📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 আরশকে কেন্দ্র করে উম্মাহর সংঘাত

📄 আরশকে কেন্দ্র করে উম্মাহর সংঘাত


প্রশ্ন হচ্ছে, ইমাম তহাবি কেন আল্লাহকে আরশ থেকে অমুখাপেক্ষী বললেন? কেউ কি আল্লাহকে আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী বলে, কিংবা বলতে পারে? কারণ, আল্লাহ স্রষ্টা আর আরশ সৃষ্টি। স্রষ্টা কীভাবে সৃষ্টির প্রতি মুখাপেক্ষী হতে পারেন! আসলে এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইমাম তহাবি সেই বিশাল জটিলতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আজও যে ক্ষত মুসলিম উম্মাহকে কুরে-কুরে খাচ্ছে। সেটা হলো, আল্লাহর আরশ ও আরশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে জটিলতা। এটা সেই বিষয় উম্মাহর যুগে যুগে যা নিয়ে বিবাদ-বিসংবাদ ও মারামারি-হানাহানি করেছে এবং দুঃখজনকভাবে আজও করছে, যাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য সম্প্রদায় সত্যিকার অর্থেই গোমরাহির শিকার হয়েছে। আবার অনেক সম্প্রদায় নিজেকে হক দাবি করে অন্যদের গোমরাহ আখ্যায়িত করেছে। এটা এমন এক মাসআলা, যা নিয়ে আলোচনা অধিকাংশ সময়ই নিষ্ফল। কারণ, প্রত্যেক সম্প্রদায়ই এখানে নিজেকে হক ও অন্যকে বাতিল মনে করে। এ কারণেই লক্ষ করলে দেখবেন, ইমাম তহাবি তাকদির এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর লম্বা লম্বা আলোচনা করলেও এখানে মাত্র একটি লাইন ব্যয় করেছেন এবং তাতেই একেবারে সংক্ষেপে মূল বিষয়টা তুলে ধরেছেন।

এমন একটি মাসআলা, যাকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর পর শতাব্দী উম্মাহ মতভেদ করে আসছে, একদল আরেক দলকে কাফের ও গোমরাহ বলে আসছে, এমন একটি মাসআলা মাত্র দেড় লাইনে কেন বলা হলো? কারণ, সম্ভবত ইমাম তহাবি সে যুগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ বিষয়টিতে মুসলমানরা একমত হতে পারবে না। ফলে আহলে সুন্নাতের মূল ধারা যেটুকুতে একমত, ততটুকু বলে এবং ভ্রান্ত মুজাসসিমাহ সম্প্রদায়ের খণ্ডন করে তিনি নীরব হয়ে গেছেন।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মতপার্থক্যের স্থান নির্ধারণ

📄 মতপার্থক্যের স্থান নির্ধারণ


আরশ আল্লাহর একটি সৃষ্টি, আল্লাহ আরশের মুখাপেক্ষী নন—এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের সকল ধারা একমত। আল্লাহ আরশের উপর ‘ইস্তিওয়া’ করেছেন—এ ব্যাপারেও সকল মুসলমান একমত। কারণ, কুরআনের একাধিক আয়াতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন: আল্লাহ বলেন,
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِ الَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُوْمَ مُسَخَّرَتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْأَمْرُ تَبْرَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعُلَمِينَ.
অর্থ: ‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমন অবস্থায় যে, দিন দ্রুত রাতের পিছনে আসে। তিনি স্বীয় আদেশের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র। মনে রেখো, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ বরকতময়, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’ [আরাফ: ৫৪]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّামٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَّا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذُلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُوْনَ.
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পারে না তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া। তিনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো। তোমরা কি চিন্তা করো না?’ [ইউনুস: ৩]

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّমواتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْনَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّরَ الشَّমْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَজَلٍ مُّسَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرُ يُفَصِّلُ الْآيَتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوْقِنُوْনَ.
অর্থ: ‘আল্লাহ যিনি উন্নীত করেছেন আকাশমণ্ডলকে কোনো স্তম্ভ ব্যতীত। তোমরা সেগুলো দেখো। অতঃপর তিনি আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন, এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।’ [রাদ: ২]

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى.
অর্থ: ‘রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।’ [ত্বহা: ৫]

আল্লাহ আরও বলেন,
الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِতَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ.
অর্থ: ‘যিনি ছয় দিনে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মাঝে যা-কিছু আছে, সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।’ [ফুরকান: ৫৯]

আল্লাহ আরও বলেন,
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِতَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ۚ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِي وَلَا شَفِيعٍ ۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ.
অর্থ: ‘আল্লাহ যিনি ছয় দিনে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মাঝে যা-কিছু আছে, সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।’ [সাজদা: ৪]

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِতَّةِ أَيَّামٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ۚ
অর্থ: ‘তিনিই ছয় দিনে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।’

এভাবে কুরআনের একাধিক আয়াতে আরশের উপর আল্লাহর ‘ইস্তিওয়া’র কথা বর্ণিত হয়েছে। ফলে আরশের উপর আল্লাহর ইস্তিওয়াকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তাই সকল মুসলমান আল্লাহর আরশকে এবং আরশের উপর ইস্তিওয়াকে বিশ্বাস করে। তাহলে জটিলতা কোথায়? জটিলতা হলো আরবি শব্দ ‘ইস্তিওয়া’র অর্থ নির্ধারণে। এটাকে কেন্দ্র করেই যত মত ও পথ তৈরি হয়েছে।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 প্রথম দলের মত

📄 প্রথম দলের মত


একদল আলিম ইস্তিওয়ার অর্থ করেন— আরোহণ করা (الصعود), উপরে ওঠা (العلى), উন্নীত হওয়া (الارتفاع), স্থির হওয়া (الاستقرار)। এ হিসেবে বাংলায় অর্থ করলে তাদের কাছে উল্লিখিত সবগুলো আয়াতে ইস্তিওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহ আরশের উপর উঠেছেন, আরশে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাদের বিশ্বাস, আমাদের মাথার উপর যে আকাশ দেখা যাচ্ছে, এ-রকম একটির উপর আরেকটি করে সাতটি আকাশ রয়েছে। সবগুলোই আমাদের মাথা বরাবর উপরের দিকে। সাত আকাশের ‘উপর’ রয়েছে সাগর। সাগরের উপর রয়েছে কুরসি। কুরসি বরাবর উপরে রয়েছে আল্লাহর আরশ। সেই আরশের উপর আল্লাহ তায়ালা থাকেন। এভাবে কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াতে যেখানেই আল্লাহর ইস্তিওয়ার কথা এসেছে, তারা সেটার অর্থ করেছেন ‘আল্লাহ আরশের উপর উঠেছেন’। তবে আরশের উপর তিনি কীভাবে আছেন, এর স্বরূপ তিনি ভালো জানেন, কোনো মানুষের পক্ষে এটা জানা সম্ভব নয়।

এটা হলো এ দিক থেকে ইস্তিওয়ার সবচেয়ে নরম ও সহনীয় ব্যাখ্যা। নতুবা কেউ কেউ ইস্তিওয়ার অর্থ নির্ধারণে এতটাই বাড়াবাড়ি করেছেন যে, আল্লাহকে মানুষের মতো বানিয়ে ফেলেছেন। কেউ আরশকে আল্লাহর অবস্থানস্থল (মাকান) আখ্যা দিয়েছেন। কেউ ইস্তিওয়া শব্দ বাদ দিয়ে বসা, সমাসীন হওয়া ও উপবেশন করা (আলজলুস ওয়ালকুউদ) ইত্যাদি শব্দ আল্লাহর শানে প্রয়োগ করেছেন। ফলে ইস্তিওয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, আল্লাহ আরশের উপর বসে আছেন। পা দুটো রেখেছেন কুরসির উপর। আবার কখনও কখনও কুরসির উপরও বসেন। তিনি যখন আরশে বসেন, তখন কটকট করে আওয়াজও বের হয়। তিনি আরশে বসলে সেখানে মাত্র চার আঙুল জায়গা খালি থাকে। সেখানে তাঁর পাশে আরশের উপর আবার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও বসাবেন। আর বসা যেহেতু কোনো বস্তুর সঙ্গে লেগে যাওয়া, তাই আল্লাহ আরশের উপর লেগে বসে আছেন। আরশ যেখানে শেষ, সেখান থেকে আল্লাহ শুরু। এভাবে তারা আল্লাহর জন্য দিক ও সীমা (আলজিহা ওয়ালহাদ) নির্ধারণ করেছেন। এর পর কথা হলো, সীমা কোন দিকে? নিচ থেকে যেহেতু আল্লাহর সীমা রয়েছে অর্থাৎ আরশ, অন্যদিক থেকেও কি সীমা রয়েছে? কেউ কেউ বলেছেন—না, অন্যদিক থেকে সীমা নেই। আবার কেউ কেউ বলেছেন—সব দিক থেকেই সীমা রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের যেমন উপর, নিচ, ডান বাম রয়েছে, তেমনই আল্লাহরও রয়েছে। ফলে তিনি সব দিক থেকে সীমায় নির্ধারিত। এভাবে কেউ কেউ আল্লাহর জন্য দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, লম্বা-চৌড়া ইত্যাদির মতো হিসাবও কষেছেন; এসব শিরোনামে বই লিখেছেন। বরং যারা বলেন আল্লাহ সীমার ঊর্ধ্বে, তাদের তারা জাহমিয়্যাহ আখ্যা দিয়েছেন। কেউ আল্লাহর ওজন আছেও বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে এই ওজনের কারণে ফেরেশতাদের আরশ ওঠাতেও কষ্ট হয়। তবে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পড়ার পরেই কেবল ওঠাতে পারেন। তারা আরও বলেছেন, আল্লাহ সময়ে-সুযোগে পৃথিবীতে এসে ঘোরাঘুরিও করেন।

বরং কেউ কেউ আল্লাহর আরশকে ছাগলের পিঠে বসিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা আব্বাস রাজি.-এর দিকে সম্পৃক্ত একটি বর্ণনা দ্বারা দলিল দেন। আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাহাবাদের একটি দলের সঙ্গে বাতহায় ছিলাম। আমাদের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন। তখন আমাদের পাশ দিয়ে একটি মেঘ উড়ে যাচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা এটাকে কী নামে ডাকো? আমরা বললাম, ‘সাহাব’ (মেঘ)। তিনি বললেন, ‘মুজন’ (মেঘ)। আমরাও বললাম ‘মুজন’। তিনি বললেন, ‘আনান’ (মেঘ)। আমরাও বললাম ‘আনান’। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জানো আকাশ ও ভূপৃষ্ঠের মাঝে দূরত্ব কতটুকু? সাহাবাগণ বললেন, আমরা জানি না। তিনি বললেন, এ দুটোর মাঝে দূরত্ব একাত্তর, বাহাত্তর কিংবা তিয়াত্তর বছর। এর উপর আকাশ। এভাবে তিনি সাত আকাশ পর্যন্ত গণনা করলেন। অতঃপর বললেন, সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে সাগর, যে সাগরের তলদেশ এবং পৃষ্ঠদেশের মাঝে দূরত্ব এক আকাশ থেকে আরেক আকাশের দূরত্বের সমান। এর উপরে রয়েছে আটটি পাহাড়ি ছাগল, যেগুলোর হাঁটু ও খুরের দূরত্ব এক আকাশ থেকে আরেক আকাশের দূরত্বের সমান। তাদের উপরে রয়েছে আরশ। এর উপরের ও নিচের অংশের মাঝে দূরত্ব এক আকাশ থেকে আকাশের দূরত্বের সমান। এর উপর রয়েছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। উক্ত বর্ণনাটি কিছু শব্দভেদে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, ইবনে মাজা, মুসনাদে বাজ্জার, মুসনাদে আহমদ, মুসতাদরাকে হাকেম-সহ বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিজি এটাকে হাসান গরিব বলেছেন। হাকেম এটাকে সহিহ বলেছেন। বাস্তবতা হলো, এটা দুর্বল। বাজ্জার, ইবনুল জাওজি, ইবনে আদি, মিজ্জি, সমকালীন শাইখ আলবানি-সহ অসংখ্য মুহাদ্দিস এটাকে দুর্বল বলেছেন। ফলে আকিদার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এমন বর্ণনা দিয়ে দলিল দেওয়া কোনোভাবেই বিশুদ্ধ নয়।

টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩৩২০)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৩৪৪৮)।
৩. মুসনাদে বাজ্জার (১৩১০)।
৪. সিলসিলা জয়িফাহ, আলবানি (১২৪৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সালাফের মাজহাব

📄 সালাফের মাজহাব


এটাই সকল সালাফে সালেহিন ও আহলে সুন্নাতের ইমামদের আকিদা। সালাফ কেবল কুরআন-সুন্নাহে যা-কিছু এসেছে, সেগুলোর উপর ঈমান এনে এর গভীর মর্ম ও স্বরূপ আল্লাহর কাছে অর্পণ করতেন। এরপর বলতেন, ‘তিনি যেমন বলেছেন তেমন’ (হুওয়া কামা ওয়াছাফা নাফসাহ); একটা শব্দও বৃদ্ধি করতেন না। ফলে ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের আকিদা ও কর্মপদ্ধতি অভিন্ন।

ইমাম আবু হানিফা (১৫০ হি.) আল্লাহর জন্য ‘দিক’ নাকচ করেছেন। ইমাম তহাবির (৩২১ হি.) ‘দিক’ নাকচ-সংক্রান্ত আলোচনা পিছনে অতিক্রান্ত হয়েছে। ইমাম বাজদাবি (৪৮২ হি.) আল্লাহর জন্য ‘দিক’ সাব্যস্ত করাকে অসম্ভব বলেছেন। ইমাম সারাখসিও (৪৮৩ হি.) লিখেন, ‘তাঁর কোনো দিক নেই।’

ইবনে হামদান (৬৯৫ হি.) ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের আকিদা বর্ণনা করে লিখেন, ‘আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে ‘নিচ’, ‘উপর’, ‘সামনে’, ‘পিছনে’, ‘স্বরূপ’ ইত্যাদি সাব্যস্ত করা যাবে না।’ ইবনে জামাআহ (৭৩৩ হি.) লিখেন, ‘ইমাম আহমদ রাহি. আল্লাহর জন্য ‘দিক’ সাব্যস্ত করতেন না।’

আবু দাউদ তয়ালিসি রাহি. বলেন, “সুফিয়ান সাওরি, শুবা, হাম্মাদ ইবনে জায়দ, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, শরিক, আবু আওয়ানাহ আল্লাহর জন্য ‘হদ’ (সীমা) নির্ধারণ করতেন না, আল্লাহর সঙ্গে কারও সাদৃশ্য সাব্যস্ত করতেন না, সৃষ্টির কিছুর সঙ্গে তাকে মেলাতেন না। হাদিসগুলো বর্ণনা করে যেতেন, ‘কীভাবে’ বলতেন না।” ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনকে আল্লাহর নুজুল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, ‘এগুলোতে বিশ্বাস রাখো, বর্ণনা দিয়ো না।’ ইমাম মালেককে ইস্তিওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘ইস্তিওয়া অজ্ঞাত নয়; কিন্তু এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত।’ ইয়াহইয়া ইবনে ইবরাহিম ইবনে মাজিন বলেন, ‘ইমাম মালেক এ ধরনের প্রশ্ন অপছন্দ করার কারণ হলো, কেউ কেউ এগুলোতে আল্লাহর সীমারেখা ও সাদৃশ্য আবিষ্কার করতে পারে, সেজন্য এগুলো আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই নিরাপদ।’

ইমাম মুহাম্মাদ (শাইবানি) বলেন, ‘সকল দেশের ফকিহ এই ব্যাপারে একমত যে, কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহে আল্লাহ তায়ালার যেসব সিফাত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে কোনো ধরনের পরিবর্তন, বিবরণ (ওয়াছফ), সাদৃশ্য দেওয়া ছাড়া গ্রহণ করতে হবে। যে ব্যক্তি এগুলো ব্যাখ্যা (তাফসির) দেবে, সে ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলের মানহাজ ও আহলে সুন্নাতের মানহাজ থেকে বিচ্যুত হবে। কারণ, তারা এগুলোর বিবরণ দেননি, ব্যাখ্যাও করেননি (লাম ইয়াছিফু ওয়া লাম ইউফাসসিরু)। বরং কুরআন ও সুন্নাহে যা এসেছে, ততটুকু বলে চুপ হয়ে যেতেন।’

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেন,
كل ما وصف الله به نفسه في كتابه، فتفسيره قراءته والسكوت عنه، ليس لأحد أن يفسره إلا الله ورسوله
অর্থাৎ ‘আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন, সেগুলো ওভাবে পাঠ করা এবং চুপ থাকাই সেগুলোর তাফসির। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল ছাড়া আর কেউ সেগুলো তাফসির করতে পারবে না।’ ইমাম তিরমিজি বলেন, “সিফাতের ক্ষেত্রে সালাফের মানহাজ হলো, এগুলোর উপর ঈমান আনা, কোনো কল্পনা ও ধারণা না করা, ব্যাখ্যা না করা। ‘কীভাবে’ এটা না বলা; বরং যেভাবে এসেছে ওভাবে রেখে দেওয়া।” ইমাম ইবনে হিব্বান লিখেন, ‘আল্লাহ সকল সীমারেখার উর্ধ্বে। কোনো সময় বা স্থান তাঁকে ধারণ করতে পারে না।’ ইমাম তহাবি লিখেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের সীমা-পরিসীমা ও গণ্ডির ঊর্ধ্বে। তিনি সকল উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও উপকরণ থেকে মুক্ত। সৃষ্টির মতো ছয় দিক তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।’

ইবনে আবদুল বার বলেন, (নুজুলের ক্ষেত্রে) ‘সত্তা-সহ’ শব্দটা যোগ করা স্বরূপ (কাইফিয়্যাত) নির্ধারণ করা। এটা আহলে সুন্নাতের কাছে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য নয়। কারণ, এটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রে নয়। কুরআন-সুন্নাহে এমন কথা নেই। সুতরাং এটা বলা মনগড়া বক্তব্য হিসেবে পরিগণিত হবে। ইবনে আবদুল বার আরও বলেন, নিজেদের আহলে সুন্নাত দাবিদার এক সম্প্রদায় বলে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে অবতরণ করেন। এমন বক্তব্য বর্জনীয়। কারণ, আল্লাহর সত্তা নব-উদ্ভাবিত কোনো কাজের স্থান নয়। সৃষ্টির কোনো বিশেষণ তাঁর মাঝে নেই। নুজুলের ক্ষেত্রে যেমন ‘সত্তাগত’ বর্জনযোগ্য, ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এমন বর্ণনা সালাফ থেকে অসংখ্য। দেখুন, তারা এসব হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে কতটা সতর্কতা অবলম্বন করতেন। এ ব্যাপারে একটা শব্দ যোগ তো দূরে থাক, মাথায়ও কোনো কল্পনার স্থান দিতেন না; বরং যেভাবে এসেছে হুবহু ওভাবে রেখে দিতেন এবং এ ব্যাপারে কথা বলা অপছন্দ করতেন। ফলে সালাফ যখন কুরআন-সুন্নাহে পেয়েছেন ‘আল্লাহ আরশের উপরে’ তারা সেটাকে সেভাবেই মেনে নিয়েছেন। এ জন্য আমাদের ক্ষুদ্র পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম প্রাণী মানুষের মাথার উপরের দিকটা হতে হবে, সালাফ সেটা দাবি করেননি। আর সেটা দাবি করলে সালাফের বক্তব্য (স্বরূপ বর্ণনা করা যাবে না) বহাল থাকল কীভাবে? কুরআন-সুন্নাহে এসেছে, তারা বিশ্বাস করেছেন—এটুকুই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সালাফের নামে আল্লাহর উপর যাচ্ছেতাই শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, তাঁকে মাথার উপর উপবিষ্ট ভাবা হয়েছে। তাঁর আরশকে রাজা-বাদশাহর সিংহাসন ও বসার জায়গা বলা হয়েছে। সৃষ্টির মতো তার নুজুলকে উপর থেকে নিচে অবতরণ বোঝানো হয়েছে। তাকে একদিক থেকে আরেক দিকে যাচ্ছেন—এভাবে কল্পনা করা হয়েছে। ‘সত্তা-সহ’, ‘হাকিকি’, ‘আল্লাহর দিক আছে’, ‘সীমা আছে’, ‘স্থান আছে’—এমন তুচ্ছ শব্দগুলো মহান আল্লাহর শানে ব্যবহার করা হয়েছে! এগুলো সালাফের মানহাজের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।

মোট কথা, ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রে সালাফের মানহাজ হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহে যা এসেছে ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকা; এক্ষেত্রে নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু যোগ না করা এবং অধিক ঘাঁটাঘাঁটি না করা। ফলে ইস্তিওয়া সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়—যেমন: আল্লাহ আরশে ‘বসেন’, ‘ওঠেন’, ‘আরশে থাকেন’, ‘উপবিষ্ট হন’, ‘অবস্থান করেন’, ‘সমাসীন হন’, ‘চার আঙুল ফাঁকা থাকে’, ‘বসার সময় কটকট আওয়াজ হয়’, ‘আল্লাহর ভারে ফেরেশতারা প্রথমে ওঠাতে পারেন না’, ‘আরশ আমাদের ঠিক মাথার উপর’, ‘হাকিকি ইস্তিওয়া’, ‘সত্তা-সহ ইস্তিওয়া’ ইত্যাদি—সঠিক নয়। এসব শব্দ আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যাবে না।

টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (২/৩৩৪); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (৪৭২৯)।
২. আত-তামহিদ, ইবনে আবদুল বার (৭/১৫১)।
৩. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৩/৪৮০); ফাতহুল বারি (১৩/৪০৭)।
৪. ফাতহুল বারি (১৩/৪০৭); লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফারিনি (১/৯৯); জাম্মুত তাবিল, ইবনে কুদামা (১৯)।
৫. তিরমিজি (৬৬২, ২৫৫৫৭)।
১. আস-সিকাত, ইবনে হিব্বান (১/১)।
২. আত-তামহিদ, ইবনে আবদুল বার (৭/১৪৪-১৪৫)।
৩. আল-ইসতিজকার, ইবনে আবদুল বার (২/৫৩০)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px