📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহর খলিল

📄 ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহর খলিল


খলিল মানে পরম প্রিয় বন্ধু। এটা ভালোবাসার সর্বোচ্চ চূড়া। আল্লাহ তায়ালা সকল মুমিন, মুসলমানকে ভালোবাসেন, তাওবাকারীদের, পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। কুরআনে এমন অনেককেই ভালোবাসার কথা বলেছেন। কিন্তু 'খুল্লাহ' তথা সর্বোচ্চ ভালোবাসা লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন মাত্র দুজন মানুষ। একজন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং অন্যজন আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا অর্থ: 'আর আল্লাহ ইবরাহিমকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [নিসা: ১২৫] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যেভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আমাকেও খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।'৩ কিয়ামতের শাফায়াত-সংক্রান্ত হাদিসগুলোতেও ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আল্লাহর খলিল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।৪

এভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। কেবল মুসলিমরা নয়, ইহুদি-খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মের লোকজনও ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। তিনি মুসা, ঈসা (মায়ের দিক থেকে) ও আমাদের নবির পূর্বপুরুষ। তারা সকলে তাঁর বংশধর। এ জন্য ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে ‘আবুল আম্বিয়া’ তথা নবিদের পিতা বলা হয়। তিনি একাই এক উম্মাহ ছিলেন [নাহল: ১২০]। আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির ইমাম সাব্যস্ত করেছেন [বাকারা: ১২৪]। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁর শরিয়ত অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, فَاتَّبِعُوا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا [আলে ইমরান: ৯৫]। তিনি মুসলিম জাতির একমাত্র পিতা; ফলে অন্য কেউ মুসলিম জাতির পিতা হবে না: مِلَّةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمّٰكُمُ الْمُسْلِمِينَ [হজ: ৭৮]। এভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এমন এক পুরুষ, যার পরে জগতের শীর্ষস্থানীয় নবি-রাসুলদের সকলেই তাঁর সন্তান। ফলে সেই যুগ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আল্লাহকে চিনবে, ইসলাম গ্রহণ করবে, তাদের সকলের পুণ্য ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর নবি-রাসুল সন্তানদের আমলনামায় যোগ হবে। ইবরাহিমের পরিবার জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিবার। আর এ কারণে আমরা প্রত্যেক নামাজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবারের উপর সালাম পেশ করি।

তবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে নিয়ে যেসব বাড়াবাড়ি বিদ্যমান, যেমন: তাকে কেন্দ্র করে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্ম মিলিয়ে ইবরাহিমি ধর্ম তৈরি করার পরিকল্পনা (Milah Abraham + Abraham Accord), ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা কিংবা তাঁকে হিন্দুদের দেবতা (ব্রহ্মা-ব্রাহামা-ইবরাহিম) মনে করা ইত্যাদি ভিত্তিহীন ও বর্জনীয় কাজকারবার।

টিকাঃ
৩. মুসলিম (৫৩২); ইবনে হিব্বান (৬৪২৫); আল-মুজামুল কাবির (১৬৮৬)।
৪. বুখারি (৪৪৭৬, ৭৪১০)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকারী

📄 মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকারী


পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালাকে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَمَا كَانَ لِبَشَرِ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَائِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ রَسُوْলًا فَيُوْحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ . অর্থাৎ 'কোনো মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন। কিন্তু ওহির মাধ্যমে অথবা পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোনো দূত প্রেরণ করবেন অতঃপর আল্লাহ যা চান, সে তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছে দেবে। নিশ্চয় তিনি সবার উর্ধ্বে, প্রজ্ঞাময়।' [শুরা: ৫১] আর মুসা আলাইহিস সালাম সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যারা আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। এ কারণে তাকে 'কালিমুল্লাহ' তথা আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকারী বলা হয়।

তবে একমাত্র মুসা আলাইহিস সালাম কালিমুল্লাহ নন। পৃথিবীতে তিনজন মানুষ ছিলেন যারা আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন: প্রথমে আদম আলাইহিস সালাম, দ্বিতীয় মুসা আলাইহিস সালাম, তৃতীয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আবু জর রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মসজিদে ঢুকে রাসুলুল্লাহকে দেখতে পেলাম। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, সর্বপ্রথম নবি কে? তিনি বললেন, আদম। আমি বললাম, তিনি কি নবি ছিলেন? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকারী নবি' (নাবিয়্যুন মুকাল্লাম)।১ রাসুলুল্লাহও মিরাজের রাতে আল্লাহর সঙ্গে কোনো মাধ্যম ছাড়া কথা বলেছেন। আল্লাহর কাছে নামাজ পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে আনার জন্য বারবার আবেদন করেন।২ হাদিসটি উল্লেখ করার পরে ইবনে হাজার লিখেন, এটা এ কথার অন্যতম শক্তিশালী দলিল যে, মিরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা নবিজির সঙ্গে কোনো মাধ্যম ছাড়া কথা বলেছেন।৩ আল্লাহর বাণী, তিলকার রুসুলু ফাদদালনা বা’দাহুম আলা বা’দ... [বাকারা: ২৫৩] ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, মুসা ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন।৪

তবে মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে আল্লাহর কথা বলার বিষয়টি সবার থেকে আলাদা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি কুরআনে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন, যা আদম ও আমাদের নবির ক্ষেত্রে হয়নি। আল্লাহ বলেন, وَكَلَّমَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا অর্থ: 'আর আল্লাহ মুসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন।' [নিসা: ১৬৪] অন্য এক আয়াতে বলেন, وَلَمَّا জাতা মুসা লি মিকাতিনা ওয়া কাল্লামাহু রাব্বুহু অর্থ: 'আর মুসা যখন আমার প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর সাথে তাঁর রব কথা বললেন।' [আরাফ: ১৪৩] পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, قَالَ يُمُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسُلِتِي وَ بِكَلامِي فَখুধ মা আতাইতুকা ওয়া কুন মিনাশ শাকিরিন। অর্থ: 'তিনি বললেন, হে মুসা, আমি আপনাকে সকল মানুষের মধ্য থেকে আমার পয়গাম ও কথোপকথনের জন্য মনোনীত করেছি। সুতরাং যা-কিছু আমি দান করলাম, সেগুলো গ্রহণ করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হোন।' [আরাফ: ১৪৪]

এভাবে আল্লাহ তায়ালা মুসার সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথোপকথনকে চিরস্থায়ী করে রেখেছেন। আয়াতের মাঝে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। তা হলো, এখানে একমাত্র মুসাকেই সকল মানুষের মাঝ থেকে কথা বলার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে মর্মে বলা হয়েছে। অথচ আদম ও আমাদের নবির সঙ্গেও আল্লাহ কথা বলেছেন। এর কারণ হলো, আদম আলাইহিস সালামের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন জান্নাতে। আর নবিজির সঙ্গে কথা বলেছেন মিরাজের রাতে পৃথিবীর বাইরে ঊর্ধ্বজগতে। বিপরীতে মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেছেন এই পৃথিবীর মাটিতেই। পৃথিবীতে থেকেই তিনি কোনো ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আল্লাহর কথা শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। ভূপৃষ্ঠের মাটিতে বসে স্রষ্টার কথা শোনার বিরল সৌভাগ্যবান একমাত্র মানুষ তিনিই। খুব সম্ভব এই কারণে কেবল তিনিই 'কালিমুল্লাহ' হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছেন।

জগতের সকল মুসলমান এ ব্যাপারে একমত। কিন্তু কালামের স্বরূপ নিয়ে তাদের মাঝে মতভেদ তৈরি হয়েছে। মুতাজিলারা বলে, আল্লাহ অক্ষর ও আওয়াজ সৃষ্টি করেন যেগুলো বোধগম্য হয়। ফলে আল্লাহর 'কথা' তাদের কাছে মাখলুক বা সৃষ্ট। এখান থেকে তারা কুরআনকেও মাখলুক বলে। সুতরাং মুতাজিলারা এ কথা বলে না যে, আল্লাহ কথা বলেন না। কিন্তু তারা কথা বলার স্বরূপকে এভাবে ব্যাখ্যা করে। আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার মাঝে আল্লাহর কথার স্বরূপ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।

একদল মনে করেন, আল্লাহ মুসার সঙ্গে অক্ষর ও আওয়াজ-সহ কথা বলেছেন। তাদের মতে, আল্লাহর কালাম অক্ষর ও আওয়াজ-সহ। তবে তারা এটাকে মাখলুক বলেন না। তারা বলেন, আল্লাহর মূল কালাম কাদিম। কিন্তু নির্ধারিত আওয়াজ কাদিম হওয়া জরুরি নয়। আর অন্যদল অক্ষর ও আওয়াজ-সহ কথাকে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তারা নিজেরা আবার মতভেদ করেন। কারও মতে, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে আত্মকথা (আল-কালামুন নাফসি) বলেছেন। আবার কারও মতে, আল্লাহ এমন আওয়াজ সৃষ্টি করেছেন, যা কথা হিসেবে মানুষ শোনে। এক্ষেত্রে প্রথম দলের সমালোচনায় তারা বলেন, আল্লাহর ইলম ও জীবন রয়েছে, কিন্তু সেগুলো সৃষ্টির ইলম ও জীবনের মতো নয়। আল্লাহর শক্তি রয়েছে, কিন্তু সেটা সৃষ্টির শক্তির মতো নয়। তাহলে আল্লাহর কথাকে কেন সৃষ্টির কথার মতো (অক্ষর ও আওয়াজ-সহ) হতে হবে? তা ছাড়া তাদের যুক্তি, অক্ষর ও আওয়াজ-সহ হলে এটা সিফাত হয় না, বরং সৃষ্টি হয়; ফলে তাদের মাঝে আর মুতাজিলাদের মাঝে কোনো পার্থক্য রইল না! বিপরীতে প্রথম দল বলেন, দ্বিতীয় দল কালামের যে ব্যাখ্যা করে, তা মূলত আল্লাহর কালাম অস্বীকারের পর্যায়ে।১

বস্তুত এসব তাত্ত্বিক আলোচনায় সাধারণ মুসলমানদের দ্বীন ও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জড়িত নয়; বরং আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেছেন, মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর কথা শুনেছেন ও বুঝেছেন—এতটুকুর উপর ঈমান আনা এবং এর স্বরূপ কী ছিল সেটা আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই যথেষ্ট। এ জন্যই ইমাম তহাবি এ সম্পর্কে কোনো বিবাদের অবতারণা করেননি। কারণ, এসব বিতর্কে আল্লাহর সঙ্গে কিয়ামতের দিন ও জান্নাতে সরাসরি কথোপকথনের যে স্বাদ ও তৃপ্তির স্বপ্ন দেখে মুসলমান, সেটা হারিয়ে গিয়ে নিরস তাত্ত্বিকতায় পরিণত হয় আকিদার আলোচনা।

টিকাঃ
১. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৭০৮৩); সহিহ ইবনে হিব্বান (৬১৯০)।
২. বুখারি (৩৮৮৭); সহিহ ইবনে হিব্বান (৪৮)।
৩. ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার (৭/২১৬)।
৪. তাফসিরে ইবনে কাসির (১/৫১১)।
১. গুনাইমি (৯৩-৯৪); শুআইবি (৫৯); সাইদ ফুদাহ (৫৪7-৫৫8)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px