📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 লাওহ ও কলম

📄 লাওহ ও কলম


তাকদিরের প্রতি ঈমান যেসব বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, তন্মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে লাওহে মাহফুজ ও কলমের উপর ঈমান আনা। এর অর্থ হচ্ছে—আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পূর্বে সবকিছু বিস্তারিত জেনেছেন, এরপর তিনি সেগুলো তাঁর জানা অনুযায়ী কলমের মাধ্যমে ঊর্ধ্ব জগতে লাওহে মাহফুজ নামক সুরক্ষিত ফলকে লিখে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা ওখানে যা লিখে রেখেছেন, জগতে সেগুলোই অক্ষরে অক্ষরে ঘটবে। কোনোকিছু চুল পরিমাণ এদিক-সেদিক হবে না। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাতে কী লেখা আছে জানে না—না কোনো ফেরেশতা কিংবা কোনো রাসুল। ফলে তাদের আল্লাহ যতটুকু জানান, ততটুকুই জানেন। সুতরাং কোনো ওলি-আউলিয়া লাওহে মাহফুজের খবর রাখবে—এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। প্রত্যেক মুমিনকে লাওহে মাহফুজে বিশ্বাস রাখতে হবে। যে এটাতে বিশ্বাস রাখবে না সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। আহলে সুন্নাতের সকলে এ ব্যাপারে সর্বসম্মত আকিদা রাখেন।

লাওহে মাহফুজকে শরিয়তে বিভিন্ন নাম আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কখনও ‘লাওহ’, কখনও ‘কিতাব’, কখনও ‘উম্মুল কিতাব’ কখনও ‘কিতাব মুবিন’ ইত্যাদি। কিন্তু সর্বত্রই এটাকে জগতের সবকিছুর তাকদির লিখে রাখার স্থান বোঝানো হয়েছে। কুরআনে অধিকাংশ জায়গায় এটাকে ‘কিতাব’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّমَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذُلِكَ فِي كِتَبٍ إِنَّ ذُلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ.
অর্থ: ‘আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ জানেন যা-কিছু আকাশে ও পৃথিবীতে আছে? নিশ্চয়ই এসব কিতাবে লিখিত আছে। এটা আল্লাহর জন্য সহজ।’ [হজ: ৭০]

অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَا مِنْ غَائِبَةٍ فِي السَّমَاءِ وَالْأَرْضِ إِلَّا فِي كِتَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোনো গোপন ভেদ নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে না আছে।’ [নামল: ৭৫]

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَ مَا تَتْلُوْا مِنْهُ مِنْ قُرْآنٍ وَلَا تَعْمَلُوْনَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا কُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُوْনَ فِيْهِ وَمَا يَعْزُبُ عَنْ رَبِّكَ مِنْ مِثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَلَا أَصْغَرَ مِنْ ذُلِكَ وَلَا أَكْبَرَ إِلَّا فِي كِتَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘বস্তুত যে অবস্থাতেই তুমি থাকো আর কুরআনের যে অংশ থেকেই পাঠ করো, কিংবা যে কাজই তোমরা করো, আমি তোমাদের নিকটে উপস্থিত থাকি যখন তোমরা তাতে মগ্ন হয়ে যাও। আর আকাশ কিংবা পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্র কণাও তোমার রবের কাছ থেকে গোপন থাকে না। আর এরচেয়ে বড় কিংবা ক্ষুদ্র যা-কিছু রয়েছে, সব সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ।’ [ইউনুস: ৬১]

অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ عِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَ يَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِতَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘তাঁর কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এগুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা আছে, তিনিই জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে গাছের পাতা ঝরে না। কোনো শস্যকণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না এবং কোনো আর্দ্র ও শুষ্ক (জীবিত ও মৃত) দ্রব্য নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে লিখিত নেই।’ [আনআম: ৫৯]

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَ مُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘আর পৃথিবীতে যত বিচরণশীল প্রাণী রয়েছে, সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমর্পিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে।’ [হুদ: ৬]

অন্য এক আয়াতে বলেন,
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَبٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَّبْرَاهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ.
অর্থ: ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের উপর যা-কিছু বিপদ আসে, তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ [হাদিদ: ২২]

সকল জিনিসের মতো লাওহে মাহফুজে কুরআনও লেখা আছে। আল্লাহ বলেন,
بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظٍ.
অর্থ: ‘বরং এটা সম্মানিত কুরআন, সুরক্ষিত ফলকে।’ [বুরুজ: ২১-২২]

একাধিক হাদিসে লাওহে মাহফুজের কথা এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সকল মাখলুকের তাকদির সৃষ্টি করেছেন। তখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে।’ আলি রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বাকিউল গারকাদে একটি জানাজায় ছিলাম। এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে এলেন। তিনি বসে গেলেন। আমরাও তাঁর চারপাশে বসে গেলাম। তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল। তিনি মাথা নুইয়ে লাঠি দ্বারা মাটিতে কিছু রেখা টানতে লাগলেন আর বললেন, ‘তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, এমন কোনো জীবিত আত্মা নেই জান্নাত কিংবা জাহান্নামে যার স্থান লেখা হয়নি, সে সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা হবে তা লেখা হয়নি।’ তখন কেউ বললেন, তাহলে কি আমরা তাকদিরের লিখনের উপর বসে থেকে আমল ছেড়ে দেবো না? কারণ, আমাদের ভিতরে যাকে সৌভাগ্যবানদের মাঝে লেখা হয়েছে, সে এমনিতেই সৌভাগ্যবানদের আমল করবে। আর যাকে দুর্ভাগাদের মাঝে লেখা হয়েছে, সে স্বাভাবিকভাবে দুর্ভাগাদের আমল করবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না, বরং যারা সৌভাগ্যবান, তাদের জন্য সৌভাগ্যের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে; আর যারা দুর্ভাগা, তাদের জন্য দুর্ভাগাদের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে।’ অতঃপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন:

ফাসাল্লামু আলাইহি... [লাইল: ৫-১০]

লাওহে মাহফুজের মাঝে আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টির ভাগ্য কলমের মাধ্যমে লিখেছেন। কুরআন ও সুন্নাহর অনেক জায়গায় এই কলমের বর্ণনা এসেছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কলমের নামে শপথ করেছেন এবং একটি সুরার নাম রেখেছেন ‘কলম’। আল্লাহ তায়ালা এই সুরার শুরুতে বলেন,
নুন। ওয়াল কলামি ওয়ামা ইয়াসতুরুন।
অর্থ: ‘নুন। শপথ কলমের আর সেই বিষয়ের যা তারা লিপিবদ্ধ করে।’ [কলম: ১]

সুরাকা ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা যেসব কাজ করছি, সেগুলো কি আগে থেকেই তাকদিরে লেখা হয়ে গিয়েছে, নাকি আমরা নতুন করে করছি? তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—না, তোমরা যা করছ সবকিছু লেখা হয়ে গিয়েছে; কলম শুকিয়ে গিয়েছে। তখন তিনি বললেন, তাহলে আমল করে কী লাভ? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমল করতে থাকো। প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে। উবাদা ইবনস সামিত রাজি. তার ছেলেকে বলেন, হে প্রিয় বৎস, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের মর্ম বোঝার স্বাদ উপলব্ধি করতে পারবে না, যতক্ষণ না এই বিশ্বাস রাখবে যে, তুমি যা পেয়েছ তা কখনও হারানোর ছিল না, আর যা হারিয়েছ তা কখনও পাওয়ারই ছিল না। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তুমি লেখো। কলম বলল, হে আমার প্রভু, আমি কী লিখবো? আল্লাহ বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টির সবকিছুর তাকদির লেখো। আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যে এই বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে না, সে আমার কেউ নয়।

টিকাঃ
১. মুসলিম (২৬৫৩)।
১. বুখারি (১৩৬২, ৪৯৪৮, ৪৯৪৯); মুসলিম (২৬৪৭)।
২. মুসলিম (২৬৪৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি

📄 আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি


উপরের হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন; অথচ অন্য কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, সর্বপ্রথম আরশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সকল মাখলুকের তাকদির সৃষ্টি করেছেন। তখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে। আরেকটি হাদিসে যখন আবু রাজিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, জগৎ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গে কেউ ছিল না (কান ফি আমা)। উপরে ও নিচে কোনো বায়ু ছিল না। অতঃপর তিনি পানির উপর আরশ সৃষ্টি করেছেন। উক্ত হাদিসগুলোতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, কলম সৃষ্টির আগে আরশ থাকার কথা বলা হচ্ছে। এ কারণে ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম-সহ অনেক আলিমের মতে, কলম নয়, আরশ আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। আবার ইমাম তাবারি, ইবনে হাজার আসকালানি, ইবনে রজব হাম্বলি-সহ অনেকের মতে, সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ, বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, আল্লাহর আরশ ছিল পানির উপর। ফলে আরশ সৃষ্টির সময় পানি ছিল না এটা হতে পারে না, বরং পানি আরশের আগে (কিংবা নিদেনপক্ষে) একসঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া আরেকটি হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে, সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবনে রজব লিখেন, সকল সৃষ্টির মূল উপকরণ পানি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস-সহ অনেক সালাফ থেকে এমন বক্তব্য বর্ণিত আছে। সে হিসেবে অগ্রগণ্য কথা হচ্ছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশ, অতঃপর কলম, অতঃপর অন্যান্য সৃষ্টি। আর কলমকে যে হাদিসে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে, উলামায়ে কেরাম সেটার দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক. আরশ ও পানি ব্যতীত অন্যান্য সৃষ্টির দিকে লক্ষ করে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে। দুই. বাক্যের অর্থ ভিন্নভাবে তোলা হবে। তখন অর্থ হবে—কলম সৃষ্টির পরে সর্বপ্রথম নির্দেশ দিয়েছেন ‘তুমি লেখো’। এক্ষেত্রে কলম কখন সৃষ্টি হয়েছে এ ব্যাপারে হাদিসে কোনো বক্তব্য থাকবে না। ফলে অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে বৈপরীত্যও থাকবে না।

টিকাঃ
১. তারিখে তাবারি (১/৪০)।
২. ইবনে হিব্বান (২৫৫৯); মুসনাদে আহমদ (৮০৪৭)।
৩. বিস্তারিত দেখুন: লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনে রজব (২১-২২)।
৪. ফাতহুল বারি (৬/২৮৯); ইবনে আবিল ইজ (২৪২); আকহাসারি (১৭১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 তাকদির লেখার ধারাক্রম

📄 তাকদির লেখার ধারাক্রম


তাকদির লেখার কয়েকটি ধাপ রয়েছে। একটা হচ্ছে লাওহে মাহফুজের লিখন, যা সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সম্পন্ন হয়েছে। আরেকটি হচ্ছে প্রত্যেকের মাতৃগর্ভের লিখন। একাধিক হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। যখন মাতৃগর্ভে বীর্য ৪০ দিন অথবা ৪০ রাত অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি বলেন—হে রব, তার রিজিক কী হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, তার জন্মকাল কতটুকু হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, নারী হবে নাকি পুরুষ হবে? তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা? তাকে জানিয়ে দেওয়া। এটা ফেরেশতাদের জন্য নতুন হলেও আল্লাহর জন্য নতুন নয়। কারণ, এগুলো সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত ‘লাওহে মাহফুজে’ লিখিত আছে। তৃতীয় আরেকটি স্তর হচ্ছে বাৎসরিক লিখন। এটাও প্রথম ও দ্বিতীয় লিখনের শাখা। লাইলাতুল কদরে এক বছরের জন্য প্রত্যেক সৃষ্টির জীবন, রিজিক-সহ সবকিছু লেখা হয় [দুখান: ১-৪]।

টিকাঃ
৫. মুসলিম (২৬৪৩)।
৬. মুসনাদে আহমদ (১৫৫০২)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 তাকদিরের লিখন খণ্ডন করা যায়?

📄 তাকদিরের লিখন খণ্ডন করা যায়?


এই তিন প্রকার লেখনীর মাঝে দ্বিতীয় ও তৃতীয়, যা ফেরেশতাদের হাতে, সেগুলোর মাঝে বান্দার আমল অনুযায়ী তাকদিরের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু লাওহে মাহফুজে লেখা মূল তাকদিরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না, যা আমরা পিছনে বলে এসেছি। অর্থাৎ দোয়া কিংবা যেকোনো পুণ্যের মাধ্যমে যদি বান্দা তার দিকে ছুটে আসা কোনো বিপদ প্রতিহত করে ফেলে, অথবা খারাপ কাজের মাধ্যমে যদি তার মৃত্যু এগিয়ে নিয়ে আসে, তবে ফেরেশতাদের হাতে থাকা আমলনামাতে পরিবর্তন আনা হয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরে লেখা—এক ব্যক্তি পঞ্চাশ বছর হায়াত পাবে। কিন্তু দেখা গেল সে এমন কোনো পুণ্যের কাজ করল, যাতে তার হায়াত আরও দুই বছর বৃদ্ধি পেল। ফেরেশতারা তখন আগের পঞ্চাশ বছর মুছে বায়ান্ন বছর লিখবেন। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিদ্যমান লাওহে মাহফুজে লেখা মূল তাকদিরে কিন্তু প্রথম থেকেই এসব বিস্তারিত লেখা আছে। অর্থাৎ প্রথমে যে পঞ্চাশ বছর, এরপর পুণ্যের মাধ্যমে দুই বছর বৃদ্ধি ইত্যাদি সবকিছু সবিস্তারে লেখা রয়েছে। ফলে সেখানে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এদিকেই ইঙ্গিত করে বলেন,

يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَ عِنْدَةً أُمُّ الْكِتَبِ.

অর্থ: ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং বহাল রাখেন। কিন্তু মূল গ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।’ [রাদ: ৩৯] এটাই হলো তাকদির পরিবর্তন-সংক্রান্ত কিছু হাদিসের ব্যাখ্যা। যেমন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্করক্ষা মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে। আরেকটি হাদিসে বলেছেন, ‘কেবল দোয়াই তাকদিরকে ফেরাতে পারে। সৎকর্ম হায়াত বৃদ্ধি করে; গুনাহ রিজিক হ্রাস করে ফেলে।’ আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি করতে চায় এবং মৃত্যু পেছাতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ অর্থাৎ এগুলো ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরনামায়, মূল লাওহে মাহফুজে এগুলো-সহই লেখা আছে। সেখানে পরিবর্তন নেই এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনও নেই।

টিকাঃ
১. মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৯৪৩)।
২. তিরমিজি (২১৩৯); মুসনাদে বাজ্জার (২৫৪০)।
৩. বুখারি (৫৯৮৬); মুসলিম (২৫৫৭); ইবনে হিব্বান (৪৩৯); বাজ্জার (৬৩১৬)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px