📄 দলিলের পর্যালোচনা
বাস্তবেই কি উপরের হাদিসগুলো থেকে রাসুলুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া, নিকট ও দূর থেকে তাঁর কাছে নিজেদের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরার বৈধতা প্রমাণিত হয়?
বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যেসব হাদিস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো দ্বারা এটা আদৌ প্রমাণিত হয় না। কারণ, জীবন আর মৃত্যু এক নয়। জীবদ্দশায় কারও কাছে কিছু চাওয়া আর মৃত্যুর পরে চাওয়া এক নয়। আর ফেরেশতাদের সাহায্যের জন্য ডাকা আর মৃত মানুষকে সাহায্যের জন্য ডাকা ভিন্ন ব্যাপার। সুতরাং এই হাদিস দিয়েও ইস্তিগাসার প্রমাণ দেওয়া যায় না।
এরপর আসা যাক সালাম-সম্পর্কিত হাদিসগুলোতে। বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, আমার কাছে তোমাদের সালাম পৌঁছে দেওয়া হয়। কীভাবে পৌঁছানো হয় সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, আমার ভিতরে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং আমি সালামের জবাব দিই। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, আমার কাছে এসে যে সালাম দেয়, আমি তার সালাম শুনতে পাই। যেহেতু কবরের জীবন পার্থিব জীবনের মতো নয়, তাই একটাকে অপরটার উপর কিয়াস করা যাবে না; বরং কুরআন ও সুন্নাহে যতটুকু এসেছে, ততটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সালাম শুনতে পান, তাই সব কথা শুনতে পাবেন—এমন বোঝা সঠিক নয়।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
প্রথমে আমাদের যে বিষয়টি খুব ভালো করে মনে রাখতে হবে তা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুবরণ করেছেন। কারণ, তিনি মানুষ ছিলেন, চিরঞ্জীব নন। ফলে অন্যান্য মানুষ যেমন মৃত্যুবরণ করে, তিনিও তেমন মৃত্যুবরণ করেছেন। খ্রিষ্টানদের মতো এই উম্মাহ যেন বিভ্রান্তিতে না পড়ে, তাই কুরআনের একাধিক আয়াতে এ বিষয়টি বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِّنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَائِنُ مِّتَّ فَهُمُ الْخُلِدُوْنَ.
অর্থ: 'আপনার পূর্বেও কোনো মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে?” [আম্বিয়া: ৩৪] অন্য আয়াতে বলেন,
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَّيْتُونَ.
অর্থ: 'নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল, তারাও মরণশীল।' [জুমার: ৩০] আল্লাহ বলেন,
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَائِنُ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّكِرِينَ .
অর্থ: 'আর মুহাম্মাদ একজন রাসুল বৈ তো নয়। তাঁর পূর্বেও বহু রাসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তা হলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা কি পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কোনো ক্ষতি নেই। আর কৃতজ্ঞদের আল্লাহ তায়ালা বিনিময় দান করবেন।' [আলে ইমরান: ১৪৪] ফলে কবরে নবিদের যে জীবনের কথা বলা হচ্ছে, সেটা ' বারজাখি জীবন', পার্থিব জীবনের মতো নয়। সুতরাং সেটাকে পার্থিব জীবনের উপর কিয়াস করা যাবে না।
তা ছাড়া ইন্তিকালের আগে বারবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর-কেন্দ্রিক সতর্কতামূলক বক্তব্য থেকে অনুভব করা যায়, তিনি উম্মাহকে নিয়ে কতটা অস্থির ছিলেন। এ জন্য ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাঁর কবর-কেন্দ্রিক যেকোনো বিচ্যুতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক করে গিয়েছেন সাহাবাদের। জুনদুব থেকে বর্ণিত, বিদায়ের মাত্র পাঁচ দিন আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা তাদের নবি ও পুণ্যবান ব্যক্তিদের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়ে নিতা। সাবধান! তোমরা কবরকে সিজদার স্থান বানিয়ো না। আমি তোমাদের নিষেধ করছি।'১ আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ো না, আর আমার কবরকে উৎসবের স্থান বানিয়ো না; আর তোমরা আমার উপর সালাম পাঠ করো। কেননা তোমরা যেখানেই থাকো, তোমাদের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।'২ ভালো করে খেয়াল করুন, হাদিসের দ্বিতীয় অংশটুকু যেন প্রথম অংশের ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তোমরা দূর থেকে সালাম পেশ করলেই যথেষ্ট। যত দূরেই থাকো, তোমাদের সালাম আমার কাছে পৌঁছয়, এ জন্য কাছে এসে সালাম দেওয়ার দরকার নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি হাদিসে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের উপর অভিসম্পাত করেছেন। কারণ তারা তাদের নবির কবরকে সিজদার স্থানরূপে গ্রহণ করেছে।’৩ অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেছেন, 'হে আল্লাহ, আমার কবরকে ইবাদতের স্থানে পরিণত করবেন না! সেই সম্প্রদায়ের উপর আল্লাহর প্রচণ্ড ক্রোধ হয়েছে, যারা তাদের নবির কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।'৪
সম্ভবত এসব কারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পরে তাঁর কবর ঘিরে সাহাবায়ে কেরামের কোনো অতিরিক্ত আগ্রহ, বিশেষ কোনো মজলিস, অনুষ্ঠান কিংবা কর্মশালা চোখে পড়ে না। যে মানুষটিকে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, নিজেদের জীবন দিয়েও যার গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হোক সেটা সহ্য করতেন না, যার থুতু মাটিতে পড়তে দিতেন না, যার ঘাম সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করতেন, যার একটি চুল সযত্নে সংরক্ষণ করতেন, সেই মানুষটিকে কবরে রাখার পরে সাহাবায়ে কেরামের কী করা উচিত ছিল? যদি অন্য কোনো ধর্ম হতো, তা হলে দেখা যেত, কবরের পাশে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সেই মহাপুরুষের অনুসারীরা বসে থাকতেন, অশ্রু ঝরাতেন, প্রার্থনা ও শোক পালন করতেন। কিন্তু ইসলাম হলো সুস্পষ্ট ও বাস্তববাদী দ্বীন। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন বিশুদ্ধ তাওহিদের ঝান্ডাবাহী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা জীবন ব্যয় করে তাদের হাতে তাওহিদের যে আমানত তুলে দিয়েছিলেন, তাদের যে মহাপবিত্র দীক্ষায় দীক্ষিত করেছিলেন, সেটা তারা আবেগের কাছে নষ্ট হতে দেবার মতো প্রজন্ম ছিলেন না। তাই তাঁর ওফাতের পরেই তারা যে যার দায়িত্বে লেগে গেলেন। একদল গোটা পৃথিবীতে দ্বীনের দাওয়াত ও জিহাদের পতাকা উঁচু করে বেরিয়ে পড়লেন। প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষ এবং তাঁর শহরকে পিছনে ফেলে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলেন চীনের সীমান্তে, আফ্রিকার জঙ্গলে, আটলান্টিকের তটে। আর যারা মদিনায় থাকলেন, তারা যে যার মতো স্বাভাবিকভাবে নিজ নিজ কর্তব্য পালন করে গেলেন। ফলে একজন সাহাবি থেকেও বর্ণিত হয়নি, যিনি আল্লাহর রাসুলের কবর ঘিরে বিশেষ ধরনের কোনো ইবাদত কিংবা আমল করেছেন; অথবা কবরের পাশে এসে বসে থেকেছেন, ধ্যান করেছেন। এটা যদি বিশেষ ফজিলতের কিছু হতো, তা হলে সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সেই ফজিলত অর্জনের সবচেয়ে আগ্রহী ও উপযুক্ত প্রজন্ম। ইসলামে যদি এগুলো করার সুযোগ থাকত, তা হলে সাহাবায়ে কেরাম সেই সুযোগ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ছিলেন সবচেয়ে অগ্রগামী। তারা যেহেতু এমন কিছুই করেননি, বোঝা গেল, এগুলো করার মাঝে কোনো ফজিলত নেই, সুযোগও নেই। এভাবে মহাপুরুষদের ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই প্রথম ব্যক্তি, মৃত্যুর পরে যার কবর ঘিরে কোনো ধরনের কুসংস্কার কিংবা অতিরঞ্জন হয়নি।
বরং মসজিদে নববিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেকবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারত করতেন এমন প্রমাণও পাওয়া যায় না। কিছু কিছু বর্ণনার দ্বারা বোঝা যায়, যখন তারা কেবল মদিনার বাইরে থেকে আসতেন, তখন রওজার সামনে এসে সালাম দিতেন। যেমন: ইবনে উমর রাজি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি যখন কোনো সফর শেষ করে মদিনায় আসতেন, ঘরে প্রবেশের আগে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের সামনে এসে বলতেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ, আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা বকর, আসসালামু আলাইকা ইয়া আবাতাহ (হে পিতা)! ১ এরপরে ঘরে যেতেন। আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনায় এসেছে, উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, ইবনে উমর ছাড়া রাসুলের আর কোনো সাহাবি এমন করতেন না। আর ইবনে উমরও উপরের তিনটি বাক্যের বেশি কিছু বলতেন না বা করতেন না। যদিও ইবনে উমর ছাড়া আর কেউ করতেন না—আবদুর রাজ্জাকের এমন কথা সঠিক নয়; বরং অন্য সাহাবারাও করতেন। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে কুরত রাজি. যখন ইয়ারমুক থেকে মদিনায় এলেন, তিনি উটের পিঠ থেকে নেমে এসে প্রথমেই রওজার সামনে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করেন।১ হ্যাঁ, তিনি সালাম ছাড়া অন্যকিছু করেননি। আলি ইবনে হুসাইন (জাইনুল আবিদিন) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি একটি ফাঁকা স্থান দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের কাছে আসত এবং সেখানে বসে দোয়া করত। একদিন তিনি তাকে দেখে ডাকলেন এবং বললেন, আমি কি তোমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিস শোনাবো না, যা আমি আমার বাবা (হুসাইন) ও দাদার (আলি) কাছ থেকে শুনেছি? তিনি বলেছেন, 'তোমরা আমার কবরকে সমবেত হওয়ার স্থান বানিয়ো না, আর তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ো না। তোমরা আমার উপর সালাম পাঠ করো। যেখানেই থাকো, তোমাদের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।'২ এ বর্ণনাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, স্বয়ং নবি- পরিবারের লোকজন নিজেরা তো কবর নিয়ে কোনো ধরনের অতিরঞ্জন করতেনই না; বরং অন্য কাউকে দেখলেও বারণ করতেন। আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হলো, আল্লাহর রাসুলের কবরের কাছাকাছি আসা এবং সেখানে বসে দোয়া করা সালাফের চোখে কোনো প্রশংসাযোগ্য আমল ছিল না। কারণ, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গিয়েছেন, 'তোমরা কবরের উপর বসো না এবং কবরের দিকে ফিরে নামাজ পড়ো না।'৩
আর সম্ভবত এ কারণেই ইমাম মালেক রাহি. মদিনাবাসীর জন্য প্রত্যেক নামাজে মসজিদে আসার সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজার কাছে আসা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, 'বহিরাগতদের জন্য প্রত্যেকবার মসজিদে আসার সময় কবরে সালাম দেওয়াতে সমস্যা নেই। কিন্তু মদিনাবাসীর জন্য এর কোনো ভিত্তি নেই। তাই এটা বর্জন করা উত্তম। এই উম্মতের পরবর্তী প্রজন্ম সে পথেই সফল হবে, যে পথে প্রথম প্রজন্ম হয়েছিল; আর তাদের কেউ এমনটি করতেন বলে আমার জানা নেই।'৪ বরং ইমাম মালেক 'আমি নবিজির কবর জিয়ারত করেছি'—এমন বক্তব্য মাকরুহ আখ্যায়িত করেছেন। কাজি ইয়াজ এর কারণ হিসেবে বলেন, যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে অত্যন্ত সতর্ক করেছেন, এ জন্য 'কবর' শব্দটা উচ্চারণ করা ইমাম মালেক পছন্দ করতেন না। ফলে এর পরিবর্তে 'আমি রাসুলুল্লাহকে জিয়ারত করেছি' বলা মাকরুহ বলতেন না।১
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারত ও কেবল সালাম দেওয়ার ক্ষেত্রেও যদি এই হয় ইমাম মালেক ও আমাদের প্রথম প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি, তা হলে রওজার সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা সময় কান্নাকাটি করা, রাসুলের কাছে প্রয়োজনের কথা তুলে ধরা এবং সাহায্য প্রার্থনার দৃশ্য দেখলে সালাফ কী বলতেন? এই সেই মদিনার ইমাম মালেক, যার ব্যাপারে বর্ণিত আছে, যখনই তাঁর সামনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণ করা হতো, তাঁর শরীরের রং বিবর্ণ হয়ে যেত, তিনি এমনভাবে ঝুঁকে যেতেন, যা তাঁর বৈঠকে উপস্থিত মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ত, ২ যিনি ওজু ছাড়া কখনও হাদিস বর্ণনা করতেন না, হাদিস ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানে কখনও রাস্তায়, দাঁড়িয়ে কিংবা তাড়াহুড়া করে হাদিস বর্ণনা করতেন না, যিনি বার্ধক্য ও শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও মদিনার ভিতরে কখনও কোনো বাহনে চড়তেন না, বলতেন, 'যে মাটিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুয়ে আছেন, আমি সে মাটির উপরে উঠতে পারি না', যে মানুষটিকে তিনি এত ভালোবাসেন, তার কবরে প্রত্যেক বেলা মদিনার লোক আসবে সেটা তিনি পছন্দ করতেন না-এটা কী করে সম্ভব? কারণ, তারা তো সেই আলোকিত প্রজন্মের আলোকিত মানুষ, যারা আবেগ ও আনুগত্যের মাঝে ভারসাম্য জানতেন। মনের সামনে দ্বীনকে ভূলুণ্ঠিত হতে দিতেন না।
বারবার রাসুলের কবরের কাছে আসা এবং সেখানে কিছু সময় সালাম ও দোয়া পাঠের প্রতিও যদি মদিনার ইমাম মালেকের এই দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, তা হলে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া, তাঁর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরা-এগুলোর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতো? কেবল ইমাম মালেক নয়, যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সকল কথা শুনতে পেতেন, তাঁকে ডাকা যদি বৈধ হতো, তা হলে সাহাবায়ে কেরাম সবার আগে এই আমল করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে গোটা জাজিরাতুল আরবে ধর্মত্যাগের তুফান ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নিজেদের নবি দাবি করতে থাকে। একের পর এক সম্প্রদায় ইসলাম থেকে বেরিয়ে কুফরের ভিতরে চলে যেতে থাকে। ইসলাম মাত্র কয়েকটি শহরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর পর একের পর এক তুফান চলতেই থাকে। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জটিলতায় জড়িয়ে যায়। তাদের শেষ করার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামে শত্রুরা। বারবার আক্রান্ত হয় মক্কা ও মদিনা। মসজিদে নববিতে আজান ও নামাজ বন্ধ থাকে। এত ঝড়- তুফানের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পরেও এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, একজন সাহাবি কোনো একদিন মসজিদে নববির কাছে এসে, রওজার সামনে এসে আল্লাহর রাসুলের কাছে তাদের সমস্যার কথা বলেছেন এবং সমাধানের জন্য দোয়া চেয়েছেন। হ্যাঁ, একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যা আমরা পিছনে উল্লেখ করেছি। প্রসিদ্ধ মতে, তিনি একজন সাহাবি বিলাল ইবনে হারিস আল-মুজানি। কিন্তু তিনি উমর, উসমান, আলি, আশারায়ে মুবাশশারাহ, তথা প্রথম সারির সাহাবাদের কেউ নন। ফলে বড় বড় সাহাবির ইজমায়ি আমলের সামনে একজনের এমন আমল খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদিও আমরা এটাকে ছুড়ে ফেলছি না, যা প্রথমেই বর্ণনা করেছি এবং এসব কারণেই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোকে আলাদা করি।
যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর থেকে এত সতর্কতা, সেখানে সাধারণ মানুষ বা পির-আউলিয়ার কবরের ব্যাপারে তো কথা বলাই নিষ্প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে জীবিত, তাঁর কাছে আমাদের সালাম পৌঁছয়, বরং তিনি আমাদের সালাম শুনতে পান, আমাদের আমলনামা তাঁর কাছে পেশ করা হয়, তা ছাড়া তিনি কিয়ামতের দিন আমাদের জন্য শাফায়াত করবেন—এসব কারণেই একদল মুহাক্কিক তাঁর কাছে শাফায়াত চাওয়া (যা প্রকারান্তরে দোয়া চাওয়া) বৈধ বলেছেন। বিপরীতে সাধারণ মানুষ মৃত্যুর সাথে সাথে দুনিয়ার সঙ্গে তাদের সব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারা কবরে তাদের নিজেদের পরিণতি নিয়ে অস্থির থাকে। অন্যের প্রয়োজন শোনা ও পূর্ণ করার সুযোগ কোথায় তার? তাই যে নামেই হোক ওলি-আউলিয়া ও পির-মাশায়েখের কবরের কাছে গিয়ে সরাসরি তাদের কাছে প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করা, কিংবা তারা উপকার করতে পারেন—এ ধরনের বিশ্বাস রেখে তাদের কাছে দোয়া করা শিরক। দূর থেকে মৃত ব্যক্তিকে ডাকাও শিরক। আর কবরের কাছে গিয়ে স্রেফ দোয়া চাওয়াও অনুচিত। কারণ তারা জীবিতদের ডাক শোনে না; আর শুনলেও সেটার হাকিকত আমাদের অজানা। কিন্তু তাদের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা বৈধ, যা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে।১
📄 সন্দেহের অপনোদন
কেউ কেউ শহিদদের জীবিত থাকার দলিলগুলো দিয়ে সাধারণ মৃতদের কাছেও দোয়া ও প্রার্থনাকে জায়েজ বলতে চান; অথচ এটা ভুল। কারণ, শহিদদের জীবিত থাকা তাদের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা অন্যদের নেই। উপরন্তু তাদের জীবন দুনিয়ার জীবনের মতো নয়, বারজাখি জীবন। ফলে তাদের কাছে কিছু চাওয়া বৈধ নয়। অনেকে রাসুলুল্লাহ ও ওলিদের কাছে প্রার্থনা বৈধতার যুক্তি হিসেবে দেখান যে, তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা; সুতরাং তাদের মাধ্যমে দোয়া করালে সেটা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। নিঃসন্দেহে এই যুক্তি ফেলে দেবার মতো নয়। কিন্তু সেটা তো মৃত মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। আপনি জীবিত পুণ্যবান ওলিদের কাছে যান, তাদের কাছে দোয়া চান। এটা ইসলামে সর্বসম্মতভাবে বৈধ। কিন্তু ওলিদের নাম করে মৃত মানুষের কাছে এমন জিনিস চাওয়া, যা কেবল আল্লাহর কাছে চাওয়া যায়, এটা কুরআন-সুন্নাহর কোন দলিলে বৈধ হয়? হ্যাঁ, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা অথবা বর্ণনা দ্বারা এর দলিল দেওয়া যাবে। কুরআন-সুন্নাহর জোড়াতালি দিয়ে যেকোনো অবৈধ বিষয়কে বৈধ বানানো যাবে। তাই এটা ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের মাজহাব। আহলে সুন্নাতের মানহাজ হলো, সকল আয়াত ও হাদিস একত্র করে সে আলোকে ফয়সালা দেওয়া। দু-একটা অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক বর্ণনার বিপরীতে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য আয়াতে মানুষকে তাঁর কাছে দোয়া করার জন্য আহ্বান করেছেন; অন্যের কাছে কিছু চাইতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ.
অর্থ: 'যখন আমার বান্দারা আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন, আমি কাছেই আছি। আমাকে যখন কেউ ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।' [বাকারা: ১৮৬] অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ.
অর্থ: 'তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ডাকো কাকুতি-মিনতি সহকারে ও সংগোপনে।' [আরাফ: ৫৫] আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوْهُ بِهَا .
অর্থ: 'আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম; তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০] অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ،
অর্থ: 'আর আপনার পালনকর্তা বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।' [গাফের: ৬০] অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ أَنَدْعُوْا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُنَا وَلَا يَضُرُّنَا وَنُرَدُّ عَلَى أَعْقَابِنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْنَا.
অর্থ: 'আপনি বলুন, আমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুকে ডাকব যা আমাদের কোনো উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে না? আর আল্লাহ তায়ালা আমাদের হিদায়াত দান করার পরে আমরা কি আমাদের পশ্চাতে ফিরে যাব?' [আনআম: ৭১] আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَدْعُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّلِمِينَ.
অর্থ: 'আর আপনি আল্লাহ ছাড়া এমন কাউকে ডাকবেন না যে আপনার কোনো উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে না। যদি আপনি তা করেন, তবে জালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হবেন।' [ইউনুস: ১০৬] আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ إِنْ تَدْعُوْهُمْ لَا يَسْمَعُوْا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوْا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيمَةِ يَكْفُرُوْنَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ .
অর্থ: 'তিনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তাঁরই। তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটিরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদের ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শোনে না; শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরককে অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মতো আপনাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না।' [ফাতির: ১৩-১৪]
কেউ বলতে পারেন, এসব আয়াত এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কেননা যারা 'ইস্তিগাসা' বৈধ হওয়ার পক্ষে, তারা সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা ওলিদের ডাকার কথা বলছেন না। কারণ, সেটা তো স্পষ্ট শিরক; বরং তারা কেবল তাদের উসিলা দিয়ে আল্লাহকে ডাকছেন যাতে করে আল্লাহ তাদের উসিলায় দোয়া কবুল করেন। সুতরাং শিরক-সম্পর্কিত আয়াতগুলো এখানে আনা উচিত নয়। আমরা বলব, উসিলা দিয়ে দোয়া করার নাম 'তাওয়াসসুল' এবং একটু আগে এটার উপর সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে। এখানে উসিলা দিয়ে দোয়া নয়, বরং সরাসরি ব্যক্তির কাছে চাওয়া হচ্ছে।
📄 শেষ কথা
সবশেষে আরজ করতে চাই, যদি রাসুলুল্লাহর রওজার কাছে উপস্থিত হয়ে শাফায়াত ও দোয়া চাওয়া-চাই সেটাকে ইস্তিশফা' কিংবা ইস্তিগাসা যে নামেই ডাকা হোক—দলিলের ভিত্তিতে এবং কিছু শর্তসাপেক্ষে বৈধ মেনে নেওয়া হয়২, তবুও এই পথ নিঃসন্দেহে কণ্টকাকীর্ণ, বড় পিচ্ছিল। তারা জায়েজ হবার যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, সেগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানেন-এ ধরনের বিশ্বাসকে হানাফি উলামায়ে কেরাম সুস্পষ্ট কুফর ফাতাওয়া দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ ব্যাপারে শিথিলতাই উম্মাহর সামনে শিরক ও হাজারও কুসংস্কারের দুয়ার খুলে দিয়েছে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে মুসলমানদের 'মদদ ইয়া আলি', 'মদদ ইয়া হুসাইন', 'মদদ ইয়া আবদুল কাদের জিলানি'তে ব্যস্ত করে দিয়েছে। মুসলমানদের বিশ্বাস করিয়েছে, নবিজি যেহেতু কবরে জীবিত এবং উম্মাহর কথা শোনেন, তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করেন, তাই অসম্ভব নয় যে, সময়ে সময়ে তিনি কবর থেকে বের হয়ে প্রিয়জনদের অনুষ্ঠানে মিলাদে ওরসে সশরীরে হাজির হন। আজ মুসলিম উম্মাহ কবর এবং বিভ্রান্ত ওলি-আউলিয়া-কেন্দ্রিক যে অন্ধকারে ডুবে আছে, এর অন্যতম কারণ এই দরজাগুলো খুলে রাখা। কারণ, যারা কবরে-মাজারে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ইবাদত করছে, সিজদা দিচ্ছে, প্রার্থনা করছে, তাদের মাঝে কবরের মৃতকে কেবল উসিলা মনে করে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর কাছে চাচ্ছে—এমন লোক বিরল; বরং তারা মূলত মৃতের ব্যাপারে অতিমানবিক এমন কিছু বিষয়ে বিশ্বাসী, যা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ব্যাপারে বিশ্বাস করা কুফর। ফলে ওখানে যা হচ্ছে, তার অধিকাংশই শিরকে আকবরে রূপান্তরিত হতে পারে, যেগুলো মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বৈধ বানানোর কোনো সুযোগ নেই।১
উপরে যেমনটা বলা হয়েছে, 'মৃত ব্যক্তি প্রয়োজন পূর্ণ করতে সক্ষম'-এমন বিশ্বাস রেখে সরাসরি তার কাছে প্রয়োজন পেশ করা এবং সেটা পূর্ণ করার জন্য প্রার্থনা করা সুস্পষ্ট হারাম এবং সর্বসম্মত শিরক। আর যদি আল্লাহকেই একমাত্র প্রয়োজন পূর্ণকারী বিশ্বাস করে মৃত ব্যক্তির কাছে স্রেফ দোয়া চাওয়া হয়, যেমন: 'আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন....' (যা কবরের কাছে হলে প্রকারান্তরে তাওয়াসসুল), তবে সেটা মতভেদপূর্ণ, যেমন মতভেদ তাওয়াসসুলের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একদল আলim অবৈধ বলেন, অন্য আলimগণ বৈধ বলেন। দূরে থেকে ডাকলে এটাও হারাম ও শিরক।২ ফলে হুকুম আরোপের সময় এগুলোর পার্থক্য মনে রাখা চাই। আবার জীবিত-মৃত এসব ফারাক ও এর ফলাফলও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা চাই। অনেক আলim সবগুলোকে স্রেফ বিদআত বলেছেন। অথচ তাতে ইনকারুল মুনকারের হক আদায় হয় না। কারণ, এগুলোকে পাইকারিভাবে বিদআত বললে হালকা করে দেখানো হয়। প্রথমটা তো সুস্পষ্ট শিরক। হ্যাঁ, ব্যক্তিবিশেষকে মুশরিক বলা থেকে বিরত থাকা এক বিষয় এবং পাইকারি হারে সবকিছুকে শিরক বলাও প্রান্তিকতা। কিন্তু কোনো পাপ যদি শিরকের পর্যায়ে হয়, তবে সেটাকে স্রেফ বিদআত বলা যথাযথ নয়। ফলে মুহাক্কিক আলিমগণ এগুলোর কোনোটাকে যেমন হারাম ও অবৈধ বলেছেন, অনেকগুলোকে সুস্পষ্ট কুফরও বলেছেন। তাই সেভাবেই বলতে হবে।
• শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি লিখেন, যদি কোনো ব্যক্তি আজমির কিংবা সালার মাসউদ বা অন্য মাশাইখের কবরের কাছে প্রয়োজন পেশ করার জন্য যায়, তবে সেটা হত্যা ও ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ। এটা প্রকারান্তরে লাত-উজ্জাকে পূজা দেওয়ার মতোই। হ্যাঁ, আমি ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলি না।৩
• দামাদ আফেন্দি লিখেন, যদি কেউ মনে করে (মৃত) মাশাইখের রুহ সর্বত্র উপস্থিত এবং তারা সবকিছু জানে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।১
• রদ্দুল মুহতারে এসেছে, আল্লাহর পরিবর্তে কোনো মৃতের ব্যাপারে এই ধারণা রাখা যে, সে যা ইচ্ছা করতে পারে, কুফর।২
• আলুসি লিখেন, বর্তমানে মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে জীবিত ও মৃত মাশাইখকে ডাকার মাঝে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। যেমন: 'হে সাইয়েদ অমুক, আমাকে রক্ষা করুন।' কোনো মুসলিমের জন্য এ-জাতীয় কথা বলা উচিত নয়। অনেক আলেমের কাছে এটা শিরক; শিরক না হলেও শিরকের মতোই। কারণ, এগুলো যারা করে, তারা সেই মৃতের ব্যাপারে জীবিত হওয়া, সবকিছু শোনা, জানা এবং উপকার- অপকার করতে পারার ক্ষমতার বিশ্বাসের কারণেই করে। তারা এমন বিশ্বাস না রাখলে আল্লাহ ছাড়া তাকে ডাকত না; অথচ এটা ভীষণ ভয়ংকর ব্যাপার।৩
• শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলভি লিখেছেন, তারা কবরের কাছে গিয়ে ভক্তি- শ্রদ্ধা, আদব ও খুশুর ক্ষেত্রে যতটা বাড়াবাড়ি করে, যতটা অতিরঞ্জনের সঙ্গে নিজেদের অক্ষমতা পেশ করে, আল্লাহর ঘর মসজিদেও কখনও তেমন করতে দেখা যায় না। তাদের কাছে কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করা, তাতে বাতি জ্বালানো, ইতিকাফ করা, আগরবাতি ও সুগন্ধি দেওয়া, কবর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার যত গুরুত্ব, আল্লাহর ঘর মসজিদের প্রতি সে তুলনায় বিন্দুমাত্র গুরুত্বও নেই।৪ তিনি অন্যত্র লিখেন, সুতরাং আল্লাহর ওলিদের কাছে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের দোয়া করা, তাদের ডাকা, প্রার্থনার জন্য তাদের কবরের কাছে যাওয়া মূলত তাদের ইবাদত করা। যদিও তারা দাবি করে যে, আমরা তো স্রেফ কবর জিয়ারত করি, ইবাদত করি না। কিন্তু এগুলো তাদের বাহানা।৫
• শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি লিখেছেন, সন্তান ও সুস্থতা ইত্যাদি যা আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারে না, সেগুলো অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে চাওয়া হারাম; বরং কুফর। যদি কোনো মুসলমান জীবিত অথবা মৃত ওলির কাছে এ-জাতীয় প্রার্থনা করে, তবে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।১ সুতরাং যেকোনো মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে উপকার-অপকার, দোয়া কবুল, সাহায্য-সহযোগিতা-সহ এ ধরনের সকল বিশ্বাস শিরক।২
• হজরত গাঙ্গুহিও এগুলো করতে নিষেধ করেছেন।৩
তাই যত দ্রুত এসব দরজা বন্ধ করা যাবে, মুসলিম উম্মাহ তত দ্রুত কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে মুক্তি পাবে। ফিরে যাবে সেই বিশুদ্ধ তাওহিদের আলোর রাজপথে, যেখানে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তাদের ছেড়ে গিয়েছিলেন।