📄 আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি
উপরের হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন; অথচ অন্য কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, সর্বপ্রথম আরশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সকল মাখলুকের তাকদির সৃষ্টি করেছেন। তখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে। আরেকটি হাদিসে যখন আবু রাজিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, জগৎ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গে কেউ ছিল না (কান ফি আমা)। উপরে ও নিচে কোনো বায়ু ছিল না। অতঃপর তিনি পানির উপর আরশ সৃষ্টি করেছেন। উক্ত হাদিসগুলোতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, কলম সৃষ্টির আগে আরশ থাকার কথা বলা হচ্ছে। এ কারণে ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম-সহ অনেক আলিমের মতে, কলম নয়, আরশ আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। আবার ইমাম তাবারি, ইবনে হাজার আসকালানি, ইবনে রজব হাম্বলি-সহ অনেকের মতে, সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ, বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, আল্লাহর আরশ ছিল পানির উপর। ফলে আরশ সৃষ্টির সময় পানি ছিল না এটা হতে পারে না, বরং পানি আরশের আগে (কিংবা নিদেনপক্ষে) একসঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া আরেকটি হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে, সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবনে রজব লিখেন, সকল সৃষ্টির মূল উপকরণ পানি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস-সহ অনেক সালাফ থেকে এমন বক্তব্য বর্ণিত আছে। সে হিসেবে অগ্রগণ্য কথা হচ্ছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশ, অতঃপর কলম, অতঃপর অন্যান্য সৃষ্টি। আর কলমকে যে হাদিসে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে, উলামায়ে কেরাম সেটার দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক. আরশ ও পানি ব্যতীত অন্যান্য সৃষ্টির দিকে লক্ষ করে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে। দুই. বাক্যের অর্থ ভিন্নভাবে তোলা হবে। তখন অর্থ হবে—কলম সৃষ্টির পরে সর্বপ্রথম নির্দেশ দিয়েছেন ‘তুমি লেখো’। এক্ষেত্রে কলম কখন সৃষ্টি হয়েছে এ ব্যাপারে হাদিসে কোনো বক্তব্য থাকবে না। ফলে অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে বৈপরীত্যও থাকবে না।
টিকাঃ
১. তারিখে তাবারি (১/৪০)।
২. ইবনে হিব্বান (২৫৫৯); মুসনাদে আহমদ (৮০৪৭)।
৩. বিস্তারিত দেখুন: লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনে রজব (২১-২২)।
৪. ফাতহুল বারি (৬/২৮৯); ইবনে আবিল ইজ (২৪২); আকহাসারি (১৭১)।
📄 তাকদির লেখার ধারাক্রম
তাকদির লেখার কয়েকটি ধাপ রয়েছে। একটা হচ্ছে লাওহে মাহফুজের লিখন, যা সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সম্পন্ন হয়েছে। আরেকটি হচ্ছে প্রত্যেকের মাতৃগর্ভের লিখন। একাধিক হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। যখন মাতৃগর্ভে বীর্য ৪০ দিন অথবা ৪০ রাত অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি বলেন—হে রব, তার রিজিক কী হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, তার জন্মকাল কতটুকু হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, নারী হবে নাকি পুরুষ হবে? তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা? তাকে জানিয়ে দেওয়া। এটা ফেরেশতাদের জন্য নতুন হলেও আল্লাহর জন্য নতুন নয়। কারণ, এগুলো সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত ‘লাওহে মাহফুজে’ লিখিত আছে। তৃতীয় আরেকটি স্তর হচ্ছে বাৎসরিক লিখন। এটাও প্রথম ও দ্বিতীয় লিখনের শাখা। লাইলাতুল কদরে এক বছরের জন্য প্রত্যেক সৃষ্টির জীবন, রিজিক-সহ সবকিছু লেখা হয় [দুখান: ১-৪]।
টিকাঃ
৫. মুসলিম (২৬৪৩)।
৬. মুসনাদে আহমদ (১৫৫০২)।
📄 তাকদিরের লিখন খণ্ডন করা যায়?
এই তিন প্রকার লেখনীর মাঝে দ্বিতীয় ও তৃতীয়, যা ফেরেশতাদের হাতে, সেগুলোর মাঝে বান্দার আমল অনুযায়ী তাকদিরের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু লাওহে মাহফুজে লেখা মূল তাকদিরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না, যা আমরা পিছনে বলে এসেছি। অর্থাৎ দোয়া কিংবা যেকোনো পুণ্যের মাধ্যমে যদি বান্দা তার দিকে ছুটে আসা কোনো বিপদ প্রতিহত করে ফেলে, অথবা খারাপ কাজের মাধ্যমে যদি তার মৃত্যু এগিয়ে নিয়ে আসে, তবে ফেরেশতাদের হাতে থাকা আমলনামাতে পরিবর্তন আনা হয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরে লেখা—এক ব্যক্তি পঞ্চাশ বছর হায়াত পাবে। কিন্তু দেখা গেল সে এমন কোনো পুণ্যের কাজ করল, যাতে তার হায়াত আরও দুই বছর বৃদ্ধি পেল। ফেরেশতারা তখন আগের পঞ্চাশ বছর মুছে বায়ান্ন বছর লিখবেন। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিদ্যমান লাওহে মাহফুজে লেখা মূল তাকদিরে কিন্তু প্রথম থেকেই এসব বিস্তারিত লেখা আছে। অর্থাৎ প্রথমে যে পঞ্চাশ বছর, এরপর পুণ্যের মাধ্যমে দুই বছর বৃদ্ধি ইত্যাদি সবকিছু সবিস্তারে লেখা রয়েছে। ফলে সেখানে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এদিকেই ইঙ্গিত করে বলেন,
يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَ عِنْدَةً أُمُّ الْكِتَبِ.
অর্থ: ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং বহাল রাখেন। কিন্তু মূল গ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।’ [রাদ: ৩৯] এটাই হলো তাকদির পরিবর্তন-সংক্রান্ত কিছু হাদিসের ব্যাখ্যা। যেমন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্করক্ষা মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে। আরেকটি হাদিসে বলেছেন, ‘কেবল দোয়াই তাকদিরকে ফেরাতে পারে। সৎকর্ম হায়াত বৃদ্ধি করে; গুনাহ রিজিক হ্রাস করে ফেলে।’ আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি করতে চায় এবং মৃত্যু পেছাতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ অর্থাৎ এগুলো ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরনামায়, মূল লাওহে মাহফুজে এগুলো-সহই লেখা আছে। সেখানে পরিবর্তন নেই এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনও নেই।
টিকাঃ
১. মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৯৪৩)।
২. তিরমিজি (২১৩৯); মুসনাদে বাজ্জার (২৫৪০)।
৩. বুখারি (৫৯৮৬); মুসলিম (২৫৫৭); ইবনে হিব্বান (৪৩৯); বাজ্জার (৬৩১৬)।
📄 তাকদির বিধানের সুফল
তাকদির, লাওহ, কলম—এগুলোর স্বরূপ নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে দৈনন্দিন জীবনে এগুলো থেকে আমাদের পাথেয় নিতে হবে। তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে জীবনে পথচলা সহজ হয়। ঝড়-তুফান মোকাবিলা করা আসান হয়। বিশাল সাফল্য এলে অহংকার তৈরি হয় না। আশেপাশের মানুষকে ছোট করে দেখা যায় না। অপরদিকে ব্যর্থতার সুনামির মুখেও বড় কোনো ভুল করতে হয় না। বরং সবরের সঙ্গে সেগুলো মোকাবিলা করে নতুন করে পথ চলার পাথেয় মেলে তাকদিরের প্রতি ঈমান থেকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ لَّنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلنَا وَ عَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَকَّلِ الْمُؤْمِنُوْনَ.
অর্থ: ‘আপনি বলুন, আমাদের কেবল তা-ই স্পর্শ করবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।’ [তাওবা: ৫১] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যা তোমার জন্য উপকারী, সেগুলো করতে সচেষ্ট থাকো। আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। ভেঙে পড়ো না। যদি কোনো বিপদ আসে, এ কথা বলো না, ‘আমি যদি এমন করতাম এমন হতো, অমন করলে অমন হতো’; বরং বলো, ‘আল্লাহ যা-কিছু লিখে রেখেছেন এবং ইচ্ছা করেছেন, তা-ই হয়েছে।’ কেননা ‘যদি’ শয়তানের কুমন্ত্রণাৰ পথ খুলে দেয়।” আরেক হাদিসে তিনি ইবনে আব্বাসকে শিশুকালে নসিহত করেন, ‘হে বালক, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিখিয়ে দিচ্ছি: আল্লাহকে হিফাজত করো (অর্থাৎ তাঁর নির্দেশ মেনে চলো), আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করবেন। আল্লাহকে হিফাজত করো, তাকে তোমার কাছে পাবে। সুখের সময় তাকে মনে রেখো, তাহলে দুঃখের সময় তিনি তোমাকে মনে রাখবেন। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছে চাইবে। যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। মনে রেখো, যদি জগতের সকল মানুষ তোমাকে উপকার করতে চায়, কোনো উপকার করতে পারবে না; হ্যাঁ, ততটুকু পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। যদি জগতের সকল মানুষ তোমাকে ক্ষতি করতে চায়, কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; হ্যাঁ, ততটুকু পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিতাব শুকিয়ে গেছে।’
মানুষ যেহেতু উপকার বা ক্ষতি কোনোটাই করার ক্ষমতা রাখে না, তাই মানুষকে সন্তুষ্ট করার চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে হবে। মুমিনের আপ্তবাক্য হোক এই হাদিস: ‘যা পেয়েছ, তা কখনও হারানোরই ছিল না। আর যা হারিয়েছ, তা কখনও পাওয়ারই ছিল না।’
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৬৬৪); ইবনে মাজা (৭৯)।
২. তিরমিজি (২৫১৬); মুসনাদে আহমদ (২৮৪৯); আল-মুজামুল কাবির (১১৫৬০)।
৩. তিরমিজি (২১৪৪); মুসনাদে আহমদ (২১৮৩৫); বাজ্জার (৪১০৭)।