📄 কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ও অনুধাবন জ্ঞান
আলোকিত অন্তরের অধিকারী আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য (তাকদির বিষয়ে) এটুকুই যথেষ্ট। এটাই জ্ঞানীদের স্তর। কারণ, জ্ঞান দুই প্রকার: বিদ্যমান জ্ঞান এবং অবিদ্যমান জ্ঞান। বিদ্যমান জ্ঞানকে অস্বীকার করা কুফর, ঠিক যেমন অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবি করা কুফর। আর ঈমানের মূল কথা হলো, বিদ্যমান জ্ঞান গ্রহণ করা, অবিদ্যমান জ্ঞানের অনুসন্ধান বর্জন করা।
বিদ্যমান জ্ঞান বলতে সেসব জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে যা কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত, অথবা মানুষের বিবেক-বোধ ও মস্তিষ্কের মাধ্যমে অর্জিত। যেমন: আল্লাহ ও পরকালের অস্তিত্ব, শরিয়তের হালাল- হারাম, আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি। এগুলো যেমন কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে জানা যায়, একইভাবে মানুষের সুস্থ বুদ্ধিমত্তা ও মস্তিষ্কও এগুলোর সত্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এসব বিষয়কে অস্বীকার করা কুফর। কারণ, এতে কুরআন-সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। অপরদিকে অবিদ্যমান জ্ঞান হচ্ছে অদৃশ্যের জ্ঞান যা মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। যেমন আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলির স্বরূপ, তাকদির, কিয়ামতের সময় নির্ধারণ ইত্যাদি। এসব জ্ঞানের দাবি করা কুফর। কারণ, এতে আল্লাহর বিশেষণকে নিজের জন্য দাবি করা হয়। ফলে এমন জ্ঞান কারও জন্য দাবি করা যাবে না; না নিজের জন্য, না নবি-রাসুলের জন্য। অনেক চরমপন্থি সুফি রাসুলকে আলিমুল গায়েব মনে করে। এটা সুস্পষ্ট গোমরাহি।¹ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيْمٌ خَبِيرٌ.
অর্থ: 'নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জানেন গর্ভাশয়ে যা থাকে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।' [লুকমান: ৩৪] আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহকে বলতে বলেন,
قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ "
অর্থ: 'আপনি বলুন, আকাশ ও জমিনে যারা আছে, তাদের কেউ গায়েব জানে না। গায়েব জানেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।' [নামল: ৬৫] অন্য একটি আয়াতে রাসুলুল্লাহকে বলতে বলেন,
وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ .
অর্থ: 'আমি যদি গায়েব জানতাম, তবে নিজের জন্য অধিক কল্যাণ সংগ্রহ করতাম।' [আরাফ: ১৮৮] হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল গায়েবের কিছু কিছু বিষয় জানেন, তবে সেটা শুধু সেগুলোই যেগুলো আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ
অর্থ: 'তাঁর জ্ঞান থেকে তারা কোনোকিছুই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন।' [বাকারা: ২৫৫] ফলে এটাকে গায়েব জানা বলে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম কিয়ামতের ক্ষণকাল জিজ্ঞাসা করেন, তিনি জবাব দেন, প্রশ্নকারীর চেয়ে যার কাছে প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি এ ব্যাপারে অতিরিক্ত কিছু জানেন না। অর্থাৎ এটা যেমন জিবরাইল জানেন না, তেমনইভাবে নবিজিও জানেন না।²
কুরআন-সুন্নাহ কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান অস্বীকার করা একধরনের অজ্ঞতা ও মূর্খতা বটে। যেমন: আল্লাহর অস্তিত্ব, পরকালের অস্তিত্ব— এগুলো কুরআন-সুন্নাহর বাইরে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল দ্বারাও সমর্থিত। কারণ, আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র একটা বস্তুও এমনি এমনি অস্তিত্বে আসে না, বরং আমাদের তৈরি করতে হয়। সেখানে এই বিশাল মহাজগৎ কীভাবে একজন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া সৃষ্টি হয়ে যাবে? একইভাবে এই পৃথিবীর জীবন যদি একমাত্র জীবন হয়, তা হলে পৃথিবীতে ন্যায়-নীতি ও মূল্যবোধ বলতে কিছুর অস্তিত্ব থাকত না। সে ব্যক্তিই সফল হিসেবে গণ্য হতো, যে জোর-জুলুম, হত্যা-অপহরণ, চুরি-লুণ্ঠন কিংবা যেকোনো পন্থায় মানুষকে ঠকিয়ে সবকিছু নিজে একা ভোগ করে। কারণ জীবন একটাই। পরবর্তী জীবন বলতে কোনোকিছুই নেই। সুতরাং এত মূল্যবোধ দিয়ে কী হবে? অথচ সেটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। ভালো কাজের প্রতিদান আর মন্দ কাজের শাস্তি জগতের চিরন্তন নিয়ম। তা হলে যেসব জালেম কিংবা অপরাধী কোনো প্রকার শাস্তি পাওয়া ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে, তাদের বিচারের কী হবে? এ কারনেই মৃত্যুর পরে একটা জীবন থাকা বাঞ্ছনীয়, যেখানে এসব অন্যায়-অত্যাচারের বিচার হবে।
একইভাবে তাকদিরের জ্ঞান অস্বীকার করা মূর্খতা। কারণ, বিশ্বজগতের কোটি কোটি মানুষ এবং অগণন প্রাণিকুলের মাঝে যদি শৃঙ্খলা বেঁধে দেওয়া না হয়, সুষ্ঠুভাবে সবকিছু বণ্টন করে দেওয়া না হয়, তবে গোটা পৃথিবীতে নৈরাজ্য লাগবে, বিশৃংঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং এটাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই।³ ইবনে উমর বলেন, আল্লাহর কসম! যদি কারও কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে, আর সে পুরোটা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে দেয়, আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না, যদি না সে তাকদিরে বিশ্বাস রাখে।⁴
আনুগত্যের সদিচ্ছা থাকলে স্বল্পজ্ঞান নিয়েও মানুষ বিশাল মহামানব হয়ে যেতে পারে। আর আনুগত্যের সদিচ্ছা না থাকলে জ্ঞানের জাহাজ নিয়েও কূপমণ্ডুক হতে পারে মানুষ। এ যুগে এসে অনেকেই কুরআন-সুন্নাহ ও অদৃশ্যে বিশ্বাসকে অন্ধবিশ্বাস ভাবে। তাদের মতে এটা পশ্চাৎপদতা, অতীতে পড়ে থাকা, প্রগতিশীলতা ও আলোকিত মননের বিরোধিতা। অথচ দিনশেষে এসব মানুষ নিজেরাই আধ্যাত্মিক, মানসিক, সামাজিক সকল দিক থেকে হতাশাগ্রস্ত, দুর্ভাগা, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। এ কারণে কুরআনকে মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত বলা হয়েছে [বাকারা: ২]। কারণ, যারা আল্লাহকে ভয় করে না, অদৃশ্যে বিশ্বাস রাখে না, ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক ও সীমাবদ্ধ বুদ্ধিই যাদের কাছে সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড, তারা কুরআন দ্বারাও হিদায়াত পাবে না। তাকদিরের বিষয়টাও তেমন। এটার স্বরূপ ও সর্বপ্রকার রহস্য না জানা থাকলেও অন্তজ্ঞানসম্পন্ন আল্লাহর প্রিয় মানুষদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। বিপরীতে মূর্খ ও কূপমণ্ডুকদের যত ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক, তাদের কাছে যতই স্পষ্ট করা হোক, তারা এটা অস্বীকারই করে যাবে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কুরআন-সুন্নাহে বিদ্যমান জ্ঞানের আনুগত্য করতে হবে, অদৃশ্যের জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে।
টিকাঃ
১. গজনবি (১০০); হারারি (১৪২)।
২. বুখারি (৫০); মুসলিম (৮)।
৩. সাইদ ফুদাহ (৮০৯-৮১০)।
৪. মুসলিম (৮)।