📄 ফেরেশতার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ কুফর
কুরআন-সুন্নাহে এমন স্পষ্ট বর্ণনা থাকার পরও মুসলমানদের কিছু সম্প্রদায় ফেরেশতা-কেন্দ্রিক আকিদার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। যেমনটা পূর্বে বলা হয়েছে, ফেরেশতারা কোনো আধ্যাত্মিক বা অদৃশ্য শক্তি নয়; বরং তারা আল্লাহর সৃষ্টি এবং শারীরিকভাবে বিদ্যমান, যদিও তাদের আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু আফসোসের বিষয়, কিছু সম্প্রদায় তাদের বাস্তবিক ও শারীরিকভাবে বিদ্যমান থাকা অস্বীকার করে এবং তারা মনে করে, ফেরেশতারা আকাশের তারকা। আবার কেউ কেউ আধ্যাত্মিক শক্তি বলে মনে করে, বাস্তবে যাদের অস্তিত্ব নেই। আবার নিজেদের প্রগতিশীল ও পণ্ডিত ভাবা অনেক অতিবুদ্ধিমান লোক ফেরেশতার অস্তিত্ব অস্বীকার করে। তারা মনে করে, যেহেতু ফেরেশতা দেখা যায় না, সুতরাং ফেরেশতা বলতে কোনো কিছু নেই। অদৃশ্যের প্রতি মানুষের কাল্পনিক ভয় ও ভালোবাসা ইত্যাদি থেকে ফেরেশতার ধারণার সূত্রপাত। ইসলাম ফেরেশতার ধারণা আরবদের কল্পিত বিশ্বাস ও অন্যান্য ধর্মের মিথ থেকে গ্রহণ করেছে ইত্যাদি। এসব কথাবার্তাকে শরিয়তের পরিভাষায় বলা হয় ‘জানদাকাহ’ তথা মুনাফেকি। যদি কেউ জেনেবুঝে এসব কথা বলে, তবে সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে।
আবার অনেকে অজ্ঞতার কারণে ফেরেশতাদের অন্যান্য ধর্মে বিদ্যমান ফেরেশতার বিকৃত ধারণার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কেউ কেউ ফেরেশতাদের জিনদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। এগুলো সবই অজ্ঞতা। ইসলামে ভূত-প্রেত, রাক্ষস-ডাইনি-পরি ইত্যাদি বলতে কোনো কিছু নেই। মানুষের বাইরে ইসলাম কেবল দুটো অদৃশ্য শক্তির স্বীকৃতি দেয়: এক. নূরের তৈরি ফেরেশতা, দুই. আগুনের তৈরি জিন ও শয়তান। আগেকার যুগের মানুষ জিনদের নারী-পুরুষকে ভূত-প্রেত ও পরি ইত্যাদি মনে করত। বর্তমানেও এমন অনেক বিশ্বাস রয়েছে। বাস্তবে এমন ভিন্ন কিছুর অস্তিত্ব নেই। ওগুলো জিনই।
ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা ফেরেশতাতে বিশ্বাস করে। কারণ, তাদের ধর্ম মূলত ইসলাম ধর্মই ছিল। শরিয়ত আলাদা হলেও আকিদা এক ও অভিন্ন ছিল। ফলে মুসলমানদের মতো তারাও বিশ্বাস করে—ফেরেশতারা নূরের তৈরি, এবং তারা মানুষ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী। তাদের অসুস্থতা নেই, ক্লান্তি নেই, ঘুম নেই, মৃত্যু নেই। তারা বিয়ে-শাদি করে না। মুসলমানদের মতো ইহুদি-খ্রিষ্টানরাও বিশ্বাস করে—জিবরাইল আলাইহিস সালাম প্রধান ফেরেশতা। কিন্তু তাঁর ব্যাপারে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। জিবরাইল আলাইহিস সালামকে বলা হয় ‘রুহুল কুদুস’। কিন্তু খ্রিষ্টানরা সেটাকে আল্লাহ মনে করে ট্রিনিটির একজন সদস্য বানিয়ে দিয়েছে। ফলে তাদের কাছে জিবরাইল আর রুহুল কুদুস ভিন্ন সত্তা। এভাবে তাদের ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ার ফলে ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে তারা অনেক ভিত্তিহীন ও বিকৃত আকিদা লালন করে।
📄 ফেরেশতারা রোবট নন
ফেরেশতারা দ্বীনের প্রতি গাইরতসম্পন্ন মুমিন সম্প্রদায়। ফলে তারা ঈমান ও আনুগত্যকে ভালোবাসেন। নবি-রাসুল ও মুমিনদের মহব্বত করেন, সাহায্য করেন; কুফরকে ঘৃণা করেন; কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাদের শাস্তি দেন, শায়েস্তা করেন। এ কথার মাধ্যমে সেসব লোকের বিভ্রান্তি স্পষ্ট হয়, যারা ফেরেশতাদের কেবল রোবটের মতো মনে করে। তাদের ধারণা—আল্লাহ ফেরেশতাদের যে কাজ করতে বলেন সেটাই করেন, সুতরাং তাদের নিজস্ব পছন্দ, ভালোলাগা, নিষ্ঠা বলতে কোনো কিছু নেই। এগুলো ভিত্তিহীন ধারণা। হ্যাঁ, তারা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ঈমান ও মুমিনদের প্রতি তাদের ভালোবাসা নেই, তারা রোবটের মতো। আমরা কুরআনে দেখি ফেরেশতারা নবিদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের দুশমনদের বিরুদ্ধে অভয় দেন। আল্লাহ তায়ালা লুত আলাইহিস সালাম ও ফেরেশতাদের মাঝে কথোপকথন সম্পর্কে কুরআনে বলেন,
ওয়া লাম্মা জাতাত রুসুলুনা লুত্বান... [হুদ: ৭৭-৮১]
বদর, খন্দক-সহ একাধিক যুদ্ধে ফেরেশতারা সাহাবাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন [আলে ইমরান: ১২৩-১২৫, আনফাল: ৯-১২, আহজাব: ৯]। ১ অন্যান্য মুজাহিদের সঙ্গেও ফেরেশতারা জিহাদে অংশগ্রহণ করেন, বর্তমানেও করছেন, ভবিষ্যতেও করতে থাকবেন।
বরং ফেরেশতা কর্তৃক মুমিনদের ভালোবাসার সুস্পষ্ট বর্ণনা হাদিসে পাওয়া যায়। আবু হুরাইরা রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আল্লাহ তায়ালা অমুককে ভালোবাসেন, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরাইল তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরাইল আকাশের অধিবাসীদের মাঝে ঘোষণা করেন, আল্লাহ তায়ালা অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আকাশের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। অতঃপর পৃথিবীর মানুষের অন্তরে তার ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা ঢেলে দেওয়া হয়’। ২
ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য দোয়া করেন। আলিমদের জন্য দোয়া করেন। ৩ দ্বীনি শিক্ষায় রত ছাত্রদের জন্য ডানা বিছিয়ে দেন। ৪ প্রথম দিকের কাতারগুলোতে যারা নামাজ আদায় করে, তাদের জন্য দোয়া করেন। ৫ যারা রোজার সাহরি খায়, তাদের জন্য দোয়া করেন। ৬ যারা রোগী দেখতে যায়, ফেরেশতারা তাদের জন্য দোয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। ৭ বরং পুণ্যবান কেউ মারা গেলে ফেরেশতারা তার জানাজাতেও অংশগ্রহণ করেন। ৮ তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন [ফুসসিলাত: ৩০-৩১]।।
বিপরীতে কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গাতে বিভিন্ন গুনাহগার ও অপরাধীদের উপর ফেরেশতাদের অভিসম্পাত করতে দেখা যায়। কারণ তারা ওগুলো পছন্দ করেন না [বাকারা: ১৬১, আলে ইমরান: ৮৬-৮৭]। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যারা তাঁর সাহাবাদের গালি দেবে, ফেরেশতারা তাদের উপর অভিসম্পাত করেন। ১ যারা আল্লাহর শরিয়তের বিধি-বিধান, হুদুদ-কিসাস ইত্যাদি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, ফেরেশতারা তাদের লানত করেন। ২ এভাবে মানুষের অস্তিত্বের শুরু থেকে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম পর্যন্ত সর্বত্রই ফেরেশতারা মানুষের সঙ্গে লেগে থাকেন। ভালো হলে তার সঙ্গে ভালো আচরণ করেন, দোয়া করেন, সাহায্য করেন। মন্দ হলে অসন্তুষ্ট হন, বদদোয়া করেন, শাস্তি দেন।
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৯৯২)।
২. বুখারি (৩২০৯); মুসলিম (২৬৩৭)।
৩. তিরমিজি (২৬৮৫)।
৪. সহিহ ইবনে হিব্বান (১৩২১)।
৫. আবু দাউদ (৬৬৪); সহিহ ইবনে খুজাইমা (১৫৫৭)।
৬. সহিহ ইবনে হিব্বান (৩৪৬৭); মুসনাদে আহমদ (১১২৫৫)।
৭. আবু দাউদ (৩০৯৮)।
৮. সুনানে কুবরা, নাসায়ী (২১৯৩)।
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১২৭০৯)।
২. আবু দাউদ (৪৫৯১); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৬৯৬৫)।
📄 কে শ্রেষ্ঠ, মানুষ না ফেরেশতা?
ফেরেশতারা মাসুম। তারা কোনো গুনাহ করেন না। তারা আল্লাহর অবাধ্য হন না। মন্দ চরিত্রের কোনো কাজে লিপ্ত হন না। এটা সকল মুসলমানের আকিদা। এ কারণে ভালো মানুষ বোঝাতে আমরা বলি ফেরেশতা। কারও ভালো চরিত্র বোঝাতে আমরা বলি ‘ফেরেশতা-চরিত্রের অধিকারী’। ফলে স্বাভাবিকভাবে ফেরেশতারা মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হন। আর এখান থেকেই কে শ্রেষ্ঠ সে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। আসলে কুরআন ও সুন্নাহে এটা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ফয়সালা দেওয়া হয়নি। ফলে স্বভাবতই আলিমদের মাঝে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে。
কেউ কেউ মনে করেন, ফেরেশতা মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মতে ব্যাপারটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ (কাফের ও ফাসেক) থেকে ফেরেশতা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু নবি-রাসুল, ওলি-আউলিয়া, ও পুণ্যবান মুসলমানরা ফেরেশতার চাইতে শ্রেষ্ঠ। কারণ, আদম আলাইহিস সালামকে ফেরেশতারা সিজদা করেছেন [বাকারা: ৩৪, কাহাফ: ৫০]। আর উত্তম অনুত্তমের জন্য সিজদা করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেন, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তারা গোটা সৃষ্টিজগতের সর্বোত্তম।’ [বাইয়িনাহ: ৭] যেহেতু ফেরেশতারাও সৃষ্টিজগতের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং পুণ্যবান মানুষ ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হলো。
কিন্তু এটা কোনো চূড়ান্ত মতামত নয়। বরং ইমাম আবু হানিফা রাহি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ মত রাখতেন। কাউকে শ্রেষ্ঠ না বলে নীরব থাকতেন। ৩ তাই এটা নিয়ে চূড়ান্ত কোনো কথা বলা কিংবা অতিরিক্ত ঘাঁটাঘাঁটি নিষ্প্রয়োজন। কারণ, এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নয়। দুনিয়া ও আখিরাতে কোথাও এটা কাজে লাগার মতো কিছু নয়। মুমিনের কর্তব্য হলো পুণ্য অর্জন করা এবং ফেরেশতাদের ভালোবাসা। ইমাম বাইহাকি লিখেন, এটা একটা সাধারণ বিষয়। এটা জানার মাঝে বিশেষ কোনো উপকার নেই। ১ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর যেসব বিষয় ফরজ করেছেন, সেগুলো নষ্ট করো না; যেসব বিষয় হারাম করেছেন, সেগুলোর মাঝে লিপ্ত হয়ো না; যেসব সীমারেখা বেঁধে দিয়েছেন, সেগুলো লঙ্ঘন করো না। আর কিছু বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ (অনুগ্রহ করে, ভুলে গিয়ে নয়) নীরব থেকেছেন; তোমরা তা খোঁজাখুঁজি করো না।’ ২
টিকাঃ
৩. ইবনে আবিল ইজ (২৮১)।
১. শুআবুল ঈমান, বাইহাকি (১/৩২২)।
২. সুনানে দারাকুতনি (৪৩৯৬)। আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৫৮৯)।