📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ও অনুধাবন জ্ঞান

📄 কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ও অনুধাবন জ্ঞান


আলোকিত অন্তরের অধিকারী আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য (তাকদির বিষয়ে) এটুকুই যথেষ্ট। এটাই জ্ঞানীদের স্তর। কারণ, জ্ঞান দুই প্রকার: বিদ্যমান জ্ঞান এবং অবিদ্যমান জ্ঞান। বিদ্যমান জ্ঞানকে অস্বীকার করা কুফর, ঠিক যেমন অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবি করা কুফর। আর ঈমানের মূল কথা হলো, বিদ্যমান জ্ঞান গ্রহণ করা, অবিদ্যমান জ্ঞানের অনুসন্ধান বর্জন করা।

বিদ্যমান জ্ঞান বলতে সেসব জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে যা কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত, অথবা মানুষের বিবেক-বোধ ও মস্তিষ্কের মাধ্যমে অর্জিত। যেমন: আল্লাহ ও পরকালের অস্তিত্ব, শরিয়তের হালাল- হারাম, আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি। এগুলো যেমন কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে জানা যায়, একইভাবে মানুষের সুস্থ বুদ্ধিমত্তা ও মস্তিষ্কও এগুলোর সত্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এসব বিষয়কে অস্বীকার করা কুফর। কারণ, এতে কুরআন-সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। অপরদিকে অবিদ্যমান জ্ঞান হচ্ছে অদৃশ্যের জ্ঞান যা মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। যেমন আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলির স্বরূপ, তাকদির, কিয়ামতের সময় নির্ধারণ ইত্যাদি। এসব জ্ঞানের দাবি করা কুফর। কারণ, এতে আল্লাহর বিশেষণকে নিজের জন্য দাবি করা হয়। ফলে এমন জ্ঞান কারও জন্য দাবি করা যাবে না; না নিজের জন্য, না নবি-রাসুলের জন্য। অনেক চরমপন্থি সুফি রাসুলকে আলিমুল গায়েব মনে করে। এটা সুস্পষ্ট গোমরাহি।¹ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيْمٌ خَبِيرٌ.
অর্থ: 'নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জানেন গর্ভাশয়ে যা থাকে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।' [লুকমান: ৩৪] আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহকে বলতে বলেন,
قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ "
অর্থ: 'আপনি বলুন, আকাশ ও জমিনে যারা আছে, তাদের কেউ গায়েব জানে না। গায়েব জানেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।' [নামল: ৬৫] অন্য একটি আয়াতে রাসুলুল্লাহকে বলতে বলেন,
وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ .
অর্থ: 'আমি যদি গায়েব জানতাম, তবে নিজের জন্য অধিক কল্যাণ সংগ্রহ করতাম।' [আরাফ: ১৮৮] হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল গায়েবের কিছু কিছু বিষয় জানেন, তবে সেটা শুধু সেগুলোই যেগুলো আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ
অর্থ: 'তাঁর জ্ঞান থেকে তারা কোনোকিছুই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন।' [বাকারা: ২৫৫] ফলে এটাকে গায়েব জানা বলে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম কিয়ামতের ক্ষণকাল জিজ্ঞাসা করেন, তিনি জবাব দেন, প্রশ্নকারীর চেয়ে যার কাছে প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি এ ব্যাপারে অতিরিক্ত কিছু জানেন না। অর্থাৎ এটা যেমন জিবরাইল জানেন না, তেমনইভাবে নবিজিও জানেন না।²

কুরআন-সুন্নাহ কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান অস্বীকার করা একধরনের অজ্ঞতা ও মূর্খতা বটে। যেমন: আল্লাহর অস্তিত্ব, পরকালের অস্তিত্ব— এগুলো কুরআন-সুন্নাহর বাইরে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল দ্বারাও সমর্থিত। কারণ, আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র একটা বস্তুও এমনি এমনি অস্তিত্বে আসে না, বরং আমাদের তৈরি করতে হয়। সেখানে এই বিশাল মহাজগৎ কীভাবে একজন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া সৃষ্টি হয়ে যাবে? একইভাবে এই পৃথিবীর জীবন যদি একমাত্র জীবন হয়, তা হলে পৃথিবীতে ন্যায়-নীতি ও মূল্যবোধ বলতে কিছুর অস্তিত্ব থাকত না। সে ব্যক্তিই সফল হিসেবে গণ্য হতো, যে জোর-জুলুম, হত্যা-অপহরণ, চুরি-লুণ্ঠন কিংবা যেকোনো পন্থায় মানুষকে ঠকিয়ে সবকিছু নিজে একা ভোগ করে। কারণ জীবন একটাই। পরবর্তী জীবন বলতে কোনোকিছুই নেই। সুতরাং এত মূল্যবোধ দিয়ে কী হবে? অথচ সেটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। ভালো কাজের প্রতিদান আর মন্দ কাজের শাস্তি জগতের চিরন্তন নিয়ম। তা হলে যেসব জালেম কিংবা অপরাধী কোনো প্রকার শাস্তি পাওয়া ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে, তাদের বিচারের কী হবে? এ কারনেই মৃত্যুর পরে একটা জীবন থাকা বাঞ্ছনীয়, যেখানে এসব অন্যায়-অত্যাচারের বিচার হবে।

একইভাবে তাকদিরের জ্ঞান অস্বীকার করা মূর্খতা। কারণ, বিশ্বজগতের কোটি কোটি মানুষ এবং অগণন প্রাণিকুলের মাঝে যদি শৃঙ্খলা বেঁধে দেওয়া না হয়, সুষ্ঠুভাবে সবকিছু বণ্টন করে দেওয়া না হয়, তবে গোটা পৃথিবীতে নৈরাজ্য লাগবে, বিশৃংঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং এটাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই।³ ইবনে উমর বলেন, আল্লাহর কসম! যদি কারও কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে, আর সে পুরোটা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে দেয়, আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না, যদি না সে তাকদিরে বিশ্বাস রাখে।⁴

আনুগত্যের সদিচ্ছা থাকলে স্বল্পজ্ঞান নিয়েও মানুষ বিশাল মহামানব হয়ে যেতে পারে। আর আনুগত্যের সদিচ্ছা না থাকলে জ্ঞানের জাহাজ নিয়েও কূপমণ্ডুক হতে পারে মানুষ। এ যুগে এসে অনেকেই কুরআন-সুন্নাহ ও অদৃশ্যে বিশ্বাসকে অন্ধবিশ্বাস ভাবে। তাদের মতে এটা পশ্চাৎপদতা, অতীতে পড়ে থাকা, প্রগতিশীলতা ও আলোকিত মননের বিরোধিতা। অথচ দিনশেষে এসব মানুষ নিজেরাই আধ্যাত্মিক, মানসিক, সামাজিক সকল দিক থেকে হতাশাগ্রস্ত, দুর্ভাগা, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। এ কারণে কুরআনকে মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত বলা হয়েছে [বাকারা: ২]। কারণ, যারা আল্লাহকে ভয় করে না, অদৃশ্যে বিশ্বাস রাখে না, ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক ও সীমাবদ্ধ বুদ্ধিই যাদের কাছে সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড, তারা কুরআন দ্বারাও হিদায়াত পাবে না। তাকদিরের বিষয়টাও তেমন। এটার স্বরূপ ও সর্বপ্রকার রহস্য না জানা থাকলেও অন্তজ্ঞানসম্পন্ন আল্লাহর প্রিয় মানুষদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। বিপরীতে মূর্খ ও কূপমণ্ডুকদের যত ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক, তাদের কাছে যতই স্পষ্ট করা হোক, তারা এটা অস্বীকারই করে যাবে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কুরআন-সুন্নাহে বিদ্যমান জ্ঞানের আনুগত্য করতে হবে, অদৃশ্যের জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে।

টিকাঃ
১. গজনবি (১০০); হারারি (১৪২)।
২. বুখারি (৫০); মুসলিম (৮)।
৩. সাইদ ফুদাহ (৮০৯-৮১০)।
৪. মুসলিম (৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 লাওহ ও কলম

📄 লাওহ ও কলম


তাকদিরের প্রতি ঈমান যেসব বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, তন্মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে লাওহে মাহফুজ ও কলমের উপর ঈমান আনা। এর অর্থ হচ্ছে—আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পূর্বে সবকিছু বিস্তারিত জেনেছেন, এরপর তিনি সেগুলো তাঁর জানা অনুযায়ী কলমের মাধ্যমে ঊর্ধ্ব জগতে লাওহে মাহফুজ নামক সুরক্ষিত ফলকে লিখে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা ওখানে যা লিখে রেখেছেন, জগতে সেগুলোই অক্ষরে অক্ষরে ঘটবে। কোনোকিছু চুল পরিমাণ এদিক-সেদিক হবে না। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাতে কী লেখা আছে জানে না—না কোনো ফেরেশতা কিংবা কোনো রাসুল। ফলে তাদের আল্লাহ যতটুকু জানান, ততটুকুই জানেন। সুতরাং কোনো ওলি-আউলিয়া লাওহে মাহফুজের খবর রাখবে—এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। প্রত্যেক মুমিনকে লাওহে মাহফুজে বিশ্বাস রাখতে হবে। যে এটাতে বিশ্বাস রাখবে না সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। আহলে সুন্নাতের সকলে এ ব্যাপারে সর্বসম্মত আকিদা রাখেন।

লাওহে মাহফুজকে শরিয়তে বিভিন্ন নাম আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কখনও ‘লাওহ’, কখনও ‘কিতাব’, কখনও ‘উম্মুল কিতাব’ কখনও ‘কিতাব মুবিন’ ইত্যাদি। কিন্তু সর্বত্রই এটাকে জগতের সবকিছুর তাকদির লিখে রাখার স্থান বোঝানো হয়েছে। কুরআনে অধিকাংশ জায়গায় এটাকে ‘কিতাব’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّমَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذُلِكَ فِي كِتَبٍ إِنَّ ذُلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ.
অর্থ: ‘আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ জানেন যা-কিছু আকাশে ও পৃথিবীতে আছে? নিশ্চয়ই এসব কিতাবে লিখিত আছে। এটা আল্লাহর জন্য সহজ।’ [হজ: ৭০]

অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَا مِنْ غَائِبَةٍ فِي السَّমَاءِ وَالْأَرْضِ إِلَّا فِي كِتَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোনো গোপন ভেদ নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে না আছে।’ [নামল: ৭৫]

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَ مَا تَتْلُوْا مِنْهُ مِنْ قُرْآنٍ وَلَا تَعْمَلُوْনَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا কُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُوْনَ فِيْهِ وَمَا يَعْزُبُ عَنْ رَبِّكَ مِنْ مِثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَلَا أَصْغَرَ مِنْ ذُلِكَ وَلَا أَكْبَرَ إِلَّا فِي كِتَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘বস্তুত যে অবস্থাতেই তুমি থাকো আর কুরআনের যে অংশ থেকেই পাঠ করো, কিংবা যে কাজই তোমরা করো, আমি তোমাদের নিকটে উপস্থিত থাকি যখন তোমরা তাতে মগ্ন হয়ে যাও। আর আকাশ কিংবা পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্র কণাও তোমার রবের কাছ থেকে গোপন থাকে না। আর এরচেয়ে বড় কিংবা ক্ষুদ্র যা-কিছু রয়েছে, সব সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ।’ [ইউনুস: ৬১]

অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ عِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَ يَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِতَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘তাঁর কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এগুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা আছে, তিনিই জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে গাছের পাতা ঝরে না। কোনো শস্যকণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না এবং কোনো আর্দ্র ও শুষ্ক (জীবিত ও মৃত) দ্রব্য নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে লিখিত নেই।’ [আনআম: ৫৯]

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَ مُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَبٍ مُّبِيْنٍ.
অর্থ: ‘আর পৃথিবীতে যত বিচরণশীল প্রাণী রয়েছে, সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমর্পিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে।’ [হুদ: ৬]

অন্য এক আয়াতে বলেন,
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَبٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَّبْرَاهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ.
অর্থ: ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের উপর যা-কিছু বিপদ আসে, তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ [হাদিদ: ২২]

সকল জিনিসের মতো লাওহে মাহফুজে কুরআনও লেখা আছে। আল্লাহ বলেন,
بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظٍ.
অর্থ: ‘বরং এটা সম্মানিত কুরআন, সুরক্ষিত ফলকে।’ [বুরুজ: ২১-২২]

একাধিক হাদিসে লাওহে মাহফুজের কথা এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সকল মাখলুকের তাকদির সৃষ্টি করেছেন। তখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে।’ আলি রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বাকিউল গারকাদে একটি জানাজায় ছিলাম। এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে এলেন। তিনি বসে গেলেন। আমরাও তাঁর চারপাশে বসে গেলাম। তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল। তিনি মাথা নুইয়ে লাঠি দ্বারা মাটিতে কিছু রেখা টানতে লাগলেন আর বললেন, ‘তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, এমন কোনো জীবিত আত্মা নেই জান্নাত কিংবা জাহান্নামে যার স্থান লেখা হয়নি, সে সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা হবে তা লেখা হয়নি।’ তখন কেউ বললেন, তাহলে কি আমরা তাকদিরের লিখনের উপর বসে থেকে আমল ছেড়ে দেবো না? কারণ, আমাদের ভিতরে যাকে সৌভাগ্যবানদের মাঝে লেখা হয়েছে, সে এমনিতেই সৌভাগ্যবানদের আমল করবে। আর যাকে দুর্ভাগাদের মাঝে লেখা হয়েছে, সে স্বাভাবিকভাবে দুর্ভাগাদের আমল করবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না, বরং যারা সৌভাগ্যবান, তাদের জন্য সৌভাগ্যের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে; আর যারা দুর্ভাগা, তাদের জন্য দুর্ভাগাদের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে।’ অতঃপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন:

ফাসাল্লামু আলাইহি... [লাইল: ৫-১০]

লাওহে মাহফুজের মাঝে আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টির ভাগ্য কলমের মাধ্যমে লিখেছেন। কুরআন ও সুন্নাহর অনেক জায়গায় এই কলমের বর্ণনা এসেছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কলমের নামে শপথ করেছেন এবং একটি সুরার নাম রেখেছেন ‘কলম’। আল্লাহ তায়ালা এই সুরার শুরুতে বলেন,
নুন। ওয়াল কলামি ওয়ামা ইয়াসতুরুন।
অর্থ: ‘নুন। শপথ কলমের আর সেই বিষয়ের যা তারা লিপিবদ্ধ করে।’ [কলম: ১]

সুরাকা ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা যেসব কাজ করছি, সেগুলো কি আগে থেকেই তাকদিরে লেখা হয়ে গিয়েছে, নাকি আমরা নতুন করে করছি? তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—না, তোমরা যা করছ সবকিছু লেখা হয়ে গিয়েছে; কলম শুকিয়ে গিয়েছে। তখন তিনি বললেন, তাহলে আমল করে কী লাভ? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমল করতে থাকো। প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে। উবাদা ইবনস সামিত রাজি. তার ছেলেকে বলেন, হে প্রিয় বৎস, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের মর্ম বোঝার স্বাদ উপলব্ধি করতে পারবে না, যতক্ষণ না এই বিশ্বাস রাখবে যে, তুমি যা পেয়েছ তা কখনও হারানোর ছিল না, আর যা হারিয়েছ তা কখনও পাওয়ারই ছিল না। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তুমি লেখো। কলম বলল, হে আমার প্রভু, আমি কী লিখবো? আল্লাহ বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টির সবকিছুর তাকদির লেখো। আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যে এই বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে না, সে আমার কেউ নয়।

টিকাঃ
১. মুসলিম (২৬৫৩)।
১. বুখারি (১৩৬২, ৪৯৪৮, ৪৯৪৯); মুসলিম (২৬৪৭)।
২. মুসলিম (২৬৪৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি

📄 আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি


উপরের হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন; অথচ অন্য কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, সর্বপ্রথম আরশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সকল মাখলুকের তাকদির সৃষ্টি করেছেন। তখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে। আরেকটি হাদিসে যখন আবু রাজিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, জগৎ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গে কেউ ছিল না (কান ফি আমা)। উপরে ও নিচে কোনো বায়ু ছিল না। অতঃপর তিনি পানির উপর আরশ সৃষ্টি করেছেন। উক্ত হাদিসগুলোতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, কলম সৃষ্টির আগে আরশ থাকার কথা বলা হচ্ছে। এ কারণে ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম-সহ অনেক আলিমের মতে, কলম নয়, আরশ আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। আবার ইমাম তাবারি, ইবনে হাজার আসকালানি, ইবনে রজব হাম্বলি-সহ অনেকের মতে, সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ, বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, আল্লাহর আরশ ছিল পানির উপর। ফলে আরশ সৃষ্টির সময় পানি ছিল না এটা হতে পারে না, বরং পানি আরশের আগে (কিংবা নিদেনপক্ষে) একসঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া আরেকটি হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে, সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবনে রজব লিখেন, সকল সৃষ্টির মূল উপকরণ পানি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস-সহ অনেক সালাফ থেকে এমন বক্তব্য বর্ণিত আছে। সে হিসেবে অগ্রগণ্য কথা হচ্ছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশ, অতঃপর কলম, অতঃপর অন্যান্য সৃষ্টি। আর কলমকে যে হাদিসে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে, উলামায়ে কেরাম সেটার দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক. আরশ ও পানি ব্যতীত অন্যান্য সৃষ্টির দিকে লক্ষ করে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে। দুই. বাক্যের অর্থ ভিন্নভাবে তোলা হবে। তখন অর্থ হবে—কলম সৃষ্টির পরে সর্বপ্রথম নির্দেশ দিয়েছেন ‘তুমি লেখো’। এক্ষেত্রে কলম কখন সৃষ্টি হয়েছে এ ব্যাপারে হাদিসে কোনো বক্তব্য থাকবে না। ফলে অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে বৈপরীত্যও থাকবে না।

টিকাঃ
১. তারিখে তাবারি (১/৪০)।
২. ইবনে হিব্বান (২৫৫৯); মুসনাদে আহমদ (৮০৪৭)।
৩. বিস্তারিত দেখুন: লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনে রজব (২১-২২)।
৪. ফাতহুল বারি (৬/২৮৯); ইবনে আবিল ইজ (২৪২); আকহাসারি (১৭১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 তাকদির লেখার ধারাক্রম

📄 তাকদির লেখার ধারাক্রম


তাকদির লেখার কয়েকটি ধাপ রয়েছে। একটা হচ্ছে লাওহে মাহফুজের লিখন, যা সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সম্পন্ন হয়েছে। আরেকটি হচ্ছে প্রত্যেকের মাতৃগর্ভের লিখন। একাধিক হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। যখন মাতৃগর্ভে বীর্য ৪০ দিন অথবা ৪০ রাত অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি বলেন—হে রব, তার রিজিক কী হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, তার জন্মকাল কতটুকু হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, নারী হবে নাকি পুরুষ হবে? তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন—হে রব, সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা? তাকে জানিয়ে দেওয়া। এটা ফেরেশতাদের জন্য নতুন হলেও আল্লাহর জন্য নতুন নয়। কারণ, এগুলো সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত ‘লাওহে মাহফুজে’ লিখিত আছে। তৃতীয় আরেকটি স্তর হচ্ছে বাৎসরিক লিখন। এটাও প্রথম ও দ্বিতীয় লিখনের শাখা। লাইলাতুল কদরে এক বছরের জন্য প্রত্যেক সৃষ্টির জীবন, রিজিক-সহ সবকিছু লেখা হয় [দুখান: ১-৪]।

টিকাঃ
৫. মুসলিম (২৬৪৩)।
৬. মুসনাদে আহমদ (১৫৫০২)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px