📄 নবি ও রাসূলের পরিচয়
নবি ও রাসুলের পরিচয়
ইসলামে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন নবি-রাসুলগণ। আল্লাহ তায়ালা তাদের মানবজাতির হিদায়াতের জন্য, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, মন্দ থেকে ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। মূর্তিপূজা থেকে মানুষকে এক লা-শারিক ইলাহের ইবাদতের দিকে, প্রবৃত্তিপুজা ও অসৎ চরিত্র থেক মানুষকে পবিত্রতার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আল্লাহ তাদের নির্বাচিত করেছেন, দায়িত্ব দিয়েছেন। তারা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে একসময় পরম প্রিয় বন্ধু আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর কাছে চলে গিয়েছেন। নবুওত ও রিসালাত আল্লাহর অনুগ্রহ। এটা যোগ্যতাবলে অর্জন করা সম্ভব নয় [হজ: ৭৫]।
📄 নবি ও রাসূলের মাঝে পার্থক্য
নবি ও রাসুলের মাঝে পার্থক্য
প্রথমত নবি এবং রাসুল দুজনের প্রতিই ওহি অবতীর্ণ হয়। এদিক থেকে তাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু অন্যান্য দিক থেকে নবি ও রাসুলের মাঝে পার্থক্য আছে। কুরআনে কারও কারও ব্যাপারে কেবল নবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, আর কারও ব্যাপারে নবি ও রাসুল দুটোই ব্যবহার করা হয়েছে [মারইয়াম: ৫১]। কুরআনের আরও কিছু আয়াত দ্বারা নবি-রাসুলের পার্থক্য বোঝা যায় [হজ: ৫২]। একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নবিদের সংখ্যা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আর রাসুলদের সংখ্যা তিনশো তেরো বা চৌদ্দ জন।৩ ফলে যারা বলে নবি ও রাসুলের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, তাদের কথার উপর আপত্তি থাকে।৪ তাহলে তাদের মাঝে পার্থক্য কী? কীভাবে নবি ও রাসুল নির্ণীত হবে?
এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। ফলে উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত কোনো মত নেই। বরং বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। নিচে আমরা উল্লেখযোগ্য মতামতগুলো উল্লেখ করব। তবে প্রথমে একটি সর্বসম্মত মূলনীতি মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক রাসুলই নবি। কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসুল নন। যেমন নুহ, ইবরাহিম, মুসা, ঈসা, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—তারা সবাই নবি ও রাসুল। কিন্তু আদম, হুদ, সালেহ, শুআইব, হারুন—তারা কেবল নবি; রাসুল নন।
নবি রাসুলের পার্থক্য নিয়ে একদল আলিম মনে করেন, যিনি ওহি লাভ করেন এবং প্রচারের জন্য আদিষ্ট হন, তিনি নবি ও রাসুল দুটোই। আর যিনি প্রচারের (তাবলিগ) জন্য আদিষ্ট নন, তিনি কেবল নবি; রাসুল নন।১ কিন্তু এ কথা সঠিক হতে পারে না। কারণ, নবুওত ও রিসালাতের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাবলিগ, নিজেকে সংশোধন নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ক্যানান নাসু উম্মাতান ওয়াহিদাতান, ফাবাআছাল্লাহুন নাবিয়্যিনা মুবাশশিরিন... অর্থ: ‘সকল মানুষ এক জাতি ছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা নবিদের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করলেন।’ [বাকারা: ২১৩] সহিহ বুখারি ও মুসলিমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন এমন অনেক নবি আসবেন, যার সঙ্গে একদল উম্মাহ থাকবে। কোনো নবির সঙ্গে এক-দুইজন থাকবে। আবার এমন নবিও আসবেন, যার সঙ্গে কেউ থাকবে না।’২ এসব আয়াত ও হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, সকল নবি দাওয়া ও তাবলিগের কাজের জন্য আদিষ্ট এবং সেগুলো করেন।
আরেক দল আলিম মনে করেন, রাসুল হচ্ছেন যিনি নতুন শরিয়তের বা কিতাবের অধিকারী হন; আর নবি হচ্ছেন যিনি পূর্ববর্তী রাসুলের শরিয়তের বা কিতাবের অনুসরণ করেন;৩ আলাদা কোনো কিতাব বা শরিয়ত নিয়ে আসেন না। যেমন মুসা-পরবর্তী বনি ইসরাইলের নবিগণ। তারা সকলেই মানুষকে তাওরাতের দিকে দাওয়াত দিতেন এবং তাওরাতের আইন সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন হয়, দাউদ আলাইহিস সালাম তো জাবুর কিতাবের অধিকারী। তাহলে তো তিনি রাসুল হওয়ার কথা ছিল। তাই তারা বলেন, রাসুল হলেন যিনি আলাদা শরিয়তের অধিকারী; কিতাব এখানে মুখ্য নয়। ফলে যিনি আলাদা শরিয়ত নিয়ে আসবেন তিনি রাসুল, আর যিনি পূর্ববর্তী শরিয়তের অনুসরণ করবেন তিনি নবি; চাই তাঁর উপর আলাদা কিতাব নাজিল হোক বা না হোক। কারণ, সকল নবির উপরই ওহি অবতীর্ণ হয়, যা পূর্বে বলা হয়েছে। আর দাউদ আলাইহিস সালামের জাবুর কেবল আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া- মুনাজাত সংবলিত। তাতে আলাদা শরিয়ত ছিল না। যে কারণে তিনিও মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তের অনুসরণ করতেন। ফলে কিতাবের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নবি; রাসুল নন।১
তৃতীয় আরেক দল আলিম মনে করেন, নবি হচ্ছেন যিনি আগের রাসুলের উম্মাহর মাঝে (অথবা মুমিনদের মাঝে) প্রেরিত হন এবং দাওয়াতি কাজ করেন। আর রাসুল হচ্ছেন যিনি নতুন বিরুদ্ধবাদী সম্প্রদায়ের মাঝে (বা কাফের সম্প্রদায়ের মাঝে) দাওয়াতি কাজ করেন। কিতাব ও শরিয়ত এখানে মুখ্য নয়। নবি কিতাবের অধিকারী হতে পারেন, আবার রাসুলও আগের শরিয়তের অনুসারী হতে পারেন। ফলে দাউদ আলাইহিস সালাম নতুন কিতাবের অনুসারী হয়েও নবি। কারণ তিনি মুসা আলাইহিস সালামের উম্মাহর মাঝে (বা মুমিনদের মাঝে) কাজ করেছেন। অপর দিকে ইউসুফ আলাইহিস সালাম কিতাব ও শরিয়ত না থাকার পরও রাসুল। কারণ তিনি নতুন মুশরিক কওমের মাঝে দাওয়াতি কাজ করেছেন।২
অধমের কথা হলো, এগুলোর প্রত্যেকটিই ইজতিহাদি আলোচনা। দাউদ ও ইউসুফ আলাইহিস সালামের নবুওত বা রিসালাতের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, সেগুলোও ইজতিহাদি। তা ছাড়া কুরআনে মাত্র কয়েকজন নবি-রাসুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শত শত রাসুল ও হাজার হাজার নবির নাম উল্লেখ করা হয়নি। তাদের নবুওত, রিসালাত ও দাওয়াতের হালত কোনো কিছুই আমাদের জানানো হয়নি; এ কারণে নবি ও রাসুলের মাঝে চূড়ান্ত ও সন্দেহাতীত পার্থক্য টানাও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমাদের এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাতে যার রাসুল হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁকে আমরা রাসুল বলব; আর যার রাসুল হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাবে না, তাঁকে আমরা নবি বলব। সামগ্রিকভাবে নবি-রাসুলদের উপর নিজেদের মানদণ্ডে বানানো কোনো হুকুম আরোপ করব না।
টিকাঃ
১. আল-মিনহাজ, হালিমি (১/২৩৯); ইবনে আবিল ইজ (১১৭); আকহাসারি (১৩৫-১৩৬); সালেহ ফাওজান (৪৮)।
২. বুখারি (৫৭৫২); (মুসলিম ২২০)।
৩. দেখুন: রুহুল মাআনি, আলুসি (৯/১৬৫); হারারি (৪৭)।
৪. দেখুন: মিনাহুর রাওজিল আজহার, মোল্লা আলি কারি (৫৫)।
১. দেখুন: তাফসিরে বাইজাবি (৪/৭৫)।
২. দেখুন: নবুওত, ইবনে তাইমিয়া (২/৭১৪)।
📄 নবি-রাসূলের সংখ্যা
নবি-রাসুলের সংখ্যা
আদম আলাইহিস সালাম হলেন সর্বপ্রথম নবি। আর সর্বশেষ নবি হচ্ছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাদের মাঝে কতজন নবি-রাসুল ছিলেন? কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানায়নি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন,
ওয়া রুসুলান ক্বাদ ক্বছাছাহুম আলাইকা মিন ক্বাবলু ওয়া রুসুলান লাম নাক্বছুসহুম আলাইকা।
অর্থ: ‘আমি আপনার পূর্বের অনেক রাসুলের অবস্থা আপনাকে বর্ণনা করেছি আর অনেক রাসুলের অবস্থা বর্ণনা করিনি।’ [নিসা: ১৬৪]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ আরসালনা রুসুলান মিন ক্বাবলিয়া মিনহুম মান ক্বছাছনা আলাইকা ওয়া মিনহুম মান লাম নাক্বছুছ আলাইকা
অর্থ: ‘আর আমি আপনার পূর্বে নিশ্চয়ই অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি যাদের কারও কারও অবস্থা আপনার কাছে বর্ণনা করেছি, আর কারও কারও অবস্থা আপনার কাছে বর্ণনা করিনি।’ [গাফের: ৭৮]
দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা সকল নবি-রাসুলের কথা আমাদের কাছে বর্ণনা করেননি। অথচ তিনি আমাদের বলেছেন, পৃথিবীর সকল সম্প্রদায়ের মাঝে তিনি নবি- রাসুল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ইন্নামা আনতা মুনজিরুন ওয়ালিকুল্লি ক্বাওমিন হাদ
অর্থ: ‘আপনি তো কেবল একজন ভীতিপ্রদর্শক, আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথপ্রদর্শনকারী রয়েছে।’ [রাদ: ৭]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ইন্না আরসালনাকা বিল হাক্কি বাশিরান ওয়া নাজিরান ওয়া ইন মিন উম্মাতিন ইল্লা খালা ফিহা নাজির
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সত্য-সহ সুসংবাদ প্রদানকারী ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি। আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝে সতর্ককারী গত হয়েছেন।’ [ফাতির: ২৪]
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ বাআছনা ফি কুল্লি উম্মাতিন রাসুলান আনাবুদুল্লাহা ওয়াজতানিবুত ত্বাগুত
অর্থ: ‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের মাঝে রাসুল প্রেরণ করেছি এই পয়গাম দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত বর্জন করো।’ [নাহল: ৩৬]
কারণ হলো, রাসুল পাঠানো ছাড়া শাস্তি দিলে কিয়ামতের দিন কেউ আপত্তি করতে পারে। তা ছাড়া এটা আল্লাহর ইনসাফের জন্যও শোভনীয় নয়। এ জন্য তিনি বলেছেন,
ওয়া মা কুন্না মুআজ্জিবিনা হাত্তা নাবআছা রাসুলান
অর্থ: ‘আমি রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।’ [ইসরা: ১৫]
ফলে আল্লাহ তায়ালা জগতের প্রত্যেকটি সম্প্রদায়ের মাঝে ধারাবাহিকভাবে রাসুল পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। একজন চলে যাওয়ার পরেই দ্বিতীয়জন পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ছুম্মা আরসালনা রুসুলানা তাত্রা কুল্লাহুমা জাআ উম্মাতান রাসুলুহা কাযযাবুহু ফাআতবা’না বা’দাহুম বা’দান ওয়া জাআলনাহুম আহাদিছা ফাবু’দান লিকাউমিন লা ইউমিনুন।
অর্থ: ‘এরপর আমি ধারাবাহিকভাবে আমার রাসুল প্রেরণ করেছি। যখনই কোনো উম্মতের কাছে তাঁর রাসুল আগমন করেছেন, তখনই তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছে। অতঃপর আমি তাদের একের পর এক ধ্বংস করেছি এবং তাদের কাহিনীর বিষয়ে পরিণত করেছি। সুতরাং ধ্বংস হোক অবিশ্বাসীরা।’ [মুমিনুন: ৪৪]
জগতের সকল সম্প্রদায়ের কাছে এভাবে হাজার হাজার বছর ধরে নবি-রাসুল পাঠানো অব্যাহত থাকলে তাদের সংখ্যা যে কত বেশি হতে পারে, সেটা সহজেই বোধগম্য। কুরআনে এ ব্যাপারে কিছু না পাওয়া গেলেও হাদিসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। যদিও কোনো কোনো আলিম এসব হাদিসের বিষয়ে আপত্তি করেছেন, তথাপি এগুলোর মাধ্যমে কিছুটা আন্দাজ করা যায় এবং এগুলো যে বিশুদ্ধ হওয়া অসম্ভব নয়, তাও অনুধাবন করা যায়।
আবু জর রাজি. থেকে বর্ণিত তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, নবিদের সংখ্যা কত? তিনি বলেন, ‘এক লক্ষ বিশ হাজার’। আবু জর জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, তাদের ভিতরে রাসুল কতজন? তিনি বলেন, ‘তিনশো তেরো জন’১। ভিন্ন একটি সূত্রে কাছাকাছি অর্থের আরও একটি হাদিস পাওয়া যায়। আবু উমামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর নবি, নবিদের সংখ্যা কত?’ তিনি বললেন, ‘এক লক্ষ চব্বিশ হাজার; আর তাদের ভিতরে রাসুল তিনশো পনেরো জন।’১ কোনো কোনো দূর্বল বর্ণনায় নবিদের সংখ্যা এক হাজারও পাওয়া যায়।২ আনাস রাজি. থেকে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবিদের সংখ্যা আট হাজার। চার হাজার বনি ইসরাইলের মাঝে, আর বাকি চার হাজার গোটা মানবজাতির মাঝে।৩ এটাও দূর্বল বর্ণনা। তবে রাসুলদের সংখ্যা বিভিন্ন হাদিসে তিনশো তেরো থেকে পনেরোর মাঝেই সীমাবদ্ধ দেখা যায়।
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হওয়ার কথা যে, নবি ও রাসুলদের সুনির্ধারিত সংখ্যা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে এটা অনুমান করা অসম্ভব নয় যে, তাদের সংখ্যা অনেক বড় এবং বেশি হবে। এত বেশি সংখ্যক নবি-রাসুলের ভিতর থেকে কুরআনে কারিমে মাত্র চব্বিশ বা পঁচিশজন নবি-রাসুলের কথা এসেছে। তাদের মাঝে আবার হাতেগোনা মাত্র কয়েকজনের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। বাকিদের কারও কেবল নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উপরন্তু যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মাঝে আবার কারও কারও ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। ফলে তারা নবি ছিলেন কি না এটা নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। এসবের কারণ হলো, কুরআন ইতিহাসের গ্রন্থ নয়। ফলে সকল নবির জীবনী তো নয়ই; স্রেফ নাম উল্লেখ করাও প্রয়োজন নেই। এ কারণে কুরআন শুধু সেসব নবির নাম ও সেসব ঘটনা উল্লেখ করেছে, যাদের সঙ্গে আমাদের ইহকাল ও পরকালের কোনো কল্যাণ জড়িত।
কুরআনে বর্ণিত নবি-রাসুলদের নাম ইবনে কাসির এভাবে লিখেন: আদম, ইদরিস, নুহ, হুদ, সালেহ, ইবরাহিম, লুত, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ, আইউব, শুআইব, মুসা, হারুন, ইউনুস, দাউদ, সুলাইমান, ইলিয়াস, আল-ইয়াসা’, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা, জুল কিফল (অনেক মুফাসসিরের মতে) এবং সবার নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।৪
উক্ত পঁচিশজনের মাঝ থেকে আঠারোজনের নাম কুরআনে এক সঙ্গে এসেছে। আল্লাহ বলেন,
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। ওয়া তিলকা হুজ্জাতুনা আতাইনাহা ইবরাহিমা আলা ক্বাউমিহি তারফাউ দারাজাতি মান নাশা ইন রাব্বাকা হাকিমুন আলিম... ওয়া ইসমাইলা ওয়াল ইয়াসাউ ওয়া ইউনুসা ওয়া লুতান ওয়া কুল্লান ফাদ্দালনা আলাল আলামিন। অর্থ: ‘এটি ছিল আমার হুজ্জত যা আমি ইবরাহিমকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে প্রদান করেছিলাম। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় সমুন্নত করি। আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞানী। আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথপ্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নুহকে পথপ্রদর্শন করেছি, তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সুলাইমান, আইউব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকে। এমনইভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। আরও (পথ প্রদর্শন করেছি) জাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াসকে। তারা সবাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ইসমাইল, ইয়াসা’, ইউনুস ও লুত প্রত্যেককেই আমি সারা জগদ্বাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি [আনআম: ৮৩-৮৬]। এর বাইরে আদম, হুদ, সালেহ, শুআইব, ইদরিস, জুল কিফল ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপর্যুক্ত সকলের নবুওতের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম একমত। তবে কুরআনে তারা ছাড়াও কিছু ব্যক্তিত্বের নাম বা আলোচনা এসেছে, যাদের নবুওতের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন খিজির। সর্বসম্মত কিংবা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মতে তিনি নবি ছিলেন। অধমও সাধ্যানুযায়ী অধ্যয়ন, গবেষণা এবং আলিমদের বক্তব্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে এটাকেই বিশুদ্ধতর মনে করছে যে, খিজির আলাইহিস সালাম নবি ছিলেন, ইনশাআল্লাহ। এই তালিকায় তিনি ছাড়া আরও রয়েছেন জুল কারনাইন (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট নয়; সে মুশরিক ছিল), লুকমান, ইউশা’ ইবনে নুন, তুব্বা’, উজাইর প্রমুখ। অনেকের মতে তারা নবি ছিলেন। অনেকের মতে নবি নন। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা বলা সম্ভব নয়। তবে তাদের প্রত্যেকে উঁচু পর্যায়ের পুণ্যবান ব্যক্তি ও আল্লাহর ওলি ছিলেন এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
টিকাঃ
১. সহিহ ইবনে হিব্বান (৩৬১) । হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের ঘোর আপত্তি রয়েছে। তা ছাড়া হাদিসের ভিতরেও যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, খুব সম্ভব এগুলো বনি ইসরাইলের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে নবি-রাসুলের সংখ্যা যে অনেক বেশি, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
১. তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম (১/১৮২) ।
২. মুসনাদ আহমদ (১১৯৩১); মুসতাদরাকে হাকেম (৪১৯০) ।
৩. মুসনাদে আবু ইয়ালা (৪১৩২); আল-মাতালিবুল আলিয়াহ (৩৪৪৪) ।
৪. তাফসিরে ইবনে কাসির (২/৪১৭) ।
📄 নবি-রাসূলের উপর ইমান আনার অর্থ
নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনার অর্থ
নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনা ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি, ঈমানের ছয় রুকনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
লাইসাল বিররা আন তুওয়াল্লু উজুহাকুম ক্বিবালিল মাশরিকি ওয়াল মাগরিব ওয়ালাকিননাল বিররা মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়াল মালাইকাতি ওয়াল কিতাবি ওয়ান নাবিয়্যিন।
অর্থ: ‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর, কিতাবের উপর এবং নবিদের উপর।’ [বাকারা: ১৭৭]
বিখ্যাত হাদিসে জিবরিলে জিবরাইল আলাইহিস সালাম যখন নবিজিকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তিনি বলেন, ঈমান হলো—আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুলগণ, আখিরাত ও তাকদিরে বিশ্বাস করা।১
নবিদের উপর ঈমান আনার অর্থ হলো এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝে তাদের হিদায়াতের জন্য, তাওহিদের দিকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
ওয়া লাক্বাদ বাআছনা ফি কুল্লি উম্মাতিন রাসুলান আনাবুদুল্লাহা ওয়াজতানিবুত ত্বাগুত।
অর্থ: ‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের মাঝে রাসুল প্রেরণ করেছি এই পয়গাম দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত বর্জন করো।’ [নাহল: ৩৬]
আরও বিশ্বাস রাখা যে, সকল নবি ও রাসুল ছিলেন সত্যবাদী, নিষ্ঠাবান, পুণ্য ও পরিপূর্ণতার শিখরে অধিষ্ঠিত। তারা তাদের দায়িত্ব সর্বোত্তমরূপে পালন করেছেন। আল্লাহর কোনো বিধান তারা গোপন করেননি, কোনো কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেননি, নিজেদের পক্ষ থেকে বিন্দু পরিমাণ সংযোজন-বিয়োজন করেননি; বরং তাদের উপর অর্পিত দাওয়াত ও রিসালাতের সর্বোচ্চ হক আদায় করেছেন, আল্লাহর আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষার সঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
সুতরাং সকল নবি-রাসুলের ব্যাপারে একই বিশ্বাস রাখতে হবে। কারণ, তারা সকলে আল্লাহর দ্বীন (ইসলামকে) পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই পৃথিবীতে আগমন করেছেন। এমন নয় যে, আমাদের রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাই আমরা তাঁকে ছাড়া আর কাউকে স্বীকার করব না, তিনি ছাড়া আর কাউকে শ্রদ্ধা করব না কিংবা ভালোবাসব না। কেউ এমন করলে তাঁর ঈমান বিশুদ্ধ হবে না; বরং সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীনের বিরোধিতা করল। এটা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের স্বভাব। তারা তাদের বানানো মূলনীতির বাইরে কোনো নবি-রাসুলের স্বীকৃতি দেয় না। যেমন: ইহুদিরা মুসা আলাইহিস সালামের উপর ঈমান আনলেও ঈসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবি বলে স্বীকার করে না। আবার খ্রিষ্টানরা মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালামের উপর ঈমান আনলেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবি বলে স্বীকার করে না। কিন্তু মুসলমানগণ পৃথিবীর সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ভূখণ্ডের নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনেন। কারণ, তারা সবাই ইসলাম নিয়েই পৃথিবীতে এসেছেন। মুসলমানগণ কোনো নবি-রাসুলের মাঝে পার্থক্য করেন না। মুসা আলাইহিস সালাম ইহুদিদের নিজস্ব নবি নন, ঈসাও আলাইহিস সালাম একমাত্র খ্রিষ্টানদের নবি নন; বরং তারা সবাই ইসলাম ও মুসলমানদের নবি। এটাই মূলত প্রকৃত আত্মসমর্পণ ও সঠিক আনুগত্য। নতুবা নিজ গোত্রে প্রেরিত নবিকে স্বীকৃতি দিয়ে অন্যদের অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িকতা। কারণ, সকল নবি-রাসুলের দাওয়াতের উৎস ও গন্তব্য এক। তাহলে কেন একজনকে স্বীকার করা হবে, অন্যজনকে প্রত্যাখ্যান করা হবে? বরং একজনকে অস্বীকার করার অর্থ হলো সবাইকে অস্বীকার করা।
এ কারণে কুরআন আমাদের শিখিয়েছে,
ক্বুলু আমান্না বিল্লাহি ওয়ামা উনজিলা ইলাইনা ওয়ামা উনজিলা ইলা ইবরাহিমা ওয়াসমাহি ইব্রাহিমা ওয়াসমাঈলা ওয়া ইসহাক্বা ওয়া ইয়াকুবা ওয়াল আসবাতি ওয়ামা উতিয়া মুসা ওয়া ঈসা ওয়ামা উতিয়ান নাবিয়্যুনা মির রাব্বিহিম লা নুফাররিক্বু বাইনা আহাদিন মিনহুম ওয়া নাহনু লাহু মুসলিমুন।
অর্থ: ‘তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মুসা, ঈসা ও অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, সবকিছুর উপর। আমরা তাদের কারও মাঝে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।’ [বাকারা: ১৩৬]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
আমানার রাসুলু বিমা উনজিলা ইলাইহি মির রাব্বিহি ওয়াল মুমিনুন, কুল্লুন আমানা বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি লা নুফাররিক্বু বাইনা আহাদিন মির রুসুলিহি, ওয়া ক্বালু সামি’না ওয়া আতা’না গুফরানাকা রাব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাছির।
অর্থ: ‘রাসুল বিশ্বাস রাখেন ওইসব বিষয়ে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসুলদের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর নবিদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। হে আমাদের প্রভু, আমরা আপনার ক্ষমা চাই। আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ [বাকারা: ২৮৫]
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ক্বুল আমান্না বিল্লাহি ওয়ামা উনজিলা আলাইনা ওয়ামা উনজিলা আলা ইবরাহিমা ওয়াসমাঈলা ওয়া ইসহাক্বা ওয়া ইয়াক্বুবা ওয়াল আসবাতি ওয়ামা উতিয়া মুসা ওয়া ঈসা ওয়ান নাবিয়্যুনা মির রাব্বিহিম লা নুফাররিক্বু বাইনা আহাদিন মিনহুম ওয়া নাহনু লাহু মুসলিমুন।
অর্থ: ‘বলুন, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের উপর, ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানের উপর, আর যা-কিছু দেওয়া হয়েছে মুসা, ঈসা এবং অন্য নবি-রাসুলকে তাঁদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আমরা তাঁদের কারও মাঝে তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।’ [আলে ইমরান: ৮৪]
এসব নির্দেশের পাশাপাশি রাসুলদের মাঝে পার্থক্য নির্ধারণ কিংবা কাউকে স্বীকার করে অন্যকে অস্বীকার করার ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন,
ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু আমানু বিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি ওয়াল কিতাবিল্লাজি নাযযালা আলা রাসুলিহি ওয়াল কিতাবিল্লাজি আনযালা মিন ক্বাবলু ওয়ামান ইয়াকফুর বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ফাক্বাদ দাল্লা দালালাম বাঈদা।
অর্থ: ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করো এবং বিশ্বাস স্থাপন করো তাঁর রাসুল ও তাঁর কিতাবের উপর, যা তিনি নাজিল করেছেন স্বীয় রাসুলের উপর এবং সে সমস্ত কিতাবের উপর, যেগুলো নাজিল করা হয়েছিল ইতঃপূর্বে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ ও কিয়ামত দিনে বিশ্বাস করবে না, সে সুদূর বিভ্রান্তিতে নিপতিত।’ [নিসা: ১৩৬]
আরেকটি আয়াতে তিনি বলেন,
ইন্নাল্লাজিনা ইয়াকফুরুনা বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি ওয়া ইউরিদুনা আই ইউফাররিকু বাইনাল্লাহি ওয়া রুসুলিহি ওয়া ইয়াকুলুনা নুমিনু বিবা’দিন ওয়া নাকফুরু বিবা’দিন ওয়া ইউরিদুনা আই ইয়াত্তাহিজু বাইনা যালিকা সাবিলা। উলাইকা হুমুল কাফিরুনা হাক্কান, ওয়া আ’তাদনা লিল কাফিরিনা আজাবাম মুহিনা।
অর্থ: ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলগণকে অস্বীকার করে, উপরন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের মাঝে ভেদাভেদ করে আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি কিন্তু কতককে অবিশ্বাস করি, এবং এরই মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়, তারাই প্রকৃত কাফের। আর আমি কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।’ [নিসা: ১৫০-১৫১]
এ কারণে আলিমগণ একমত যে, কেউ যদি সকল নবি-রাসুলের উপর ঈমান এনেও কেবল একজন নবির নবুওতকে অস্বীকার করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কুরআনে নুহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, কাযযাবাত ক্বাউমু নুহিনিল মুরসালিন। অর্থ: ‘নুহের সম্প্রদায় রাসুলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।’ [শুআরা: ১০৫] হুদ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেন, কাযযাবাত আদুনিল মুরসালিন। অর্থ: ‘আদ সম্প্রদায় রাসুলদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।’ [শুআরা: ১২৩] সালেহ আলাইহিস সালামের কওমের ব্যাপারে বলেন, কাযযাবাত ছামুদুল মুরসালিন। অর্থ: ‘সামুদ সম্প্রদায় রাসুলদের মিথ্যা সাব্যস্ত করেছিল’ [শুআরা: ১৪১]। লুত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেন, কাযযাবাত ক্বাউমু লুতিনিল মুরসালিন। অর্থ: ‘লুতের সম্প্রদায় রাসুলদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।’ [শুআরা: ১৬০]
উপরের আয়াতগুলোতে দেখুন, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলা হচ্ছে—তারা রাসুলদের অস্বীকার করেছে। অথচ তাদের প্রত্যেকের কাছে কেবল নিজেদের একজন রাসুলই এসেছিলেন। তাহলে বহুবচন ব্যবহারের রহস্য কী? রহস্য হলো, প্রত্যেক রাসুল তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পূর্ববর্তী রাসুলের সত্যায়নকারী ও পরবর্তী রাসুলের সুসংবাদ প্রদানকারী হিসেবে আসতেন। ফলে তাদের একজনকে অস্বীকার করার অর্থ ছিল তাঁর পূর্বাপর সকলকে অস্বীকার করা।
টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫) ।