📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 তাকদির বিধানের সুফল

📄 তাকদির বিধানের সুফল


তাকদির, লাওহ, কলম—এগুলোর স্বরূপ নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে দৈনন্দিন জীবনে এগুলো থেকে আমাদের পাথেয় নিতে হবে। তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে জীবনে পথচলা সহজ হয়। ঝড়-তুফান মোকাবিলা করা আসান হয়। বিশাল সাফল্য এলে অহংকার তৈরি হয় না। আশেপাশের মানুষকে ছোট করে দেখা যায় না। অপরদিকে ব্যর্থতার সুনামির মুখেও বড় কোনো ভুল করতে হয় না। বরং সবরের সঙ্গে সেগুলো মোকাবিলা করে নতুন করে পথ চলার পাথেয় মেলে তাকদিরের প্রতি ঈমান থেকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ لَّنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلنَا وَ عَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَকَّلِ الْمُؤْمِنُوْনَ.

অর্থ: ‘আপনি বলুন, আমাদের কেবল তা-ই স্পর্শ করবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।’ [তাওবা: ৫১] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যা তোমার জন্য উপকারী, সেগুলো করতে সচেষ্ট থাকো। আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। ভেঙে পড়ো না। যদি কোনো বিপদ আসে, এ কথা বলো না, ‘আমি যদি এমন করতাম এমন হতো, অমন করলে অমন হতো’; বরং বলো, ‘আল্লাহ যা-কিছু লিখে রেখেছেন এবং ইচ্ছা করেছেন, তা-ই হয়েছে।’ কেননা ‘যদি’ শয়তানের কুমন্ত্রণাৰ পথ খুলে দেয়।” আরেক হাদিসে তিনি ইবনে আব্বাসকে শিশুকালে নসিহত করেন, ‘হে বালক, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিখিয়ে দিচ্ছি: আল্লাহকে হিফাজত করো (অর্থাৎ তাঁর নির্দেশ মেনে চলো), আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করবেন। আল্লাহকে হিফাজত করো, তাকে তোমার কাছে পাবে। সুখের সময় তাকে মনে রেখো, তাহলে দুঃখের সময় তিনি তোমাকে মনে রাখবেন। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছে চাইবে। যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। মনে রেখো, যদি জগতের সকল মানুষ তোমাকে উপকার করতে চায়, কোনো উপকার করতে পারবে না; হ্যাঁ, ততটুকু পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। যদি জগতের সকল মানুষ তোমাকে ক্ষতি করতে চায়, কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; হ্যাঁ, ততটুকু পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিতাব শুকিয়ে গেছে।’

মানুষ যেহেতু উপকার বা ক্ষতি কোনোটাই করার ক্ষমতা রাখে না, তাই মানুষকে সন্তুষ্ট করার চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে হবে। মুমিনের আপ্তবাক্য হোক এই হাদিস: ‘যা পেয়েছ, তা কখনও হারানোরই ছিল না। আর যা হারিয়েছ, তা কখনও পাওয়ারই ছিল না।’

টিকাঃ
১. মুসলিম (২৬৬৪); ইবনে মাজা (৭৯)।
২. তিরমিজি (২৫১৬); মুসনাদে আহমদ (২৮৪৯); আল-মুজামুল কাবির (১১৫৬০)।
৩. তিরমিজি (২১৪৪); মুসনাদে আহমদ (২১৮৩৫); বাজ্জার (৪১০৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 তাকদির ইমানের মৌলিক বিষয়

📄 তাকদির ইমানের মৌলিক বিষয়


বান্দার জানা কর্তব্য, শুরু থেকেই সৃষ্টির প্রত্যেকটি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার সর্বাঙ্গীণ জ্ঞান রয়েছে। তাই তিনি সুচারুরূপে এবং সুদৃঢ়ভাবে সকলের তাকদির নির্ধারণ করেছেন। আসমান ও জমিনের কারও পক্ষে এটা রদ কিংবা বাতিল করার সাধ্য নেই। এটার বিরুদ্ধাচরণ কিংবা পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও সংযোজন-বিয়োজনের সামর্থ্য নেই...। এটাই দৃঢ় ঈমান এবং প্রকৃত জ্ঞান; আল্লাহ তায়ালার তাওহিদ এবং রবুবিয়্যাতের স্বীকৃতি। পবিত্র কুরআনে তিনি বলেছেন, ‘আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলো পরিমিতভাবে নির্ধারণ করেছেন।’ আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘আর আল্লাহর নির্দেশ সুনির্ধারিত।’ সুতরাং ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য, যে তাকদির নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়; অসুস্থ অন্তর দিয়ে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। এভাবে সে নিছক অনুমানের বশবর্তী হয়ে সুপ্ত জ্ঞানের সন্ধানে ঘোরে। শেষে পরিণত হয় মিথ্যুক পাপাচারীতে।

টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); ইবনে মাজা (৬৩)।
২. তিরমিজি (২১৩৩); মুসানদে আবু ইয়ালা (৬০৪৫); বাজ্জার (১০০৬৩); মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (৯৭৩৭)।
৩. মুসনাদে আহমদ (২১১৮৫); বাজ্জার (৪২৮৮); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৭৪৬২)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 একটু দৃষ্টি আকর্ষণ

📄 একটু দৃষ্টি আকর্ষণ


আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যাকার শাইখ আবু হাফস সিরাজুদ্দিন গজনবি উপরে মূল টেক্সটের (...) চিহ্নিত স্থানে একটি বাক্য যোগ করেছেন, যা মূল গ্রন্থ কিংবা অন্য কোনো প্রাচীন ব্যাখ্যাগ্রন্থে অনুপস্থিত। বাক্যটি হলো: لا يكون مكون إلا بتكوينه، والتكوين لا يكون إلا حسنا جميلا যার সরল অর্থ হলো: পৃথিবীর প্রত্যেকটা বস্তুই তাকউইন তথা গঠনের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসেছে। আর এই তাকউইন তথা গঠন সবসময় সুন্দর হওয়া আবশ্যক। কথা হলো, এই বাক্যটি গজনবি কোথায় পেলেন? অধমের কাছে আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর চারটি হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি আছে। বাস্তবতা হলো, মাত্র একটি পাণ্ডুলিপিতে উক্ত বাক্যটি বিদ্যমান; অপর তিনটি পাণ্ডুলিপিতে অনুপস্থিত। উপরন্তু গজনবি ছাড়া আশআরি ও মাতুরিদি ধারার সকল ব্যাখ্যাগ্রন্থেও বাক্যটি অনুপস্থিত। কেবল সমকালীন ব্যাখ্যাকার শাইখ সাইদ ফুদাহ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে তার কথাতে স্পষ্ট যে, তিনি বাক্যটি কোনো পাণ্ডুলিপি থেকে নয়, বরং—তার ভাষ্যমতে—বাবিরতি থেকে নিয়েছেন। যদিও বাবিরতির ব্যাখ্যাটি মূলত গজনবির ব্যাখ্যাই, ভুলে বাবিরতির নামে প্রচারিত হয়েছে।

উক্ত বাক্যটা কি ইমাম তহাবির? চূড়ান্তভাবে ফয়সালা দেওয়া কঠিন, যেহেতু একটা পাণ্ডুলিপিতে এটা পাওয়া যায়। কিন্তু ইমাম তহাবির শব্দচয়ন ও লেখার ধারা খুব সম্ভবত এটার পরবর্তী সময়ে অনুপ্রবেশের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। কারণ, প্রথমত বাক্যটির এই স্থানে প্রাসঙ্গিকতা কম। দ্বিতীয়ত ‘তাকউইন’ হচ্ছে মাতুরিদি ধারার একটি বিশেষ আকিদা, যা অন্যান্য ধারার মাঝে বলতে গেলে অনুপস্থিত। আর ইমাম তহাবির পুরো বইয়ে আমরা তার শব্দচয়নে কোনো বিশেষ ধারার বিশেষ আকিদার প্রতিনিধিত্ব দেখি না। ফলে এমন একটি বাক্যের উপস্থিতি এখানে বেশ অদ্ভুত। আল্লাহ ভালো জানেন。

টিকাঃ
১. তিরমিজি (২১৪৯); ইবনে মাজা (৬২); মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ (৫৭৯)।
২. গজনবি (১০৩)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px