📄 সংশয় নিরসন
সংশয় নিরসন: কেউ প্রশ্ন করতে পারে, আল্লাহ তায়ালা কেন একজনকে হিদায়াত দান করেন, অন্যজনকে গোমরাহ করেন? এর উত্তর ইমাম তহাবি রাহি. নিজে দিয়েছেন: 'তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ অনুগ্রহে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, সুরক্ষিত রাখেন, সুস্থতা ও নিরাপত্তা দান করেন। আবার যাকে ইচ্ছা ইনসাফপূর্বক তার নিজের উপর ছেড়ে দেন, বিপথগামী করেন, পরীক্ষায় ফেলেন। সকলেই তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর অনুগ্রহ ও ইনসাফের মাঝে আবর্তিত হয়।' অর্থাৎ হিদায়াত দান তাঁর অনুগ্রহ, আর পথচ্যুতকরণ তাঁর ইনসাফ। সুতরাং পথচ্যুত ব্যক্তিকে আল্লাহ জুলুম করেছেন এই অজুহাত দেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ বলতে পারে, একজনকে অনুগ্রহ করে হিদায়াত দেওয়া, আরেকজনকে পথচ্যুত করা হোক সেটা ইনসাফভিত্তিক, সেটাও কি এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব কিংবা জুলুমের পর্যায়ে পড়ে না? যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা পক্ষপাতমূলক হয়, তবে জুলুম না হলেও এমন আচরণ তো ইতিবাচক নয়। আমরা জবাবে বলব, আল্লাহর ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয় না। কারণ, আল্লাহ সবার সৃষ্টিকর্তা, সবার জন্ম ও মৃত্যুদাতা, সবার রিজিকদাতা। সুতরাং তিনি কারও পক্ষপাতিত্ব করবেন এটা কল্পনাও করা যায় না। নেতিবাচকভাবে কারও প্রতি অনুগ্রহ করবেন, আর কারও প্রতি করবেন না, এটা হতেই পারে না। কারণ, সৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সকল মানুষ তাঁর কাছে সমান।
তা হলে কেন তিনি একজনের প্রতি অনুগ্রহ করেন অন্যজনের প্রতি করেন না? এর উত্তর তিনি নিজেই কুরআনের একটি সুরায় দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى، وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى. فَسَنُيَسِرُهُ لِلْيُسْرَى، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى. وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى : فَسَنُيَسِرُهُ لِلْعُسْرَى.
অর্থ: 'অতএব, যে দান করে, আল্লাহভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে, আমি তার জন্য সুখের বিষয় সহজ করে দেবো। আর যে কৃপণতা করে, মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেবো।'¹ [লাইল: ৫-১০]
দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ মানুষের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবেন, এটা অনেকখানি মানুষের নিজের কর্মের উপর নির্ভর করে। কেউ নিজেকে সংশোধনের মাধ্যমে, নিজের প্রচেষ্টা ব্যয়ের মাধ্যমে, নিষ্ঠা ও আশা নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও মিনতির মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হতে পারে, হিদায়াত পেতে পারে। আবার মানুষ চাইলে নিজের আলস্য ও গাফিলতির মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়ে কেবল ইনসাফের পাত্র হয়। তখন তার পথচ্যুত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ অর্থ: 'আল্লাহ তায়ালা জালেম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দান করেন না।' [আলে ইমরান: ৮৬]
তা ছাড়া কাউকে হিদায়াত দান করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি নেই; কাউকে পথচ্যুত করলে আল্লাহর লাভ নেই। সুতরাং লাভ-ক্ষতি পুরোটাই বান্দার। ফলে আল্লাহ তায়ালা কারও প্রতি জুলুম করবেন সে প্রশ্নই ওঠে না। বরং তিনি বান্দাদের কর্মের ভিত্তিতে কাউকে অনুগ্রহ করে হিদায়াত দেন, আর কাউকে ইনসাফপূর্বক হিদায়াত থেকে বঞ্চিত করেন।² আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ 'আল্লাহ তাদের জুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করেছে।' [নাহল: ৩৩]
মুমিন ও কাফের এবং সৎ ও অসতের মাঝে পার্থক্য দেখিয়ে আল্লাহ বলেন,
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّاتِ أَن نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَ عَمِلُوا الصُّلِحَتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ.
অর্থ: 'যারা অসৎকর্ম করেছে তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের সে লোকদের মতো মনে করব, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং তাদের জীবন ও মুত্যু কি সমান হবে? তাদের দাবি কত মন্দ!' [জাসিয়াহ: ২১]
টিকাঃ
১. বুখারি (৪৯৪৯); মুসলিম (২৬৪৭)।
২. সালেহ ফাওজান (৪৩)।
📄 আল্লাহর প্রতিদ্বন্দী-সমকক্ষ নেই
আরও বলেন,
أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَ عَمِلُوا الصَّلِحَتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ অর্থ: 'আমি কি বিশ্বাসী ও সৎকর্মীদের পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাফেরদের সমকক্ষ করে দেবো, না খোদাভীরুদের পাপাচারীদের সমান করে দেবো? [সাদ: ২৮]
আরেক জায়গায় একই অর্থের তাগিদ করেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ . مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ অর্থ: 'আমি কি আজ্ঞাবহদের অপরাধীদের মতো গণ্য করব? তোমাদের কী হলো? তোমরা কেমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ? [কলম: ৩৫-৩৬]
আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী-সমকক্ষ নেই: কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে,
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ . অর্থ: 'তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।' [ইখলাস: ৪]
আরেক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَانْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
অর্থ: 'অতএব, তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করো না।' [বাকারা: ২২]
অন্যত্র বলেন,
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ অর্থ: 'আল্লাহ মানুষের জন্য অনুগ্রহের মধ্য থেকে যা খুলে দেন, তা ফেরাবার কেউ নেই এবং তিনি যা বারণ করেন, তা কেউ প্রেরণ করতে পারে না তিনি ব্যতীত। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।' [ফাতির: ২]
এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে বলতেন, اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ ، وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি যা দান করবেন তা ফেরানোর সাধ্য কারও নেই; আপনি যা দান করবেন না তা দেওয়ার সাধ্য কারও নেই।'¹
উপরে ইমাম তহাবির বক্তব্য মূলত তাকদিরের ক্ষেত্রে মুতাজিলাদের মতাদর্শের খণ্ডন। মুতাজিলারা তাকদিরের ক্ষেত্রে মানুষকে আল্লাহর সমকক্ষ/প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করায়। কারণ তাদের ধারণা, মানুষের সকল কাজের সৃষ্টিকর্তা মানুষ নিজে। ফলে এভাবে তারা দুইজন সৃষ্টিকর্তা সাব্যস্ত করে: এক. আল্লাহ তায়ালা, দুই. মানুষ নিজেই। তাই ইমাম তহাবি তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন, আল্লাহই সবার ও সবার সকল কর্মের স্রষ্টা। ভাগ্যের নিয়ন্তা।²
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (১০৭)।
২. বুখারি (৮৪৪, ৭২৯২); মুসলিম (৪৭১)।
📄 তাঁর নির্দেশের ব্যত্যয় নেই
তাঁর নির্দেশের ব্যত্যয় নেই: কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ. অর্থ: “তিনি যখন কোনোকিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, 'হও', তখনই তা হয়ে যায়।” [ইয়াসিন: ৮২]
আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন,
وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ. অর্থ: 'আর আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশ স্থগিত করার মতো কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী।' [রাদ: ৪১] আরেক আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন, وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ. অর্থ: 'আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্তে প্রবল। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।' [ইউসুফ: ২১]
টিকাঃ
📄 তাকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে
তাকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে: এ ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هُذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هُذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ
অর্থ: ‘তাদের কোনো কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তখন বলে, এটা হয়েছে আপনার পক্ষ থেকে। বলুন, এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ [নিসা: ৭৮]
প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরিলে এসেছে, জিবরিল আলাইহিস সালাম যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদিরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করা।’¹
ইমাম তহাবি রাহি. এখানে ‘ঈমান’ এবং ‘ইয়াকিন’ দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন। দুটোর অর্থ কাছাকাছিই। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রাহি. মনে করেন, ‘ঈমান’ হলো ওহি এবং কুরআন-সুন্নাহ সত্যায়নের নাম। আর ‘ইয়াকিন’ হলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও গবেষণা-প্রসূত বিশ্বাসের নাম। কারণ, কুরআনে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয়েছিল ‘ইয়াকিন’।² [আনআম: ৭৫]
টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।
২. গজনবি (৬৮); তুর্কিস্তানি (৮৬)।