📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল

📄 সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল


এটা মূলত হাদিসের বক্তব্য। উপরে এ সংক্রান্ত সাহল বিন সাদ রাজি.-এর হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। বুখারি-সহ বিভিন্ন গ্রন্থে হাদিসটি এসেছে। সবগুলোর মর্মার্থ হচ্ছে, মানুষের নিজের ভালো কাজ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভোগা উচিত। বরং কর্তব্য হলো সারাজীবন হকের উপর অটল থাকার চেষ্টা করে যাওয়া: অলসতা ও অবহেলা না করা। কারণ, কার মৃত্যু কোন অবস্থায় হবে, ঈমান নাকি কুফরের উপর, পুণ্য নাকি গুনাহের উপর এটা কারও জানা নেই। ফলে সবসময় আনুগত্যের উপর থাকা আবশ্যক। কেননা পরকালের পরিণতি শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল।

ইমাম তিরমিজির বর্ণনায় এ-রকম একটি হাদিস দেখলে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের প্রত্যেকের মায়ের গর্ভে সর্বপ্রথম তার সৃষ্টি প্রকাশ পায় চল্লিশ দিনে। এর পরের চল্লিশ দিনে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। এর পর চল্লিশ দিনে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। তখন আল্লাহ তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠান যে তার ভিতরে রুহ ফুঁকে দেয় এবং চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করে: রিজিক, মৃত্যু, আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা। ওই সত্তার শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তোমাদের কেউ জীবনভর জান্নাতের আমল করতে থাকে, এর পর যখন জান্নাত এবং তার মাঝে মাত্র এক হাত বাকি থাকে, ওই সময় ভাগ্যলিপি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তার সর্বশেষ আমল হয় জাহান্নামিদের আর সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ সারা জীবন জাহান্নামের আমল করে। পরিশেষে যখন তার মাঝে ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, ভাগ্যলিপি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তার জীবনের শেষ আমল হয় জান্নাতিদের আর সে জান্নাতে প্রবেশ করে।'¹ এ কারণে ইমাম তিরমিজি উক্ত হাদিসের শিরোনাম লিখেছেন 'সকল আমল শেষ পরিণতির উপর নির্ভরশীল'।

উক্ত হাদিসের তাৎপর্য বান্দার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার জীবনের শেষ মুহূর্তে তাকে জান্নাতি কিংবা জাহান্নামি বানানো নয়; জীবনের শেষ সময়ে তাকদিরের মাধ্যমে কারও সারা জীবনের আমল বরবাদ করে তাকে জুলুম করা নয়; বরং হাদিসের তাৎপর্য হলো, মানবজীবনের সর্বশেষ মুহূর্তের গুরুত্ব তুলে ধরা। অর্থাৎ কোন পরিস্থিতিতে মানুষের মৃত্যু হবে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবসময় ভালো কাজের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বৃদ্ধ হলে তাওবা করব, ঠিক হয়ে যাবো—এমন চিন্তা চরম নির্বুদ্ধিতা। যেখানে এক মুহূর্ত পরে তার পরিণতি সম্পর্কে কেউ জানে না, সেখানে কবে বৃদ্ধ হবে আর তাওবা করবে সেটার নিশ্চয়তা তাকে কে দেবে?

আর হাদিসে জীবনের শেষ মুহূর্তে ভাগ্যলিপি এসে যে ফারাক তৈরি করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, এখানে বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং এই হাদিসকেও পিছনের হাদিসগুলোর মতো বুঝতে হবে। অর্থাৎ কোনো লোক সারা জীবন ভালো কাজ করেছে, জীবনের শেষ মুহূর্তেও সে ভালো কাজ করে জান্নাতে যেত, কিন্তু আল্লাহ ভাগ্যের মাধ্যমে তাকে জান্নাত থেকে ঘুরিয়ে জাহান্নামে ছুড়ে ফেললেন—তেমন নয়; বরং আল্লাহ জানতেন যে, সারা জীবন ভালো কাজ করার পরেও মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জাহান্নামিদের কাজ করে জাহান্নামে যাবে। ফলাফলে এর দায়ভার আল্লাহ নন, সে নিজে বহন করবে।

সারা জীবন খারাপ কাজ করে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জান্নাতি, আর সারা জীবন ভালো কাজ করে শেষ মুহূর্তে জাহান্নামি হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন: নিষ্ঠাহীনতা, লৌকিকতা কিংবা অন্য যেকোনো অপরাধে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চনা এবং শেষে নিজ কর্মফলে পথ হারানো। অপরদিকে সারা জীবন খারাপ কাজ করে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ভালো কাজ করারও অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন নিষ্ঠা, বিনয় কিংবা যেকোনো সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হওয়া এবং ফলাফলে জাহান্নাম থেকে বেঁচে যাওয়া। তবে আল্লাহর অনুগ্রহে পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম হলো, যিনি সারা জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্য করেন, তার মৃত্যু আনুগত্যের উপরেই হয়। আর যে সারা জীবন আল্লাহর অবাধ্য থাকে, গুনাহের কাজ করে, তার মৃত্যু মন্দের উপর হয়।

টিকাঃ
১. তিরমিজি (২১৩৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে

📄 সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে


উপরে উল্লিখিত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি.-এর হাদিস এই মূলনীতির ভিত্তি।¹ ইবনে মাসউদ ছাড়া অন্যান্য সাহাবি থেকেও বিভিন্ন গ্রন্থে হাদিসটি এসেছে। আনাস ইবনে মালেক রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা মাতৃগর্ভে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত রাখেন। তিনি বলেন, হে প্রভু বীর্য, হে প্রভু রক্তপিণ্ড, হে প্রভু মাংসপিণ্ড। এর পর যখন সৃষ্টির সর্বশেষ ধাপ সম্পন্ন করার সময় আসে, তখন তিনি বলেন, হে প্রভু পুরুষ নাকি নারী? সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা? রিজিক ও জীবনকাল কী? এভাবে সবকিছু মায়ের পেটে থাকতেই লেখা হয়।² জাবের রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন মাতৃগর্ভে বীর্য ৪০ দিন অথবা ৪০ রাত অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি বলেন, হে রব, তার রিজিক কী হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন, হে রব, তার জন্মকাল কতটুকু হবে? তাকে বলে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন, হে রব, নারী হবে নাকি পুরুষ হবে? তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্ন করেন, হে রব, সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা? তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়।³

এই হাদিসগুলোকে পূর্বের হাদিসগুলোর মতো একই মূলনীতিতে বুঝতে হবে। সেটা হলো, আল্লাহ তায়ালা মানুষের পেটে থাকা অবস্থায় সৌভাগ্যবান অথবা দুর্ভাগা লিখে দেন, এর পর পৃথিবীতে এসে সে রোবটের মত তা-ই করে—ব্যাপারটা এমন নয়। এমন হলে তো বান্দার কোনো দোষ থাকে না। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। সুতরাং তাঁর জন্মের আগেই যদি সে সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা লেখা হয়ে যায়, তবে আল্লাহর সেই লেখার বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। বোঝা গেল, হাদিসগুলোর উদ্দেশ্য বাহ্যিক অর্থ নয়; বরং অভ্যন্তরীণ মর্ম। আর তা হলো, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। সে চাইলে ঈমান ও কুফর, তাওহিদ ও শিরক—এগুলোর মাঝে যেকোনো একটা নিজ ইচ্ছায় বেছে নিতে পারে। আল্লাহ তায়ালা যেহেতু সবকিছু জানেন, তাই প্রত্যেক সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার আগেই সে কোনটা বেছে নেবে তা খুব ভালোভাবে জানেন এবং সেটা লিখে রাখেন। কিন্তু ফেরেশতা যেহেতু জানেন না, তাই প্রশ্ন করে জেনে নেন। সুতরাং কাউকে সৌভাগ্যবান আর কাউকে দুর্ভাগা লেখার অর্থ হলো—যিনি সৌভাগ্যবান হবেন, তিনি তার নিজ কর্ম ও আল্লাহর অনুগ্রহে সৌভাগ্যবান হবেন; আর যে দুর্ভাগা হবে, সে নিজের কর্ম ও আল্লাহর ইনসাফের কারণে দুর্ভাগা হবে। আল্লাহ তায়ালা যেহেতু সবকিছু জানেন, তিনি তা লিখে রেখেছেন এবং তিনি চাইলে নিজ অনুগ্রহে যে কাউকে সৌভাগ্যবান করতে পারেন, আবার ইনসাফের ভিত্তিতে যে কাউকে দুর্ভাগা বানাতে পারেন, এ জন্যই মূলত সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের ফয়সালা তার দিকেই সম্পৃক্ত করা হয়।

টিকাঃ
১. তিরমিজি (২১৩৭)।
২. বুখারি (৩১৮, ৩৩৩৩)।
৩. মুসনাদে আহমদ (১৫৫০২)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 তাকদির নিয়ে অতিরিক্ত অনুসন্ধিৎসা নিষিদ্ধ

📄 তাকদির নিয়ে অতিরিক্ত অনুসন্ধিৎসা নিষিদ্ধ


তাকদির সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে আল্লাহর এক গোপন রহস্য। আল্লাহর নিকটবর্তী কোনো ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত নবিরও এ সম্পর্কে জ্ঞান নেই; বরং এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি এবং অধিক চিন্তাভাবনা দুর্ভাগ্য বয়ে আনে, বঞ্চিত করে, অবাধ্যতার পথে নিয়ে যায়। সুতরাং তাকদির নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা এবং মনের কুমন্ত্রণার ব্যাপারে পূর্ণ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের কাছ থেকে তাকদিরের জ্ঞান ঢেকে রেখেছেন। এর পিছনে পড়তে নিষেধ করেছেন। যেমন: তিনি বলেছেন, 'তিনি যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন না, কিন্তু তারা যা করে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।' সুতরাং কেউ যদি বলে, 'তিনি কেন এটা করলেন', তবে সে আল্লাহর কিতাবের আইনকে অমান্য করল। আর যে আল্লাহর কিতাবের আইন অমান্য করে, সে কাফের।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমামদের সর্বসম্মতিক্রমে তাকদির একটি রহস্যপূর্ণ বিষয়, যা সৃষ্টির সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়ের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের কাছ থেকে তাকদিরের জ্ঞান ঢেকে রেখেছেন। এর পিছনে পড়তে নিষেধ করেছেন। ফলে এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে যতটুকু এসেছে, ততটুকুতে ঈমান আনার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে। যে ব্যক্তি এক্ষেত্রে দুঃসাহসিকতা দেখাবে, সে হোঁচট খাবে। সত্যের পথ থেকে পা পিছলে গোমরাহির গহ্বরে নিপতিত হবে। কারণ কুরআন-সুন্নাহে তাকদির নিয়ে বিভিন্ন মূলনীতির উল্লেখ থাকলেও মানুষের মনে উত্থাপিত সকল প্রশ্নের জবাব নেই তাতে, কিংবা থাকলেও মানুষের সেগুলো বোঝার সামর্থ্য নেই। কেননা এটা বোঝার মেশিনই দেওয়া হয়নি মানুষকে। এ কারণে বরং কুরআনের অনেক আয়াতের রহস্য নিয়ে মানুষ কূল-কিনারা করতে পারবে না। যেমন: আল্লাহর বাণী:
وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَٰكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.
অর্থ: 'আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেককে হিদায়াত দিতাম; কিন্তু আমার এ উক্তি অবধারিত সত্য যে, আমি অবশ্যই জিন ও মানব সকলকে দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করব।' [সাজদা: ১৩] আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَآمَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا ۚ أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ.
অর্থ: 'আপনার রব যদি চাইতেন, তবে ভূপৃষ্ঠের সবাই সামগ্রিকভাবে মুমিন হয়ে যেত। অতএব, আপনি কি মানুষকে মুমিন হওয়ার জন্য বাধ্য করবেন?' [ইউনুস: ৯৯] অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ ۖ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ ۚ كَذَٰلِكَ يَجْعَلُ اللَّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ.
অর্থ: 'আল্লাহ যাকে হিদায়াত দিতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন; আর যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এভাবেই যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, আল্লাহ তাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করেন।' [আনআম: ১২৫]

মুফাসসিরগণ বিভিন্নভাবে এসব আয়াতের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা যদি এসব আয়াতের গভীরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, আসলেই আল্লাহ কেন দুনিয়ার সবাইকে মুমিন বানাতে চাননি? কেন আল্লাহ তার সৃষ্টি করা একদল মানুষ ও জিনকে দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করবেন? দুনিয়াতে ভালো-মন্দের অস্তিত্ব কেন? তিনি চাইলে কেবল ভালো দিয়েও তো দুনিয়ার জীবন বৈচিত্র্যময় করে সাজাতে পারতেন, যেহেতু তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন। আমাদের তিনি কেন পরীক্ষা করলেন? তিনি চাইলে আমাদের পরীক্ষা ছাড়াও তো জান্নাত দিতে পারতেন, যেহেতু তিনি জানেন অধিকাংশ মানুষই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না, ফলে তাদের চিরস্থায়ী জাহান্নামে যেতে হবে। তা হলে এমন পরীক্ষা করার কী প্রয়োজন ছিল? তাদের সৃষ্টি না করলেই কি তাদের প্রতি অনুগ্রহ হতো না? কারণ, তাদের কেউ তো আল্লাহর কাছে নিজেকে সৃষ্টির আবেদন করেনি। কেউ জান্নাতে গেলে যদি তাঁর ক্ষতি না হয় এবং জাহান্নামে গেলে তাঁর লাভ না হয়, তা হলে জাহান্নাম সৃষ্টিরই-বা কী দরকার ছিল? নাউজুবিল্লাহ!

এগুলো নিতান্তই কিছু উদাহরণ। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, এই পথে চলতে থাকলে এ-রকম প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসতেই থাকবে, যে প্রশ্নের কোনো শেষ নেই, যে অন্ধকারের কোনো সীমা নেই। ধীরে ধীরে এভাবে মানুষ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। হয়তো বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে, কিন্তু এগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ও চূড়ান্ত উত্তর মানবীয় সামর্থ্য-সীমার ঊর্ধ্বের বিষয়। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই কোনো-না-কোনো হিকমতের কারণে করেছেন। কিন্তু মানুষের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা জানতে ও মানতে হবে। এটার নামই ঈমান। যে এক্ষেত্রে আত্মম্ভরিতা দেখাবে, নিজের জ্ঞান নিয়ে অতি অহংকারী হবে, তার ধ্বংস অনিবার্য।

এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন, সালাফ ও খালাফ সকল যুগেই উলামায়ে কেরাম মানুষকে তাকদির নিয়ে অতিরিক্ত অনুসন্ধান ও ঘাঁটাঘাঁটি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। কুরআন ও সুন্নাহে এ ব্যাপারে যা এসেছে, ততটুকুর মাঝে ঈমান এনে সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক মনে করেন। যারা তাদের নিষেধাজ্ঞা শুনেছে, তাকদিরের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বক্তব্যের মাঝে সন্তুষ্ট থেকেছে, অতিরিক্ত অনুসন্ধান ও বিবেক-বুদ্ধি খাটানো থেকে বিরত থেকেছে, তারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে, মুক্তি পেয়েছে। বিপরীতে যারা এসব নিষেধাজ্ঞায় কর্ণপাত করেনি, কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নিজের সীমাবদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বিবেক-বুদ্ধিকে মানদণ্ড ধরে এই সুপ্ত সুড়ঙ্গে প্রবেশের দুঃসাহস দেখিয়েছে, তারা এর অন্ধকারে হারিয়ে গেছে, কখনও বের হতে পারেনি। এ কারণে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন সম্প্রদায় এটা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে ধ্বংস হয়েছে। যদি এটা বোঝা এত সহজই হতো, এতগুলো সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হতো না।

আবু হুরাইরা রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের মাঝে বের হলেন। তখন আমরা তাকদির নিয়ে বিবাদ করছিলাম। তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তাঁর মুখ লাল হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল সেখানে ডালিম নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, 'তোমাদের কি এটা করতে বলা হয়েছে? আমি কি এটা নিয়ে তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি? তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তখনই ধ্বংস হয়েছিল যখন এটা নিয়ে তারা বিতর্ক শুরু করেছিল। তাই আমি তোমাদের কঠোরভাবে এটা নিয়ে বিতর্ক করতে নিষেধ করে দিচ্ছি।'¹ ইমাম তিরমিজি উক্ত অধ্যায়ের শিরোনাম লিখেছেন 'তাকদির নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি ও খোঁড়াখুঁড়ি নিষিদ্ধ'।

আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে দেখলেন সাহাবাগণ তাকদির নিয়ে কথা বলছেন। তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন। মনে হচ্ছিল তার মুখে ডালিম নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি তাদের লক্ষ্য করে বললেন, 'কী ব্যাপার? তোমরা আল্লাহর কিতাবের একটি অংশকে অপর অংশের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছ কেন? এভাবেই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।' বর্ণনাকারী বলেন, আমি কোনো দিন রাসুলুল্লাহর কোনো মজলিসে অনুপস্থিত থেকে খুশি হইনি, যতটা খুশি সেদিন হয়েছিলাম (কারণ তিনি রাসুলুল্লাহর ক্রোধ থেকে বেঁচে গিয়েছেন)।² আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও সাওবান থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন তাকদির নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখন সেটা থেকে বিরত থাকো।'³

ইমাম আজুররি (মৃ. ৩৬০ হি.) লিখেন, মুসলমানদের তাকদির নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা উচিত নয়। কেননা তাকদির আল্লাহর একটি রহস্য। তাই ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়—এতটুকুতে ঈমান আবশ্যক। এর বাইরে কেউ চিন্তা করতে গেলে তাকদিরের যেকোনো বিষয় অস্বীকার করে বসতে পারে; আর এভাবে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে।⁴

ইবনে আবদুল বার (৪৬৩ হি.) লিখেন, 'তাকদির আল্লাহর রহস্য। অনুসন্ধান কিংবা বিবাদের মাধ্যমে এটা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। দলিল-প্রমাণ ও মুনাজারার মাধ্যমে এ সম্পর্কে পূর্ণ তৃপ্তিলাভ সম্ভব নয়। তাই মুমিনের জন্য এক্ষেত্রে যথেষ্ট হচ্ছে, সে বিশ্বাস করবে—জগতে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনোকিছুই হয় না। সৃষ্টি ও নির্দেশ আল্লাহরই। আরও বিশ্বাস রাখবে—আল্লাহ কাউকে বিন্দু পরিমাণ জুলুম করেন না; কারও উপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। তিনি পরম করুণাময়, দয়ার সাগর।⁵

সামআনি (মৃ. ৪৮৯ হি.) বলেন, 'তাকদির সম্পর্কে জানার একমাত্র মাধ্যম হলো কুরআন ও সুন্নাহ। বিবেক-বুদ্ধি কিংবা অনুমান খাটিয়ে এটা জানা সম্ভব নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সে বিভ্রান্ত হবে। হতবুদ্ধিতার সাগরে ঘুরতে থাকবে; কখনোই সমাধানের সৈকতে পৌঁছাতে পারবে না; কখনোই তার হৃদয় প্রশান্ত হবে না। কারণ, তাকদির আল্লাহর একটি গোপন বিষয়, যার জ্ঞান তাঁর কাছেই রয়েছে। বিশেষ হিকমতের কারণে গোটা সৃষ্টি থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। যে কারণে কোনো নবি-রাসুল কিংবা ফেরেশতা পর্যন্ত এ সম্পর্কে কিছু জানতে সক্ষম হননি। বলা হয়, তাকদিরের রহস্য জান্নাতে গেলে উদঘাটিত হবে। জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত এ রহস্য উদঘাটিত হবে না।⁶

বরং মুসলিম উম্মাহর মাঝে কিছু মানুষ যে তাকদিরের ক্ষেত্রে বিচ্যুতির শিকার হবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটার ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাজি. বলেন আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, 'নিশ্চয়ই আমার উম্মতের ভিতরে এমন কিছু সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা তাকদির অস্বীকার করবে।'⁷ ইবনে উমর থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'শেষ যুগে একটি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা তাকদির অস্বীকার করবে। সাবধান! তারা এই উম্মতের অগ্নিপূজারী (মাজুস)। তারা অসুস্থ হলে তোমরা দেখতে যাবে না, মৃত্যুবরণ করলে (জানাজা/কাফন/দাফনে) উপস্থিত হবে না।'⁸

টিকাঃ
১. তিরমিজি (২১৩৩); মুসানদে আবু ইয়ালা (৬০৪৫); বাজ্জার (১০০৬৩); মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (৯৭৩৭)।
২. মুসনাদে আহমদ (৬৭৭৯)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৪২৭, ১০৪৪৮); আল-মাতালিবুল আলিয়াহ (২৯৫৬)।
৪. আশ-শরিয়াহ (২/৭০২)।
৫. আত-তামহিদ (৩/১৩৯)।
৬. ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার (১১/৪৭৭)।
৭. আবু দাউদ (৪৬১৩); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (২০৯৪০); মুসতাদরাকে হাকেম (২৮৪)।
৮. তাবারানি, আল-মুজামুস সাগির (৮০০); আল-আওসাত (৫৩০৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 তাকদির নিয়ে প্রশ্ন করার বিধান

📄 তাকদির নিয়ে প্রশ্ন করার বিধান


ইমাম তহাবির বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী তাকদির নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কারণ, তিনি বলেছেন, 'তিনি (আল্লাহ) যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন না, কিন্তু তারা যা করে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।' সুতরাং কেউ যদি বলে, 'তিনি কেন এটা করলেন', তবে সে আল্লাহর কিতাবের আইন অমান্য করল। আর যে আল্লাহর কিতাবের আইন অমান্য করে, সে কাফের। এর মানে কি এটা যে, কোনো ব্যক্তি তাকদিরের যেকোনো বিষয় নিয়ে যদি বলে 'এটা আল্লাহ কেন করলেন', তা হলে কাফের হয়ে যাবে? এটা ইমাম তহাবির কথার বাহ্যিক অর্থ। কিন্তু প্রকৃত মর্ম অন্যরকম। তাকদির নিয়ে আলোচনাই করা যাবে না-এমন নয়। কারণ, এমন হলে কুরআন-সুন্নাহে তাকদির নিয়ে এত আলোচনা থাকত না। বরং বিভিন্ন বর্ণনায় আমরা দেখি স্বয়ং তাবেয়িরা সাহাবাদের তাকদির নিয়ে প্রশ্ন করছেন, আর সাহাবারা সেগুলোর জবাব দিচ্ছেন।¹ ইমাম তহাবির কথার অর্থ হচ্ছে, তাকদির নিয়ে অন্যায়ভাবে বিতর্ক ও অমূলক কথা বলা যাবে না; না জেনে অনুমান-নির্ভর বক্তব্য দেওয়া যাবে না; আল্লাহর কোনো সিদ্ধান্তের উপর আপত্তি তোলা যাবে না। ইবনে আবদুল বার বলেন, যে ব্যক্তি জানার জন্য এবং নিজের অজ্ঞতা দূর করার জন্য দ্বীনি প্রয়োজনে প্রশ্ন করবে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ, অজ্ঞতার চিকিৎসা প্রশ্নই। কিন্তু যে ব্যক্তি জানার উদ্দেশ্যে নয়, বরং হঠকারিতামূলক প্রশ্ন করবে, এমন প্রশ্ন বৈধ নয়।²

টিকাঃ
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১০৫৬৪)।
২. আত-তামহিদ (২১/২৯২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00