📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 রুহের জগতের অঙ্গীকার

📄 রুহের জগতের অঙ্গীকার


আল্লাহ তায়ালা আদম আলাইহিস সালাম এবং তার সন্তানদের কাছ থেকে যে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন, তা সত্য। অনাদিকাল থেকেই আল্লাহ তায়ালা বিস্তারিত জানেন কতজন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং কতজন জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সুতরাং তাতে প্রবেশকারীদের সংখ্যা কোনো ধরনের কমবেশি হবে না। একইভাবে পৃথিবীতে কে কী কাজ করবে আল্লাহ তায়ালা তাও জেনে রেখেছেন। ফলে প্রত্যেককে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল। তাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান হচ্ছে সে ব্যক্তি, আল্লাহ তায়ালা যার কপালে সৌভাগ্য লিখে রেখেছেন। আর দুর্ভাগা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা যার কপালে দুর্ভাগ্য লিখে রেখেছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ، قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُوْلُوْا يَوْمَ الْقِيمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَفِلِينَ ﴿١٢﴾ أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِنْ بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ
অর্থ: 'আর যখন আপনার পালনকর্তা বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং নিজের উপর সাক্ষ্য নিলেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। অথবা বলতে শুরু করো যে, শিরক তো করেছে ইতঃপূর্বে আমাদের বাপ-দাদারা, আমরা তো তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আপনি কি তা হলে পথভ্রষ্টদের কর্মের কারণে আমাদের ধ্বংস করবেন?' [আরাফ: ১৭২-১৭৩]

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় উবাই ইবনে কাব বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা তখন কিয়ামত পর্যন্ত যারা পৃথিবীতে আসবে, সবার রুহকে একত্র করেন, এরপর তাদের অবয়ব দান করেন। তাদের কথা বলতে বলেন এবং তারা কথা বলে। আল্লাহ তায়ালা তখন তাদের থেকে এই প্রতিশ্রুতি নেন ('আর যখন আপনার পালনকর্তা বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং নিজের উপর সাক্ষ্য নিলেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। অথবা বলতে শুরু করো যে, অথবা বলতে শুরু করো যে, শিরক তো করেছে ইতঃপূর্বে আমাদের বাপ-দাদারা, আমরা তো তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আপনি কি তা হলে পথভ্রষ্টদের কর্মের কারণে আমাদের ধ্বংস করবেন?')। আল্লাহ বলেন, আমি সাত আকাশ ও সাত জমিনকে তোমাদের উপর সাক্ষী হিসেবে রাখছি, আর সাক্ষী হিসেবে রাখছি তোমাদের পিতা আদমকে, যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন না বলো যে, আমরা তো জানতাম না অথবা আমরা এগুলো থেকে গাফেল ছিলাম। সুতরাং তোমরা আমার সঙ্গে অন্যকিছু শরিক করো না। আমি তোমাদের কাছে আমার রাসুলদের প্রেরণ করব। তারা তোমাদের আমাকে প্রদত্ত এই অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। আমি তোমাদের উপর আমার গ্রন্থাবলি অবতীর্ণ করব। তখন সবাই বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আমাদের রব। আপনি ছাড়া আমাদের আর কোনো রব নেই। আপনি ছাড়া আমাদের আর কোনো ইলাহ নেই...।¹

আরেকটি হাদিসে আবদুর রহমান ইবনে কাতাদা সুলামি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা আদমকে সৃষ্টি করেন। এরপর তার পিঠ থেকে সমগ্র সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেন। অতঃপর বলেন, এরা জান্নাতের জন্য; আর আমি কোনোকিছুর পরোয়া করি না। এরা জাহান্নামের জন্য; আর আমি কোনোকিছুর পরোয়া করি না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, তা হলে আমাদের আমল করে কী লাভ? তিনি বললেন, তাকদিরের ফয়সালা অনুযায়ী।²

উমর ইবনুল খাত্তাবকে এই আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা হলে উমর বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এটা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তখন আমি তাকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করে তাঁর ডান হাত আদমের পিঠে বুলিয়ে দেন এবং সেখান থেকে আদমের সন্তানদের বের করেন। অতঃপর বলেন, এদের জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি। তারা জান্নাতিদের আমলই করবে। অতঃপর তিনি আদমের পিঠে হাত বুলিয়ে দেন এবং সেখান থেকে তার সন্তানদের বের করেন। অতঃপর বলেন, এদের আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি ফলে তারা জাহান্নামিদের আমল করবে। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, তা হলে আমরা আমল কেন করব? আল্লাহর রাসুল বললেন, আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তাকে জান্নাতিদের কাজে লাগিয়ে দেন। ফলে জান্নাতিদের আমলের উপরেই তার মৃত্যু হয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করে। আর যখন তিনি কাউকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, জাহান্নামিদের কাজে লাগিয়ে দেন। ফলে জাহান্নামিদের কাজের উপর তার মৃত্যু ঘটে এবং সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।³

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা আদমের পিঠ থেকে তার সকল সন্তানকে বের করে তাঁর সামনে রাখেন। অতঃপর তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তখন তারা বলে, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম...।⁴

আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন জাহান্নামের সবচেয়ে কম শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলবেন, যদি তুমি গোটা ভূপৃষ্ঠের সবকিছুর মালিক হতে, তা হলে কি সেগুলো এই শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিসর্জন দিতে? সে বলবে, হ্যাঁ, অবশ্যই। আল্লাহ বলবেন, আমি তো তোমার কাছ থেকে এরচেয়ে হালকা জিনিস চেয়েছিলাম যখন তুমি আদমের পিঠে ছিলে। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, কিন্তু তুমি শিরক করেই ছাড়লে।⁵

উপরের হাদিসগুলোতে সাহাবাদের বক্তব্য দ্বারা স্পষ্ট যে, তারা আল্লাহ কর্তৃক মানুষের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার বিষয়টি আধ্যাত্মিক ও শারীরিক দুইভাবেই মনে করেন। অর্থাৎ সকল মানুষকে প্রত্যেকের বাবার পিঠ থেকে বের করা হয়। প্রতিশ্রুতি নেওয়ার পরে আবার তাদের সেখানে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর পর তারা ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীতে আসতে থাকে। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা।

কিন্তু তারা কুরআনের যে আয়াত (আরাফ: ১৭২-১৭৩) দিয়ে দলিল দিয়েছেন, এই আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে আলিমদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। প্রথম দলের মতে, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাই হচ্ছে যা উপরে সাহাবাদের মুখে উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত আয়াতে প্রতিশ্রুতি বলতে বাস্তব (আধ্যাত্মিক ও শারীরিক) প্রতিশ্রুতি বোঝানো হয়েছে। ফলে আয়াতটি উপরের হাদিসগুলোর দলিল। কিন্তু বিপরীতে আরেক দল মনে করেন, হাদিসগুলোতে উল্লিখিত (রুহের জগতের বাস্তব) প্রতিশ্রুতি সত্য। কিন্তু সেগুলো হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত। আয়াতের সঙ্গে সেই রুহের জগতের বাস্তব প্রতিশ্রুতির কোনো সম্পর্ক নেই। বরং আয়াতে রূপক অর্থে মানুষের ইসলাম ও তাওহিদের উপর জন্মের কথা বলা হয়েছে, যা কুরআনে 'ফিতরত' শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ * ذلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ * وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ .
অর্থ: 'তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরত (প্রকৃতি), যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।' [রোম: ৩০]

হাদিসেও এটাকে ফিতরত (সত্য ও ভালোর প্রতি স্বভাবজাত আগ্রহ) বলে বোঝানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'প্রত্যেক মানবসন্তান ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজারী বানিয়ে ফেলে।'⁶ ফলে সত্য ধর্ম তথা ইসলামের প্রতি মানুষের এই সতত স্বভাবজাত আকর্ষণকে আয়াতে রূপকভাবে বলা হয়েছে।⁷

এক্ষেত্রে তারা কিছু যুক্তি পেশ করেন। যেমন: হাদিসগুলোতে বলা হয়েছে আল্লাহ তায়ালা সবাইকে আদমের পিঠ থেকে বের করেন, কিন্তু আয়াতে বলা হয়েছে সবাইকে সবার পিতার পিঠ থেকে বের করেন। আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, সবার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে এটা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেদের সাক্ষ্য থাকে এবং পরে যেন বলতে না পারে যে, আমরা গাফেল ছিলাম। অথচ রুহের জগতের সেই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আমরা সবাই গাফেল। কারণ, সেটা কারও মনে নেই। একইভাবে আয়াত দেখলে বোঝা যায়, সেই প্রতিশ্রুতিই তাদের বিরুদ্ধে হুজ্জত কায়েমের জন্য যথেষ্ট। অথচ বাস্তবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রাসুল পাঠানো ছাড়া তিনি কাউকে শাস্তি দেবেন না। এর দ্বারা বোঝা গেল, উক্ত আয়াত হাদিসগুলোর দলিল নয়, কিংবা হাদিসগুলো আয়াতের ব্যাখ্যা নয়। বরং হাদিসগুলোর বিষয়বস্তু রুহের জগতের প্রতিশ্রুতি, আর আয়াতের বিষয়বস্তু মানুষকে তাওহিদের ফিতরতের উপর তৈরির বর্ণনা, প্রতিশ্রুতি এখানে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

এভাবে তারা উক্ত আয়াতের তাবিল করেন; অথচ এমন তাবিল নিষ্প্রয়োজন। বরং উক্ত আয়াতে প্রতিশ্রুতি বলতে রুহের জগতের সেই বাস্তব প্রতিশ্রুতিই বোঝানো হয়েছে, যা হাদিসগুলোতে বলা হয়েছে। ফলে আয়াত ও হাদিসের বিষয়বস্তু অভিন্ন প্রতিশ্রুতিই। উবাই বিন কাব, উমর ইবনুল খাত্তাব-এর মতো সাহাবগণ সেটাই বুঝেছেন। আর তারা যেসব আপত্তি তুলেছেন, সেগুলো ততটা শক্তিশালী নয়। যেমন: হাদিসে বলা হয়েছে সবাইকে আদমের পিঠ থেকে বের করার কথা, আর আয়াতে বলা হয়েছে সবাইকে সবার পিতার পিঠ থেকে বের করার কথা। দুটোর মাঝে আদতে বৈপরীত্য নেই। কারণ, প্রত্যেকের পিতাও তখন আদমের পিঠেই ছিলেন। সেই হিসেবে মূল কথা একই, প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন।⁸

কেবল এটুকুই নয়, উক্ত আয়াতটি নিয়ে আলিমগণ আরও বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন ৯। তবে বিস্তারিত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দ্বিমত থাকলেও মূল মাসআলাতে কোনো দ্বিমত নেই। রুহের জগতে আল্লাহর নেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং মানুষকে তাওহিদের ফিতরতের উপর সৃষ্টি দুটোই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা। আয়াত প্রথমটার দলিল কি না সেটা গৌণ বিষয়। কারণ, যারা আয়াতকে রুহের জগতে প্রতিশ্রুতির দলিল মানেন না, তারাও সেই প্রতিশ্রুতিকে অস্বীকার করেন না। এর কারণ, আয়াত সেটার দলিল হোক বা না হোক, বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং অস্বীকারের প্রশ্নই ওঠে না।¹⁰

টিকাঃ
১. মুসতাদরাকে হাকেম (৩২৭৪)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৮৫)।
৩. সুনানে আবু দাউদ (৪৭০৩); সহিহ ইবনে হিব্বান (৬১৬৬); মুসতাদরাকে হাকেম (৩২৭৫); মুয়াত্তা ইমাম মালেক (৬৭৮/৩৩৩৮) (রিওয়াইয়াতু ইহইয়া আল-লাইসি নং ১৫৯৩)।
৪. মুসনাদে আহমদ (২৪৯৪); সুনানে কুবরা বাইহাকি (১১১২৭)।
৫. বুখারি (৬৫৫৭); মুসলিম (২৮০৫)।
৬. বুখারি (১৩৮৫); মুসলিম (২৬৫৮)।
৭. সালেহ ফাওজান (৮১-৮২); হামুদ শুআইবি (১১০)।
৮. তাফসিরে কাবির, রাজি (১৫/৪০১-৪০২)।
৯. গজনবি (৯৫-৯৬)।
১০. তাফসিরে ইবনে কাসির (৩/৪৫৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 একটি জরুরি কথা

📄 একটি জরুরি কথা


পৃথিবীর কোনো মানুষের পক্ষে রুহের জগতের এসব প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে অনেক দুর্ভাগা যখন এগুলো নিজের যুক্তির মানদণ্ডে বিচার করতে চায় এবং এর গভীরতা ঠাওর করতে না পারে, তখন অস্বীকার করতে শুরু করে। অথচ আল্লাহর নেওয়া প্রতিশ্রুতির সত্যতা যাচাই করার আগে সে যদি নিজের সীমাবদ্ধতা ও সামর্থ্য যাচাই করত, তা হলে হয়তো ধ্বংসের অতল গহ্বরে মুখ থুবড়ে পড়ত না। সে নিজের দিকে কখনও তাকিয়ে দেখেনি, অথচ আল্লাহর দিকে তাকাতে গিয়েছে। সে রুহের জগতের প্রতিশ্রুতি স্মরণ করতে না পেরে সেটাকে অস্বীকার করছে, অথচ তার মায়ের পেটে থাকা নয় মাসের কিছুই স্মরণ করতে পারে না। তা হলে কি সে তা অস্বীকার করে? কেবল মায়ের পেট নয়; জীবনের প্রথম কয়েক বছরের বড় হওয়া, হাঁটা-চলা, নাওয়া-খাওয়া, হাসিকান্না, খেলাধুলা কিছুই মানুষ মনে করতে পারে না। তবুও মানুষকে বিশ্বাস করতে হয় সবকিছু। আল্লাহ সত্য বলেছেন, وَكَانَ الْإِنْسَنُ كَفُورًا ; অর্থ: 'আর মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ।' [ইসরা: ৬৭] জ্ঞানীগণ সত্য বলেছেন, যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন, আল্লাহকে চেনা তার জন্য কঠিন নয়।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহ কি আপনাকে বাধ্য করে?

📄 আল্লাহ কি আপনাকে বাধ্য করে?


অনাদিকাল থেকেই আল্লাহ তায়ালা বিস্তারিত জানেন কতজন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং কতজন জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সুতরাং তাতে প্রবেশকারীদের সংখ্যা কোনো ধরনের কমবেশি হবে না। একইভাবে পৃথিবীতে কে কী কাজ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাও জেনে রেখেছেন। ফলে প্রত্যেককে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল। তাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান হচ্ছে সে ব্যক্তি, আল্লাহ তায়ালা যার কপালে সৌভাগ্য লিখে রেখেছেন। আর দুর্ভাগা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা যার কপালে দুর্ভাগ্য লিখে রেখেছেন।

উপরের বক্তব্যগুলো মূলত কুরআনের কিছু আয়াত ও হাদিসের নির্যাস। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সব জানেন। অতীতে কী হয়েছে তিনি জানেন, বর্তমানে কী হচ্ছে জানেন, ভবিষ্যতে কী হবে জানেন, আর তিনি জানেন যা হয়নি যদি হতো কীভাবে হতো। সুতরাং তিনি মানুষ সৃষ্টির আগেই জানতেন যে, প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে কী আমল করবে এবং সর্বশেষে তার স্থান জান্নাতে হবে নাকি জাহান্নামে। আর আল্লাহর জ্ঞান যেহেতু পরিপূর্ণ ও অনিবার্য, তাই তিনি সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার আগেই যে জান্নাতি এবং জাহান্নামির সংখ্যা সম্পর্কে জেনেছেন তাতে কমবেশি হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

এটুকু বোঝা সহজ। কিন্তু বক্তব্যের শেষাংশ 'ফলে প্রত্যেককে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার কাছে সহজ করে দেওয়া হবে' একটু জটিল। যদিও আমরা পিছনে এটা নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু বক্তব্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আরও কিছু কথা যোগ করা প্রয়োজন মনে করছি। বাস্তব কথা হলো, ইমাম তহাবি তাঁর কিতাবে তাকদিরের আলোচনা এক জায়গায় করেননি; বরং বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গাতে এনেছেন। এ জন্য অনেক সময় কিছু কথার পুনরাবৃত্তিও হয়েছে। তবে সম্ভবত বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি লক্ষ করেই তিনি বারবার বলার চেষ্টা করেছেন।

জটিলতা হলো রাসুলুল্লাহর বাণী 'প্রত্যেককে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে'¹ তা হলে এর অর্থ কী দাঁড়াল? এখানে হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, যাকে যে জন্য আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য সে কাজটা সহজ করে দেবেন। অর্থাৎ আল্লাহ প্রথমেই একজনকে জান্নাতের জন্য তৈরি করেছেন, আরেকজনকে জাহান্নামের জন্য তৈরি করেছেন। এর পর পৃথিবীতে দুজনকে পাঠানোর পরে একজনের জন্য জান্নাতের কাজ সহজ করে দিয়েছেন, আরেকজনের জন্য জাহান্নামের কাজ সহজ করে দিয়েছেন। ফলে একজন জান্নাতি হবে, আরেকজন জাহান্নামি হবে। এখানেই জটিলতা। কারণ আমরা জানি, পৃথিবীতে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনোকিছুই হয় না। আল্লাহ যদি কাউকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, এর পর তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে জাহান্নামের কাজ তার জন্য সহজ করে দেন, তা হলে তার জাহান্নাম ছাড়া উপায় কী? এক্ষেত্রে মানুষের দায় কোথায়? এর পর তাকে ঈমান আনতে বলা, ভালো কাজ করতে বলার মূল্য কী? কারণ, আল্লাহ তাকে তৈরি করেছেন জাহান্নামের জন্য, আর জাহান্নামের পথ তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন!

কিন্তু হাদিসের এই বাহ্যিক ব্যাখ্যা ভুল। আমরা যদি এ ব্যাপারে বর্ণিত একাধিক হাদিস দেখি, জটিলতা কেটে যাবে। কয়েকভাবে এই জটিলতার সমাধান করা যেতে পারে। একটি সমাধান হচ্ছে যা আমরা পিছনে উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কথা বলার পরে কুরআনের আয়াত দিয়ে তার বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি কুরআনের এই আয়াত পড়েন:
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقُ وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَ اسْتَغْنَى . " وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى
অর্থ: 'অতএব, যে দান করে, আল্লাহভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে, তার জন্য আমি সুখের বিষয়কে সহজ করে দেবো। আর যে কৃপণতা করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেবো।” [লাইল: ৫-১০] আয়াতে স্পষ্ট যে, জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ প্রথমেই তাকে জান্নাত-জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীতে কেবল পুতুল হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাহলে নবি-রাসুল প্রেরণ, কিতাব অবতরণ ও হালাল-হারামের বিধান দেওয়ার অর্থ হয় না। বরং তিনি তাঁর ইলমের মাধ্যমে জেনেছেন কে জান্নাতিদের আমল করে জান্নাতি হবে, আর কে জাহান্নামিদের আমল করে জাহান্নামি হবে। এটাকেই 'সৃষ্টি করেছেন' শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। এ জন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ভালো কাজ করলে ভালো পথ সহজ হবে, আর মন্দ কাজ করলে মন্দ পথ সহজ হবে। আগে থেকে নির্ধারিত থাকার ফলে প্রত্যেকে ভালো এবং মন্দ কাজে বাধ্য হয়ে যাবে এ-রকম নয়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমরের সূত্রে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা যে কাজগুলো করি সেগুলো কি তাকদিরে লিখিত, নাকি আমরা নিজেদের মতো করে করি? আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকদিরে লিখিত'। তখন কেউ বললেন, তা হলে আমল করে কী লাভ? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'জান্নাতবাসীর জন্য জান্নাতের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে; জাহান্নামবাসীর জন্য জাহান্নামের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে।'² এখানেও জান্নাতবাসীর জন্য জান্নাতের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে আর জাহান্নামবাসীর জন্য জাহান্নামের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে-এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির আগে কারও জন্য নিজ থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ধারণ করেছেন, এর পর দুনিয়ায় পাঠিয়ে তার জন্য সে পথ সহজ করে দেন; বরং আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির আগেই জেনেছেন পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে পাঠানোর পরে কোন মানুষ কোন পথে যাবে, তাই আল্লাহ তায়ালা সেটা লিখে রাখেন। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে আসার পরে সে নিজ থেকেই যেহেতু সেটাকে অবলম্বন করেছে, তাই তার জন্য সেটা সহজ করে দেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে দুটি গ্রন্থ নিয়ে আমাদের নিকট এসে বললেন, 'তোমরা কি জানো এ দুটো কী?' আমরা বললাম, 'না, হে আল্লাহর রাসুল' (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তিনি তাঁর ডান হাতের গ্রন্থের দিকে ইশারা করে বললেন, 'এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি কিতাব। এতে জান্নাতি সকল ব্যক্তির নাম, তাদের বাপ-দাদার নাম এবং তাদের গোত্রের নাম লেখা আছে। আর শেষে এর মোট সংখ্যা রয়েছে এবং এতে কম-বেশি করা হবে না।' তারপর তিনি তার বাম হাতের গ্রন্থের দিকে ইশারা করে বললেন, 'এটাও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে একটি গ্রন্থ। এতে জাহান্নামি সকল ব্যক্তির নাম, তাদের বাপ-দাদার নাম এবং গোত্রের নাম লেখা আছে। এর শেষেও মোট ফল রয়েছে। এতে হ্রাস-বৃদ্ধি হবে না।' সাহাবিরা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, তবে আমলের কী প্রয়োজন?' তিনি বললেন, 'তোমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করতে থাকো। যথাসম্ভব আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করো। কেননা, কেউ জান্নাতি হয়ে থাকলে তার শেষ আমল জান্নাতিদের আমলই হবে, আগে যে আমলই করুক। কেউ যদি জাহান্নামি হয়ে থাকে, তা হলে তার শেষ আমল জাহান্নামিদের আমলই হবে, আগে যে আমলই করে থাকুক।' তারপর রাসুলুল্লাহ তার দুই হাতে ইশারা করেন এবং কিতাব দুটি ফেলে দিয়ে বলেন, 'তোমাদের প্রভু তার বান্দাদের আমল চূড়ান্ত করে ফেলেছেন—একদল জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর অন্যদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'³

উক্ত হাদিসটিও আমাদের আগের মূলনীতিতে বুঝতে হবে। অর্থাৎ মানুষের চূড়ান্ত আমলের উপর তার আখিরাতের পরিণতি নির্ভরশীল। এ জন্য সবসময় সত্যের উপর থাকার জন্য চেষ্টা করতে হবে। এটা এই হাদিসের মূল অর্থ। এর অর্থ এটা নয় যে, কেউ সারা জীবন জান্নাতের আমল করবে আর জীবনের শেষ মুহূর্তে আল্লাহ তার হাত ধরে জোর করে জাহান্নামিদের আমল করিয়ে তাকে জাহান্নামে ছুড়ে ফেলবেন। বরং আল্লাহ জানতেন যে, সারা জীবন ভালো আমল করার পরেও মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জাহান্নামিদের কাজ করে জাহান্নামে যাবে। ফলাফলে এর দায়ভার আল্লাহ নন, সে নিজে বহন করবে।

সারা জীবন খারাপ কাজ করে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জান্নাতি, আর সারা জীবন ভালো কাজ করে শেষ মুহূর্তে জাহান্নামি হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন: নিষ্ঠাহীনতা, লৌকিকতা কিংবা অন্য যেকোনো অপরাধে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চনা এবং শেষে নিজ কর্মফলে পথ হারানো। অপরদিকে সারা জীবন খারাপ কাজ করে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ভালো কাজ করারও অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন নিষ্ঠা, বিনয় কিংবা যেকোনো সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হওয়া এবং ফলাফলে জাহান্নাম থেকে বেঁচে যাওয়া। তবে আল্লাহর অনুগ্রহে পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম হলো, যিনি সারা জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্য করেন, তার মৃত্যু আনুগত্যের উপরেই হয়। আর যে সারা জীবন আল্লাহর অবাধ্য থাকে, গুনাহের কাজ করে, তার মৃত্যু মন্দের উপর হয়।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (২০); মুসনাদে বাজ্জার (২৮)।
২. আবু দাউদ (৪৬৮২)।
৩. তিরমিজি (২১৪১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল

📄 সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল


এটা মূলত হাদিসের বক্তব্য। উপরে এ সংক্রান্ত সাহল বিন সাদ রাজি.-এর হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। বুখারি-সহ বিভিন্ন গ্রন্থে হাদিসটি এসেছে। সবগুলোর মর্মার্থ হচ্ছে, মানুষের নিজের ভালো কাজ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভোগা উচিত। বরং কর্তব্য হলো সারাজীবন হকের উপর অটল থাকার চেষ্টা করে যাওয়া: অলসতা ও অবহেলা না করা। কারণ, কার মৃত্যু কোন অবস্থায় হবে, ঈমান নাকি কুফরের উপর, পুণ্য নাকি গুনাহের উপর এটা কারও জানা নেই। ফলে সবসময় আনুগত্যের উপর থাকা আবশ্যক। কেননা পরকালের পরিণতি শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল।

ইমাম তিরমিজির বর্ণনায় এ-রকম একটি হাদিস দেখলে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের প্রত্যেকের মায়ের গর্ভে সর্বপ্রথম তার সৃষ্টি প্রকাশ পায় চল্লিশ দিনে। এর পরের চল্লিশ দিনে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। এর পর চল্লিশ দিনে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। তখন আল্লাহ তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠান যে তার ভিতরে রুহ ফুঁকে দেয় এবং চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করে: রিজিক, মৃত্যু, আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা। ওই সত্তার শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তোমাদের কেউ জীবনভর জান্নাতের আমল করতে থাকে, এর পর যখন জান্নাত এবং তার মাঝে মাত্র এক হাত বাকি থাকে, ওই সময় ভাগ্যলিপি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তার সর্বশেষ আমল হয় জাহান্নামিদের আর সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ সারা জীবন জাহান্নামের আমল করে। পরিশেষে যখন তার মাঝে ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, ভাগ্যলিপি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তার জীবনের শেষ আমল হয় জান্নাতিদের আর সে জান্নাতে প্রবেশ করে।'¹ এ কারণে ইমাম তিরমিজি উক্ত হাদিসের শিরোনাম লিখেছেন 'সকল আমল শেষ পরিণতির উপর নির্ভরশীল'।

উক্ত হাদিসের তাৎপর্য বান্দার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার জীবনের শেষ মুহূর্তে তাকে জান্নাতি কিংবা জাহান্নামি বানানো নয়; জীবনের শেষ সময়ে তাকদিরের মাধ্যমে কারও সারা জীবনের আমল বরবাদ করে তাকে জুলুম করা নয়; বরং হাদিসের তাৎপর্য হলো, মানবজীবনের সর্বশেষ মুহূর্তের গুরুত্ব তুলে ধরা। অর্থাৎ কোন পরিস্থিতিতে মানুষের মৃত্যু হবে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবসময় ভালো কাজের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বৃদ্ধ হলে তাওবা করব, ঠিক হয়ে যাবো—এমন চিন্তা চরম নির্বুদ্ধিতা। যেখানে এক মুহূর্ত পরে তার পরিণতি সম্পর্কে কেউ জানে না, সেখানে কবে বৃদ্ধ হবে আর তাওবা করবে সেটার নিশ্চয়তা তাকে কে দেবে?

আর হাদিসে জীবনের শেষ মুহূর্তে ভাগ্যলিপি এসে যে ফারাক তৈরি করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, এখানে বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং এই হাদিসকেও পিছনের হাদিসগুলোর মতো বুঝতে হবে। অর্থাৎ কোনো লোক সারা জীবন ভালো কাজ করেছে, জীবনের শেষ মুহূর্তেও সে ভালো কাজ করে জান্নাতে যেত, কিন্তু আল্লাহ ভাগ্যের মাধ্যমে তাকে জান্নাত থেকে ঘুরিয়ে জাহান্নামে ছুড়ে ফেললেন—তেমন নয়; বরং আল্লাহ জানতেন যে, সারা জীবন ভালো কাজ করার পরেও মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জাহান্নামিদের কাজ করে জাহান্নামে যাবে। ফলাফলে এর দায়ভার আল্লাহ নন, সে নিজে বহন করবে।

সারা জীবন খারাপ কাজ করে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জান্নাতি, আর সারা জীবন ভালো কাজ করে শেষ মুহূর্তে জাহান্নামি হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন: নিষ্ঠাহীনতা, লৌকিকতা কিংবা অন্য যেকোনো অপরাধে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চনা এবং শেষে নিজ কর্মফলে পথ হারানো। অপরদিকে সারা জীবন খারাপ কাজ করে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ভালো কাজ করারও অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন নিষ্ঠা, বিনয় কিংবা যেকোনো সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হওয়া এবং ফলাফলে জাহান্নাম থেকে বেঁচে যাওয়া। তবে আল্লাহর অনুগ্রহে পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম হলো, যিনি সারা জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্য করেন, তার মৃত্যু আনুগত্যের উপরেই হয়। আর যে সারা জীবন আল্লাহর অবাধ্য থাকে, গুনাহের কাজ করে, তার মৃত্যু মন্দের উপর হয়।

টিকাঃ
১. তিরমিজি (২১৩৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00