্বছুসহুম আলাইকা।
অর্থ: ‘আমি আপনার পূর্বের অনেক রাসুলের অবস্থা আপনাকে বর্ণনা করেছি আর অনেক রাসুলের অবস্থা বর্ণনা করিনি।’ [নিসা: ১৬৪]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ আরসালনা রুসুলান মিন ক্বাবলিয়া মিনহুম মান ক্বছাছনা আলাইকা ওয়া মিনহুম মান লাম নাক্বছুছ আলাইকা
অর্থ: ‘আর আমি আপনার পূর্বে নিশ্চয়ই অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি যাদের কারও কারও অবস্থা আপনার কাছে বর্ণনা করেছি, আর কারও কারও অবস্থা আপনার কাছে বর্ণনা করিনি।’ [গাফের: ৭৮]
দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা সকল নবি-রাসুলের কথা আমাদের কাছে বর্ণনা করেননি। অথচ তিনি আমাদের বলেছেন, পৃথিবীর সকল সম্প্রদায়ের মাঝে তিনি নবি- রাসুল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ইন্নামা আনতা মুনজিরুন ওয়ালিকুল্লি ক্বাওমিন হাদ
অর্থ: ‘আপনি তো কেবল একজন ভীতিপ্রদর্শক, আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথপ্রদর্শনকারী রয়েছে।’ [রাদ: ৭]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ইন্না আরসালনাকা বিল হাক্কি বাশিরান ওয়া নাজিরান ওয়া ইন মিন উম্মাতিন ইল্লা খালা ফিহা নাজির
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সত্য-সহ সুসংবাদ প্রদানকারী ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি। আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝে সতর্ককারী গত হয়েছেন।’ [ফাতির: ২৪]
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ বাআছনা ফি কুল্লি উম্মাতিন রাসুলান আনাবুদুল্লাহা ওয়াজতানিবুত ত্বাগুত
অর্থ: ‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের মাঝে রাসুল প্রেরণ করেছি এই পয়গাম দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত বর্জন করো।’ [নাহল: ৩৬]
কারণ হলো, রাসুল পাঠানো ছাড়া শাস্তি দিলে কিয়ামতের দিন কেউ আপত্তি করতে পারে। তা ছাড়া এটা আল্লাহর ইনসাফের জন্যও শোভনীয় নয়। এ জন্য তিনি বলেছেন,
ওয়া মা কুন্না মুআজ্জিবিনা হাত্তা নাবআছা রাসুলান
অর্থ: ‘আমি রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।’ [ইসরা: ১৫]
ফলে আল্লাহ তায়ালা জগতের প্রত্যেকটি সম্প্রদায়ের মাঝে ধারাবাহিকভাবে রাসুল পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। একজন চলে যাওয়ার পরেই দ্বিতীয়জন পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ছুম্মা আরসালনা রুসুলানা তাত্রা কুল্লাহুমা জাআ উম্মাতান রাসুলুহা কাযযাবুহু ফাআতবা’না বা’দাহুম বা’দান ওয়া জাআলনাহুম আহাদিছা ফাবু’দান লিকাউমিন লা ইউমিনুন।
অর্থ: ‘এরপর আমি ধারাবাহিকভাবে আমার রাসুল প্রেরণ করেছি। যখনই কোনো উম্মতের কাছে তাঁর রাসুল আগমন করেছেন, তখনই তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছে। অতঃপর আমি তাদের একের পর এক ধ্বংস করেছি এবং তাদের কাহিনীর বিষয়ে পরিণত করেছি। সুতরাং ধ্বংস হোক অবিশ্বাসীরা।’ [মুমিনুন: ৪৪]
জগতের সকল সম্প্রদায়ের কাছে এভাবে হাজার হাজার বছর ধরে নবি-রাসুল পাঠানো অব্যাহত থাকলে তাদের সংখ্যা যে কত বেশি হতে পারে, সেটা সহজেই বোধগম্য। কুরআনে এ ব্যাপারে কিছু না পাওয়া গেলেও হাদিসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। যদিও কোনো কোনো আলিম এসব হাদিসের বিষয়ে আপত্তি করেছেন, তথাপি এগুলোর মাধ্যমে কিছুটা আন্দাজ করা যায় এবং এগুলো যে বিশুদ্ধ হওয়া অসম্ভব নয়, তাও অনুধাবন করা যায়।
আবু জর রাজি. থেকে বর্ণিত তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, নবিদের সংখ্যা কত? তিনি বলেন, ‘এক লক্ষ বিশ হাজার’। আবু জর জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, তাদের ভিতরে রাসুল কতজন? তিনি বলেন, ‘তিনশো তেরো জন’১। ভিন্ন একটি সূত্রে কাছাকাছি অর্থের আরও একটি হাদিস পাওয়া যায়। আবু উমামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর নবি, নবিদের সংখ্যা কত?’ তিনি বললেন, ‘এক লক্ষ চব্বিশ হাজার; আর তাদের ভিতরে রাসুল তিনশো পনেরো জন।’১ কোনো কোনো দূর্বল বর্ণনায় নবিদের সংখ্যা এক হাজারও পাওয়া যায়।২ আনাস রাজি. থেকে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবিদের সংখ্যা আট হাজার। চার হাজার বনি ইসরাইলের মাঝে, আর বাকি চার হাজার গোটা মানবজাতির মাঝে।৩ এটাও দূর্বল বর্ণনা। তবে রাসুলদের সংখ্যা বিভিন্ন হাদিসে তিনশো তেরো থেকে পনেরোর মাঝেই সীমাবদ্ধ দেখা যায়।
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হওয়ার কথা যে, নবি ও রাসুলদের সুনির্ধারিত সংখ্যা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে এটা অনুমান করা অসম্ভব নয় যে, তাদের সংখ্যা অনেক বড় এবং বেশি হবে। এত বেশি সংখ্যক নবি-রাসুলের ভিতর থেকে কুরআনে কারিমে মাত্র চব্বিশ বা পঁচিশজন নবি-রাসুলের কথা এসেছে। তাদের মাঝে আবার হাতেগোনা মাত্র কয়েকজনের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। বাকিদের কারও কেবল নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উপরন্তু যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মাঝে আবার কারও কারও ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। ফলে তারা নবি ছিলেন কি না এটা নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। এসবের কারণ হলো, কুরআন ইতিহাসের গ্রন্থ নয়। ফলে সকল নবির জীবনী তো নয়ই; স্রেফ নাম উল্লেখ করাও প্রয়োজন নেই। এ কারণে কুরআন শুধু সেসব নবির নাম ও সেসব ঘটনা উল্লেখ করেছে, যাদের সঙ্গে আমাদের ইহকাল ও পরকালের কোনো কল্যাণ জড়িত।
কুরআনে বর্ণিত নবি-রাসুলদের নাম ইবনে কাসির এভাবে লিখেন: আদম, ইদরিস, নুহ, হুদ, সালেহ, ইবরাহিম, লুত, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ, আইউব, শুআইব, মুসা, হারুন, ইউনুস, দাউদ, সুলাইমান, ইলিয়াস, আল-ইয়াসা’, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা, জুল কিফল (অনেক মুফাসসিরের মতে) এবং সবার নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।৪
উক্ত পঁচিশজনের মাঝ থেকে আঠারোজনের নাম কুরআনে এক সঙ্গে এসেছে। আল্লাহ বলেন,
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। ওয়া তিলকা হুজ্জাতুনা আতাইনাহা ইবরাহিমা আলা ক্বাউমিহি তারফাউ দারাজাতি মান নাশা ইন রাব্বাকা হাকিমুন আলিম... ওয়া ইসমাইলা ওয়াল ইয়াসাউ ওয়া ইউনুসা ওয়া লুতান ওয়া কুল্লান ফাদ্দালনা আলাল আলামিন। অর্থ: ‘এটি ছিল আমার হুজ্জত যা আমি ইবরাহিমকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে প্রদান করেছিলাম। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় সমুন্নত করি। আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞানী। আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথপ্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নুহকে পথপ্রদর্শন করেছি, তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সুলাইমান, আইউব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকে। এমনইভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। আরও (পথ প্রদর্শন করেছি) জাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াসকে। তারা সবাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ইসমাইল, ইয়াসা’, ইউনুস ও লুত প্রত্যেককেই আমি সারা জগদ্বাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি [আনআম: ৮৩-৮৬]। এর বাইরে আদম, হুদ, সালেহ, শুআইব, ইদরিস, জুল কিফল ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপর্যুক্ত সকলের নবুওতের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম একমত। তবে কুরআনে তারা ছাড়াও কিছু ব্যক্তিত্বের নাম বা আলোচনা এসেছে, যাদের নবুওতের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন খিজির। সর্বসম্মত কিংবা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মতে তিনি নবি ছিলেন। অধমও সাধ্যানুযায়ী অধ্যয়ন, গবেষণা এবং আলিমদের বক্তব্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে এটাকেই বিশুদ্ধতর মনে করছে যে, খিজির আলাইহিস সালাম নবি ছিলেন, ইনশাআল্লাহ। এই তালিকায় তিনি ছাড়া আরও রয়েছেন জুল কারনাইন (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট নয়; সে মুশরিক ছিল), লুকমান, ইউশা’ ইবনে নুন, তুব্বা’, উজাইর প্রমুখ। অনেকের মতে তারা নবি ছিলেন। অনেকের মতে নবি নন। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা বলা সম্ভব নয়। তবে তাদের প্রত্যেকে উঁচু পর্যায়ের পুণ্যবান ব্যক্তি ও আল্লাহর ওলি ছিলেন এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
টিকাঃ
১. সহিহ ইবনে হিব্বান (৩৬১) । হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের ঘোর আপত্তি রয়েছে। তা ছাড়া হাদিসের ভিতরেও যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, খুব সম্ভব এগুলো বনি ইসরাইলের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে নবি-রাসুলের সংখ্যা যে অনেক বেশি, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
১. তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম (১/১৮২) ।
২. মুসনাদ আহমদ (১১৯৩১); মুসতাদরাকে হাকেম (৪১৯০) ।
৩. মুসনাদে আবু ইয়ালা (৪১৩২); আল-মাতালিবুল আলিয়াহ (৩৪৪৪) ।
৪. তাফসিরে ইবনে কাসির (২/৪১৭) ।
📄 নবি-রাসূলের উপর ইমান আনার অর্থ
নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনার অর্থ
নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনা ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি, ঈমানের ছয় রুকনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
লাইসাল বিররা আন তুওয়াল্লু উজুহাকুম ক্বিবালিল মাশরিকি ওয়াল মাগরিব ওয়ালাকিননাল বিররা মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়াল মালাইকাতি ওয়াল কিতাবি ওয়ান নাবিয়্যিন।
অর্থ: ‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর, কিতাবের উপর এবং নবিদের উপর।’ [বাকারা: ১৭৭]
বিখ্যাত হাদিসে জিবরিলে জিবরাইল আলাইহিস সালাম যখন নবিজিকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তিনি বলেন, ঈমান হলো—আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুলগণ, আখিরাত ও তাকদিরে বিশ্বাস করা।১
নবিদের উপর ঈমান আনার অর্থ হলো এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝে তাদের হিদায়াতের জন্য, তাওহিদের দিকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ বাআছনা ফি কুল্লি উম্মাতিন রাসুলান আনাবুদুল্লাহা ওয়াজতানিবুত ত্বাগুত।
অর্থ: ‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের মাঝে রাসুল প্রেরণ করেছি এই পয়গাম দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত বর্জন করো।’ [নাহল: ৩৬]
আরও বিশ্বাস রাখা যে, সকল নবি ও রাসুল ছিলেন সত্যবাদী, নিষ্ঠাবান, পুণ্য ও পরিপূর্ণতার শিখরে অধিষ্ঠিত। তারা তাদের দায়িত্ব সর্বোত্তমরূপে পালন করেছেন। আল্লাহর কোনো বিধান তারা গোপন করেননি, কোনো কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেননি, নিজেদের পক্ষ থেকে বিন্দু পরিমাণ সংযোজন-বিয়োজন করেননি; বরং তাদের উপর অর্পিত দাওয়াত ও রিসালাতের সর্বোচ্চ হক আদায় করেছেন, আল্লাহর আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষার সঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
সুতরাং সকল নবি-রাসুলের ব্যাপারে একই বিশ্বাস রাখতে হবে। কারণ, তারা সকলে আল্লাহর দ্বীন (ইসলামকে) পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই পৃথিবীতে আগমন করেছেন। এমন নয় যে, আমাদের রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাই আমরা তাঁকে ছাড়া আর কাউকে স্বীকার করব না, তিনি ছাড়া আর কাউকে শ্রদ্ধা করব না কিংবা ভালোবাসব না। কেউ এমন করলে তাঁর ঈমান বিশুদ্ধ হবে না; বরং সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীনের বিরোধিতা করল। এটা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের স্বভাব। তারা তাদের বানানো মূলনীতির বাইরে কোনো নবি-রাসুলের স্বীকৃতি দেয় না। যেমন: ইহুদিরা মুসা আলাইহিস সালামের উপর ঈমান আনলেও ঈসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবি বলে স্বীকার করে না। আবার খ্রিষ্টানরা মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালামের উপর ঈমান আনলেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবি বলে স্বীকার করে না। কিন্তু মুসলমানগণ পৃথিবীর সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ভূখণ্ডের নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনেন। কারণ, তারা সবাই ইসলাম নিয়েই পৃথিবীতে এসেছেন। মুসলমানগণ কোনো নবি-রাসুলের মাঝে পার্থক্য করেন না। মুসা আলাইহিস সালাম ইহুদিদের নিজস্ব নবি নন, ঈসাও আলাইহিস সালাম একমাত্র খ্রিষ্টানদের নবি নন; বরং তারা সবাই ইসলাম ও মুসলমানদের নবি। এটাই মূলত প্রকৃত আত্মসমর্পণ ও সঠিক আনুগত্য। নতুবা নিজ গোত্রে প্রেরিত নবিকে স্বীকৃতি দিয়ে অন্যদের অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িকতা। কারণ, সকল নবি-রাসুলের দাওয়াতের উৎস ও গন্তব্য এক। তাহলে কেন একজনকে স্বীকার করা হবে, অন্যজনকে প্রত্যাখ্যান করা হবে? বরং একজনকে অস্বীকার করার অর্থ হলো সবাইকে অস্বীকার করা।
এ কারণে কুরআন আমাদের শিখিয়েছে,
ক্বুলু আমান্না বিল্লাহি ওয়ামা উনজিলা ইলাইনা ওয়ামা উনজিলা ইলা ইবরাহিমা ওয়াসমাহি ইব্রাহিমা ওয়াসমাঈলা ওয়া ইসহাক্বা ওয়া ইয়াকুবা ওয়াল আসবাতি ওয়ামা উতিয়া মুসা ওয়া ঈসা ওয়ামা উতিয়ান নাবিয়্যুনা মির রাব্বিহিম লা নুফাররিক্বু বাইনা আহাদিন মিনহুম ওয়া নাহনু লাহু মুসলিমুন।
অর্থ: ‘তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মুসা, ঈসা ও অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, সবকিছুর উপর। আমরা তাদের কারও মাঝে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।’ [বাকারা: ১৩৬]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
আমানার রাসুলু বিমা উনজিলা ইলাইহি মির রাব্বিহি ওয়াল মুমিনুন, কুল্লুন আমানা বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি লা নুফাররিক্বু বাইনা আহাদিন মির রুসুলিহি, ওয়া ক্বালু সামি’না ওয়া আতা’না গুফরানাকা রাব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাছির।
অর্থ: ‘রাসুল বিশ্বাস রাখেন ওইসব বিষয়ে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসুলদের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর নবিদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। হে আমাদের প্রভু, আমরা আপনার ক্ষমা চাই। আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ [বাকারা: ২৮৫]
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ক্বুল আমান্না বিল্লাহি ওয়ামা উনজিলা আলাইনা ওয়ামা উনজিলা আলা ইবরাহিমা ওয়াসমাঈলা ওয়া ইসহাক্বা ওয়া ইয়াক্বুবা ওয়াল আসবাতি ওয়ামা উতিয়া মুসা ওয়া ঈসা ওয়ান নাবিয়্যুনা মির রাব্বিহিম লা নুফাররিক্বু বাইনা আহাদিন মিনহুম ওয়া নাহনু লাহু মুসলিমুন।
অর্থ: ‘বলুন, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের উপর, ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানের উপর, আর যা-কিছু দেওয়া হয়েছে মুসা, ঈসা এবং অন্য নবি-রাসুলকে তাঁদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আমরা তাঁদের কারও মাঝে তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।’ [আলে ইমরান: ৮৪]
এসব নির্দেশের পাশাপাশি রাসুলদের মাঝে পার্থক্য নির্ধারণ কিংবা কাউকে স্বীকার করে অন্যকে অস্বীকার করার ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন,
ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু আমানু বিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি ওয়াল কিতাবিল্লাজি নাযযালা আলা রাসুলিহি ওয়াল কিতাবিল্লাজি আনযালা মিন ক্বাবলু ওয়ামান ইয়াকফুর বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ফাক্বাদ দাল্লা দালালাম বাঈদা।
অর্থ: ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করো এবং বিশ্বাস স্থাপন করো তাঁর রাসুল ও তাঁর কিতাবের উপর, যা তিনি নাজিল করেছেন স্বীয় রাসুলের উপর এবং সে সমস্ত কিতাবের উপর, যেগুলো নাজিল করা হয়েছিল ইতঃপূর্বে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ ও কিয়ামত দিনে বিশ্বাস করবে না, সে সুদূর বিভ্রান্তিতে নিপতিত।’ [নিসা: ১৩৬]
আরেকটি আয়াতে তিনি বলেন,
ইন্নাল্লাজিনা ইয়াকফুরুনা বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি ওয়া ইউরিদুনা আই ইউফাররিকু বাইনাল্লাহি ওয়া রুসুলিহি ওয়া ইয়াকুলুনা নুমিনু বিবা’দিন ওয়া নাকফুরু বিবা’দিন ওয়া ইউরিদুনা আই ইয়াত্তাহিজু বাইনা যালিকা সাবিলা। উলাইকা হুমুল কাফিরুনা হাক্কান, ওয়া আ’তাদনা লিল কাফিরিনা আজাবাম মুহিনা।
অর্থ: ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলগণকে অস্বীকার করে, উপরন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের মাঝে ভেদাভেদ করে আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি কিন্তু কতককে অবিশ্বাস করি, এবং এরই মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়, তারাই প্রকৃত কাফের। আর আমি কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।’ [নিসা: ১৫০-১৫১]
এ কারণে আলিমগণ একমত যে, কেউ যদি সকল নবি-রাসুলের উপর ঈমান এনেও কেবল একজন নবির নবুওতকে অস্বীকার করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কুরআনে নুহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, কাযযাবাত ক্বাউমু নুহিনিল মুরসালিন। অর্থ: ‘নুহের সম্প্রদায় রাসুলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।’ [শুআরা: ১০৫] হুদ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেন, কাযযাবাত আদুনিল মুরসালিন। অর্থ: ‘আদ সম্প্রদায় রাসুলদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।’ [শুআরা: ১২৩] সালেহ আলাইহিস সালামের কওমের ব্যাপারে বলেন, কাযযাবাত ছামুদুল মুরসালিন। অর্থ: ‘সামুদ সম্প্রদায় রাসুলদের মিথ্যা সাব্যস্ত করেছিল’ [শুআরা: ১৪১]। লুত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেন, কাযযাবাত ক্বাউমু লুতিনিল মুরসালিন। অর্থ: ‘লুতের সম্প্রদায় রাসুলদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।’ [শুআরা: ১৬০]
উপরের আয়াতগুলোতে দেখুন, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলা হচ্ছে—তারা রাসুলদের অস্বীকার করেছে। অথচ তাদের প্রত্যেকের কাছে কেবল নিজেদের একজন রাসুলই এসেছিলেন। তাহলে বহুবচন ব্যবহারের রহস্য কী? রহস্য হলো, প্রত্যেক রাসুল তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পূর্ববর্তী রাসুলের সত্যায়নকারী ও পরবর্তী রাসুলের সুসংবাদ প্রদানকারী হিসেবে আসতেন। ফলে তাদের একজনকে অস্বীকার করার অর্থ ছিল তাঁর পূর্বাপর সকলকে অস্বীকার করা।
টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫) ।
📄 রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ কি নবি?
রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ কি নবি?
যেমনইভাবে সকল নবি-রাসুলের উপর কোনো ভেদাভেদ ছাড়া ঈমান আনা আবশ্যক, তেমনইভাবে কুরআন-সুন্নাহর দলিল ছাড়া কাউকে নবি-রাসুল সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকাও আবশ্যক। হ্যাঁ, যদি কারও নবি হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে, কাতয়ি কিংবা জান্নি প্রমাণাদি থাকে, সালাফের বক্তব্য থাকে, সেক্ষেত্রে তাকে নবি বলা যেতে পারে। যেমন: খিজির আলাইহিস সালাম। কুরআন-সুন্নাহে তাঁর নবি হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও তাঁর ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্যগুলো দেখলে বোঝা যায়, এগুলো নবি ছাড়া আর কারও ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। ফলে সালাফ ও খালাফের অসংখ্য আলিম খিজির আলাইহিস সালামকে নবি বলেছেন।১
বিপরীতে লুকমান, জুল কারনাইন, ইউশা’ প্রমুখের নবুওত কুরআনে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়, ফলে তাদের নবি বলা যাবে না। একইভাবে অন্যান্য ধর্মের অনুসরণীয় ব্যক্তি, যাদের তাদের অনুসারীরা তাদের খোদার দূত, অবতার ইত্যাদি মানে, ইহুদি ধর্মের বিভিন্ন নবি (যাদের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে হ্যাঁ বা না-বাচক কোনো বক্তব্য আসেনি), খ্রিষ্টধর্মের সেন্ট পল, হিন্দু ধর্মের রাম ও কৃষ্ণ প্রমুখ, পারসি ধর্মের জরথুস্ত্র (জারাদিশত), বৌদ্ধধর্মের গৌতম বুদ্ধ, চীনের কনফুফিয়াস, কিংবা গ্রিসের সক্রেটিস, তাদের কাউকেই নবি বলা যাবে না। যদি তাদের আনীত মতাদর্শে তাওহিদের নিদর্শন পাওয়া যায়, নবিদের দাওয়াতের সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সাদৃশ্য থাকে, তবুও তাদের নবি সাব্যস্ত করা বৈধ নয়; বরং তাদের ব্যাপারে ‘তাওয়াককুফ’ তথা নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকতে হবে, গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান কোনোটাই না করে আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে; কারণ নবুওত অদৃশ্যের বিষয়, কুরআন-সুন্নাহর উপর নির্ভরশীল; ইতিহাস, কল্পনা, গবেষণা বা যুক্তির উপর নয়। অনেককে এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ির শিকার দেখা যায়। ফলে কেউ কেউ বুদ্ধ, রাম কিংবা জরথুস্ত্রকে নবি বানিয়ে দেন। আবার বিপরীতে কেউ কেউ তাদের সরাসরি মুশরিক আখ্যা দেন।২ অথচ দুটোই ভুল।
একইভাবে নবিদের ব্যাপারে ঠিক ততটুকু বিশ্বাস রাখতে হবে, যতটুকু কুরআন ও সুন্নাহে এসেছে। এর বাইরে ঐতিহাসিক কোনো গ্রন্থের উপর কিংবা তাদের অনুসারী দাবিদারদের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি কোনোটিই করা যাবে না। যেমন: ইহুদিরা নবিদের মাসুম মনে করে না, বরং নবিদের ব্যাপারে তাদের বিকৃত গ্রন্থাবলিতে এমন জঘন্য বক্তব্য আছে, যা নবিগণ তো দূরের কথা সুস্থ রুচির কোনো সাধারণ মানুষের সঙ্গেও যায় না। যেমন: মদ্যপান, মেয়ের সঙ্গে অজাচার, নাচগান, মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা, অধীনস্থের সঙ্গে খিয়ানত করে তার বউকে বাগিয়ে নেওয়া, কোনো নবিকে জারজ সন্তান মনে করা ইত্যাদি। নবিদের ব্যাপারে এমন জঘন্য বক্তব্যে ইহুদিদের গ্রন্থগুলো ভরপুর। এগুলো বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, জগতের সকল নবি-রাসুল সব ধরনের কবিরা গুনাহ ও মানহানিকর কর্ম কিংবা চারিত্রিক স্খলন থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। ঠিক বিপরীতভাবে নবিদের ব্যাপারে বাড়াবাড়িও করা যাবে না। যেমন: খ্রিষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করে তাকে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে ফেলেছে, তিন খোদার এক খোদা নির্ধারণ করেছে। এগুলো বিশ্বাস করা যাবে না। বরং ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবি ও রাসুল এটুকু বিশ্বাস করতে হবে।
টিকাঃ
১. শরহে মুসলিম, নববি (১৫/১৩৬); আল-কালাইদ, কওনবি (১৭৩) ।
২. বুদ্ধ, জরথুস্ত্র, রাম, কৃষ্ণ, কনফুসিয়াসকে যেমন নবি বলা ভুল... [তাহরিম: ৭]
📄 খিজির আলাইহিস সালাম কি জীবিত?
খিজির আলাইহিস সালাম কি জীবিত?
একইভাবে খিজির আলাইহিস সালামের ব্যাপারে সেসব বাড়াবাড়ি করা যাবে না, যেসব বাড়াবাড়ি কিছু মুসলিম ঘরানাতে পাওয়া যায়। যেমন: খিজির ও ইলিয়াস আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত, তারা পাহাড়ে সাগরে জঙ্গলে থাকেন, ওলি-আউলিয়াদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তাদের সহায়তা করেন—এ জাতীয় বক্তব্য। ইমাম কুরতুবি, নববি, ইরাকি, ইবনুস সালাহ-সহ১ অনেক মুহাক্কিক আলিম ও তাসাউফের মোটামুটি অধিকাংশ বুজুর্গই এ কথা বলেছেন। মাশায়েখে দেওবন্দ খিজির আলাইহিস সালামকে জীবিত মানেন। কিন্তু তারা যেসব দলিল পেশ করেন, সেগুলো দ্বারা আদৌ তারা দুজন জীবিত সেটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় না। বরং কুরআন-হাদিসের সকল দলিল তাদের মৃত্যুকে নিশ্চিত করে। যেমন: কুরআনে বর্ণিত মানবজীবনের চিরন্তন রীতি:
কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাওত
অর্থ: ‘প্রত্যেক নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’। [আম্বিয়া: ৩৫]
রাসুলকে লক্ষ্য করে আল্লাহর বাণী,
ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন
অর্থ: ‘আপনি মৃত্যুবরণ করবেন যেমন তারা মৃত্যুবরণ করবেন।’ [জুমার: ৩০]
অন্যত্র রাসুলুল্লাহকে বলেন,
ওয়া মা জাআলনা লিবাশারিন মিন ক্বাবলিকাল খুলদা আফায়িন মিত্তাহ ফাহুমুল খালিদুন
অর্থ: আমি আপনার পূর্বে কোনো মানুষকে চিরঞ্জীব করিনি। সুতরাং আপনি যদি মৃত্যুবরণ করেন, তারা কি চিরকাল থাকবে? [আম্বিয়া: ৩৪]
এ কারণে আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের কাছে গ্রহণযোগ্য মত হলো, খিজির ও ইলিয়াস মৃত্যুবরণ করেছেন।১ কেউ ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত থাকার যুক্তি দেখাতে পারে। অথচ দুটো কোনোভাবেই এক নয়। ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশে রয়েছেন। আর আকাশের জীবন দুনিয়ার জীবন থেকে ভিন্ন; বরং আকাশে তো অন্যান্য রাসুলও রয়েছেন। তাছাড়া ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত থাকার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য রয়েছে। বিপরীতে তাদের দুজনের ব্যাপারে এমন কিছুই নেই। সুতরাং ঈসা আলাইহিস সালামের উপর কিয়াস করে খিজির ও ইলিয়াসকে জীবিত বলা সঠিক নয়।
একইভাবে রাসুলুল্লাহর হাদিস, যেখানে এক রাতে তিনি সাহাবাদের লক্ষ্য করে বলেছেন, আজ যারা দুনিয়ার বুকে আছে, একশো বছর পরে কেউ থাকবে না।২ এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তারা কেউ জীবিত নন। ইমাম নববি-সহ কেউ কেউ এখান থেকে খিজিরকে ব্যতিক্রম ধরার কথা বলেন। দাজ্জাল (জাসসাসাহ) ও ইয়াজুজ- মাজুজের উপর কিয়াস করে। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কারণ, তাদের জীবিত থাকা নস দ্বারা প্রমাণিত। ফলে তাদের ব্যতিক্রম ধরা হবে। কিন্তু খিজির আলাইহিস সালামের জীবন প্রমাণিতই নয়; ব্যতিক্রম তো পরের বিষয়।
বিপরীতে তাদের জীবিত থাকার যেসব দলিল পেশ করা হয়, তার অনেকগুলো বানোয়াট বাকিগুলো দুর্বল, অজ্ঞাত ব্যক্তির বর্ণনা, স্বপ্নের দর্শন, কল্পনা ও যুক্তি ইত্যাদি, যেগুলোর মাধ্যমে আকিদা প্রমাণিত হয় না। ইমাম বুখারি, ইমাম আহমদ এমন আকিদা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইবনুল জাওজি শক্তভাবে এটা খণ্ডন করেছেন।৩ ইমাম নববি খিজির জীবিত থাকাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মত বলেছেন।৪ কিন্তু ইবনে হাজার আসকালানি সেটাকে খণ্ডন করেছেন। ইবনে কাসিরও খিজির জীবিত থাকার মত খণ্ডন করেছেন এবং তারা যেসব দলিল দেন, সেগুলোকে অশুদ্ধ বলেছেন। আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহতে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, খিজির এবং ইলিয়াস দুজনই মৃত্যুবরণ করেছেন।৫ তাদের জীবিত থাকার ব্যাপারে যেসব দলিল দেওয়া হয়, সেগুলো সহিহ নয়। হজরত থানভি খিজির জীবিত থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এটা বুজুর্গদের মাধ্যমে মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত।৬
তর্কের খাতিরে যদি মেনে নেওয়া হয়, খিজির ও ইলিয়াস আলাইহিমাস সালাম জীবিত, প্রশ্ন ওঠে, এমন জীবনের সার্থকতা ও যৌক্তিকতা কী? ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে এসে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবেন, দাজ্জাল-সহ দ্বীনের শত্রুদের পরাভূত করবেন। ইসলামের পতাকা বুলন্দ করবেন, রণাঙ্গণে মুজাহিদদের নেতৃত্ব দেবেন। ফলে এমন প্রত্যাবর্তন দ্বীনের জন্যই। বিপরীতে হাজার বছর ধরে খিজির ও ইলিয়াস বেঁচে আছেন, মুসলিম উম্মাহ অধঃপতনের অতলে তলিয়ে গেছে, শিরক-বিদআত উম্মাহকে গ্রাস করে নিয়েছে, বারবার ইসলামের দুশমনের হাতে বিধ্বস্ত হয়েছে, মুসলমানদের খেলাফত লুপ্ত হয়েছে, ইহুদি-খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে, মুসলিম উম্মাহ দাওয়াত ও জিহাদ ভুলে দুনিয়াদারির মাঝে মেতে আছে, তবুও খিজির ও ইলিয়াস একটি বারের জন্য জঙ্গল থেকে বের হলেন না; মুসলিম দাঈদের এই বিপদ থেকে উত্তরণের পরামর্শ দিলেন না; মুজাহিদদের ময়দানে নেমে সহায়তা করলেন না; কেবল মাঝে মাঝে জঙ্গলে গেলে কিছু সুফি-সাধকের সামনে তারা ধরা দেন, দু-একটি কথা বলে আবার মুহূর্তেই নাই হয়ে যান। এমন জীবন থেকে তাহলে কে উপকৃত হচ্ছে? তারা নিজে? নাকি ইসলাম ও মুসলমান? শরয়ি এবং আকলি কোনোভাবেই এমন বেঁচে থাকার সার্থকতা নেই। এ জন্য রাজিউদ্দীন বোস্তামি, ইবনে সিনা, আবু বকর তর্তুশি, ইবনুল আরাবি, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম-সহ সকল বড় ইমাম ও ফকিহগন খিজির আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পক্ষে মত দিয়েছেন এবং যারা তাঁর জীবিত থাকার দাবি করেছেন তাদের মতামতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লাহ বাস্তবায়নের মালিক।
টিকাঃ
১. শরহে মুসলিম, নববি (১৫/১৩৬); তাহজিবুল আসমা, নববি (১/১৭৭) ।
১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১/৩৯৪) ।
২. বুখারি (১১৬); মুসলিম (২৫৩৭) ।
৩. বিস্তারিত দেখুন আল-মানারুল মুনিফ...
৪. তাহজিবুল আসমা, নববি (১/১৭৭) ।
৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১/৩৯৪) ।
৬. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৫৪১-৫৪২) ।