📄 তাকদির লেখার ধারাক্রম
তাকদির লেখার কয়েকটি ধাপ রয়েছে। একটা হচ্ছে লাওহে মাহফুজের লিখন, যা সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সম্পন্ন হয়েছে। আরেকটি হচ্ছে প্রত্যেকের মাতৃগর্ভের লিখন। একাধিক হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। যখন মাতৃগর্ভে বীর্য ৪০ দিন অথবা ৪০ রাত অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি বলেন—হে রব, তার রিজিক কী হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, তার জন্মকাল কতটুকু হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, নারী হবে নাকি পুরুষ হবে? তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা? তাকে জানিয়ে দেওয়া। এটা ফেরেশতাদের জন্য নতুন হলেও আল্লাহর জন্য নতুন নয়। কারণ, এগুলো সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত ‘লাওহে মাহফুজে’ লিখিত আছে। তৃতীয় আরেকটি স্তর হচ্ছে বাৎসরিক লিখন। এটাও প্রথম ও দ্বিতীয় লিখনের শাখা। লাইলাতুল কদরে এক বছরের জন্য প্রত্যেক সৃষ্টির জীবন, রিজিক-সহ সবকিছু লেখা হয় [দুখান: ১-৪]।
টিকাঃ
৫. মুসলিম (২৬৪৩)।
৬. মুসনাদে আহমদ (১৫৫০২)।
📄 তাকদিরের লিখন খণ্ডন করা যায়?
এই তিন প্রকার লেখনীর মাঝে দ্বিতীয় ও তৃতীয়, যা ফেরেশতাদের হাতে, সেগুলোর মাঝে বান্দার আমল অনুযায়ী তাকদিরের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু লাওহে মাহফুজে লেখা মূল তাকদিরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না, যা আমরা পিছনে বলে এসেছি। অর্থাৎ দোয়া কিংবা যেকোনো পুণ্যের মাধ্যমে যদি বান্দা তার দিকে ছুটে আসা কোনো বিপদ প্রতিহত করে ফেলে, অথবা খারাপ কাজের মাধ্যমে যদি তার মৃত্যু এগিয়ে নিয়ে আসে, তবে ফেরেশতাদের হাতে থাকা আমলনামাতে পরিবর্তন আনা হয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরে লেখা—এক ব্যক্তি পঞ্চাশ বছর হায়াত পাবে। কিন্তু দেখা গেল সে এমন কোনো পুণ্যের কাজ করল, যাতে তার হায়াত আরও দুই বছর বৃদ্ধি পেল। ফেরেশতারা তখন আগের পঞ্চাশ বছর মুছে বায়ান্ন বছর লিখবেন। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিদ্যমান লাওহে মাহফুজে লেখা মূল তাকদিরে কিন্তু প্রথম থেকেই এসব বিস্তারিত লেখা আছে। অর্থাৎ প্রথমে যে পঞ্চাশ বছর, এরপর পুণ্যের মাধ্যমে দুই বছর বৃদ্ধি ইত্যাদি সবকিছু সবিস্তারে লেখা রয়েছে। ফলে সেখানে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এদিকেই ইঙ্গিত করে বলেন,
يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَ عِنْدَةً أُمُّ الْكِتَبِ.
অর্থ: ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং বহাল রাখেন। কিন্তু মূল গ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।’ [রাদ: ৩৯] এটাই হলো তাকদির পরিবর্তন-সংক্রান্ত কিছু হাদিসের ব্যাখ্যা। যেমন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্করক্ষা মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে। আরেকটি হাদিসে বলেছেন, ‘কেবল দোয়াই তাকদিরকে ফেরাতে পারে। সৎকর্ম হায়াত বৃদ্ধি করে; গুনাহ রিজিক হ্রাস করে ফেলে।’ আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি করতে চায় এবং মৃত্যু পেছাতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ অর্থাৎ এগুলো ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরনামায়, মূল লাওহে মাহফুজে এগুলো-সহই লেখা আছে। সেখানে পরিবর্তন নেই এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনও নেই।
টিকাঃ
১. মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৯৪৩)।
২. তিরমিজি (২১৩৯); মুসনাদে বাজ্জার (২৫৪০)।
৩. বুখারি (৫৯৮৬); মুসলিম (২৫৫৭); ইবনে হিব্বান (৪৩৯); বাজ্জার (৬৩১৬)।
📄 তাকদির বিধানের সুফল
তাকদির, লাওহ, কলম—এগুলোর স্বরূপ নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে দৈনন্দিন জীবনে এগুলো থেকে আমাদের পাথেয় নিতে হবে। তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে জীবনে পথচলা সহজ হয়। ঝড়-তুফান মোকাবিলা করা আসান হয়। বিশাল সাফল্য এলে অহংকার তৈরি হয় না। আশেপাশের মানুষকে ছোট করে দেখা যায় না। অপরদিকে ব্যর্থতার সুনামির মুখেও বড় কোনো ভুল করতে হয় না। বরং সবরের সঙ্গে সেগুলো মোকাবিলা করে নতুন করে পথ চলার পাথেয় মেলে তাকদিরের প্রতি ঈমান থেকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ لَّنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلنَا وَ عَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَকَّلِ الْمُؤْمِنُوْনَ.
অর্থ: ‘আপনি বলুন, আমাদের কেবল তা-ই স্পর্শ করবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।’ [তাওবা: ৫১] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যা তোমার জন্য উপকারী, সেগুলো করতে সচেষ্ট থাকো। আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। ভেঙে পড়ো না। যদি কোনো বিপদ আসে, এ কথা বলো না, ‘আমি যদি এমন করতাম এমন হতো, অমন করলে অমন হতো’; বরং বলো, ‘আল্লাহ যা-কিছু লিখে রেখেছেন এবং ইচ্ছা করেছেন, তা-ই হয়েছে।’ কেননা ‘যদি’ শয়তানের কুমন্ত্রণাৰ পথ খুলে দেয়।” আরেক হাদিসে তিনি ইবনে আব্বাসকে শিশুকালে নসিহত করেন, ‘হে বালক, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিখিয়ে দিচ্ছি: আল্লাহকে হিফাজত করো (অর্থাৎ তাঁর নির্দেশ মেনে চলো), আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করবেন। আল্লাহকে হিফাজত করো, তাকে তোমার কাছে পাবে। সুখের সময় তাকে মনে রেখো, তাহলে দুঃখের সময় তিনি তোমাকে মনে রাখবেন। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছে চাইবে। যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। মনে রেখো, যদি জগতের সকল মানুষ তোমাকে উপকার করতে চায়, কোনো উপকার করতে পারবে না; হ্যাঁ, ততটুকু পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। যদি জগতের সকল মানুষ তোমাকে ক্ষতি করতে চায়, কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; হ্যাঁ, ততটুকু পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিতাব শুকিয়ে গেছে।’
মানুষ যেহেতু উপকার বা ক্ষতি কোনোটাই করার ক্ষমতা রাখে না, তাই মানুষকে সন্তুষ্ট করার চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে হবে। মুমিনের আপ্তবাক্য হোক এই হাদিস: ‘যা পেয়েছ, তা কখনও হারানোরই ছিল না। আর যা হারিয়েছ, তা কখনও পাওয়ারই ছিল না।’
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৬৬৪); ইবনে মাজা (৭৯)।
২. তিরমিজি (২৫১৬); মুসনাদে আহমদ (২৮৪৯); আল-মুজামুল কাবির (১১৫৬০)।
৩. তিরমিজি (২১৪৪); মুসনাদে আহমদ (২১৮৩৫); বাজ্জার (৪১০৭)।
📄 তাকদির ইমানের মৌলিক বিষয়
বান্দার জানা কর্তব্য, শুরু থেকেই সৃষ্টির প্রত্যেকটি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার সর্বাঙ্গীণ জ্ঞান রয়েছে। তাই তিনি সুচারুরূপে এবং সুদৃঢ়ভাবে সকলের তাকদির নির্ধারণ করেছেন। আসমান ও জমিনের কারও পক্ষে এটা রদ কিংবা বাতিল করার সাধ্য নেই। এটার বিরুদ্ধাচরণ কিংবা পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও সংযোজন-বিয়োজনের সামর্থ্য নেই...। এটাই দৃঢ় ঈমান এবং প্রকৃত জ্ঞান; আল্লাহ তায়ালার তাওহিদ এবং রবুবিয়্যাতের স্বীকৃতি। পবিত্র কুরআনে তিনি বলেছেন, ‘আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলো পরিমিতভাবে নির্ধারণ করেছেন।’ আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘আর আল্লাহর নির্দেশ সুনির্ধারিত।’ সুতরাং ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য, যে তাকদির নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়; অসুস্থ অন্তর দিয়ে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। এভাবে সে নিছক অনুমানের বশবর্তী হয়ে সুপ্ত জ্ঞানের সন্ধানে ঘোরে। শেষে পরিণত হয় মিথ্যুক পাপাচারীতে।
টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); ইবনে মাজা (৬৩)।
২. তিরমিজি (২১৩৩); মুসানদে আবু ইয়ালা (৬০৪৫); বাজ্জার (১০০৬৩); মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (৯৭৩৭)।
৩. মুসনাদে আহমদ (২১১৮৫); বাজ্জার (৪২৮৮); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৭৪৬২)।