📄 একটি নিবেদন
এগুলো নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শেষ হবার নয়। দশ-বিশ পৃষ্ঠা দূরের কথা, আমরা যদি এগুলোর উপর হাজার পৃষ্ঠাও লিখে ফেলি আর পাঠক সেগুলো পড়েন, তবুও এ সম্পর্কে বিবাদের মীমাংসা হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, বিতর্ক হাজার বছরের। তা হলে করণীয় কী? করণীয় হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা, বিনয়ী হওয়া; এ ব্যাপারে আলোচনা যথাসম্ভব সীমিত রাখা; নীরবতাকে প্রাধান্য দেওয়া; বিপরীত মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সদয় হওয়া।
বর্তমান যুগে আকিদা নিয়ে বিতর্ক একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আল্লাহর সিফাত ছাড়া অন্যান্য বিষয় নিয়ে যেহেতু তেমন বিতর্ক নেই, তাই সিফাত নিয়ে বিবাদ-বিভেদ যেন আমাদের নিত্ত-নৈমিত্তিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। যে যার মতো করে বিষয়টাতে নাক গলাচ্ছে। আকিদা-সম্পর্কে অজ্ঞ তরুণরা বড় বড় আলিম ও ইমামকে গালি-গালাজ করছে। বরং আকিদা মানেই সিফাত নিয়ে টানাটানি। অথচ এগুলো সালাফের কর্মপন্থা নয়। ইমাম মালেক রাহি.-কে যে লোক ইস্তিওয়া নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি তাকে মসজিদের বাইরে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।¹ 'তাঁর মতো কেউ নয়' এটুকু বলে সারা দিন যদি আল্লাহর এসব সিফাত চর্চার বিষয়ই হতো, তবে রাগ করা কিংবা মসজিদের বাইরে বের করে দেওয়ার মতো পর্যায়ে যেত না। একইভাবে ইমাম মালেক রাহি.-কে যখন خَلَقَ وَأَنَّهُ يُدْخِلُ يَدَهُ فِي جَهَنَّمَ حَتَّى إِنَّ اللهَ يَكْشِفُ عَنْ سَاقِهِ وَأَنَّ اللهَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ يَخْرُجُ مَنْ أَرَادَ এই হাদিসগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি প্রচণ্ডভাবে প্রতিবাদ করেন এবং কাউকে এসব হাদিস বর্ণনা করতে নিষেধ করেন! ² এখানেও কাইফিয়্যাত সম্পর্কে নয়; বরং স্বাভাবিক বর্ণনা করতেও নিষেধ করা হয়েছে। আর
টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (ফাতহুল বারি (১৩/৪০৭)
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/১৮২-১৮৩)।
📄 আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সবকিছু ঊর্ধ্বে
আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের সীমা-পরিসীমা ও গণ্ডির ঊর্ধ্বে। তিনি সকল উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও উপকরণ থেকে মুক্ত। সৃষ্টির মতো ছয় দিক তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।
ব্যাখ্যা
আল্লাহ তায়ালা জগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। তিনি মানুষ ও অন্য সকল প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। সবার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রূপদান করেছেন। তিনিই জগতে বিদ্যমান ছোট-বড় সকল সাজ-সরঞ্জাম, উপায়-উপকরণ অস্তিত্বে এনেছেন। ফলে এগুলোর কোনোকিছুই তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল তিনি বানিয়েছেন; আকাশ ও মাটি তিনি গড়েছেন; সূর্য ও চন্দ্র তিনি উদ্ভাবন করেছেন। পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ, উপর ও নিচ তাঁর বানানো। ফলে তিনি উপর ও নিচের ঊর্ধ্বে। এসব দিক সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য; সৃষ্টির বোঝার সুবিধার্থে। আল্লাহর জন্য এসব দিক প্রযোজ্য নয়। কেনো দিক (জিহাহ) তাঁকে পরিবেষ্টিত করতে পারে না। কোনো সীমা-পরিসীমা (হদ-গায়াহ) তাঁকে ধারণ করতে পারে না। এগুলোই ইমাম তহাবি রাহি.-এর বক্তব্যের অর্থ।
কিন্তু একদল ব্যাখ্যাতা এখানে ইমাম তহাবির উপর প্রচণ্ড আপত্তি করেছেন। তাদের বক্তব্য—আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের ব্যাপারে এসব শব্দ প্রয়োগ করেননি, রাসুলুল্লাহও আল্লাহর ব্যাপারে এমন শব্দ প্রয়োগ করেননি। ফলে এগুলো ব্যবহার না করাই উত্তম। বরং কেউ কেউ তো এটাও বলেছেন যে, 'এগুলো ইমাম তহাবি বলেননি, অন্যকেউ ঢুকিয়েছে', আর আফসোস করেছেন, 'যদি ইমাম তহাবি এমন কথা না বলতেন!'
কিন্তু এই আপত্তি যথাযথ নয়। কারণ, ইমাম তহাবি রাহি. এখানে যা বলেছেন, সেটা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফ থেকে গৃহীত ব্যাখ্যাই। তা ছাড়া এসব শব্দ তাঁর নিজের আবিষ্কৃত নয়; বরং সালাফের মাঝেও এসব পরিভাষা প্রচলিত ছিল। খোদ ইমাম আজম আবু হানিফা রাহি. আল্লাহর জন্য 'হদ' (সীমা) নাকচ করেছেন। আল-ফিকহুল আকবারে তিনি বলেন, 'তাঁর কোনো 'হদ' (সীমা) নেই, প্রতিপক্ষ নেই, সমকক্ষ নেই; তাঁর মতো কিছু নেই।' (له حد ولا ضد له ولا ند له ولا مثل له)¹
আবু দাউদ তয়ালিসি (২০৪ হি.) বলেন, 'সুফিয়ান সাওরি, শু'বা, হাম্মাদ ইবনে জায়দ, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, শরিক ও আবু আওয়ানাহ আল্লাহর জন্য 'হদ' নির্ধারণ করতেন না, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সাদৃশ্য দিতেন না, সৃষ্টির কিছুর সঙ্গে তাকে মেলাতেন না।'² সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুস্তরি (২৮৩ হি.) বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার সত্তা ইলমের গুণে গুণান্বিত, কিন্তু তাকে পূর্ণ উপলব্ধি কিংবা ধারণ করা সম্ভব নয়। দুনিয়াতে তাঁকে চোখে দেখা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, ঈমানের মাধ্যমে তিনি বিদ্যমান আছেন সেটা বোঝা সম্ভব। কিন্তু তাঁর সীমারেখা নির্ধারণ সম্ভব নয়, তাঁকে পরিবেষ্টন করা সম্ভব নয়। সৃষ্টির মাঝে তাঁকে ধারণ করা সম্ভব নয়....' ³
ইমাম আহমদ রাহি. থেকে খাল্লাল (৩১১ হি.) বর্ণনা করেন, মৃত্যুর আগের দিন ইমামকে সিফাতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাব দেন, 'যেভাবে এসেছে ওভাবেই রেখে দিতে হবে। ওগুলোর উপর ঈমান আনতে হবে। বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হলে কোনোকিছু নাকচ করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা নিজের ব্যাপারে যা বলেছেন, তারচেয়ে কিছু বেশি বলা যাবে না। কোনোরূপ সীমা-পরিসীমা (بلا حد ولا غاية) নির্ধারণ ব্যতিরেকে!'⁴ লালাকায়ির (৪১৮ হি.) বর্ণনাতেও এসেছে, ইমাম আহমদ রাহি. বলেন, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর কোনো সীমা ও স্বরূপ নির্ধারণ ছাড়া স্বীকার করা (بلا حد ولا صفة) ইবনে হিব্বান (৩৫৪ হি.) বলেন, আল্লাহ তায়ালার কোনো সীমা নেই তিনি সীমাবদ্ধ নন (ليس له حد محدود فيحتوى)। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। যেহেতু মুশাববিহাহ ও মুজাসসিমাহ সম্প্রদায় আল্লাহর ব্যাপারে এসব শব্দ
টিকাঃ
১. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
২. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (২/৩৩৪); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (৪৭২৯)।
৩. আর রিসালাহ কুশাইরিয়্যাহ (২/৪৬৪)।
৪. আকিদাহ (রিওয়াইয়াতু খাল্লাল) (১২৭)।
৫. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (২/৪৪৬); তারিখুল ইসলাম, জাহাবি (৫/১০২৪)।
৬. আস সিকাত, ইবনে হিব্বান (১/১)।
📄 ‘দিক’ ও ‘সীমা’ সাদৃশ্যকারীদের মানহাজের পর্যালোচনা
উপরে আমরা ইমাম তহাবির ব্যবহৃত শব্দগুলোর উপর একদল আলিমের আপত্তির কথা উল্লেখ করেছি। তারা ইমাম তহাবির সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেন এবং আল্লাহর জন্য 'হদ' (সীমা) এবং 'জিহাহ' (দিক) দুটোই সাব্যস্ত করেন। বরং তারা আল্লাহর 'সীমা' অস্বীকার করাকে বাতিল মনে করেন! আল্লাহর সীমা থাকাকে তারা সালাফের মানহাজ মনে করেন। তাদের মতে, আরশ আমাদের উপরে এবং এটা একটা 'দিক'। আর আল্লাহ আরশের 'উপরে' এটাও একটা 'দিক'। সুতরাং আল্লাহ একটা 'দিকেই' আছেন )في جهة( উপরন্তু এটাকে তারা ইমাম আহমদের মাজহাব হিসেবে ঘোষণা করেন। এক্ষেত্রে তাদের দলিল, ইমাম আহমদ আল্লাহর আরশে ইস্তিওয়াকে সাব্যস্ত করেন।¹
কিন্তু ইমাম আহমদ রাহি. এমন মাজহাব থেকে মুক্ত। যদি আরশের উপর ইস্তিওয়া সাব্যস্ত করার কারণে ইমাম আহমদ দিক সাব্যস্ত করেন বলা হয়, তবে তো সকল সালাফের ব্যাপারে বলতে হবে তারাও দিক সাব্যস্ত করেন। অথচ সালাফ কেবল 'জাহের' সাব্যস্ত করতেন। নুসুসের অনুসরণে ইস্তিওয়াসহ সকল সিফাতকে হুবহু যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতেন। এর গভীর মর্ম, স্বরূপ ও ধরন উপলব্ধি করতে নিজেদের অক্ষম মনে করতেন, যেমনটা ইমাম মালেক ও শাফেয়ি থেকে প্রসিদ্ধ। ফলে আরশে আল্লাহর ইস্তিওয়ার স্বরূপ তিনিই ভালো জানেন। এর সঙ্গে 'দিকের' কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহর জন্য জিহাহ সাব্যস্ত করা সালাফ কিংবা খালাফ কোনো মুহাক্কিকেরই মাজহাব নয়।²
ইমাম আহমদ রাহি.-এর মাজহাব হলো: 'আরশ সৃষ্টির আগে কিংবা পরে আল্লাহর মাঝে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কোনো সীমারেখা আল্লাহকে পরিবেষ্টিত করতে পারে না।'³ ইবনে হামদান (৬৯৫ হি.) ইমাম আহমদ রাহি. থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আরশের উপরে যেভাবে তিনি চেয়েছেন। কোনো সীমা (হদ) ছাড়া।'⁴ ইবনে হামদান ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের আকিদা বর্ণনা করে আরও লিখেন, “আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে 'নিচ', 'উপর', 'সম্মুখ', 'পিছন', 'স্বরূপ'
টিকাঃ
১. বায়ানু তালবিসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৪৬৬, ৫৯১, ৭৩০)।
২. ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়্যাহ, মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি (১/২৪৬)।
৩. আকিদাহ, আহমদ ইবনে হাম্বল (১১)।
৪. নিহায়াতুল মুবতাদিয়ীন (৩১)।