📄 ইমাম তহাবির বক্তব্যের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন আসতে পারে, ইমাম তহাবি কোন পক্ষে? বরাবরের মতো এখানেও তাকে নিয়ে টানাটানি। প্রথম ধারা মনে করে ইমাম তহাবি তাদের আকিদা সমর্থন করেছেন। দ্বিতীয় ধারা মনে করে ইমাম তহাবি তাদের আকিদা সমর্থন করেছেন। তাদের উভয়ের দলিল ইমাম তহাবির বক্তব্য: ‘আল্লাহ তায়ালা আরশ এবং আরশের নিচে বিদ্যমান সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি প্রত্যেক বস্তু এবং তার (তথা আরশের) উপর যা-কিছু রয়েছে সবগুলোকে পরিবেষ্টনকারী’ (মুহিতুম বিকুল্লি শাইয়িন ফামা ফাউকাহু)। প্রথম দল এটার অর্থ করেছে ‘আল্লাহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে’। ফলে ইমাম তহাবির বক্তব্য তাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে। দ্বিতীয় দল এটার অর্থ করেছে, রূপকভাবে উর্ধ্বে। ফলে ইমাম তহাবির বক্তব্য তাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে। অথচ বাস্তব কথা হলো, ইমাম তহাবি এই দুই পক্ষের জটিলতার মাঝে ঢুকতেই চাননি। ফলে কুরআন-সুন্নাহর মতো তিনিও ব্যাপারটি এমনভাবে রেখে দিয়েছেন, যাতে তার কথা দুই দিকেই নেওয়া যায়। এটা সম্ভবত এই কারণে যে, তিনি এসব নিয়ে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি পছন্দ করতেন না। কারণ, এগুলো আকিদার মৌলিক বিষয় নয়।
ফলে আমরা যদি ইমাম তহাবির বক্তব্যের একটু গভীরে যাই, এখানে আল্লাহর সত্তাগত/রূপক অর্থে কোনোভাবেই উর্ধ্বে হওয়ার কোনো বক্তব্য নেই যেমনটা উভয় ধারা মনে করে থাকে; বরং এখানে স্রেফ ‘পরিবেষ্টন’ সম্পর্কিত বক্তব্য। বাক্যের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, তিনি সবকিছু পরিবেষ্টনকারী। কুরআনে পরিবেষ্টন (আল-ইহাতা) সংক্রান্ত যত আয়াত এসেছে, সবগুলো আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা দ্বারা পরিবেষ্টন বোঝানো হয়েছে; সত্তাগতভাবে নয়। ফলে এখানেও জ্ঞানগত পরিবেষ্টনই বোঝানো হয়েছে। কারণ, সত্তাগতভাবে আল্লাহ সবকিছু বেষ্টন করে আছেন এমন আকিদা সর্বেশ্বরবাদী বিশ্বাস, যা প্রথম দলেরও বক্তব্য। আর বাক্যের দ্বিতীয় অংশ (ফামা ফাউকাহু) এর ‘আতফ’ পরিবেষ্টনের উপর; আল্লাহর উপর নয়। কিছু কিছু পাণ্ডুলিপিতে এটা (ওয়ামা) ও (বিমা ফাউকাহু) রয়েছে এবং সবগুলোর অর্থই এক। ফলে পিছনের বাক্য-সহ এর অর্থ দাঁড়াবে: আল্লাহ আরশ ও আরশের নিচে বিদ্যমান সকল সৃষ্টি থেকে যেমন অমুখাপেক্ষী, তেমনই তিনি আরশ, আরশের নিচে বিদ্যমান সকল সৃষ্টি এবং আরশের উপর বিদ্যমান সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী। ফলে এখানে প্রসঙ্গ হলো ‘পরিবেষ্টন’; ‘অবস্থান’ নয়। বিশেষত (মা ফাউকাহু) ও (ফামা ফাউকাহু) পড়লে তো সত্তাগত অবস্থানের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগই নেই। স্রেফ (ওয়াফাউকাহু) পড়লে আল্লাহর অবস্থানগত বক্তব্যের সুযোগ থাকে। কিন্তু সেটাও সত্তাগত হয় না। কারণ, স্বয়ং প্রথম দলও বাক্যের প্রথম অংশ (পরিবেষ্টন)-কে সত্তাগত নয়, বরং রূপক ধরেন। ফলে প্রথম অংশ রূপক ধরে পরের অংশ শাব্দিক ধরার কোনো সুযোগ নেই। ইবনে আবিল ইজ আরেকটি রূপ বর্ণনা করেছেন (আল-মুহিতু বিকুল্লি শাইয়িন ফাউকাহু)। এখানে সত্তাগতভাবে অর্থ তোলার কোনো সুযোগই নেই। কারণ, তখন এর অর্থ আরশের উপরে যা-কিছু বিদ্যমান সেগুলোকেও পরিবেষ্টন করা, সত্তাগত উর্ধ্বে নয়। ফলে দুটো পরিবেষ্টনের একই (রূপক) অর্থ দাঁড়াবে।
উপরের আলোচনায় স্পষ্ট যে, ইমাম তহাবিকে এখানে আকিদার প্রচলিত কোনো ধারার মাঝে ঢোকানো যাবে না। কারণ, ইমাম তহাবি খালাফের আকিদার প্রবর্তক নন। বরং এখানে ইমাম তহাবির মানহাজ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় হলো, তিনি চাইলে তার বইয়ে এগুলো নিয়ে লম্বা কথা বলতে পারতেন, কিন্তু করেননি। যেখানে তাকদির নিয়ে, রাসুলুল্লাহ নিয়ে, জিহাদ ও ওয়ালা-বারা নিয়ে তিনি তুলনামূলক লম্বা কথা বলেছেন, সেখানে পুরা বইয়ে তিনি ইস্তিওয়া/নুজুল শব্দগুলো উল্লেখই করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায়, এটা জানা মুসলিম উম্মাহর জন্য যতটা উপকার, তারচেয়ে বরং ক্ষতির পরিমাণ বেশি। কারণ, যেখানে এই আকিদা আল্লাহর প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসার পাথেয় হওয়ার কথা ছিল, সেটাকে আজ বানানো হয়েছে বিভক্তি ও কাটাকাটির হাতিয়ার।
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (২৫৯); সালেহ ফাওজান (১০০); আল-ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা, আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (২৬২)।
১. গজনবি (১০৬); সাইদ ফুদাহ (৮৮৮); আল-আকিদা আত ত্বহাবিয়্যাহ, মুফতি শরিফুল ইসলাম (৩১)。
📄 সিফাতের আলোচনা সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ
ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ এতটাই বিভক্ত যে আল্লাহ তায়ালা না চাইলে কখনোই তাদের এ ব্যাপারে একমত করা সম্ভব নয়। স্রেফ মতানৈক্য থাকলেও সমস্যা ছিল না। কারণ এমন মতানৈক্য তো চার মাজহাবের ভিতরেও রয়েছে। কিন্তু এখানে পরস্পরকে গালি-গালাজ, হিংসা-বিদ্বেষ, সমালোচনা, হানাহানি-মারামারি, সম্পর্ক ছিন্ন-সহ সব ধরনের ফ্যাসাদের উৎস এই মাসআলা। যেহেতু এটার সমাধান করা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ শতাব্দের পর শতাব্দ মুসলিম উম্মাহ এটা নিয়ে ঝগড়া করেও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি, এ জন্য আমাদের উচিত হবে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সুর খুঁজে বের করা。
প্রথম কথা হলো, অন্যান্য সিফাতের মতো এখানেও কিছু সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। তারা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির শিকার হয়েছে। একদল আল্লাহকে আরশের উপর সেভাবে বসিয়ে দিয়েছে, যেভাবে রাজা-বাদশাহ তাদের সিংহাসনে বসে। এরা হলো দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদী। আরেক দল আল্লাহ তায়ালার এ সকল সিফাতকে এমনভাবে অপব্যাখ্যা করেছে যে, এর কোনো অস্তিত্বই থাকেনি। এরা হলো জাহমিয়্যাহ, মুতাজিলা ইত্যাদি। ফলে এই দুই সম্প্রদায় আমাদের আলোচনার বাইরে。
আগেও আমরা বলেছি, আল্লাহর অন্যান্য সিফাতের মতো এখানেও আমরা সালাফের মানহাজের সঙ্গে থাকব। আর তা হলো, কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। তাই কুরআন ও সুন্নাহে যা বলা হয়েছে ততটুকুই বলব; নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো কথা যোগ করব না। আল্লাহ বলেছেন, তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন, আমরা বলব না: ‘না, তিনি ইস্তিওয়া করেননি।’ আবার এগুলোর স্বরূপ নির্ধারণ কিংবা এমন অর্থ করব না যা মানুষের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। ফলে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দগুলো যেমন ওঠা, আরোহণ করা, বসা, সমাসীন হওয়া, স্থিত হওয়া, অবস্থান গ্রহণ করা ইত্যাদি আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহার করব না। কারণ, আল্লাহ নিজের জন্য এগুলো ব্যবহার করেননি। আবার এটার তাবিলও করব না। কারণ, তাবিলের মাধ্যমে যে অর্থটা আমরা নির্ধারণ করছি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা সালাফ তা করেননি। একইভাবে যেসব হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, ‘আল্লাহ আরশের উপরে’, আমরা সেগুলো অস্বীকার করব না। কিন্তু সৃষ্টিজীবের জন্য প্রযোজ্য ক্ষুদ্র দিক বা স্থানের মাঝেও আল্লাহকে আমরা সীমাবদ্ধ করব না। বিশেষ কোনো দিকে বা স্থানে তাকে কল্পনা করব না। আমরা বলব, ‘আল্লাহ আরশের উপরে ইস্তিওয়া করেছেন যেমন তিনি ও তাঁর রাসুল বলেছেন, যেভাবে তাঁর জন্য শোভনীয়। এর স্বরূপ ও ব্যাখ্যা তিনিই ভালো জানেন। তিনি সকল স্থান ও কালের উর্ধ্বে। সৃষ্টি তাকে ধারণ করতে পারে না, উপলব্ধি করতে পারে না। এর বাইরে ‘সত্তা-সহ’, ‘স্বয়ং নিজে’, ‘হাকিকিভাবে’, ‘আরশ থেকে ফাঁকা হয়ে বা মিলে’, ‘আরশ বরাবর’, ‘আমাদের মাথার উপরের দিকে’, ‘আরশের সীমা শেষ হওয়ার পরে’ ইত্যাদি শর্ত যোগ করব না। কারণ, কুরআন-সুন্নাহ কিংবা সালাফ এটা করেননি। এগুলো দেহবাদের দিকে নিয়ে যায়। আবার রাজত্ব, কর্তৃত্ব, পরিচালনা ইত্যাদিও বলব না। কারণ, আল্লাহ নিজের জন্য এসব শব্দ ব্যবহার করেননি, সালাফ করেননি। তাই আকিদার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর বাইরে অনুমানমূলক কিছু বলব না। কিছু মনে মনেও ভাবব না। সংক্ষেপে ইজমালিভাবে ঈমান আনব। প্রকৃত রূপরেখা আল্লাহর হাতে সঁপে দেবো। এগুলো নিয়ে আলোচনা করা ইসলামের জরুরি বিষয় মনে করব না; বরং যথাসম্ভব এগুলো নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকব। আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত কেউ যদি আমার এই বিশ্বাস না রাখে, তাকে দাওয়াত দেবো, যথাসম্ভব মাজুর মনে করব।’
এই আকিদা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি হলে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাহে স্পষ্টভাবে বলে যেতেন যে, আল্লাহ আরশের উপর বসেছেন; উপর বলতে যা বোঝায়, বসা বলতে যা বোঝায়, তা-ই, তবে সৃষ্টির বসার মতো নয়। এটুকু বললে মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোনো বিবাদ হতো না। সালাফও এই কথাটা বলতে পারতেন। কিন্তু আমরা দেখি, তাদের কেউ এই কথা বলছেন না। তারা শুধু বলছেন, ‘যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দাও।’ অথবা তাদের কেউ বলছেন, ‘আরশের উপর আল্লাহর ইস্তিওয়া সত্য’ কিন্তু তিনি ইস্তিওয়া দিয়ে কী বোঝাচ্ছেন এবং উপর বলতে কোন উপর বোঝাচ্ছেন, সেগুলো স্পষ্ট করেননি। ফলে জটিলতা রয়েই গেছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সালাফ মনে করতেন, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে যা এসেছে, সেটার উপর ইজমালি ঈমান এনে বাকিটা আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু পরবর্তী আলিমগণ এখানে স্থির থাকেনি। তাদের একদল ইস্তিওয়ার অর্থ নির্ধারণে এতটাই অতিরঞ্জন করেছে যে, আল্লাহকে রাজা-বাদশাহর মতো আরশের উপরে একটা চেয়ার দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। আরেক দল ইস্তিওয়ার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এতটাই অতিরঞ্জন করেছে, যা আয়াতের রুহ নাকচের পর্যায়ে চলে গিয়েছে。
তা ছাড়া প্রশ্ন হলো, যে বিষয়টি নিয়ে উম্মাহ যুগের পর যুগ বিভক্ত হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, পরস্পর ভয়ংকর দুশমনে পরিণত হচ্ছে, যেটাকে কেন্দ্র করে মুসলমানরা একে অপরের নোংরা সমালোচনা করছে, গালি দিচ্ছে, কথা বন্ধ করছে, সম্পর্ক ছিন্ন করছে, ইসলামে সেটার গুরুত্ব কতখানি? ইস্তিওয়া, নুজুল এবং এ-জাতীয় সিফাতের অর্থ ও উদ্দেশ্য জানা কি দ্বীনের মৌলিক কোনো বিষয়?
ইবনে খুজাইমাকে (৩১১ হি.) আসমা ও সিফাতের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা একটা বিদআত, যা তারা আবিষ্কার করেছে। নতুবা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, মুসলমানদের ইমাম, ফিকহি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ, যেমন: মালেক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরি, আওজায়ি, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক হানজালি (ইবনে রাহাওয়াইহ), ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া—তারা কেউ এ ব্যাপারে কথা বলতেন না। এগুলোর মাঝে প্রবেশ করতে নিষেধ করতেন। তাদের কিতাবে দৃষ্টি বোলাতে বারণ করতেন। আল্লাহ আমাদের সব ধরনের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন।’
খতিবে বাগদাদি (৪৬৩ হি.) লিখেছেন, ‘মুহাদ্দিসের জন্য উচিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে এমন হাদিস বর্ণনা না করা, যা তাদের আকল গ্রহণ করতে অক্ষম। যেমন: সিফাতের হাদিসগুলো। এগুলো বাহ্যিকভাবে আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য, দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইত্যাদির দিকে ইঙ্গিত করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা তা থেকে পবিত্র। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো বর্ণনা করা হলে তারা আল্লাহকে সৃষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলবে। তাই এগুলো কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছেই বর্ণনা করা উচিত।’
ইবনে কুদামা (৬২০ হি.) বলেন لا حاجة لنا إلى علم معنى مَا أَرَادَ اللهُ تَعَالَى من صفاته ... অর্থাৎ আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার সিফাতের উদ্দিষ্ট অর্থ জানা দরকার নেই। কেননা এগুলোর সঙ্গে কোনো আমল জড়িত নয়। কেবল ঈমান আনা ছাড়া এগুলোর ক্ষেত্রে আর কোনো কাজ নেই। আর ঈমান আনার জন্য এগুলোর অর্থ জানা জরুরি নয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ফেরেশতা, কিতাব এবং রাসুল এবং তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপরও ঈমান আনতে বলেছেন, অথচ ওসবের আমরা নাম ছাড়া কিছুই জানি না।’
ইবনে কুদামা এসব ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলেন, ‘সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এসব শব্দ, আয়াত ও হাদিসের উপর আল্লাহ যা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, সেই ভিত্তিতে ঈমান আনা। যেসব অর্থ আমাদের জানা নেই, সেসব ব্যাপারে নীরব থাকা; আল্লাহ তায়ালা যেগুলো আমাদের জানাননি কিংবা জানার জন্য নির্দেশ দেননি, সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করা। এ পথে যারা চলবে, তাদের কোনো ভয় নেই, তাদের উপর কোনো ভর্ৎসনা নেই। যারা তাদের ভর্ৎসনা করবে, তারা ভুলের উপর আছে।
ইমাম রাজি (৬০৬ হি.) লিখেন, ইস্তিওয়ার জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই উত্তম। কারণ, যে জিনিসের জ্ঞান ওয়াজিব নয়, সে সম্পর্কে যদি কেউ বলে ‘আমি জানি না’, তাহলে সে নিন্দার পাত্র হবে না। ইসলামের অন্যতম মূলনীতি হলো তিনটি— তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস রাখা, পরকালে বিশ্বাস রাখা ও রাসুলদের স্বীকৃতি দেওয়া। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, পরকালে বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব, কিন্তু বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানা ওয়াজিব নয়। যেমন এটা কবে হবে সে জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কারও নেই। তাওহিদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর একত্ববাদ এবং তাঁর সুন্দর সুন্দর গুণের প্রতি সংক্ষিপ্তভাবে বিশ্বাস রাখা এবং সকল বিচ্যুতি ও ত্রুটি থেকে তাকে মুক্ত ঘোষণা করাই যথেষ্ট। তাঁর সকল গুণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি নয়। ইস্তিওয়াও আল্লাহর তেমন একটি সিফাত, যা সম্পর্কে জানা ওয়াজিব নয়। সুতরাং কেউ যদি এটা না জানে, তবে কোনো ক্ষতি নেই। বিপরীতে কেউ যদি নিজেকে এটার ভিতরে ঢুকিয়ে ভুল কিছু বলে কিংবা উলটো বিশ্বাস রাখে, তবে সেটা ক্ষতিকর।
হাকিমুল উম্মত থানভি লিখেন, এগুলো এমন তালা, যেসবের চাবি মানুষকে দেওয়া হয়নি। ফলে এগুলোর আলোচনা থেকে বিরত থাকা উচিত।
এর পরেও কেউ কেউ ঘাড় বাঁকিয়ে নিজের পথে থাকবে। ইস্তিওয়ার মাসআলাকে কালিমার মতো দ্বীনের মূল বিষয় মনে করবে। মানুষের জন্য এগুলো জানা এবং সাধারণ মানুষকে এগুলোর প্রতি দাওয়াত দেওয়া আবশ্যক ভাববে। এক্ষেত্রে তারা আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এক দাসীকে আল্লাহ কোথায়-সম্পর্কিত হাদিস দিয়ে দলিলও দেবে। অথচ কখনও ভাববে না, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা জীবনে একবারই একটা দাসীকে এমন প্রশ্ন করেছেন। তাও নিয়মিত দাওয়াতের অংশ হিসেবে নয়; বরং স্রেফ দাসী মুমিন কি না সেটা পরীক্ষার জন্য। রাসুলের তো মিশন ছিল ‘যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর আমি আল্লাহর রাসুল।’ বরং খোদ দাসীর হাদিসটিও বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ‘আল্লাহ কোথায়’ এমন প্রশ্ন না করে ‘তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আল্লাহ এক?’, কিংবা ‘তোমার রব কে?’ এমন শব্দে প্রশ্ন করেছেন। ফলে এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে ‘ইস্তিওয়া’-সংক্রান্ত নিগূঢ় আলোচনাকে দ্বীনের মূল বিষয় বানিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (ফাতহুল বারি (১৩/৪০৭)।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/১৮২-১৮৩)।
১. হিলয়াতুল আউলিয়া...
১. তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ আল-কুবরা (৯/৪০-৪১)।
২. আল-মুওয়াফাকাত, শাতেবি (৩/৩২৯)।
৩. ফাতহুল বারি (৩/৩০)।
৪. ফাতহুল বারি (৩/৩০)।
১. ফাতহুল বারি (১৩/৩৮৩)।
২. ফাতাওয়ায়ে ইবনিস সালাহ (১/৮৩)।
৩. তুহফাতুল আহওজায়ি, মুবারকপুরি (২/৪৩১)।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা (১১/২৩০)।
৫. তাবাকাতুশ শাফিইয়্যিাহ আল-কুবরা (৮/২১৯)।
১. মুসলিম (৫৩৭)।
২. বুখারি (২৫, ৩৯২)।
৩. মুসনাদে আহমদ (১৫৯৮৪)।
১. তাহরিমুন নাজার ফি ইলমিল কালাম, ইবনে কুদামা (৫২)।
২. প্রাগুক্ত (৫৪)。