📄 হাউজের নাম
ইমাম তহাবি রাহি.-কেবল হাউজের কথা বলেছেন। হাদিসেও কেবল 'হাউজ' শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে 'হাউজে কাউসার' নাম এলো কোত্থেকে? কুরআনে উল্লিখিত কাউসার কি এই হাউজ নাকি ভিন্ন কোনো বস্তু?
বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। একদল আলিম দুটোকে এক বলেছেন। অন্য একদল আলিম দুটোকে আলাদা বলেছেন। এই মতভেদের কারণ হচ্ছে-এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে স্পষ্ট বক্তব্য নেই; একদিক থেকে বোঝা যায় দুটো একই, অন্যদিক থেকে বোঝা যায় দুটো আলাদা।
সহিহ মুসলিমে এসেছে, রাসুলুল্লাহর উপর যখন সুরা কাউসার অবতীর্ণ হলো, তখন তিনি সাহাবাদের বললেন, 'তোমরা কি জানো কাউসার কী?' তারা বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন।' তিনি বললেন, 'এটা একটা নদী। আল্লাহ তায়ালা আমাকে তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাতে কল্যাণ রয়েছে। এটা হাউজ, কিয়ামতের দিন আমার উম্মত এখানে আমার কাছে পান করার জন্য আসবে। এর পাত্রগুলো আকাশের তারকা পরিমাণ....'' উক্ত হাদিসে দেখা যাচ্ছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউসারকে প্রথমে 'নদী' বলে আখ্যা দিলেও পরে এটাকেই 'হাউজ' বলে আখ্যা দেন। ফলে বোঝা যায়, হাউজ আর কাউসার আলাদা নয়; বরং নদী বলা হলেও হাউজটির নামই কাউসার।
কিন্তু কিছু কিছু হাদিসে বোঝা যায়, কাউসার এবং রাসুলুল্লাহর হাউজ আলাদা। যেমন আবু দাউদের বর্ণনায় উক্ত হাদিসটিই এভাবে এসেছে : فَإِنَّهُ نَهَرُ وَعَدَنِيهِ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ فِي الْجَنَّةِ ، وَعَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ، عَلَيْهِ حَوْضٌ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ যাচ্ছে, কাউসারকে জান্নাতের নদী বলা হচ্ছে; অথচ হাউজ জান্নাতে নয়, বরং হাশরের মাঠে। অপরদিকে হাউজকে নদীর উপর বলা হচ্ছে।২ এর মানে, হাউজটি জান্নাতের কাউসার নদী থেকে উৎসারিত। অন্য কিছু হাদিসও এটাকে শক্তিশালী করছে। যেমন আবু জর রাজি. থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, 'হাউজ জান্নাতের দুটো নালার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।'৩ এতে বোঝা যাচ্ছে, হাউজটি জান্নাতের কাউসার নদী থেকেই উৎসারিত। অর্থাৎ একদিক থেকে দুটো ভিন্ন; একটি নদী, অপরটি হাউজ। আরেক দিক থেকে দুটো এক। কারণ, হাউজটি নদীরই শাখা। এ কারণে সম্ভবত এর নাম হয়েছে 'হাউজে কাউসার' তথা কাউসার নদী থেকে উৎসারিত হাউজ। আল্লাহ এর স্বরূপ ভালো জানেন।
📄 শাফায়াতের পরিচয় ও প্রকারভেদ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আখিরাত সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা হচ্ছে শাফায়াত তথা সুপারিশ। আখিরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অপরাধীদের পক্ষে সুপারিশ করে তাদের উদ্ধার করার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেওয়া হয়েছে। এটাকেই বলা হয় 'শাফায়াত'। বিভ্রান্ত খারেজি ও মুতাজিলারা এটাকে অস্বীকার করে। তারা ব্যতীত আহলে সুন্নাতের সকল ধারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই শাফায়াতকে বিশ্বাস করে। ফলে এটা মুসলমানদের সর্বসম্মত আকিদা।
📄 কিয়ামতে রাসূলুল্লাহর শাফায়াত
শাফায়াতের অনেকগুলো প্রকার রয়েছে। কিছু শাফায়াত সকল নবি-রাসুল, ফেরেশতা ও সৎকর্মশীল মুমিন সবার জন্য। আর কিছু শাফায়াত একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। আমরা প্রথমে রাসুলুল্লাহর জন্য নির্ধারিত শাফায়াতগুলো নিয়ে আলোচনা করব, এরপর সবার জন্য উন্মুক্ত শাফায়াত উল্লেখ করব।¹
এক. আহলুল মাওকিফ তথা হাশরের ময়দানে চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের উদ্ধারের শাফায়াত। যখন হাশরের মাঠে মানুষের অবস্থান অত্যন্ত দীর্ঘ হতে থাকবে, ভিড় বাড়তে থাকবে, সূর্য মাথার কাছাকাছি চলে আসবে, বিপদ ও উৎকণ্ঠায় মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে, তখন সকল মানুষ চাইবে চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাক; কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত করার পথ কী? যেকোনো নবির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সেটা প্রার্থনা করা। এ জন্য সবাই আদম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে আল্লাহর দরবারে শাফায়াত প্রার্থনা করবে; কিন্তু তিনি অপারগতা পেশ করবেন। অতঃপর তারা নুহ আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনিও অপারগতা পেশ করবেন। এরপর যাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে। তিনিও রাজি হবেন না। এরপর যাবে মুসা আলাইহিস সালামের কাছে। তিনিও নিজের অক্ষমতার কথা বলবেন। এরপর যাবে ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে। ঈসাও নিজের অক্ষমতা পেশ করবেন। সবশেষে তারা যাবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। তিনি সম্মত হয়ে বলবেন, 'হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত।' তখন তিনি আল্লাহর কাছে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে দোয়া ও কান্নাকাটি করতে থাকবেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, 'আপনার মাথা উত্তোলন করুন। আপনি চান, দেওয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে সৃষ্টির ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা দেওয়ার সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করে চূড়ান্ত ফয়সালা শুরু করবেন।²
এটা হলো 'শাফায়াতে উজমা' তথা সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাফায়াত। কারণ, এটা একদিকে একমাত্র রাসুলুল্লাহর জন্য নির্ধারিত। জগতের বড় বড় নবি-রাসুলও এটা করতে পারবেন না। ফলে এর মাধ্যমে একদিকে যেমন রাসুলুল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়, অপরদিকে শুধু তাঁর উম্মত নয়, গোটা সৃষ্টির প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও দরদ প্রকাশ পায়। এই মর্যাদা গোটা সৃষ্টির মাঝে কেবল রাসুলুল্লাহরই। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এটাকে 'মাকামে মাহমুদ' তথা প্রশংসনীয় স্থান হিসেবে অভিহিত করে তা রাসুলুল্লাহকে দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَ مِنَ الَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ * عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا .
অর্থ: 'রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ পড়ুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত শ্রেষ্ঠত্ব। আশা করা যায়, আপনার পালনকর্তা আপনাকে 'মাকামে মাহমুদে' পৌঁছাবেন।'³ [ইসরা: ৭৯]
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (২০২-২০৬); গুনাইমি (৭৯-৮১); সালেহ ফাওজান (৭৯-৮০)।
২. বুখারি (৪৭১২); মুসলিম (১৯৪); তিরমিজি (২৪৩৪)।
৩. গুনাইমি (৭৯)।
📄 আরশের মুমিনদের জন্য শাফায়াত
দুই. জান্নাতের ফয়সালাপ্রাপ্ত লোকদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের শাফায়াত। তিনিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাঁর উম্মতই সর্বপ্রথম উম্মত হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তিন. জান্নাতবাসীর জন্য জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির শাফায়াত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল জান্নাতির মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য শাফায়াত করবেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর শাফায়াত কবুল করে সেসব লোকের মর্যাদা বুলন্দ করবেন।
চার. নিজ চাচা আবু তালিবের জন্য শাফায়াত। এটা একটা বিশেষ শাফায়াত, যা একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কাউকে দেওয়া হবে না। আবু তালিবও একমাত্র মানুষ, যিনি অমুসলিম থাকা সত্ত্বেও তার ব্যাপারে শাফায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে এবং সে শাফায়াত কবুল করা হবে। তবে তিনি অমুসলিম হওয়াতে চিরস্থায়ী জাহান্নাম তার জন্য অনিবার্য। ফলে রাসুলের শাফায়াত তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের জন্য নয়, বরং তার শাস্তি লঘু করার জন্য। কারণ তিনি রাসুলুল্লাহর প্রিয় চাচা, অভিভাবক। তিনিই রাসুলুল্লাহকে মাতা সাইয়িদা আমিনা ও দাদা আবদুল মুত্তালিবের ইন্তিকালের পরে বড় করেছেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, রাসুলের সুরক্ষা-প্রাচীর হয়ে ছিলেন। আবু তালিবের কারণে কেউ রাসুলুল্লাহর দিকে হাত প্রসারিত করতে পারত না। তার মৃত্যুর পরেই কাফেররা রাসুলুল্লাহকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ পায়। এই বিশাল ভালোবাসা ও অনুগ্রহের বিনিময়স্বরূপ আল্লাহ তায়ালা তার শাস্তি লঘু করে দেবেন। ফলে জাহান্নামিদের মাঝে আবু তালিবের শাস্তি হবে সবচেয়ে কম, তথাপি তার কাছে মনে হবে সবার চেয়ে বেশি।¹
গুনাহগার মুমিনদের জন্য শাফায়াত: উপরে বর্ণিত শাফায়াতগুলো কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। এর বাইরে আরেকটি শাফায়াত রয়েছে, যা রাসুলুল্লাহর পাশাপাশি সবার জন্য উন্মুক্ত। সেটা হলো, গুনাহগার মুমিনদের জন্য শাফায়াত। যাদের গুনাহের কারণে জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে গেছে, তাদের জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি কিংবা যাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়ে গেছে, তাদের সেখান থেকে বের করার জন্য এই শাফায়াত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা শাফায়াতের মাধ্যমে একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন।² রাসুলুল্লাহর পাশাপাশি প্রত্যেক মুমিনের জন্য প্রত্যেক মুমিন এই শাফায়াত করতে পারবে। ফলে ফেরেশতা, নবি-রাসুল, ওলি-আউলিয়া, বালেগ হওয়ার পূর্বে মৃত্যুবরণকারী ছোট ছোট শিশু সবাই তাদের প্রিয় ও পরিচিতজনদের জন্য এই শাফায়াত করতে পারবে।¹ এটা আহলে সুন্নাতের সকল ধারার আকিদা। কিন্তু খারেজি, মুতাজিলা এবং সমকালীন ইবাজিয়্যাহ সম্প্রদায় ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত অনেকে এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার। তারা এই শাফায়াতকে অস্বীকার করে।² আকীদাহ ত্বহাবিয়্যার সমকালীন একজন ব্যাখ্যাতা হাসান সাক্কাফ এ ধরনের শাফায়াতকে অস্বীকার করেন এবং এটাকে ইহুদিদের আকিদা মনে করেন।³
এগুলো দ্বীনের অপব্যাখ্যা। কারণ তাদের মতাদর্শে, কবিরা গুনাহকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামি। ফলে কেউ যদি কবিরা গুনাহ করে, তবে সে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে, আর পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। কিন্তু এটা ভুল আকিদা। কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। কেউ ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে যত গুনাহই থাকুক, একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জাবের রাজি. থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদিস বর্ণিত আছে, 'আমার শাফায়াত আমার উম্মতের মাঝে কবিরা গুনাহকারীদের জন্য।'⁴ এ কারণে ইমাম ইবনে আবদুল বার লিখেন, 'এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকলে এগুলো সত্যায়ন করেন। কেবল বিদআতিরা অস্বীকার করে।'⁵
টিকাঃ
১. মুসলিম (২১১, ২১৩)।
২. মুসলিম (১৯১); মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ (৯০৫); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (২০৮৩৫)।
৩. মুসলিম (১৮৩); মুসনাদে আহমদ (১২০৭৯); তয়ালিসি (২২৯৩)।
৪. ইবনে আবিল ইজ (২০৬)।
৫. দেখুন: হাসান সাক্কাফ (৫৭৮)।