📄 শেষ কথা
পুণ্যবানদের তাবাররুক গ্রহণ ইসলামে একটি স্বীকৃত বিষয়। যারা এটাকে কেবল রাসুলুল্লাহর মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেন, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়, যার কিছু প্রমাণ আমরা পিছনে উল্লেখ করেছি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখতে গেলে গ্রন্থের কলেবর দীর্ঘ হয়ে যাবে, তাই এখানেই শেষ করা হচ্ছে। উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় স্পষ্ট হওয়ার কথা যে, একদিকে যেমন বুজুর্গ-ওলিদের মাধ্যমে তাবাররুক গ্রহণের বৈধতা স্বীকার করতে হবে, অপরদিকে বরকতের নামে প্রচলিত বিদআত ও কুসংস্কারেরও বিরোধিতা করতে হবে।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের স্মৃতি বিজড়িত এ সকল স্থানের প্রতি কতটুকু গুরুত্ব দিতেন আর আমরা কতটা গুরুত্ব দিই।
আজ মক্কাতে বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান বলে প্রচলিত জায়গাটিতে ভিড় করে এটাকে বরকতময় মনে করতে এবং ওখানে বিভিন্ন ইবাদত করতে দেখা যায়। একইভাবে দেখা যায় মানুষ দলে দলে হেরা গুহায় যাচ্ছে, ওখানে গিয়ে নামাজ-সহ বিভিন্ন ইবাদত করছে। অথচ তাঁর জন্ম কোথায় হয়েছিল সে জায়গাটি আজ সন্দেহাতীতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ, তার জন্ম হয়েছিল জাহেলি যুগে। তখন এসব জায়গার বিশেষ কোনো গুরুত্ব ছিল না। নবুওতের পরে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর জন্য পাগলপারা থাকলেও, তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা সত্ত্বেও এসব জায়গার ব্যাপারে গুরুত্ব দেননি। কারণ, তাদের কাছে রাসুলুল্লাহর জন্মস্থানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাসুলুল্লাহর আনীত জীবনবিধান। নবুওতের আগে তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত হেরা গুহায় ইবাদত করতেন। অথচ নবুওত পরবর্তী বাকি ২৩ বছরে একটি বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তিনি কিংবা সাহাবারা সেই জায়গাটিকে দেখতে গিয়েছিলেন। অথচ আজ মুসলমানরা এসব জায়গাতেই বেশি আগ্রহ নিয়ে যায়, সময় কাটায়।
কারণ কী? কারণ, সাহাবায়ে কেরামের কাছে এগুলোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাসুলের অনুসরণ। জন্মস্থান দর্শনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তিনি যে তাওহিদ নিয়ে এসেছেন সেটার বাস্তবায়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। এগুলো করতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম অলস সময় কাটানোর সুযোগ পাননি। এখন যেহেতু মুসলমানদের চিন্তাভাবনা বদলে গিয়েছে, চিন্তাভাবনায় অধঃপতন নেমে এসেছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছেড়ে অগুরুত্বপূর্ণ কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি তাদের মনোযোগ বেড়েছে, ফলে দেখা যাচ্ছে ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান ও আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য মনোযোগ নেই, অথচ পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে তারা অগ্রগামী। জিহাদের প্রতি অনেকে মনে অজানা বিদ্বেষ রাখে কিংবা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়, অথচ বদর ও উহুদের ময়দানে ঘোরাঘুরি ও সেলফি তোলায় তারা দারুণ ব্যস্ত। রাসুলুল্লাহর জুতা, চুল, পদচিহ্ন (যার কোনোটাই আজ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়) ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে বিরাট বিরাট ব্যাবসা দাঁড়িয়ে গেছে; অথচ রাসুলুল্লাহর আনীত দ্বীনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এখানেই শেষ নয়।
শরিয়তের নির্দেশ পালনে মুসলমানরা যতটা গাফেল হয়েছে, ততটাই বেড়েছে পির ও কবরের প্রতি মনোযোগ। পির নামে নোংরা লোকদের ওজু-গোসলের পানি পান করা হচ্ছে। সেগুলো দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করে বরকতের উদ্দেশ্যে খাওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, অনেক দ্বীনি মহলেও বুজুর্গদের ওজু-গোসলের পানি নিয়ে বাড়াবাড়ির উদাহরণ রয়েছে। অথচ স্বয়ং থানভি লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওজুর পানি দিয়ে বরকতগ্রহণ প্রমাণিত নয়।১
বরকতের দোহাই দিয়ে মুসলমানদের মসজিদ শূন্য হয়েছে। আসর-উরশ আর কবর-মাজারে উপচে পড়া ভিড় জমেছে। বুজুর্গদের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ হয়ে গেছে কবরের সামনে এসে গর্দান ঝোঁকানো, কবরে ফুল দেওয়া, চাদর জড়ানো, বাতি জ্বালানো ইত্যাদি। ফলে প্রত্যেকটা কবর একেকটা দানবীয় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিনা পুঁজিতে চলে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার ব্যাবসা; চলে কিছু ফাসিক লোকের পেটপূজা। এগুলো সবই সেই তাবাররুক নামক সূত্র থেকে উৎসারিত। তাই এ ব্যাপারে আলিমদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই। তাদের আদর্শ হতে পারেন সাইয়েদুনা উমর ইবনুল খাত্তাব, যিনি হুদাইবিয়ার বৃক্ষের নিচে মানুষ জড়ো হওয়ার কথা জানতে পেরে বৃক্ষটাই কেটে ফেলার নির্দেশ দেন।২ কারণ, অনিষ্টকে সমূলে উপড়ে ফেলাই ইনসাফ।
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৯০)।
২. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৭৬২৭)।