📄 আরশের মুমিনদের জন্য শাফায়াত
দুই. জান্নাতের ফয়সালাপ্রাপ্ত লোকদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের শাফায়াত। তিনিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাঁর উম্মতই সর্বপ্রথম উম্মত হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তিন. জান্নাতবাসীর জন্য জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির শাফায়াত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল জান্নাতির মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য শাফায়াত করবেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর শাফায়াত কবুল করে সেসব লোকের মর্যাদা বুলন্দ করবেন।
চার. নিজ চাচা আবু তালিবের জন্য শাফায়াত। এটা একটা বিশেষ শাফায়াত, যা একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কাউকে দেওয়া হবে না। আবু তালিবও একমাত্র মানুষ, যিনি অমুসলিম থাকা সত্ত্বেও তার ব্যাপারে শাফায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে এবং সে শাফায়াত কবুল করা হবে। তবে তিনি অমুসলিম হওয়াতে চিরস্থায়ী জাহান্নাম তার জন্য অনিবার্য। ফলে রাসুলের শাফায়াত তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের জন্য নয়, বরং তার শাস্তি লঘু করার জন্য। কারণ তিনি রাসুলুল্লাহর প্রিয় চাচা, অভিভাবক। তিনিই রাসুলুল্লাহকে মাতা সাইয়িদা আমিনা ও দাদা আবদুল মুত্তালিবের ইন্তিকালের পরে বড় করেছেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, রাসুলের সুরক্ষা-প্রাচীর হয়ে ছিলেন। আবু তালিবের কারণে কেউ রাসুলুল্লাহর দিকে হাত প্রসারিত করতে পারত না। তার মৃত্যুর পরেই কাফেররা রাসুলুল্লাহকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ পায়। এই বিশাল ভালোবাসা ও অনুগ্রহের বিনিময়স্বরূপ আল্লাহ তায়ালা তার শাস্তি লঘু করে দেবেন। ফলে জাহান্নামিদের মাঝে আবু তালিবের শাস্তি হবে সবচেয়ে কম, তথাপি তার কাছে মনে হবে সবার চেয়ে বেশি।¹
গুনাহগার মুমিনদের জন্য শাফায়াত: উপরে বর্ণিত শাফায়াতগুলো কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। এর বাইরে আরেকটি শাফায়াত রয়েছে, যা রাসুলুল্লাহর পাশাপাশি সবার জন্য উন্মুক্ত। সেটা হলো, গুনাহগার মুমিনদের জন্য শাফায়াত। যাদের গুনাহের কারণে জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে গেছে, তাদের জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি কিংবা যাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়ে গেছে, তাদের সেখান থেকে বের করার জন্য এই শাফায়াত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা শাফায়াতের মাধ্যমে একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন।² রাসুলুল্লাহর পাশাপাশি প্রত্যেক মুমিনের জন্য প্রত্যেক মুমিন এই শাফায়াত করতে পারবে। ফলে ফেরেশতা, নবি-রাসুল, ওলি-আউলিয়া, বালেগ হওয়ার পূর্বে মৃত্যুবরণকারী ছোট ছোট শিশু সবাই তাদের প্রিয় ও পরিচিতজনদের জন্য এই শাফায়াত করতে পারবে।¹ এটা আহলে সুন্নাতের সকল ধারার আকিদা। কিন্তু খারেজি, মুতাজিলা এবং সমকালীন ইবাজিয়্যাহ সম্প্রদায় ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত অনেকে এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার। তারা এই শাফায়াতকে অস্বীকার করে।² আকীদাহ ত্বহাবিয়্যার সমকালীন একজন ব্যাখ্যাতা হাসান সাক্কাফ এ ধরনের শাফায়াতকে অস্বীকার করেন এবং এটাকে ইহুদিদের আকিদা মনে করেন।³
এগুলো দ্বীনের অপব্যাখ্যা। কারণ তাদের মতাদর্শে, কবিরা গুনাহকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামি। ফলে কেউ যদি কবিরা গুনাহ করে, তবে সে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে, আর পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। কিন্তু এটা ভুল আকিদা। কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। কেউ ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে যত গুনাহই থাকুক, একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জাবের রাজি. থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদিস বর্ণিত আছে, 'আমার শাফায়াত আমার উম্মতের মাঝে কবিরা গুনাহকারীদের জন্য।'⁴ এ কারণে ইমাম ইবনে আবদুল বার লিখেন, 'এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকলে এগুলো সত্যায়ন করেন। কেবল বিদআতিরা অস্বীকার করে।'⁵
টিকাঃ
১. মুসলিম (২১১, ২১৩)।
২. মুসলিম (১৯১); মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ (৯০৫); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (২০৮৩৫)।
৩. মুসলিম (১৮৩); মুসনাদে আহমদ (১২০৭৯); তয়ালিসি (২২৯৩)।
৪. ইবনে আবিল ইজ (২০৬)।
৫. দেখুন: হাসান সাক্কাফ (৫৭৮)।
📄 রাসূলের শাফায়াত কীভাবে পাওয়া যাবে?
কিয়ামতের দিন রাসুলের শাফায়াতে ধন্য হওয়া বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই শাফায়াত নসিব হলে জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়া যাবে, জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে যাওয়ার পরেও জান্নাতে যাওয়া যাবে। এমনকি জাহান্নামে প্রবেশ করে থাকলেও (নাউজুবিল্লাহ) এই শাফায়াতের উসিলায় আল্লাহ বের করে আনবেন।¹ প্রশ্ন হলো, রাসুলুল্লাহর শাফায়াত কীভাবে পাওয়া যাবে?
আমাদের সৌভাগ্য যে, আল্লাহর রাসুল তাঁর শাফায়াত পাওয়ার জন্য অনেকগুলো পথ বাতলে দিয়েছেন; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আমলের বিনিময়ে শাফায়াত প্রাপ্তির সুসংবাদ দিয়েছেন। ফলে সামান্য আন্তরিকতা থাকলেও কিয়ামতের দিন আল্লাহ চাইলে তাঁর শাফায়াত পাওয়া সহজ। শাফায়াতপ্রাপ্তির কিছু পথ ও পদ্ধতি:
এক. তাওহিদের উপর মৃত্যুবরণ করা। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সঙ্গে হৃদয়ের গভীর থেকে বলবে 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই', সে কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াতের সৌভাগ্য লাভ করবে।²
দুই. আজানের পরে দোয়া পাঠ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আজানের পরে এই দোয়া পাঠ করবে: اللَّهُمَّ رَبِّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে যাবে।³
তিন. মদিনায় সবর করে বসবাস করা এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি মদিনার কষ্ট এবং প্রতিকূলতা সহ্য করে এখানে বসবাস করবে এবং মৃত্যুবরণ করবে আমি কিয়ামতের দিন তার জন্য শাফায়াতকারী হব।'⁴ আরেকটি হাদিসে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি মদিনাতে মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম, সে যেন এখানে মৃত্যুবরণ করে। কারণ, এখানে যে মৃত্যুবরণ করবে, আমি তার জন্য সুপারিশ করব।'⁵
আগের দিনে মদিনাতে বসবাস করা কষ্টকর ছিল, কিন্তু যে-কেউ চাইলে সেটা সম্ভব ছিল। এখন মদিনায় বসবাস করা কষ্টকর নয়, কিন্তু চাইলেই সেটা সম্ভব হয় না। তবে বসবাস সম্ভব না হলেও মৃত্যু সম্ভব, আল্লাহ যদি সে সৌভাগ্য কপালে লিখে রাখেন। এ জন্য আমাদের অনেক শাইখ মদিনায় মৃত্যুবরণ করতে চাইতেন। এটা সম্ভব না হলেও প্রথম দুটি সবার জন্যই সম্ভব।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (২৩২১৪)।
২. বুখারি (৯৯, ৬৫৭০); বাজ্জার (৮৪৬৯)।
৩. বুখারি (৬১৪); আবু দাউদ (৫২৯); ইবনে খুজাইমা (৪২০)।
৪. মুসলিম (১৩৭৪, ১৩৭৮); তিরমিজি (৩৬২৪)।
৫. তিরমিজি (৩৬১৭); ইবনে মাজা (৩১১১); মুসনাদে আহমদ (৫৫৩৪)।