📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 তাকদির বদলায় কি?

📄 তাকদির বদলায় কি?


তাকদির বদলায় কি? একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে।’ যদি মানুষের জন্ম ও
মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে সূক্ষ্মভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের জীবন কীভাবে বৃদ্ধি করবে? উলামায়ে কেরাম বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। সবচেয়ে উত্তম উত্তর হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের জীবন বৃদ্ধির কারণ; স্বতন্ত্রভাবে এটা জীবন বৃদ্ধি করে এমন নয়। কারণ, জীবন বৃদ্ধির মালিক আল্লাহ তায়ালা। ফলে তিনি প্রত্যেকের তাকদিরে লিখেই দিয়েছেন কে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে জীবন বৃদ্ধি করবে এবং কতটুকু করবে আর কে করবে না। ফলে আর আপত্তির সুযোগ নেই।১ এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি হাদিস বুঝতে হবে, যেখানে তিনি বলেছেন, 'কেবল দোয়াই তাকদিরকে ফেরাতে পারে। সৎকর্ম হায়াত বৃদ্ধি করে। গুনাহ রিজিক হ্রাস করে ফেলে।'২ যেহেতু কে দোয়া করবে এবং কী দুআ করবে, কে সৎকর্ম করবে কে করবে না, কে গুনাহ করবে, কী গুনাহ করবে এবং কখন করবে, সবকিছু আল্লাহ তায়ালা জানেন, ফলে তিনি সেভাবেই তার জন্ম-মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছেন। আরও একটি হাদিস আছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি করতে চায় এবং মৃত্যু পেছাতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।'৩ আরেকটি হাদিসে বলেছেন, 'সদকা অপমৃত্যুকে দূর করে।'৪ সবগুলো ক্ষেত্রে উপরের মূলনীতি প্রযোজ্য হবে।

টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (১০১); আকহাসারি (১২৯)।
২. তিরমিজি (২১৩৯); মুসনাদে বাজ্জার (২৫৪০)।
৩. বুখারি (৫৯৮৬); মুসলিম (২৫৫৭); ইবনে হিব্বান (৪৩৯); বাজ্জার (৬৩১৬)।
৪. তিরমিজি (৬৬৪); ইবনে হিব্বান (৩৩০৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 একটি প্রশ্ন ও উত্তর

📄 একটি প্রশ্ন ও উত্তর


একটি প্রশ্ন ও উত্তর: প্রশ্ন হলো, একটু আগে উম্মে হাবিবা রাজি. যখন তাঁর জীবনসঙ্গী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বাবা ও ভাইয়ের দীর্ঘ জীবনের জন্য দোয়া চেয়েছেন, তখন তিনি তাঁকে বলেছেন, এসব নির্ধারিত এবং অপরিবর্তনীয় বিষয়। এখন আবার বলছেন, দোয়া তাকদিরকে ফেরাতে পারে। দুটোর মাঝে সমতাবিধান কীভাবে?
প্রথম কথা হলো, জীবন বৃদ্ধির জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হাবিবার ব্যাপারে আপত্তি করলেও অবৈধ ঘোষণা করেননি। তিনি কেবল তাকে আখিরাত সংক্রান্ত দোয়ায় উৎসাহিত করেছেন। তাই দুই হাদিসের মাঝে বৈপরীত্য নেই। যদিও সালাফের কোনো কোনো ইমাম থেকে জীবন বৃদ্ধির দোয়া অপছন্দ করার কথা এসেছে। যেমন: ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের জন্য কেউ দীর্ঘ হায়াতের দোয়া

টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (১৩০)।
২. বুখারি (৫৭২৯); মুসলিম (২২১৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 সৃষ্টির আগেই তিনি সবার কর্ম সম্পর্কে জানতেন

📄 সৃষ্টির আগেই তিনি সবার কর্ম সম্পর্কে জানতেন


করত, তিনি বলতেন, 'এটা আগ থেকেই নির্ধারিত।’১ কিন্তু এটা অবৈধ কিংবা নিষিদ্ধ নয়। ফলে জীবন বৃদ্ধির জন্য দোয়া করা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুরআন-সুন্নাহে মানুষের জীবন নির্ধারিত হওয়ার ব্যাপারে বারবার নিশ্চিত করা হয়েছে। তা হলে দোয়া কীভাবে মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে?
এটার উত্তর ইমামগণ বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুন্দর মতামত হলো (যার অংশবিশেষ উপরেও বলা হয়েছে), দোয়ার মাধ্যমে যে তাকদিরের পরিবর্তন ঘটবে, সেটাও আল্লাহ তায়ালা জানেন এবং সে হিসেবেই তার তাকদির লিখেছেন। অর্থাৎ যদি সে দোয়া করে, তবে এটা হবে; আর দোয়া না করলে ওটা হবে—লাওহে মাহফুজে সব লিখিত। ফলে বান্দার কাছে দোয়ার মাধ্যমে তাকদিরের পরিবর্তন ঘটলেও মূল তাকদিরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এ কারণেই উলামায়ে কেরাম তাকদিরকে দুইভাবে ভাগ করেছেন। যথা: তাকদিরে মুবরাম (তথা সুনির্ধারিত) এবং মুআললাক (তথা ঝুলন্ত)। প্রথমটা আল্লাহর কাছে লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত। তাতে কোনো পরিবর্তন নেই। আর দ্বিতীয়টা মানুষ ও ফেরেশতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে। অর্থাৎ দোয়া, সৎকর্ম ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে জীবন বৃদ্ধি পায়, গুনাহের মাধ্যমে জীবন কমে যায়; ঔষধ খেলে মানুষ সুস্থ হয় এবং বেঁচে থাকে, না খেলে মারা যায়। এক জায়গায় থাকলে মানুষ মৃত্যুবরণ করে, অন্য জায়গায় চলে গেলে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়—এই একাধিক সম্ভাবনাগুলো দ্বিতীয় তাকদিরে থাকে, প্রথম তাকদিরে চূড়ান্তটাই নির্ধারিত থাকে, যা পরিবর্তনীয় নয়। এ জন্যই উমর রাজি. বলেছেন, 'আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে পালিয়ে আরেক তাকদিরের কাছে যাচ্ছি!'২
কুরআনে এই দ্বিতীয় প্রকারের তাকদির সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ . يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَعِنْدَةً أُمُّ الْكِتَبِ.
অর্থ: 'প্রত্যেকটি নির্ধারিত সময় লিখিত আছে। আল্লাহ যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং বহাল রাখেন এবং মূলগ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।' [রাদ: ৩৮-৩৯]
অর্থাৎ ফেরেশতাদের কাছে থাকা দ্বিতীয় প্রকারের তাকদিরে বান্দার কাজের ভিন্নতায় পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু এসব পরিবর্তন ঘটা-সহ চূড়ান্তভাবে কী হবে, সেটা
লেখা হয়েছে প্রথম প্রকারের তাকদির 'মূলগ্রন্থ' আল্লাহর কাছে। ওখানে কোনো পরিবর্তন নেই। অপর একটি আয়াতেও তাকদিরের এই প্রকারভেদের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا يُعَمَّرُ مِنْ مُعَمَّرٍ وَلَا يُنْقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَبٍ إِنَّ ذُلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ অর্থ: 'কোনো বয়স্ক ব্যক্তি বয়স পায় না এবং তার বয়স হ্রাস পায় না; কিন্তু তা লিখিত আছে কিতাবে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।' [ফাতির: ১১]
অর্থাৎ দোয়া, চিকিৎসা, সতর্কতা, সৎকর্ম, গুনাহ-সহ কুরআন-হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন কারণে মানুষের বয়স কম-বেশি হতে পারে, সেটা দ্বিতীয় প্রকারের তাকদিরে রয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন-সহ সবকিছু লেখা রয়েছে প্রথম তাকদিরে, যেটাকে আল্লাহ 'কিতাব' নামে ব্যক্ত করেছেন। ফলে ওখানে কার বয়স বাড়বে কিংবা কমবে এবং কীভাবে বাড়বে-কমবে, সবকিছু লেখা আছে।১ ইবনে তাইমিয়া রাহি. লিখেছেন, '(মানুষের তাকদির দুটো)। পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটে ফেরেশতাদের হাতে থাকা তাকদিরে। যদি পরিবর্তনের মতো কোনো কাজ করে, তবে সেটাতে পরিবর্তন ঘটে। কারণ, ফেরেশতাদের কাছে চূড়ান্ত জ্ঞান নেই। অপরদিকে আল্লাহর কাছে রয়েছে চূড়ান্ত জ্ঞান। ফলে তাঁর কাছে লিখিত তাকদিরে কোনো পরিবর্তন নেই। কারণ, ফেরেশতাদের তাকদিরে লেখা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের বিষয়টিটিও তিনি আগে থেকেই জানেন, ফলে চূড়ান্ত কথাই লিখেছেন।'২
সৃষ্টির আগেই তিনি সবার কর্ম সম্পর্কে জানতেন: কারণ তাঁর জ্ঞান সর্বব্যাপী। এ জন্য সালাফের উলামায়ে কেরাম বলেছেন, 'আল্লাহ অতীতে কী হয়েছে, জানেন; বর্তমানে কী হচ্ছে, জানেন; ভবিষ্যতে কী হবে, জানেন। আর তিনি জানেন, যা হয়নি, যদি হতো কীভাবে হতো!' ভ্রান্ত কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, আল্লাহ সৃষ্টির আগে কিছুই জানেন না।৩ এটা তাদের গোমরাহি। কারণ, আল্লাহ অগ্র-পশ্চাৎ সব জানেন। মানুষ সৃষ্টির আগে, যখন ফেরেশতাদের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পরামর্শ করেছিলেন,

টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন: ফয়জুল বারি, কাশ্মীরি (৩/৪০৭); তুহফাতুল আহওয়াজি (৬/২৮৯-২৯০); শরহে মিশকাত, তিবি (৫/১৭১০); ইবনে আবিল ইজ (১০২)।
২. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া (১৪/৪৯০-৪৯২); আরও দেখুন: তাফসিরে ইবনে আতিয়্যাহ (৩/৩১৭)।
৩. ইবনে আবিল ইজ (১০৩); আকহাসারি (১২৯); হারারি (৪৪)। কেউ কেউ মুতাজিলাদের ব্যাপারেও এমন ধারণা রাখে। কিন্তু আল্লামা জামাখশারির তাফসির দেখলে বোঝা যায়, মুতাজিলারা 'কোনোকিছু অস্তিত্বে আসার আগে আল্লাহ সে ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন'-এটা অস্বীকার করে না। দেখুন: কাশশাফ (৪/৪৪১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 মানুষের সৃষ্টি ইবাদতের জন্য

📄 মানুষের সৃষ্টি ইবাদতের জন্য


এটাকেই ইমাম তহাবি 'তিনি তাদের তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন' বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ.
অর্থ: 'আমি মানুষ ও জিনকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।' [জারিয়াত: ৫৬]
তিনি আরও বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيُوةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
অর্থ: 'যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ।' [মুলক: ২]
প্রশ্ন উঠতে পারে, আল্লাহ যদি সৃষ্টির আগেই সবার পরিণতি সম্পর্কে জানেন, তবে কাফেরদের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার কী রহস্য? উত্তর হলো: আল্লাহ তায়ালা কারও প্রতি সামান্য জুলুম করেন না। ফলে তিনি কাউকে স্রেফ জানার ভিত্তিতে শাস্তি দেন না। কারণ, তাতে সে যুক্তি দিতে পারে, তাকে সুযোগ ও স্বাধীনতা দেওয়া হলে সে কুফরি করত না। বরং সুযোগ দেওয়ার পরেও কাফেররা মৃত্যুর সময় বলে,
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ . لَعَلَى أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِن وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
অর্থ: 'যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে পুনরায় (পৃথিবীতে) প্রেরণ করুন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। (আল্লাহ বলেন) কখনোই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।' [মুমিনুন: ৯৯-১০০]
তাই আল্লাহ প্রত্যেককে সুযোগ দেন। অতঃপর সে কুফরি করে নিজেকে শাস্তির যোগ্য করে নেয়। ফলে প্রতিদানটা আল্লাহর জ্ঞান কিংবা তাকদিরের উপর নির্ভরশীল নয়, মানুষের কর্মের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ সবাইকে সৎ কাজের আদেশ দিয়েছেন। যে সেগুলো মান্য করবে, সে জান্নাত দ্বারা সম্মানিত হবে। যে অমান্য করবে, সে শাস্তি পাবে।¹

টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (৪১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00