📄 দ্বিতীয় দলের মতামত
‘ইস্তিওয়া’র ব্যাপারে প্রথম ধারার বিপরীতে উম্মাহর আরও বেশ কিছু ধারা রয়েছে। তাদের নিজেদের মাঝে আবার এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। আমরা সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনায় প্রবেশ করব না; বরং মোটাদাগে প্রথম ধারার বিপরীতে তাদের বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করব।
তাদের মতে, আরশ আল্লাহর একটি সৃষ্টি। আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ ছিলেন। যেহেতু তিনি আগে থেকেই পরিপূর্ণ, তাই আরশ সৃষ্টি তাঁর পূর্ণতার ভিতরে কিছু যোগ করেছে—এটা সম্ভব নয়। তাঁর সকল গুণ অনাদি। ফলে আরশ সৃষ্টির পরে তাঁর ভিতরে নতুন কোনো গুণ তৈরি হয়েছে—এমন নয়। আল্লাহ যখন ছিলেন, তখন কোনো দিক ও সীমা ছিল না। আল্লাহই এসব দিক ও সীমা সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আল্লাহ সকল দিক ও সীমার ঊর্ধ্বে। উপর-নিচ ও ডান-বাম বলতে আমরা যা বুঝি, সব সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহর ক্ষেত্রে এগুলো প্রযোজ্য নয়। ফলে আল্লাহ আরশের উপর উঠছেন—ইস্তিওয়ার এমন অর্থ ধরলে আল্লাহকে দিকের মাঝে সীমাবদ্ধ করা হয়, অথচ তিনি সকল দিকের ঊর্ধ্বে। তাই তারা আল্লাহর ইস্তিওয়া-সংক্রান্ত আয়াতগুলোকে ‘মুতাশাবিহাত’ গণ্য করেন এবং এগুলোর কোনো অর্থ নির্ধারণ করেন না। তাদের মতে, আল্লাহ কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ নন; বরং তিনি আরশ সৃষ্টির আগে যেমন ছিলেন, তেমন আছেন। আবার যেদিন আরশ থাকবে না, তিনি থাকবেন। কারণ, তিনি ছাড়া কেউ চিরন্তন ও অবিনশ্বর নয়। ফলে আরশের আগে যেথায় ছিলেন, আরশের পরে যেথায় থাকবেন, এখন তিনি সেখানেই আছেন। অন্য কথায়, স্থান-কাল সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য; আল্লাহর জন্য নয় (বিলা জামানিন ওয়া মাকানিন)।
এ ধারার আলিমগণ মনে করেন, ইস্তিওয়াকে আরশের উপর ওঠা বললে প্রশ্ন আসে—আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? তা ছাড়া আরশের উপর ওঠা বললে বোঝা যায় আগে তিনি নিচে ছিলেন। কিংবা আরশের উপর আল্লাহর বসাকে পূর্ণতা মনে করলে বোঝা যায়, আল্লাহ আগে অপূর্ণ ছিলেন। যেহেতু আরশ সৃষ্টির আগে এই বসার পূর্ণতা তার মাঝে ছিল না। ফলে আরশ আল্লাহর পূর্ণতা এনে দিয়েছে। আল্লাহর পূর্ণতা আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী। অথচ আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, আল্লাহ আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন। রাজি লিখেন, ‘কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আল্লাহর আরশকে আটজন ফেরেশতা বহন করে। [হাক্কাহ: ১৭] আল্লাহকে যদি আরশের উপর বসা মনে করা হয়, তবে অর্থ দাঁড়াচ্ছে—আটজন ফেরেশতা আল্লাহকে বহন করে। অথচ এ ধরনের বক্তব্য যে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি, তা যে কারও কাছে ধরা পড়বে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। সুতরাং তিনি স্থান ও দিক থেকেও অমুখাপেক্ষী।’
এ কারণে তারা কুরআনে ইস্তিওয়া-সংক্রান্ত আয়াত তাবিল করার মাধ্যমে তাদের মাজহাব প্রমাণিত ও বিপরীত মাজহাব খণ্ডন করেন। তাদের বক্তব্য:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ.
অর্থ: ‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন। [আরাফ: ৫৪] এই আয়াতে (অতঃপর) শব্দটি দ্বারা বোঝায়—আসমান ও জমিন সৃষ্টির সময় তিনি আরশের উপর ছিলেন না, অথচ আরশ তখনও ছিল। কারণ আরশ আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি। আর তাদের করা অর্থমতে আয়াতের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আকাশ ও মাটি সৃষ্টির পরে তিনি আরশে উঠেছেন, এর আগে আরশে ছিলেন না।
মোটকথা, তারা কুরআনে ব্যবহৃত ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রে দুটো মানহাজ অবলম্বন করেন: (এক.) এগুলোর অর্থ, মর্ম, ধরন, স্বরূপ—সবকিছু আল্লাহর কাছে সঁপে দেন (তাফবিজ মুতলাক করেন)। এ ধারার প্রথম যুগের আলিমদের মাঝে এ কর্মপদ্ধতি প্রচলিত ছিল। (দুই.) পরবর্তী যুগের আলিমগণ নতুন আরেকটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং বর্তমানেও তারা সেটার উপরই জোর দেন। তা হলো, এসব শব্দের আল্লাহর শানের উপযোগী ব্যাখ্যা (তাবিল) করা। ফলে তারা ইস্তিওয়ার অর্থ করেন: প্রতিপত্তি (আল-ইসতিলা), সৃষ্টির পরিচালনা (তদবির)। অর্থাৎ আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করার পরে সেগুলোর পরিচালনা শুরু করেন।
উদাহরণ হিসেবে সুরা আরাফ ধরা যাক। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي الَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّমْسَ وَالْقَمَرَ وَ النُّجُومَ مُসَخَّরُতٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْأَمْرُ تَبْرَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعُلَمِينَ.
অর্থ: ‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমন অবস্থায় যে, দিন দ্রুত রাতের পিছনে আসে। তিনি স্বীয় আদেশের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র। মনে রেখো, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ বরকতময়, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’ [আরাফ: ৫৪] তারা মনে করেন, উক্ত আয়াতে ইস্তিওয়ার অর্থ বসা নয়। কারণ, আলোচ্য আয়াতটি মূলত নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি এবং এগুলোর পরিচালনা-সংক্রান্ত। সৃষ্টির সঙ্গে বসার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াতে বলেছেন, তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করে রাত, দিন, চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি ইত্যাদি-সহ সৃষ্টির পরিচালনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। আয়াতের পরের অংশ ‘সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই’—এখানেও দেখা যাচ্ছে, সৃষ্টিকে পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আয়াতের শেষ অংশে ‘বিশ্বজগতের পালনকর্তা’ হিসেবে আল্লাহর গুণকীর্তন করা হয়েছে। আর গুণকীর্তনের সঙ্গে বসার সম্পর্ক নেই; বরং গোটা বিশ্বকে পরিচালনার কারণে তিনি এই গুণকীর্তনের অধিকারী। উপরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আয়াতে ব্যবহৃত ثم (অতঃপর) নিয়েও কোনো জটিলতা নেই। কারণ সৃষ্টির পরেই তো পরিচালনার কথা আসে। সৃষ্টি না থাকলে পরিচালনার প্রসঙ্গ আসে না। অপরদিকে বিশ্ব-সৃষ্টির সঙ্গে বসার কোনো সম্পর্ক নেই।
একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُৱَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ .
অর্থ: ‘যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনি বলুন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি তার উপর ভরসা করলাম, আর তিনি মহান আরশের প্রতিপালক।’ [তাওবা: ১২৯] এখানেও আল্লাহর উপর ভরসার সঙ্গে ইস্তিওয়া শব্দটা আনা হয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যিনি আরশের মতো এত বড় সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন, আমার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আরশে বসার সঙ্গে ভরসার সম্পর্ক নেই।
সুরা ইউনুসে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذُلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُوْনَ .
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পারে না তাঁর অনুমতি ছাড়া। তিনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো। তোমরা কি চিন্তা করো না?’ [ইউনুস: ৩] এখানে সুস্পষ্টভাবে ইস্তিওয়াকে পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তা ছাড়া আয়াতে সুপারিশের কথা বলা হয়েছে, যা একধরনের মালিকানা, কর্তৃত্ব ও পরিচালনা বোঝায়। বসার সঙ্গে সুপারিশের কোনো সম্পর্ক নেই।
সুরা রাদে আল্লাহ বলেন,
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّমَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُসَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرَ يُفَصِّلُ الْآيَتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوْقِنُوْনল.
অর্থ: ‘আল্লাহ যিনি উন্নীত করেছেন আকাশমণ্ডলীকে কোনো স্তম্ভ ব্যতীত। তোমরা সেগুলো দেখো। অতঃপর তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন, এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।’ [রাদ: ২] এখানেও আকাশ উন্নত করা, চন্দ্র-সূর্য সবকিছু পরিচালনা করার সঙ্গে ইস্তিওয়ার উল্লেখ রয়েছে, যার সঙ্গে বসার সম্পর্ক নেই।
এভাবে এই ধারার প্রথম যুগের আলিমগণ ইস্তিওয়ার অর্থ ও স্বরূপ তাফবিজ করতেন। ইস্তিওয়ার কোনো অর্থ নির্ধারণ করতেন না। পরবর্তী আলিমগণ তাফবিজের পাশাপাশি তাবিলের পন্থা গ্রহণ করেন এবং ইস্তিওয়াকে ‘রাজত্ব’, ‘কর্তৃত্ব’, ‘পরিচালনা’ ইত্যাদি অর্থে ব্যাখ্যা করেন। প্রশ্ন হতে পারে, এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু সঠিক? অন্য কথায়, ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রে ‘তাফবিজ’ ও ‘তাবিল’-এর পথে হাঁটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মানদণ্ডে কতটা সঠিক?
পিছনে আমরা আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে তাফবিজি দৃষ্টিভঙ্গির শুদ্ধ্যশুদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা বিভিন্ন দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছি যে, সালাফে সালেহিন থেকে সিফাতের তাফবিজ প্রমাণিত। কিন্তু সেই তাফবিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ঢালাওভাবে সবকিছু এড়িয়ে যাওয়া নয়। অর্থাৎ ইস্তিওয়া তাফবিজ করার অর্থ যদি হয় হাকিকতে লফজি (শাব্দিক অর্থ) সাব্যস্ত করে হাকিকতে উরফি (প্রচলিত অর্থ) আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া, তবে সেটা সালাফে সালেহিনের মানহাজ। কিন্তু যদি তাফবিজ অর্থ করা হয় ইস্তিওয়ার সব ধরনের হাকিকত আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে এ ব্যাপারে পুরোপুরি অন্ধ থাকা, তবে সেটা সালাফে সালেহিনের মানহাজ নয়। এ ধরনের তাফবিজ কোনো সিফাতের ক্ষেত্রেই বৈধ নয়। কারণ, এ প্রকারের তাফবিজের ক্ষেত্রে ‘ইস্তিওয়া’, ‘নুজুল’, ‘ইয়াদ’, ‘ওয়াজহ’ ইত্যাদির মাঝে কোনো তফাত থাকে না। বরং যা-ই ‘ইস্তিওয়া’, তা-ই নুজুল, যা-ই ‘ইয়াদ’, তা-ই ওয়াজহ’ হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ তায়ালা যেখানে ‘ইস্তিওয়া’ শব্দ প্রয়োজন সেখানে ‘ইস্তিওয়া’ই ব্যবহার করেছেন, যেখানে ‘নুজুল’ শব্দ প্রয়োজন সেখানে নুজুলই ব্যবহার করেছেন। তাই সবগুলোর সব রকমের হাকিকত নাকচ করার সুযোগ নেই। তা ছাড়া অসংখ্য সালাফে সালেহিন থেকে ইস্তিওয়ার ‘অর্থ’ সাব্যস্ত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। হ্যাঁ, তারা কোন ‘অর্থ’ গ্রহণ করতেন এবং সেসব ‘অর্থ’ কীভাবে বুঝব—সে ব্যাপারে পিছনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাই বলে সম্পূর্ণরূপে অর্থ (হাকিকতে লফজি) তাফবিজের সুযোগ নেই। ফলে এ ধারার আলিমগণ যদি ‘আল্লাহর ইস্তিওয়ার তাফবিজ’ বলতে শব্দের হাকিকত সাব্যস্ত করে প্রচলিত হাকিকত (নিচ থেকে উপরে ওঠা) তাফবিজের কথা বলেন, তবে সেটা বিশুদ্ধ। কিন্তু যদি লফজি ও উরফি সব ধরনের হাকিকতকে তাফবিজের কথা বলেন, তবে তাদের কথা সঠিক নয়। এটা সালাফের মানহাজ নয়। এটা কুরআন-সুন্নাহ তাজহিলের নামান্তর。
এ ধারার পরবর্তী আলিমগণ কুরআনে আল্লাহর ইস্তিওয়া-সম্পর্কিত সবগুলো আয়াতকে পরিচালনা, প্রতিপত্তি, রাজত্ব ইত্যাদি অর্থে নেন এবং এটাকেই আয়াতের মর্ম অনুযায়ী ব্যাখ্যা মনে করেন। প্রশ্ন হয়, এই তাবিল কতটুকু সঠিক?
গভীর ও নিরপেক্ষভাবে আমরা এসব নসের দিকে তাকালে দেখব—এসব তাবিল ত্রুটিমুক্ত নয়। কারণ, আরশ আল্লাহর স্বতন্ত্র একটি সৃষ্টি। একাধিক হাদিসে এসেছে—যখন কিছু ছিল না, আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। এরপর আল্লাহ আরশকে পানির উপর সৃষ্টি করেন। আরশ আল্লাহর প্রথম পর্যায়ের সৃষ্টিগুলোর মাঝে একটি শরীরী সৃষ্টি। ফলে ‘ইস্তিওয়া আলাল আরশ’কে প্রতিপত্তির মতো রূপক অর্থে নিলে আরশের বিশেষ কোনো অর্থ থাকে না। একইভাবে কুরআনের বাণী, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করছেন। আরশকে যদি রাজত্বের মাধ্যমে তাবিল করা হয়, সেই রাজত্ব আটজন ফেরেশতা বহন করার কোনো যুক্তি আছে কি? এ কারণে আমরা দেখি—ইমাম আহমদ রাহি. ইস্তিওয়ার মাসআলাতে বলছেন, ‘আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন যেমন তিনি বলেছেন, যেমন তাঁর জন্য শোভনীয়। আমরা এটা তাবিল করি না, তাফসির করি না...।’ খোদ ইমাম আবুল হাসান আশআরি রাহি.-ও এর বিপক্ষে। তিনি ইস্তিওয়াকে প্রতিপত্তি (আল-ইসতিলা), প্রভাব (আল-কাহর), রাজত্ব ইত্যাদির মাধ্যমে তাবিল করাকে মুতাজিলা, জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়্যাহদের মত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কাজি ইসমাইল শাইবানি হানাফিও তাবিলের সমালোচনা করে লিখেছেন, মুতাজিলারা আরশকে রাজত্ব আর কুরসিকে ইলম দ্বারা তাবিল করে। আবদুল কাদের জিলানি রাহি. লিখেন, ইস্তিওয়াকে তাবিল করা উচিত নয়। ... ইস্তিওয়ার অর্থ সম্মান ও মর্যাদাগত উচ্চতা নয় ...। কিংবা এর অর্থ পরিচালনা ও প্রতিপত্তিও নয়...। কারণ, শরিয়তে এসব বলা হয়নি। সাহাবি, তাবেয়িন কিংবা সালাফের কেউ এগুলো বলেননি। বরং তারা স্বাভাবিক অবস্থার উপর রেখে দিয়েছেন। ইমাম বাইহাকি বলেন, আমাদের পূর্ববর্তী আলিমগণ এগুলোর তাফসির করতেন না, এগুলো নিয়ে কথাও বলতেন না। এর পরও এটাকে তাবিল করার সুযোগ থাকে কীভাবে?
তাই এই ধারার, বিশেষত পরবর্তী আলিমদের, জটিলতা হচ্ছে অতিরিক্ত তাবিল করা। তারা যেখানে স্বীকার করছেন সালাফের মাজহাব তাফবিজ, সেখানে তারা সেটার অনুসরণ না করে তাবিল করছেন। তারা এক্ষেত্রে যুক্তি দেন যে, সময় ও মানুষের প্রয়োজনে তাবিল করা হয়েছে; অথচ এমন প্রয়োজন আগেও ছিল, কিন্তু সালাফ তাবিল করেননি। কারণ, তাবিল করলে কুরআন-সুন্নাহে নিজের মনগড়া কথা ঢুকে পড়ার ব্যাপক আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া আমরা আগেও উল্লেখ করেছি, সালাফ প্রয়োজনে তাবিল করেছেন। বরং তারা অসংখ্য জায়গায় তাবিল করেছেন। কুরআন-সুন্নাহর অনেক জায়গা তাবিল করা অপরিহার্য। কারণ, সেগুলোর বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেগুলো নসের প্রয়োজনে এবং শর্তসাপেক্ষে। সালাফ তাবিলকে মানহাজ বানিয়ে নেননি。
ইমাম তিরমিজি লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায়, হাত, পা, শ্রবণ ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেছেন। জাহমিয়্যাহরা এগুলোর অপব্যাখ্যা করে। সালাফ বলেছেন, আল্লাহ আদমকে তার হাতে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু জাহমিয়্যাহরা বলে, তিনি আদমকে শক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন।’ এখানে ইমাম তিরমিজির বক্তব্যে তাবিলের নিন্দা সুস্পষ্ট; বরং যারা তাবিল করেন, তারাও স্বীকার করেন যে, তাবিল করা অনুত্তম。
ইমাম রাজি লিখেন, ‘সুতরাং ইস্তিওয়া বলতে আরশের উপর আল্লাহর বসা, স্থিতি, কিংবা জায়গা ও দিক দখল ইত্যাদি বোঝাবে না; বরং আহলুল ইলমদের কাছে এখানে দুই পন্থার যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে: এক. আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের স্থান ও দিকের উর্ধ্বে বিশ্বাস করব। এ সম্পর্কিত আয়াতগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাঝে প্রবেশ করব না; বরং এগুলোর প্রকৃত ইলম আল্লাহর কাছে সঁপে দেবো (তাফবিজ)। এটা আমার পছন্দের মত। আমি এটা বলি ও এর উপর আস্থা রাখি। দুই. এগুলোর যথোপযুক্ত তাবিল করব। যেমন ইস্তিওয়া বলতে পরিচালনা, কর্তৃত্ব, রাজত্ব ইত্যাদি।’ ইমাম রাজি অন্যত্র ইস্তিওয়ার ব্যাখ্যায় লিখেন, ‘এ ব্যাপারে আলিমদের দুটো মত। এক. এর মর্ম আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। দুই. যথোপযুক্ত তাবিল তথা ব্যাখ্যা করা। তবে প্রথম পন্থাটি নিরাপদ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। সুতরাং অনিরাপদ বাদ দিয়ে নিরাপদ পথে হাঁটা যে উত্তম, সেটা সবার জানার কথা। ‘তাসিসে’ও ইমাম রাজি রাহি. লিখেন, ‘এগুলোর অর্থ আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই সালাফের মানহাজ। তাদের কাছে এগুলোর তাফসির করা বৈধ নয়। কিন্তু মুতাকাল্লিমিন এগুলোর তাবিল করে থাকেন।’ (ইয়াজিবু তাফউইজু মা’নাহা ইলাল্লাহ, ওয়ালা ইয়াজুজুল খাউজু ফি তাফসিরিহা, ওয়া কালা জুমহুরুল মুতাকাল্লিমিন: বাল ইয়াজিবুল খাউজু ফি তাবিলি তিলকাল মুতাশাবিহাত)
ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি লিখেন, ‘কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত সিফাতের আয়াতগুলো সালাফ তাবিল করেননি, বরং বাহ্যিক অবস্থার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। এগুলোর অর্থ আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়েছেন। এটাই আমাদের পছন্দের মতামত এবং এটাই আমাদের আকিদা ও দ্বীন। কারণ সালাফের অনুসরণ আর নব আবিষ্কার (বিদআত) পরিত্যাগ করা উত্তম। শরিয়তের দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে, উম্মতের ইজমা একটি অনুসরণীয় দলিল এবং এটা শরিয়তের একটি বড় প্রমাণ। আর আল্লাহর রাসুলের সাহাবাগণ এগুলোর অর্থ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেননি, এসবের রহস্য উদ্ঘাটনের পিছনে নিজেদের ব্যস্ত করেননি, অথচ তাঁরা ছিলেন ইসলামের সর্বোত্তম প্রজন্ম, শরিয়তের নিশান-বরদার। দ্বীনের সুরক্ষার ক্ষেত্রে, উম্মাহর ভিত্তি মজবুত করতে তারা কোনো ত্রুটি করতেন না। মানুষকে প্রয়োজনীয় জিনিস শিক্ষা দিতে তারা সামান্য অবহেলা করতেন না। যদি এসব আয়াত ও হাদিসকে তাবিল করা সঠিক ও আবশ্যক হতো, তা হলে শরিয়তের শাখাগত বিষয় (হালাল-হারাম ইত্যাদি) এর পরিবর্তে এগুলোর প্রতি তাদের গুরুত্ব আরও বেশি হতো। কিন্তু এভাবেই তাবিল ছাড়া তাদের যুগ এবং তাবেয়িদের যুগ শেষ হয়ে যায়। আর সালাফের মানহাজ যেহেতু অনুসরণীয়, তাই প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য হবে আল্লাহকে সব ধরনের সৃষ্টির গুণ থেকে পবিত্র জানা এবং নিজেকে অস্পষ্ট বিষয়ের তাবিলে ব্যস্ত না করে এর অর্থ আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া।’
জাওহারার ব্যাখ্যায় বাইজুরি লিখেন, ‘ইস্তিওয়ার ব্যাপারে সালাফের মানহাজ ছিল এটা বলা যে, ইস্তিওয়া হাকিকত কিন্তু আমরা সেটার স্বরূপ জানি না। আর খালাফের কাছে এর অর্থ প্রভাব ও প্রতিপত্তি।’ কাশ্মীরিও ইস্তিওয়াকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করাকে সঠিক মনে করেন না। আবার আক্ষরিক (শারীরিক) অর্থেও নয়।’ (ফলাইসাল ইসতিওয়াউ ইনদি মাহমুলান আলাল ইসতিআরাতি, ওয়ালা আলাল হিস্সিয়্যি আল্লাজি নাতায়াককালুহু) এ ব্যাপারে হজরত থানভি রাহি.-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আয়াত ও হাদিস হাকিকিভাবে বিশ্বাস করতে হবে, কিন্তু এর স্বরূপ আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে।’
তবে এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের বিজ্ঞ আলেমদের একটি বড় দল ইস্তিওয়াকে রূপক অর্থে না নিয়ে হাকিকত বা শব্দের মূল অর্থ সাব্যস্ত করার কথা বলেন। তাদের মতে, আল্লাহ্ তায়ালা যখন বলেছেন তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন, তখন সেটার অর্থ রাজত্ব বা প্রতিপত্তি নয়, বরং আরশের উপরে হওয়া। এ ব্যাপারে তারা সালাফ থেকে বর্ণিত শত শত আসার ও বর্ণনা দলিল হিসেবে পেশ করেন। তাদের মতে সালাফের ঐকমত্য হলো ‘ইস্তিওয়া’ অর্থ আরশের উপরে হওয়া। এবং এটাকেই তারা আহলে সুন্নাতের প্রকৃত মানহাজ মনে করেন। তারা ইস্তিওয়াকে তাবিল করাকে ‘তাতিল’ বা আল্লাহর সিফাত অস্বীকারের শামিল মনে করেন। এ ব্যাপারে তারা অনেক যুক্তিবৃত্তিক দলিলও দেন। তাদের মতে ‘ইস্তিওয়া’ যদি রাজত্ব বা পরিচালনা অর্থে হতো, তবে কেবল আরশের সাথে সেটাকে নির্দিষ্ট করার কোনো অর্থ থাকতো না। কারণ আল্লাহ্ তায়ালা জগতের সবকিছুরই পরিচালক ও মালিক। সুতরাং আরশের উপর হওয়ার অর্থ হলো আল্লাহ্ তায়ালা সবকিছুর উর্ধ্বে এবং তিনি আরশের উপরে আছেন যেমনটা তিনি বলেছেন। হ্যাঁ এর স্বরূপ বা কাইফিয়্যাহ কী সেটা আমাদের অজানা। এবং এটাই ইসবাত ও তাফবিজের সমন্বয়। অর্থাৎ অর্থ সাব্যস্ত করে স্বরূপ তাফবিজ করা।
সারকথা হলো, ইস্তিওয়া আল্লাহর একটি সিফাত যা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। এ ব্যাপারে সালাফের ইমামগণ এবং আহলে সুন্নাতের সকল ধারার মানুষ একমত। মতভেদ হয়েছে সেটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও স্বরূপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে। কেউ সেটাকে আরশের উপর হওয়া সাব্যস্ত করেছেন, কেউ সেটাকে রাজত্ব বা পরিচালনা হিসেবে তাবিল করেছেন। কিন্তু সকল ধারার মূল সুর ছিল আল্লাহকে সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র রাখা। তাই এসব মতভেদ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে সালাফের মতো ইজমালিভাবে ঈমান আনা এবং বিস্তারিত জ্ঞান আল্লাহর হাতে সমর্পণ করাই নিরাপদ পথ।
টিকাঃ
১. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (২৫/১৩৮)।
২. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (১৪/২৬৮)।
১. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (১৪/২৬৮)।
২. তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ, মাতুরিদি (১/৪১১)।
১. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (১৪/২৬৯)।
২. তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ, মাতুরিদি (১/৪১১)।
৩. তিরমিজি (৩১০৯)।
১. নিহায়াতুল মুবতাদিয়িন, ইবনে হামদান (৩১)।
২. আল-ইবানাহ, আশআরি (১০৮)।
৩. শাইবানি (২৭)।
৪. আল-গুনইয়াহ, জিলানি (১/১২৪)।
৫. আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩০৩)।
১. তিরমিজি (৬৬২)।
২. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (১৪/২৬৯-২৭১)।
৩. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (২৫/১৩৭)।
৪. তাসিসুত তাকদিস, রাজি (২২৯)।
১. আল-আকিদাহ আন নিজামিয়্যাহ, জুয়াইনি (১৬৬)।
২. শরহুল জাওহারাহ, বাইজুরি (১৮৮)।
৩. ফয়জুল বারি (৬/৫৬৩)।
৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৬/২৮)。
📄 ইমাম তহাবির বক্তব্যের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন আসতে পারে, ইমাম তহাবি কোন পক্ষে? বরাবরের মতো এখানেও তাকে নিয়ে টানাটানি। প্রথম ধারা মনে করে ইমাম তহাবি তাদের আকিদা সমর্থন করেছেন। দ্বিতীয় ধারা মনে করে ইমাম তহাবি তাদের আকিদা সমর্থন করেছেন। তাদের উভয়ের দলিল ইমাম তহাবির বক্তব্য: ‘আল্লাহ তায়ালা আরশ এবং আরশের নিচে বিদ্যমান সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি প্রত্যেক বস্তু এবং তার (তথা আরশের) উপর যা-কিছু রয়েছে সবগুলোকে পরিবেষ্টনকারী’ (মুহিতুম বিকুল্লি শাইয়িন ফামা ফাউকাহু)। প্রথম দল এটার অর্থ করেছে ‘আল্লাহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে’। ফলে ইমাম তহাবির বক্তব্য তাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে। দ্বিতীয় দল এটার অর্থ করেছে, রূপকভাবে উর্ধ্বে। ফলে ইমাম তহাবির বক্তব্য তাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে। অথচ বাস্তব কথা হলো, ইমাম তহাবি এই দুই পক্ষের জটিলতার মাঝে ঢুকতেই চাননি। ফলে কুরআন-সুন্নাহর মতো তিনিও ব্যাপারটি এমনভাবে রেখে দিয়েছেন, যাতে তার কথা দুই দিকেই নেওয়া যায়। এটা সম্ভবত এই কারণে যে, তিনি এসব নিয়ে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি পছন্দ করতেন না। কারণ, এগুলো আকিদার মৌলিক বিষয় নয়।
ফলে আমরা যদি ইমাম তহাবির বক্তব্যের একটু গভীরে যাই, এখানে আল্লাহর সত্তাগত/রূপক অর্থে কোনোভাবেই উর্ধ্বে হওয়ার কোনো বক্তব্য নেই যেমনটা উভয় ধারা মনে করে থাকে; বরং এখানে স্রেফ ‘পরিবেষ্টন’ সম্পর্কিত বক্তব্য। বাক্যের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, তিনি সবকিছু পরিবেষ্টনকারী। কুরআনে পরিবেষ্টন (আল-ইহাতা) সংক্রান্ত যত আয়াত এসেছে, সবগুলো আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা দ্বারা পরিবেষ্টন বোঝানো হয়েছে; সত্তাগতভাবে নয়। ফলে এখানেও জ্ঞানগত পরিবেষ্টনই বোঝানো হয়েছে। কারণ, সত্তাগতভাবে আল্লাহ সবকিছু বেষ্টন করে আছেন এমন আকিদা সর্বেশ্বরবাদী বিশ্বাস, যা প্রথম দলেরও বক্তব্য। আর বাক্যের দ্বিতীয় অংশ (ফামা ফাউকাহু) এর ‘আতফ’ পরিবেষ্টনের উপর; আল্লাহর উপর নয়। কিছু কিছু পাণ্ডুলিপিতে এটা (ওয়ামা) ও (বিমা ফাউকাহু) রয়েছে এবং সবগুলোর অর্থই এক। ফলে পিছনের বাক্য-সহ এর অর্থ দাঁড়াবে: আল্লাহ আরশ ও আরশের নিচে বিদ্যমান সকল সৃষ্টি থেকে যেমন অমুখাপেক্ষী, তেমনই তিনি আরশ, আরশের নিচে বিদ্যমান সকল সৃষ্টি এবং আরশের উপর বিদ্যমান সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী। ফলে এখানে প্রসঙ্গ হলো ‘পরিবেষ্টন’; ‘অবস্থান’ নয়। বিশেষত (মা ফাউকাহু) ও (ফামা ফাউকাহু) পড়লে তো সত্তাগত অবস্থানের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগই নেই। স্রেফ (ওয়াফাউকাহু) পড়লে আল্লাহর অবস্থানগত বক্তব্যের সুযোগ থাকে। কিন্তু সেটাও সত্তাগত হয় না। কারণ, স্বয়ং প্রথম দলও বাক্যের প্রথম অংশ (পরিবেষ্টন)-কে সত্তাগত নয়, বরং রূপক ধরেন। ফলে প্রথম অংশ রূপক ধরে পরের অংশ শাব্দিক ধরার কোনো সুযোগ নেই। ইবনে আবিল ইজ আরেকটি রূপ বর্ণনা করেছেন (আল-মুহিতু বিকুল্লি শাইয়িন ফাউকাহু)। এখানে সত্তাগতভাবে অর্থ তোলার কোনো সুযোগই নেই। কারণ, তখন এর অর্থ আরশের উপরে যা-কিছু বিদ্যমান সেগুলোকেও পরিবেষ্টন করা, সত্তাগত উর্ধ্বে নয়। ফলে দুটো পরিবেষ্টনের একই (রূপক) অর্থ দাঁড়াবে।
উপরের আলোচনায় স্পষ্ট যে, ইমাম তহাবিকে এখানে আকিদার প্রচলিত কোনো ধারার মাঝে ঢোকানো যাবে না। কারণ, ইমাম তহাবি খালাফের আকিদার প্রবর্তক নন। বরং এখানে ইমাম তহাবির মানহাজ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় হলো, তিনি চাইলে তার বইয়ে এগুলো নিয়ে লম্বা কথা বলতে পারতেন, কিন্তু করেননি। যেখানে তাকদির নিয়ে, রাসুলুল্লাহ নিয়ে, জিহাদ ও ওয়ালা-বারা নিয়ে তিনি তুলনামূলক লম্বা কথা বলেছেন, সেখানে পুরা বইয়ে তিনি ইস্তিওয়া/নুজুল শব্দগুলো উল্লেখই করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায়, এটা জানা মুসলিম উম্মাহর জন্য যতটা উপকার, তারচেয়ে বরং ক্ষতির পরিমাণ বেশি। কারণ, যেখানে এই আকিদা আল্লাহর প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসার পাথেয় হওয়ার কথা ছিল, সেটাকে আজ বানানো হয়েছে বিভক্তি ও কাটাকাটির হাতিয়ার।
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (২৫৯); সালেহ ফাওজান (১০০); আল-ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা, আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (২৬২)।
১. গজনবি (১০৬); সাইদ ফুদাহ (৮৮৮); আল-আকিদা আত ত্বহাবিয়্যাহ, মুফতি শরিফুল ইসলাম (৩১)。
📄 সিফাতের আলোচনা সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ
ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ এতটাই বিভক্ত যে আল্লাহ তায়ালা না চাইলে কখনোই তাদের এ ব্যাপারে একমত করা সম্ভব নয়। স্রেফ মতানৈক্য থাকলেও সমস্যা ছিল না। কারণ এমন মতানৈক্য তো চার মাজহাবের ভিতরেও রয়েছে। কিন্তু এখানে পরস্পরকে গালি-গালাজ, হিংসা-বিদ্বেষ, সমালোচনা, হানাহানি-মারামারি, সম্পর্ক ছিন্ন-সহ সব ধরনের ফ্যাসাদের উৎস এই মাসআলা। যেহেতু এটার সমাধান করা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ শতাব্দের পর শতাব্দ মুসলিম উম্মাহ এটা নিয়ে ঝগড়া করেও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি, এ জন্য আমাদের উচিত হবে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সুর খুঁজে বের করা。
প্রথম কথা হলো, অন্যান্য সিফাতের মতো এখানেও কিছু সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। তারা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির শিকার হয়েছে। একদল আল্লাহকে আরশের উপর সেভাবে বসিয়ে দিয়েছে, যেভাবে রাজা-বাদশাহ তাদের সিংহাসনে বসে। এরা হলো দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদী। আরেক দল আল্লাহ তায়ালার এ সকল সিফাতকে এমনভাবে অপব্যাখ্যা করেছে যে, এর কোনো অস্তিত্বই থাকেনি। এরা হলো জাহমিয়্যাহ, মুতাজিলা ইত্যাদি। ফলে এই দুই সম্প্রদায় আমাদের আলোচনার বাইরে。
আগেও আমরা বলেছি, আল্লাহর অন্যান্য সিফাতের মতো এখানেও আমরা সালাফের মানহাজের সঙ্গে থাকব। আর তা হলো, কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। তাই কুরআন ও সুন্নাহে যা বলা হয়েছে ততটুকুই বলব; নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো কথা যোগ করব না। আল্লাহ বলেছেন, তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন, আমরা বলব না: ‘না, তিনি ইস্তিওয়া করেননি।’ আবার এগুলোর স্বরূপ নির্ধারণ কিংবা এমন অর্থ করব না যা মানুষের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। ফলে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দগুলো যেমন ওঠা, আরোহণ করা, বসা, সমাসীন হওয়া, স্থিত হওয়া, অবস্থান গ্রহণ করা ইত্যাদি আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহার করব না। কারণ, আল্লাহ নিজের জন্য এগুলো ব্যবহার করেননি। আবার এটার তাবিলও করব না। কারণ, তাবিলের মাধ্যমে যে অর্থটা আমরা নির্ধারণ করছি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা সালাফ তা করেননি। একইভাবে যেসব হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, ‘আল্লাহ আরশের উপরে’, আমরা সেগুলো অস্বীকার করব না। কিন্তু সৃষ্টিজীবের জন্য প্রযোজ্য ক্ষুদ্র দিক বা স্থানের মাঝেও আল্লাহকে আমরা সীমাবদ্ধ করব না। বিশেষ কোনো দিকে বা স্থানে তাকে কল্পনা করব না। আমরা বলব, ‘আল্লাহ আরশের উপরে ইস্তিওয়া করেছেন যেমন তিনি ও তাঁর রাসুল বলেছেন, যেভাবে তাঁর জন্য শোভনীয়। এর স্বরূপ ও ব্যাখ্যা তিনিই ভালো জানেন। তিনি সকল স্থান ও কালের উর্ধ্বে। সৃষ্টি তাকে ধারণ করতে পারে না, উপলব্ধি করতে পারে না। এর বাইরে ‘সত্তা-সহ’, ‘স্বয়ং নিজে’, ‘হাকিকিভাবে’, ‘আরশ থেকে ফাঁকা হয়ে বা মিলে’, ‘আরশ বরাবর’, ‘আমাদের মাথার উপরের দিকে’, ‘আরশের সীমা শেষ হওয়ার পরে’ ইত্যাদি শর্ত যোগ করব না। কারণ, কুরআন-সুন্নাহ কিংবা সালাফ এটা করেননি। এগুলো দেহবাদের দিকে নিয়ে যায়। আবার রাজত্ব, কর্তৃত্ব, পরিচালনা ইত্যাদিও বলব না। কারণ, আল্লাহ নিজের জন্য এসব শব্দ ব্যবহার করেননি, সালাফ করেননি। তাই আকিদার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর বাইরে অনুমানমূলক কিছু বলব না। কিছু মনে মনেও ভাবব না। সংক্ষেপে ইজমালিভাবে ঈমান আনব। প্রকৃত রূপরেখা আল্লাহর হাতে সঁপে দেবো। এগুলো নিয়ে আলোচনা করা ইসলামের জরুরি বিষয় মনে করব না; বরং যথাসম্ভব এগুলো নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকব। আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত কেউ যদি আমার এই বিশ্বাস না রাখে, তাকে দাওয়াত দেবো, যথাসম্ভব মাজুর মনে করব।’
এই আকিদা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি হলে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাহে স্পষ্টভাবে বলে যেতেন যে, আল্লাহ আরশের উপর বসেছেন; উপর বলতে যা বোঝায়, বসা বলতে যা বোঝায়, তা-ই, তবে সৃষ্টির বসার মতো নয়। এটুকু বললে মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোনো বিবাদ হতো না। সালাফও এই কথাটা বলতে পারতেন। কিন্তু আমরা দেখি, তাদের কেউ এই কথা বলছেন না। তারা শুধু বলছেন, ‘যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দাও।’ অথবা তাদের কেউ বলছেন, ‘আরশের উপর আল্লাহর ইস্তিওয়া সত্য’ কিন্তু তিনি ইস্তিওয়া দিয়ে কী বোঝাচ্ছেন এবং উপর বলতে কোন উপর বোঝাচ্ছেন, সেগুলো স্পষ্ট করেননি। ফলে জটিলতা রয়েই গেছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সালাফ মনে করতেন, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে যা এসেছে, সেটার উপর ইজমালি ঈমান এনে বাকিটা আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু পরবর্তী আলিমগণ এখানে স্থির থাকেনি। তাদের একদল ইস্তিওয়ার অর্থ নির্ধারণে এতটাই অতিরঞ্জন করেছে যে, আল্লাহকে রাজা-বাদশাহর মতো আরশের উপরে একটা চেয়ার দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। আরেক দল ইস্তিওয়ার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এতটাই অতিরঞ্জন করেছে, যা আয়াতের রুহ নাকচের পর্যায়ে চলে গিয়েছে。
তা ছাড়া প্রশ্ন হলো, যে বিষয়টি নিয়ে উম্মাহ যুগের পর যুগ বিভক্ত হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, পরস্পর ভয়ংকর দুশমনে পরিণত হচ্ছে, যেটাকে কেন্দ্র করে মুসলমানরা একে অপরের নোংরা সমালোচনা করছে, গালি দিচ্ছে, কথা বন্ধ করছে, সম্পর্ক ছিন্ন করছে, ইসলামে সেটার গুরুত্ব কতখানি? ইস্তিওয়া, নুজুল এবং এ-জাতীয় সিফাতের অর্থ ও উদ্দেশ্য জানা কি দ্বীনের মৌলিক কোনো বিষয়?
ইবনে খুজাইমাকে (৩১১ হি.) আসমা ও সিফাতের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা একটা বিদআত, যা তারা আবিষ্কার করেছে। নতুবা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, মুসলমানদের ইমাম, ফিকহি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ, যেমন: মালেক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরি, আওজায়ি, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক হানজালি (ইবনে রাহাওয়াইহ), ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া—তারা কেউ এ ব্যাপারে কথা বলতেন না। এগুলোর মাঝে প্রবেশ করতে নিষেধ করতেন। তাদের কিতাবে দৃষ্টি বোলাতে বারণ করতেন। আল্লাহ আমাদের সব ধরনের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন।’
খতিবে বাগদাদি (৪৬৩ হি.) লিখেছেন, ‘মুহাদ্দিসের জন্য উচিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে এমন হাদিস বর্ণনা না করা, যা তাদের আকল গ্রহণ করতে অক্ষম। যেমন: সিফাতের হাদিসগুলো। এগুলো বাহ্যিকভাবে আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য, দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইত্যাদির দিকে ইঙ্গিত করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা তা থেকে পবিত্র। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো বর্ণনা করা হলে তারা আল্লাহকে সৃষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলবে। তাই এগুলো কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছেই বর্ণনা করা উচিত।’
ইবনে কুদামা (৬২০ হি.) বলেন لا حاجة لنا إلى علم معنى مَا أَرَادَ اللهُ تَعَالَى من صفاته ... অর্থাৎ আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার সিফাতের উদ্দিষ্ট অর্থ জানা দরকার নেই। কেননা এগুলোর সঙ্গে কোনো আমল জড়িত নয়। কেবল ঈমান আনা ছাড়া এগুলোর ক্ষেত্রে আর কোনো কাজ নেই। আর ঈমান আনার জন্য এগুলোর অর্থ জানা জরুরি নয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ফেরেশতা, কিতাব এবং রাসুল এবং তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপরও ঈমান আনতে বলেছেন, অথচ ওসবের আমরা নাম ছাড়া কিছুই জানি না।’
ইবনে কুদামা এসব ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলেন, ‘সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এসব শব্দ, আয়াত ও হাদিসের উপর আল্লাহ যা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, সেই ভিত্তিতে ঈমান আনা। যেসব অর্থ আমাদের জানা নেই, সেসব ব্যাপারে নীরব থাকা; আল্লাহ তায়ালা যেগুলো আমাদের জানাননি কিংবা জানার জন্য নির্দেশ দেননি, সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করা। এ পথে যারা চলবে, তাদের কোনো ভয় নেই, তাদের উপর কোনো ভর্ৎসনা নেই। যারা তাদের ভর্ৎসনা করবে, তারা ভুলের উপর আছে।
ইমাম রাজি (৬০৬ হি.) লিখেন, ইস্তিওয়ার জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই উত্তম। কারণ, যে জিনিসের জ্ঞান ওয়াজিব নয়, সে সম্পর্কে যদি কেউ বলে ‘আমি জানি না’, তাহলে সে নিন্দার পাত্র হবে না। ইসলামের অন্যতম মূলনীতি হলো তিনটি— তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস রাখা, পরকালে বিশ্বাস রাখা ও রাসুলদের স্বীকৃতি দেওয়া। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, পরকালে বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব, কিন্তু বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানা ওয়াজিব নয়। যেমন এটা কবে হবে সে জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কারও নেই। তাওহিদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর একত্ববাদ এবং তাঁর সুন্দর সুন্দর গুণের প্রতি সংক্ষিপ্তভাবে বিশ্বাস রাখা এবং সকল বিচ্যুতি ও ত্রুটি থেকে তাকে মুক্ত ঘোষণা করাই যথেষ্ট। তাঁর সকল গুণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি নয়। ইস্তিওয়াও আল্লাহর তেমন একটি সিফাত, যা সম্পর্কে জানা ওয়াজিব নয়। সুতরাং কেউ যদি এটা না জানে, তবে কোনো ক্ষতি নেই। বিপরীতে কেউ যদি নিজেকে এটার ভিতরে ঢুকিয়ে ভুল কিছু বলে কিংবা উলটো বিশ্বাস রাখে, তবে সেটা ক্ষতিকর।
হাকিমুল উম্মত থানভি লিখেন, এগুলো এমন তালা, যেসবের চাবি মানুষকে দেওয়া হয়নি। ফলে এগুলোর আলোচনা থেকে বিরত থাকা উচিত।
এর পরেও কেউ কেউ ঘাড় বাঁকিয়ে নিজের পথে থাকবে। ইস্তিওয়ার মাসআলাকে কালিমার মতো দ্বীনের মূল বিষয় মনে করবে। মানুষের জন্য এগুলো জানা এবং সাধারণ মানুষকে এগুলোর প্রতি দাওয়াত দেওয়া আবশ্যক ভাববে। এক্ষেত্রে তারা আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এক দাসীকে আল্লাহ কোথায়-সম্পর্কিত হাদিস দিয়ে দলিলও দেবে। অথচ কখনও ভাববে না, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা জীবনে একবারই একটা দাসীকে এমন প্রশ্ন করেছেন। তাও নিয়মিত দাওয়াতের অংশ হিসেবে নয়; বরং স্রেফ দাসী মুমিন কি না সেটা পরীক্ষার জন্য। রাসুলের তো মিশন ছিল ‘যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর আমি আল্লাহর রাসুল।’ বরং খোদ দাসীর হাদিসটিও বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ‘আল্লাহ কোথায়’ এমন প্রশ্ন না করে ‘তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আল্লাহ এক?’, কিংবা ‘তোমার রব কে?’ এমন শব্দে প্রশ্ন করেছেন। ফলে এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে ‘ইস্তিওয়া’-সংক্রান্ত নিগূঢ় আলোচনাকে দ্বীনের মূল বিষয় বানিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (ফাতহুল বারি (১৩/৪০৭)।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/১৮২-১৮৩)।
১. হিলয়াতুল আউলিয়া...
১. তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ আল-কুবরা (৯/৪০-৪১)।
২. আল-মুওয়াফাকাত, শাতেবি (৩/৩২৯)।
৩. ফাতহুল বারি (৩/৩০)।
৪. ফাতহুল বারি (৩/৩০)।
১. ফাতহুল বারি (১৩/৩৮৩)।
২. ফাতাওয়ায়ে ইবনিস সালাহ (১/৮৩)।
৩. তুহফাতুল আহওজায়ি, মুবারকপুরি (২/৪৩১)।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা (১১/২৩০)।
৫. তাবাকাতুশ শাফিইয়্যিাহ আল-কুবরা (৮/২১৯)।
১. মুসলিম (৫৩৭)।
২. বুখারি (২৫, ৩৯২)।
৩. মুসনাদে আহমদ (১৫৯৮৪)।
১. তাহরিমুন নাজার ফি ইলমিল কালাম, ইবনে কুদামা (৫২)।
২. প্রাগুক্ত (৫৪)。