📄 শেষ কথা
সবশেষে আরজ করতে চাই, যদি রাসুলুল্লাহর রওজার কাছে উপস্থিত হয়ে শাফায়াত ও দোয়া চাওয়া-চাই সেটাকে ইস্তিশফা' কিংবা ইস্তিগাসা যে নামেই ডাকা হোক—দলিলের ভিত্তিতে এবং কিছু শর্তসাপেক্ষে বৈধ মেনে নেওয়া হয়২, তবুও এই পথ নিঃসন্দেহে কণ্টকাকীর্ণ, বড় পিচ্ছিল। তারা জায়েজ হবার যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, সেগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানেন-এ ধরনের বিশ্বাসকে হানাফি উলামায়ে কেরাম সুস্পষ্ট কুফর ফাতাওয়া দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ ব্যাপারে শিথিলতাই উম্মাহর সামনে শিরক ও হাজারও কুসংস্কারের দুয়ার খুলে দিয়েছে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে মুসলমানদের 'মদদ ইয়া আলি', 'মদদ ইয়া হুসাইন', 'মদদ ইয়া আবদুল কাদের জিলানি'তে ব্যস্ত করে দিয়েছে। মুসলমানদের বিশ্বাস করিয়েছে, নবিজি যেহেতু কবরে জীবিত এবং উম্মাহর কথা শোনেন, তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করেন, তাই অসম্ভব নয় যে, সময়ে সময়ে তিনি কবর থেকে বের হয়ে প্রিয়জনদের অনুষ্ঠানে মিলাদে ওরসে সশরীরে হাজির হন। আজ মুসলিম উম্মাহ কবর এবং বিভ্রান্ত ওলি-আউলিয়া-কেন্দ্রিক যে অন্ধকারে ডুবে আছে, এর অন্যতম কারণ এই দরজাগুলো খুলে রাখা। কারণ, যারা কবরে-মাজারে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ইবাদত করছে, সিজদা দিচ্ছে, প্রার্থনা করছে, তাদের মাঝে কবরের মৃতকে কেবল উসিলা মনে করে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর কাছে চাচ্ছে—এমন লোক বিরল; বরং তারা মূলত মৃতের ব্যাপারে অতিমানবিক এমন কিছু বিষয়ে বিশ্বাসী, যা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ব্যাপারে বিশ্বাস করা কুফর। ফলে ওখানে যা হচ্ছে, তার অধিকাংশই শিরকে আকবরে রূপান্তরিত হতে পারে, যেগুলো মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বৈধ বানানোর কোনো সুযোগ নেই।১
উপরে যেমনটা বলা হয়েছে, 'মৃত ব্যক্তি প্রয়োজন পূর্ণ করতে সক্ষম'-এমন বিশ্বাস রেখে সরাসরি তার কাছে প্রয়োজন পেশ করা এবং সেটা পূর্ণ করার জন্য প্রার্থনা করা সুস্পষ্ট হারাম এবং সর্বসম্মত শিরক। আর যদি আল্লাহকেই একমাত্র প্রয়োজন পূর্ণকারী বিশ্বাস করে মৃত ব্যক্তির কাছে স্রেফ দোয়া চাওয়া হয়, যেমন: 'আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন....' (যা কবরের কাছে হলে প্রকারান্তরে তাওয়াসসুল), তবে সেটা মতভেদপূর্ণ, যেমন মতভেদ তাওয়াসসুলের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একদল আলim অবৈধ বলেন, অন্য আলimগণ বৈধ বলেন। দূরে থেকে ডাকলে এটাও হারাম ও শিরক।২ ফলে হুকুম আরোপের সময় এগুলোর পার্থক্য মনে রাখা চাই। আবার জীবিত-মৃত এসব ফারাক ও এর ফলাফলও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা চাই। অনেক আলim সবগুলোকে স্রেফ বিদআত বলেছেন। অথচ তাতে ইনকারুল মুনকারের হক আদায় হয় না। কারণ, এগুলোকে পাইকারিভাবে বিদআত বললে হালকা করে দেখানো হয়। প্রথমটা তো সুস্পষ্ট শিরক। হ্যাঁ, ব্যক্তিবিশেষকে মুশরিক বলা থেকে বিরত থাকা এক বিষয় এবং পাইকারি হারে সবকিছুকে শিরক বলাও প্রান্তিকতা। কিন্তু কোনো পাপ যদি শিরকের পর্যায়ে হয়, তবে সেটাকে স্রেফ বিদআত বলা যথাযথ নয়। ফলে মুহাক্কিক আলিমগণ এগুলোর কোনোটাকে যেমন হারাম ও অবৈধ বলেছেন, অনেকগুলোকে সুস্পষ্ট কুফরও বলেছেন। তাই সেভাবেই বলতে হবে।
• শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি লিখেন, যদি কোনো ব্যক্তি আজমির কিংবা সালার মাসউদ বা অন্য মাশাইখের কবরের কাছে প্রয়োজন পেশ করার জন্য যায়, তবে সেটা হত্যা ও ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ। এটা প্রকারান্তরে লাত-উজ্জাকে পূজা দেওয়ার মতোই। হ্যাঁ, আমি ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলি না।৩
• দামাদ আফেন্দি লিখেন, যদি কেউ মনে করে (মৃত) মাশাইখের রুহ সর্বত্র উপস্থিত এবং তারা সবকিছু জানে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।১
• রদ্দুল মুহতারে এসেছে, আল্লাহর পরিবর্তে কোনো মৃতের ব্যাপারে এই ধারণা রাখা যে, সে যা ইচ্ছা করতে পারে, কুফর।২
• আলুসি লিখেন, বর্তমানে মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে জীবিত ও মৃত মাশাইখকে ডাকার মাঝে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। যেমন: 'হে সাইয়েদ অমুক, আমাকে রক্ষা করুন।' কোনো মুসলিমের জন্য এ-জাতীয় কথা বলা উচিত নয়। অনেক আলেমের কাছে এটা শিরক; শিরক না হলেও শিরকের মতোই। কারণ, এগুলো যারা করে, তারা সেই মৃতের ব্যাপারে জীবিত হওয়া, সবকিছু শোনা, জানা এবং উপকার- অপকার করতে পারার ক্ষমতার বিশ্বাসের কারণেই করে। তারা এমন বিশ্বাস না রাখলে আল্লাহ ছাড়া তাকে ডাকত না; অথচ এটা ভীষণ ভয়ংকর ব্যাপার।৩
• শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলভি লিখেছেন, তারা কবরের কাছে গিয়ে ভক্তি- শ্রদ্ধা, আদব ও খুশুর ক্ষেত্রে যতটা বাড়াবাড়ি করে, যতটা অতিরঞ্জনের সঙ্গে নিজেদের অক্ষমতা পেশ করে, আল্লাহর ঘর মসজিদেও কখনও তেমন করতে দেখা যায় না। তাদের কাছে কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করা, তাতে বাতি জ্বালানো, ইতিকাফ করা, আগরবাতি ও সুগন্ধি দেওয়া, কবর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার যত গুরুত্ব, আল্লাহর ঘর মসজিদের প্রতি সে তুলনায় বিন্দুমাত্র গুরুত্বও নেই।৪ তিনি অন্যত্র লিখেন, সুতরাং আল্লাহর ওলিদের কাছে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের দোয়া করা, তাদের ডাকা, প্রার্থনার জন্য তাদের কবরের কাছে যাওয়া মূলত তাদের ইবাদত করা। যদিও তারা দাবি করে যে, আমরা তো স্রেফ কবর জিয়ারত করি, ইবাদত করি না। কিন্তু এগুলো তাদের বাহানা।৫
• শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি লিখেছেন, সন্তান ও সুস্থতা ইত্যাদি যা আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারে না, সেগুলো অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে চাওয়া হারাম; বরং কুফর। যদি কোনো মুসলমান জীবিত অথবা মৃত ওলির কাছে এ-জাতীয় প্রার্থনা করে, তবে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।১ সুতরাং যেকোনো মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে উপকার-অপকার, দোয়া কবুল, সাহায্য-সহযোগিতা-সহ এ ধরনের সকল বিশ্বাস শিরক।২
• হজরত গাঙ্গুহিও এগুলো করতে নিষেধ করেছেন।৩
তাই যত দ্রুত এসব দরজা বন্ধ করা যাবে, মুসলিম উম্মাহ তত দ্রুত কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে মুক্তি পাবে। ফিরে যাবে সেই বিশুদ্ধ তাওহিদের আলোর রাজপথে, যেখানে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তাদের ছেড়ে গিয়েছিলেন।