📄 সৃষ্টির আগেই তিনি সবার কর্ম সম্পর্কে জানতেন
করত, তিনি বলতেন, 'এটা আগ থেকেই নির্ধারিত।’১ কিন্তু এটা অবৈধ কিংবা নিষিদ্ধ নয়। ফলে জীবন বৃদ্ধির জন্য দোয়া করা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুরআন-সুন্নাহে মানুষের জীবন নির্ধারিত হওয়ার ব্যাপারে বারবার নিশ্চিত করা হয়েছে। তা হলে দোয়া কীভাবে মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে?
এটার উত্তর ইমামগণ বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুন্দর মতামত হলো (যার অংশবিশেষ উপরেও বলা হয়েছে), দোয়ার মাধ্যমে যে তাকদিরের পরিবর্তন ঘটবে, সেটাও আল্লাহ তায়ালা জানেন এবং সে হিসেবেই তার তাকদির লিখেছেন। অর্থাৎ যদি সে দোয়া করে, তবে এটা হবে; আর দোয়া না করলে ওটা হবে—লাওহে মাহফুজে সব লিখিত। ফলে বান্দার কাছে দোয়ার মাধ্যমে তাকদিরের পরিবর্তন ঘটলেও মূল তাকদিরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এ কারণেই উলামায়ে কেরাম তাকদিরকে দুইভাবে ভাগ করেছেন। যথা: তাকদিরে মুবরাম (তথা সুনির্ধারিত) এবং মুআললাক (তথা ঝুলন্ত)। প্রথমটা আল্লাহর কাছে লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত। তাতে কোনো পরিবর্তন নেই। আর দ্বিতীয়টা মানুষ ও ফেরেশতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে। অর্থাৎ দোয়া, সৎকর্ম ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে জীবন বৃদ্ধি পায়, গুনাহের মাধ্যমে জীবন কমে যায়; ঔষধ খেলে মানুষ সুস্থ হয় এবং বেঁচে থাকে, না খেলে মারা যায়। এক জায়গায় থাকলে মানুষ মৃত্যুবরণ করে, অন্য জায়গায় চলে গেলে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়—এই একাধিক সম্ভাবনাগুলো দ্বিতীয় তাকদিরে থাকে, প্রথম তাকদিরে চূড়ান্তটাই নির্ধারিত থাকে, যা পরিবর্তনীয় নয়। এ জন্যই উমর রাজি. বলেছেন, 'আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে পালিয়ে আরেক তাকদিরের কাছে যাচ্ছি!'২
কুরআনে এই দ্বিতীয় প্রকারের তাকদির সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ . يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَعِنْدَةً أُمُّ الْكِتَبِ.
অর্থ: 'প্রত্যেকটি নির্ধারিত সময় লিখিত আছে। আল্লাহ যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং বহাল রাখেন এবং মূলগ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।' [রাদ: ৩৮-৩৯]
অর্থাৎ ফেরেশতাদের কাছে থাকা দ্বিতীয় প্রকারের তাকদিরে বান্দার কাজের ভিন্নতায় পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু এসব পরিবর্তন ঘটা-সহ চূড়ান্তভাবে কী হবে, সেটা
লেখা হয়েছে প্রথম প্রকারের তাকদির 'মূলগ্রন্থ' আল্লাহর কাছে। ওখানে কোনো পরিবর্তন নেই। অপর একটি আয়াতেও তাকদিরের এই প্রকারভেদের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا يُعَمَّرُ مِنْ مُعَمَّرٍ وَلَا يُنْقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَبٍ إِنَّ ذُلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ অর্থ: 'কোনো বয়স্ক ব্যক্তি বয়স পায় না এবং তার বয়স হ্রাস পায় না; কিন্তু তা লিখিত আছে কিতাবে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।' [ফাতির: ১১]
অর্থাৎ দোয়া, চিকিৎসা, সতর্কতা, সৎকর্ম, গুনাহ-সহ কুরআন-হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন কারণে মানুষের বয়স কম-বেশি হতে পারে, সেটা দ্বিতীয় প্রকারের তাকদিরে রয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন-সহ সবকিছু লেখা রয়েছে প্রথম তাকদিরে, যেটাকে আল্লাহ 'কিতাব' নামে ব্যক্ত করেছেন। ফলে ওখানে কার বয়স বাড়বে কিংবা কমবে এবং কীভাবে বাড়বে-কমবে, সবকিছু লেখা আছে।১ ইবনে তাইমিয়া রাহি. লিখেছেন, '(মানুষের তাকদির দুটো)। পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটে ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরে। যদি পরিবর্তনের মতো কোনো কাজ করে, তবে সেটাতে পরিবর্তন ঘটে। কারণ, ফেরেশতাদের কাছে চূড়ান্ত জ্ঞান নেই। অপরদিকে আল্লাহর কাছে রয়েছে চূড়ান্ত জ্ঞান। ফলে তাঁর কাছে লিখিত তাকদিরে কোনো পরিবর্তন নেই। কারণ, ফেরেশতাদের তাকদিরে লেখা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের বিষয়টিটিও তিনি আগে থেকেই জানেন, ফলে চূড়ান্ত কথাই লিখেছেন।'২
সৃষ্টির আগেই তিনি সবার কর্ম সম্পর্কে জানতেন: কারণ তাঁর জ্ঞান সর্বব্যাপী। এ জন্য সালাফের উলামায়ে কেরাম বলেছেন, 'আল্লাহ অতীতে কী হয়েছে, জানেন; বর্তমানে কী হচ্ছে, জানেন; ভবিষ্যতে কী হবে, জানেন। আর তিনি জানেন, যা হয়নি, যদি হতো কীভাবে হতো!' ভ্রান্ত কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, আল্লাহ সৃষ্টির আগে কিছুই জানেন না।৩ এটা তাদের গোমরাহি। কারণ, আল্লাহ অগ্র-পশ্চাৎ সব জানেন। মানুষ সৃষ্টির আগে, যখন ফেরেশতাদের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পরামর্শ করেছিলেন,
টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন: ফয়জুল বারি, কাশ্মীরি (৩/৪০৭); তুহফাতুল আহওয়াজি (৬/২৮৯-২৯০); শরহে মিশকাত, তিবি (৫/১৭১০); ইবনে আবিল ইজ (১০২)।
২. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া (১৪/৪৯০-৪৯২); আরও দেখুন: তাফসিরে ইবনে আতিয়্যাহ (৩/৩১৭)।
৩. ইবনে আবিল ইজ (১০৩); আকহাসারি (১২৯); হারারি (৪৪)। কেউ কেউ মুতাজিলাদের ব্যাপারেও এমন ধারণা রাখে। কিন্তু আল্লামা জামাখশারির তাফসির দেখলে বোঝা যায়, মুতাজিলারা 'কোনোকিছু অস্তিত্বে আসার আগে আল্লাহ সে ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন'-এটা অস্বীকার করে না। দেখুন: কাশশাফ (৪/৪৪১)।
📄 মানুষের সৃষ্টি ইবাদতের জন্য
এটাকেই ইমাম তহাবি 'তিনি তাদের তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন' বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ.
অর্থ: 'আমি মানুষ ও জিনকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।' [জারিয়াত: ৫৬]
তিনি আরও বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيُوةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
অর্থ: 'যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ।' [মুলক: ২]
প্রশ্ন উঠতে পারে, আল্লাহ যদি সৃষ্টির আগেই সবার পরিণতি সম্পর্কে জানেন, তবে কাফেরদের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার কী রহস্য? উত্তর হলো: আল্লাহ তায়ালা কারও প্রতি সামান্য জুলুম করেন না। ফলে তিনি কাউকে স্রেফ জানার ভিত্তিতে শাস্তি দেন না। কারণ, তাতে সে যুক্তি দিতে পারে, তাকে সুযোগ ও স্বাধীনতা দেওয়া হলে সে কুফরি করত না। বরং সুযোগ দেওয়ার পরেও কাফেররা মৃত্যুর সময় বলে,
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ . لَعَلَى أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِن وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
অর্থ: 'যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে পুনরায় (পৃথিবীতে) প্রেরণ করুন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। (আল্লাহ বলেন) কখনোই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।' [মুমিনুন: ৯৯-১০০]
তাই আল্লাহ প্রত্যেককে সুযোগ দেন। অতঃপর সে কুফরি করে নিজেকে শাস্তির যোগ্য করে নেয়। ফলে প্রতিদানটা আল্লাহর জ্ঞান কিংবা তাকদিরের উপর নির্ভরশীল নয়, মানুষের কর্মের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ সবাইকে সৎ কাজের আদেশ দিয়েছেন। যে সেগুলো মান্য করবে, সে জান্নাত দ্বারা সম্মানিত হবে। যে অমান্য করবে, সে শাস্তি পাবে।¹
টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (৪১)।
📄 আল্লাহর ইচ্ছা চূড়ান্ত। সৃষ্টির ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন
এ ব্যাপারে কুরআনে অসংখ্য আয়াত এসেছে। নিচে আমরা কয়েকটি তুলে ধরছি: আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا.
অর্থ: 'আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তোমরা কোনো ইচ্ছা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [ইনসান: ৩০]
তিনি আরও বলেন, وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعُلَمِينَ.
অর্থ: 'বিশ্বজগতের পালনকর্তার ইচ্ছা ব্যতিরেকে তোমরা কোনো ইচ্ছা করো না।' [তাকভির: ২৯]
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন, وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلْئِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتُ وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلًا مَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَلَكِنَّ اكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ.
অর্থ: 'আমি যদি তাদের কাছে ফেরেশতাদের অবতারণ করতাম, তাদের সাথে মৃতরা কথাবার্তা বলত এবং আমি সব বস্তুকে তাদের সামনে জীবিত করে পেশ
১৩ | আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ |
📄 আরেকটি সন্দেহের অপনোদন
একটি সন্দেহের অপনোদন:
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা যদি পৃথিবীর সবার জন্য ঈমান কামনা করেন, তবে আবু বকর রাজি.-এর কপালে ঈমান লিখে থাকলে আবু লাহাবের কপালে কেন লিখলেন না? আবু বকর রাজি.-কে ঈমান গ্রহণে সহায়তা করেছেন, আবু লাহাবকে কেন করলেন না? উত্তর হলো:
এক. আল্লাহ তায়ালা তাঁর গায়েবি ইলমের মাধ্যমে প্রথমেই জেনেছেন যে, আবু লাহাবের ঈমান তার কোনো উপকারে আসবে না। অর্থাৎ সে গোমরাহির পথেই চলবে, ফলে তাকে মুমিন বানিয়ে সৃষ্টি করেননি, কিংবা তাকে ঈমান গ্রহণে সাহায্য করেননি।
দুই. আবু বকর রাজি.-কে আল্লাহ ঈমান গ্রহণে সহায়তা করে অনুগ্রহ করেছেন। কারণ, তিনি নিজের পুণ্য, উত্তম চরিত্র, হৃদয়ের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতার ফলে সেই অনুগ্রহ লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। অপরদিকে আবু লাহাব তার মন্দ গুণ ও মন্দ চরিত্র, হৃদয়ের অস্বচ্ছতার ফলে অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তিন. আল্লাহ তায়ালা হক ও বাতিল তৈরি করেছেন। মানুষকে এই দুটো থেকে যেকোনো একটা গ্রহণের স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতা দিয়েই ছেড়ে দেননি। বরং নিজ অনুগ্রহে তাদের হক ও বাতিল চিনিয়ে দিয়েছেন। হক গ্রহণ করতে এবং বাতিল বর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সতর্ক করার জন্য নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। এর পরেও আবু লাহাব কুফর করলে সেটার দায়ভার আল্লাহর উপর হতে পারে?।¹
এ কারণে একটি বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবাদের বললেন, সকল মানুষের জন্মের আগেই জান্নাত কিংবা জাহান্নামে তার জন্য জায়গা নির্ধারিত হয়ে যায়। সে সৌভাগ্যবান হবে, নাকি দুর্ভাগা হবে, লেখা হয়ে যায়। তখন এক সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তা হলে তাকদিরের উপর নির্ভর করে বসে থাকলেই তো হয়। আমল করার কী দরকার? কারণ, যে সৌভাগ্যবান হওয়ার, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সৌভাগ্যের আমল করবে। আর যে দুর্ভাগা হওয়ার, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে পথে অগ্রসর হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং তোমরা কাজ করত থাকো। প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। যাকে সৌভাগ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেসব কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। আর যাকে দুর্ভাগ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেসব কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন,
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَ اتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى : وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى.
অর্থ: 'অতএব, যে দান করে, আল্লাহভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে, তার জন্য সুখের বিষয় সহজ করে দেবো। আর যে কৃপণতা করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেবো।'² [লাইল: ৫-১০]
দেখা যাচ্ছে, সৃষ্টির আগেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইলমের মাধ্যমে কে জান্নাতি হবে এবং কে জাহান্নামি হবে সেটা লিখে রাখলেও মানুষকে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন। ভালো ও মন্দ এখতিয়ার করার সুযোগ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকদিরের উপর নির্ভর করে বসে থাকতে নিষেধ করেছেন। কারণ, কেউই জানে না যে, তার তাকদিরে কী আছে। তা ছাড়া পার্থিব বিষয়ে মানুষ তাকদিরের উপর বসে না থেকে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে সে তাকদিরে যা আছে তা-ই হবে বলে বসে থাকে না। আখিরাতের ক্ষেত্রেও আমাদের তা-ই করতে হবে। হিদায়াতের জন্য চেষ্টা ব্যয় করলে আল্লাহ জান্নাতের পথ খুলে দেবেন বলেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বরং পার্থিব ব্যাপারেও তাকদির মানুষের সুখের অবলম্বন। বিপদ-আপদে মুমিন তাকদিরের কথা বলে প্রবোধ ও সান্ত্বনা লাভ করে। কারণ, সে জানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللهِ يَسِيرٌ . لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ.
অর্থ: 'পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের উপর যা-কিছু বিপদ আসে, তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা যা হারাও তার জন্য দুঃখিত না হও, আর তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তার জন্য উল্লসিত না হও। আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।' [হাদিদ: ২২-২৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যা তুমি পেয়েছ, তা কখনও হারানোরই ছিল না। আর যা হারিয়েছ, তা কখনও পাওয়ারই ছিল না।'³ বিপরীতে নাস্তিক ও কাফেরের কাছে সান্ত্বনার এই দুর্গটা নেই। ফলে তাকে নিজের উপরই নিজের নির্ভর করতে হয়। যখন সে নিজের বোঝা আর বইতে পারে না, নিরাশার অন্ধকারে আত্মহননের পথে এগিয়ে যায়।
টিকাঃ
১. ঘুমাইয়িস (২১০-২১১)।
২. বুখারি (৪৯৪৯); মুসলিম (২৬৪৭)।
৩. এটা রাসুলুল্লাহর প্রসিদ্ধ হাদিস। তিরমিজি (২১৪৪); মুসনাদে আহমদ (২১৮৩৫); বাজ্জার (৪১০৭)-সহ বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।