📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 অধমের কথা

📄 অধমের কথা


অধমের কথা: উপরের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তাশবিহ (সাদৃশ্যকারী) ও তাজসিম (দেহবাদী) ধারা আল্লাহর সিফাত সাব্যস্তকরণের ক্ষেত্রে চরম অতিরঞ্জন করে সেগুলোকে পুরো সৃষ্টির মতো বানিয়ে দিয়েছে। ফলে এগুলো ভ্রান্ত মতাদর্শ। একইভাবে তাতিলের মাধ্যমে সিফাতকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়, ফলে এটাও ভ্রান্ত মতাদর্শ। সুতরাং বাহ্যিক অর্থ সাব্যস্তকরণ কিংবা ইসবাতের ক্ষেত্রে যারা অতিরঞ্জন করবে, তাদের মাজহাব তাজসিমের অত্যন্ত কাছাকাছি। আবার যারা তাফবিজ কিংবা তাবিলের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করবে, তারাও তাতিল ও তাহরিফের অনেক কাছাকাছি। সুতরাং সিফাতের ইসবাত ও তাফবিজের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে উপরের মূলনীতি অনুসরণের বিকল্প নেই।
এটা হলো 'সালাফের ইসবাত ও তাফবিজের উদ্দেশ্য কী' সে প্রশ্নের জবাব। এখন প্রশ্ন হতে পারে, সামগ্রিকভাবে আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে সালাফের মানহাজ কী? আমরা আগেই বলেছি, সকল সিফাতের ক্ষেত্রে সকল সালাফ কোনো একক মানহাজে ছিলেন না-কোথাও ইসবাত (শাব্দিক অর্থ সাব্যস্ত) করেছেন, কোথাও তাফবিজ (প্রচলিত অর্থ আল্লাহর কাছে সমর্পণ) করেছেন, আবার কোথাও তাবিল করেছেন। বরং একজন একেক জায়গায় একেক রকম করেছেন। যেমন: ইমাম আহমদ রাহি, কখনও তাফবিজ করেছেন, ¹ কখনও ইসবাত করেছেন, ² কখনও তাবিল করেছেন।³ তাই ইমাম আহমদের দু-একটা বক্তব্য থেকে তার জন্য পুরো একটা মানহাজ দাঁড় করানো যাবে না। বরং যেখানে যেটা মুনাসিব, তিনি সেটা করেছেন। ইমাম মালেক রাহি, কখনও তাফবিজ করেছেন, কখনও তাবিল করেছেন।⁴ ইবনে হাজারও লিখেছেন, আরবি ভাষার ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে সালাফের কেউ কেউ কখনও তাবিল করেছেন, কখনও তাফবিজ করেছেন।⁵ ইমাম তিরমিজি রাহি. ইস্তিওয়ার হাদিসে তাবিলের সমালোচনা করেছেন।⁶ সেই তিনিই আবার 'হাবল' এর হাদিসে তাবিল করেছেন।⁷ সুতরাং সালাফের কাজের মাধ্যমে খালাফের আবিষ্কৃত القول في بعض الصفات كالقول في بعض القول মূলনীতিটি ভুল প্রমাণিত হলো।⁸ কারণ, সকল সিফাতের ক্ষেত্রে এক ধরনের কথা বলা কখনোই সালাফের মানহাজ ছিল না। বরং নুসূসের যা চাহিদা, সালাফ সে অনুযায়ী সেটাকে গ্রহণ করেছেন।
ফলে সালাফকে কোনো সীমাবদ্ধ মানহাজে আবদ্ধ করার সুযোগ নেই। কিংবা আমাদের বানানো মানহাজকে 'এটাই সালাফের মানহাজ' এমন বলার সুযোগ নেই। সালাফ কারও লিখিত কোনো মানহাজের উপর চলেননি। বরং যেখানে যেটা প্রযোজ্য, সেখানে সেটা করেছেন। তাই আমাদের বানানো মানহাজে সালাফকে না ঢুকিয়ে সালাফের মানহাজে আমাদের ঢুকতে হবে। সামগ্রিকভাবে আমরাও তাদের সামগ্রিক মানহাজ অনুসরণ করব। সেটা হলো: আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য যেসব গুণ সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলোকে আমরা স্বীকার করব। যেমন: আল্লাহ বলেছেন, ‘রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন’, আমরা বলব না: ‘না, তিনি ইস্তিওয়া করেননি।’ আবার ইস্তিওয়াকে সৃষ্টির খাটে বসা, আরোহণ করা, ওঠা, থাকা, সমাসীন হওয়া ইত্যাদির সদৃশ বানিয়ে ফেলব না। আল্লাহকে কোনো বিশেষ দিকে বা স্থানে ভাবব না। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে নুজুল করেন, আমরা বলব না: ‘তিনি নুজুল করেন না।’ আবার এটাকে সৃষ্টির অবতরণ/স্থানান্তরের মতোও ভাবব না। আল্লাহ তায়ালা রহমান, আমরা বলব না: ‘তাঁর রহমত নেই।’ আবার তাঁর রহমত সৃষ্টির রহমতের মতোও ভাবব না। আল্লাহ রাগ করেন। আমরা বলব না: ‘তিনি রাগ করেন না।’ আবার তাঁর রাগকে সৃষ্টির রাগ-জাতীয় মনে করব না। কুরআনে আল্লাহ তায়ালার দুই হাতের (ইয়াদ) কথা এসেছে, চেহারার (ওয়াজহ) কথা এসেছে। আমরা বলব না: ‘তাঁর হাত (ইয়াদ) নেই, চেহারা (ওয়াজহ) নেই।’ কারণ তাঁর এগুলো আছে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে এগুলো সিফাত (গুণ ও বিশেষণ)। ফলে এগুলোকে সৃষ্টির মতো (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ/ আকার-আকৃতি) ভাবব না; তাবিল করব না। আবার এগুলোর উপর ‘হাকিকি হাত’, ‘হাকিকি চেহারা’ এ-জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করব না। বরং সালাফের মতো সংক্ষিপ্তভাবে এগুলোতে ঈমান রাখব আর এর গভীর মর্ম ও ধরন (ওয়াসফ ও কাইফিয়‍্যাত) এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা (তাফসির) আল্লাহর হাতে সোপর্দ করব। এগুলো নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ঘাঁটাঘাঁটি থেকে বিরত থাকব।¹
আর পৃথক পৃথক মাসআলাতে সালাফ যা করেছেন, তা-ই করব। একটু আগেই বলা হয়েছে, সালাফ সকল মাসআলাতে যেকোনো একটা পদ্ধতি গ্রহণ করেননি; বরং যেখানে যেটা প্রযোজ্য সেটা গ্রহণ করেছেন। কারণ, কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত সবগুলো সিফাতকে যদি অর্থ এবং কাইফিয়্যাহ-সহ সম্পূর্ণভাবে (লফজি-সহ) তাফবিজ করা হয়, তবে এসবের আর কোনো অর্থ থাকে না, যা তাতিলের মতোই। এটা সালাফের মানহাজ নয়, খালাফেরও মানহাজ নয়; কারণ খালাফ অনেকগুলো সিফাতের অর্থ গ্রহণ করেন। আবার সবগুলোকে (লফজি-সহ) তাবিল করে ফেললেও এগুলো তাতিলের পর্যায়ে চলে যায়। এটাও সালাফ করেননি। আবার সবগুলোর বাহ্যিক অর্থ (উরফি-সহ) ইসবাত করলেও তাজসিম ও তাশবিহের পর্যায়ে চলে যায় কিংবা অনেক সময় এগুলোর অর্থ ঠিক থাকে না। ফলে সালাফ এটাও করেননি।
তাই আমরা সালাফের অনুসরণে যেখানে যেটা প্রযোজ্য, সেখানে সেটা করব। যেখানে তারা তাফবিজ করেছেন, আমরাও সেখানে তাফবিজ করব। যেখানে তারা শব্দের অর্থ ইসবাত করেছেন, আমরাও সেখানে ইসবাত করব। যেসব জায়গায় তারা তাবিল করেছেন, আমরাও সেখানে তাবিল করব। যদি কোথাও একাধিক সালাফ থেকে মতবিরোধপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায় (বিশেষত ইসবাত ও তাবিলের ক্ষেত্রে), তবে যেটা সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী সেটা মানব। সবগুলো একপর্যায়ে থাকলে কিংবা মীমাংসা না করা গেলে (যথা কেউ তাবিল করেছেন কেউ করেননি), সেগুলো গ্রহণকারীদের পরস্পরকে মুজতাহিদ মনে করব। সবার মতকে আহলে সুন্নাতের অংশ মনে করব। সালাফের মানহাজের সুস্পষ্ট বিরুদ্ধাচরণ ছাড়া কাউকে আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ করব না।
এটাই হলো সালাফের প্রকৃত অনুসরণ। এটাই সর্বোচ্চ নিরাপদ পথ। আর এটা বাদ দিয়ে যদি সব জায়গাতেই জোর করে সালাফকে জাহেরপন্থি বানাতে যাই, কিংবা সব জায়গায় তাদের তাবিলকারী বানাতে যাই, তবে সেটা সালাফের অনুসরণ হবে না, সালাফের নামে নিজেদের মতাদর্শের অনুসরণ হবে।

টিকাঃ
১. তারিখে তাবারি (৮/৬৩৯); ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আল্লাহর বাণী'-এর অর্থ কী? এটার অর্থ কিন্তু আহলে সুন্নাতের সবার কাছে জ্ঞাত। তাও তিনি বলেন, 'আমি জানি না। আল্লাহ যেভাবে নিজেকে বর্ণনা করেছেন।'
২. আকিদাহ (রিওয়াইয়াতু খাল্লাল) (১০২)।
৩. আল ফাসল, ইবনে হাজম (২/১৩২)।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/১৮৩)।
৫. ফাতহুল বারি, (৩/৩০)।
৬. তিরমিজি (৬৬২ নং হাদিসের উপর ইমামের বক্তব্য)।
৭. তিরমিজি (৩২৯৮ নং হাদিসের উপর ইমামের বক্তব্য)।
৮. মাজমুউল ফাতাওয়া (৩/১৭)।
৯. আল-আসনা ফি শরহি আসমাইল্লাহিল হুসনা, কুরতুবি (১৬৯)। ইমাম নিশাপুরী ‘ইস্তিওয়া’ সম্পর্কে আবু হানিফা (র.) এর আকিদা লেখেন এভাবে: ‘আমাদের রবের কিতাব যেভাবে বলেছে আমরা সেভাবে মানি। এব্যাপারে আমরা কোনো ইলম দাবি করি না। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি ইস্তিওয়া করেছেন। কিন্তু সৃষ্টির ইস্তিওয়ার সঙ্গে তাঁর ইস্তিওয়ার কোনো সাদৃশ্য নেই। আরশের উপর ইস্তিওয়ার ব্যাপারে এটাই আমাদের বক্তব্য’। আল ইতিকাদ, নিশাপুরী (১৪৯)। নিহায়াতুল মুবতাদিয়ীন, ইবনে হামদান (৩১-৩৩)। আল-ইনসাফ, বাকিল্লানি (১২)। কারী মুহাম্মত তৈয়ব লিখেছেন, 'আল্লাহ শোনেন কিন্তু আমাদের শোনার মতো নয়। আল্লাহ দেখেন কিন্তু আমাদের দেখার মতো নয়।... আল্লাহ নুযুল করেন কিন্তু আমাদের নুজুলের মতো নয়। আল্লাহ হাসেন কিন্তু আমাদের হাসার মতো নয়। আল্লাহ আরশের উপর ইস্তিওয়া করেন কিন্তু আমাদের ইস্তিওয়ার মতো নয়' (৩৬, ১৩৬)। ইমাম আবুল ইউসর বাজদাবি (র.) বলেন, 'আল্লাহর হাত, চোখ ইত্যাদি বিশেষ সিফাত। কুরআন এগুলো সাব্যস্ত করেছে। তাই আমরাও সাব্যস্ত করবো। তবে সৃষ্টির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো মনে করবো না। আর আরবী থেকে অন্য ভাষায় এগুলো অনুবাদ নিয়ে আলিমগণ মতভেদ করেছেন। কারও কাছে অঙ্গ ভেবে নয় এই শর্তে বৈধ, কেউ কেউ সতর্কতামূলক অবৈধ বলেছেন..' (উসুলুদ্দিন ৩৯)। সারাখসি (র.) বলেন, যারা অবৈধ বলেছেন তারা মূলত আম মানুষদের ফিতনার ভয়ে বলেছেন। নতুবা দীনী দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ। তবে হানাফি আলিমগণ অনুবাদ না করাকেই প্রাধান্য দেন (তাতারখানিয়া ৭/২৮৬-২৮৭)। কিন্তু সাধারণ মানুষদেরকে বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক করে অনুবাদ বৈধ হওয়াই উচিত। নতুবা এসব শব্দের অর্থ তাদের কখনোই জানা হবে না। পেছনে আমরা কাশ্মীরি (র.) এর বক্তব্য উল্লেখ করেছি, যিনি এগুলোর অনুবাদকে বৈধ মনে করেন। আল-আরাফুশ শাযী, কাশ্মীরি (১/৪১৬)। উক্ত স্থানে কাশ্মীরি (র.) আরও বলেন, নুযুল ও ইস্তিওয়ার ক্ষেত্রে সালাফের মাজহাব হলো, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা (তাবিল) ও স্বরূপ বর্ণনা (তাকয়ীফ) ছাড়া যাহেরের উপর ঈমান আনা এবং কাইফিয়্যাত আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়া।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 একটি নিবেদন

📄 একটি নিবেদন


এগুলো নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শেষ হবার নয়। দশ-বিশ পৃষ্ঠা দূরের কথা, আমরা যদি এগুলোর উপর হাজার পৃষ্ঠাও লিখে ফেলি আর পাঠক সেগুলো পড়েন, তবুও এ সম্পর্কে বিবাদের মীমাংসা হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, বিতর্ক হাজার বছরের। তা হলে করণীয় কী? করণীয় হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা, বিনয়ী হওয়া; এ ব্যাপারে আলোচনা যথাসম্ভব সীমিত রাখা; নীরবতাকে প্রাধান্য দেওয়া; বিপরীত মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সদয় হওয়া।

বর্তমান যুগে আকিদা নিয়ে বিতর্ক একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আল্লাহর সিফাত ছাড়া অন্যান্য বিষয় নিয়ে যেহেতু তেমন বিতর্ক নেই, তাই সিফাত নিয়ে বিবাদ-বিভেদ যেন আমাদের নিত্ত-নৈমিত্তিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। যে যার মতো করে বিষয়টাতে নাক গলাচ্ছে। আকিদা-সম্পর্কে অজ্ঞ তরুণরা বড় বড় আলিম ও ইমামকে গালি-গালাজ করছে। বরং আকিদা মানেই সিফাত নিয়ে টানাটানি। অথচ এগুলো সালাফের কর্মপন্থা নয়। ইমাম মালেক রাহি.-কে যে লোক ইস্তিওয়া নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি তাকে মসজিদের বাইরে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।¹ 'তাঁর মতো কেউ নয়' এটুকু বলে সারা দিন যদি আল্লাহর এসব সিফাত চর্চার বিষয়ই হতো, তবে রাগ করা কিংবা মসজিদের বাইরে বের করে দেওয়ার মতো পর্যায়ে যেত না। একইভাবে ইমাম মালেক রাহি.-কে যখন خَلَقَ وَأَنَّهُ يُدْخِلُ يَدَهُ فِي جَهَنَّمَ حَتَّى إِنَّ اللهَ يَكْشِفُ عَنْ سَاقِهِ وَأَنَّ اللهَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ يَخْرُجُ مَنْ أَرَادَ এই হাদিসগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি প্রচণ্ডভাবে প্রতিবাদ করেন এবং কাউকে এসব হাদিস বর্ণনা করতে নিষেধ করেন! ² এখানেও কাইফিয়্যাত সম্পর্কে নয়; বরং স্বাভাবিক বর্ণনা করতেও নিষেধ করা হয়েছে। আর

টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (ফাতহুল বারি (১৩/৪০৭)
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/১৮২-১৮৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সবকিছু ঊর্ধ্বে

📄 আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সবকিছু ঊর্ধ্বে


আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের সীমা-পরিসীমা ও গণ্ডির ঊর্ধ্বে। তিনি সকল উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও উপকরণ থেকে মুক্ত। সৃষ্টির মতো ছয় দিক তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।

ব্যাখ্যা
আল্লাহ তায়ালা জগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। তিনি মানুষ ও অন্য সকল প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। সবার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রূপদান করেছেন। তিনিই জগতে বিদ্যমান ছোট-বড় সকল সাজ-সরঞ্জাম, উপায়-উপকরণ অস্তিত্বে এনেছেন। ফলে এগুলোর কোনোকিছুই তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল তিনি বানিয়েছেন; আকাশ ও মাটি তিনি গড়েছেন; সূর্য ও চন্দ্র তিনি উদ্ভাবন করেছেন। পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ, উপর ও নিচ তাঁর বানানো। ফলে তিনি উপর ও নিচের ঊর্ধ্বে। এসব দিক সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য; সৃষ্টির বোঝার সুবিধার্থে। আল্লাহর জন্য এসব দিক প্রযোজ্য নয়। কেনো দিক (জিহাহ) তাঁকে পরিবেষ্টিত করতে পারে না। কোনো সীমা-পরিসীমা (হদ-গায়াহ) তাঁকে ধারণ করতে পারে না। এগুলোই ইমাম তহাবি রাহি.-এর বক্তব্যের অর্থ।

কিন্তু একদল ব্যাখ্যাতা এখানে ইমাম তহাবির উপর প্রচণ্ড আপত্তি করেছেন। তাদের বক্তব্য—আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের ব্যাপারে এসব শব্দ প্রয়োগ করেননি, রাসুলুল্লাহও আল্লাহর ব্যাপারে এমন শব্দ প্রয়োগ করেননি। ফলে এগুলো ব্যবহার না করাই উত্তম। বরং কেউ কেউ তো এটাও বলেছেন যে, 'এগুলো ইমাম তহাবি বলেননি, অন্যকেউ ঢুকিয়েছে', আর আফসোস করেছেন, 'যদি ইমাম তহাবি এমন কথা না বলতেন!'

কিন্তু এই আপত্তি যথাযথ নয়। কারণ, ইমাম তহাবি রাহি. এখানে যা বলেছেন, সেটা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফ থেকে গৃহীত ব্যাখ্যাই। তা ছাড়া এসব শব্দ তাঁর নিজের আবিষ্কৃত নয়; বরং সালাফের মাঝেও এসব পরিভাষা প্রচলিত ছিল। খোদ ইমাম আজম আবু হানিফা রাহি. আল্লাহর জন্য 'হদ' (সীমা) নাকচ করেছেন। আল-ফিকহুল আকবারে তিনি বলেন, 'তাঁর কোনো 'হদ' (সীমা) নেই, প্রতিপক্ষ নেই, সমকক্ষ নেই; তাঁর মতো কিছু নেই।' (له حد ولا ضد له ولا ند له ولا مثل له)¹

আবু দাউদ তয়ালিসি (২০৪ হি.) বলেন, 'সুফিয়ান সাওরি, শু'বা, হাম্মাদ ইবনে জায়দ, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, শরিক ও আবু আওয়ানাহ আল্লাহর জন্য 'হদ' নির্ধারণ করতেন না, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সাদৃশ্য দিতেন না, সৃষ্টির কিছুর সঙ্গে তাকে মেলাতেন না।'² সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুস্তরি (২৮৩ হি.) বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার সত্তা ইলমের গুণে গুণান্বিত, কিন্তু তাকে পূর্ণ উপলব্ধি কিংবা ধারণ করা সম্ভব নয়। দুনিয়াতে তাঁকে চোখে দেখা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, ঈমানের মাধ্যমে তিনি বিদ্যমান আছেন সেটা বোঝা সম্ভব। কিন্তু তাঁর সীমারেখা নির্ধারণ সম্ভব নয়, তাঁকে পরিবেষ্টন করা সম্ভব নয়। সৃষ্টির মাঝে তাঁকে ধারণ করা সম্ভব নয়....' ³

ইমাম আহমদ রাহি. থেকে খাল্লাল (৩১১ হি.) বর্ণনা করেন, মৃত্যুর আগের দিন ইমামকে সিফাতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাব দেন, 'যেভাবে এসেছে ওভাবেই রেখে দিতে হবে। ওগুলোর উপর ঈমান আনতে হবে। বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হলে কোনোকিছু নাকচ করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা নিজের ব্যাপারে যা বলেছেন, তারচেয়ে কিছু বেশি বলা যাবে না। কোনোরূপ সীমা-পরিসীমা (بلا حد ولا غاية) নির্ধারণ ব্যতিরেকে!'⁴ লালাকায়ির (৪১৮ হি.) বর্ণনাতেও এসেছে, ইমাম আহমদ রাহি. বলেন, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর কোনো সীমা ও স্বরূপ নির্ধারণ ছাড়া স্বীকার করা (بلا حد ولا صفة) ইবনে হিব্বান (৩৫৪ হি.) বলেন, আল্লাহ তায়ালার কোনো সীমা নেই তিনি সীমাবদ্ধ নন (ليس له حد محدود فيحتوى)। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। যেহেতু মুশাববিহাহ ও মুজাসসিমাহ সম্প্রদায় আল্লাহর ব্যাপারে এসব শব্দ

টিকাঃ
১. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
২. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (২/৩৩৪); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (৪৭২৯)।
৩. আর রিসালাহ কুশাইরিয়্যাহ (২/৪৬৪)।
৪. আকিদাহ (রিওয়াইয়াতু খাল্লাল) (১২৭)।
৫. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (২/৪৪৬); তারিখুল ইসলাম, জাহাবি (৫/১০২৪)।
৬. আস সিকাত, ইবনে হিব্বান (১/১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 ‘দিক’ ও ‘সীমা’ সাদৃশ্যকারীদের মানহাজের পর্যালোচনা

📄 ‘দিক’ ও ‘সীমা’ সাদৃশ্যকারীদের মানহাজের পর্যালোচনা


উপরে আমরা ইমাম তহাবির ব্যবহৃত শব্দগুলোর উপর একদল আলিমের আপত্তির কথা উল্লেখ করেছি। তারা ইমাম তহাবির সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেন এবং আল্লাহর জন্য 'হদ' (সীমা) এবং 'জিহাহ' (দিক) দুটোই সাব্যস্ত করেন। বরং তারা আল্লাহর 'সীমা' অস্বীকার করাকে বাতিল মনে করেন! আল্লাহর সীমা থাকাকে তারা সালাফের মানহাজ মনে করেন। তাদের মতে, আরশ আমাদের উপরে এবং এটা একটা 'দিক'। আর আল্লাহ আরশের 'উপরে' এটাও একটা 'দিক'। সুতরাং আল্লাহ একটা 'দিকেই' আছেন )في جهة( উপরন্তু এটাকে তারা ইমাম আহমদের মাজহাব হিসেবে ঘোষণা করেন। এক্ষেত্রে তাদের দলিল, ইমাম আহমদ আল্লাহর আরশে ইস্তিওয়াকে সাব্যস্ত করেন।¹

কিন্তু ইমাম আহমদ রাহি. এমন মাজহাব থেকে মুক্ত। যদি আরশের উপর ইস্তিওয়া সাব্যস্ত করার কারণে ইমাম আহমদ দিক সাব্যস্ত করেন বলা হয়, তবে তো সকল সালাফের ব্যাপারে বলতে হবে তারাও দিক সাব্যস্ত করেন। অথচ সালাফ কেবল 'জাহের' সাব্যস্ত করতেন। নুসুসের অনুসরণে ইস্তিওয়াসহ সকল সিফাতকে হুবহু যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতেন। এর গভীর মর্ম, স্বরূপ ও ধরন উপলব্ধি করতে নিজেদের অক্ষম মনে করতেন, যেমনটা ইমাম মালেক ও শাফেয়ি থেকে প্রসিদ্ধ। ফলে আরশে আল্লাহর ইস্তিওয়ার স্বরূপ তিনিই ভালো জানেন। এর সঙ্গে 'দিকের' কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহর জন্য জিহাহ সাব্যস্ত করা সালাফ কিংবা খালাফ কোনো মুহাক্কিকেরই মাজহাব নয়।²

ইমাম আহমদ রাহি.-এর মাজহাব হলো: 'আরশ সৃষ্টির আগে কিংবা পরে আল্লাহর মাঝে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কোনো সীমারেখা আল্লাহকে পরিবেষ্টিত করতে পারে না।'³ ইবনে হামদান (৬৯৫ হি.) ইমাম আহমদ রাহি. থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আরশের উপরে যেভাবে তিনি চেয়েছেন। কোনো সীমা (হদ) ছাড়া।'⁴ ইবনে হামদান ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের আকিদা বর্ণনা করে আরও লিখেন, “আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে 'নিচ', 'উপর', 'সম্মুখ', 'পিছন', 'স্বরূপ'

টিকাঃ
১. বায়ানু তালবিসিল জাহমিয়‍্যাহ (৩/৪৬৬, ৫৯১, ৭৩০)।
২. ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়্যাহ, মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি (১/২৪৬)।
৩. আকিদাহ, আহমদ ইবনে হাম্বল (১১)।
৪. নিহায়াতুল মুবতাদিয়ীন (৩১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00