📄 আল্লাহ সবকিছু সুশৃঙ্খভাবে নির্ধারণ করেছেন
আল্লাহ সবকিছু সুষ্ঠুভাবে নির্ধারণ করেছেন: কারণ পৃথিবীর সবকিছুতে যে বিরল শৃঙ্খলা চোখে পড়ে, তা একজন মহাশক্তিশালী জ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। একটা ছোট অণু-পরমাণু হতে শুরু করে বিশাল গ্রহ- নক্ষত্র, ছায়াপথ-সৌরজগৎ, ক্ষুদ্র পিপীলিকা থেকে শুরু করে হাতি ও তিমি, সকল জীব-জগতে বিদ্যমান শৃঙ্খলা আল্লাহর তৈরি। এমনকি মানুষের শরীরের সৌন্দর্য, কোন অঙ্গ কোথায় থাকবে, কয়টা থাকবে, মানুষের বোধ ও বিবেক কতটুকু থাকবে, কবে থেকে শুরু হবে, কতদিন থাকবে—সবকিছু আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই সুষ্ঠু নির্ধারণ ও বণ্টনের ফলে পৃথিবী স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলেছে। মানুষ পৃথিবীতে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا عِنْدَنَا خَزَائِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُومٍ অর্থ: 'আমার কাছে প্রত্যেক বস্তুর ভাণ্ডার রয়েছে। আমি নির্দিষ্ট পরিমাণেই তা অবতরণ করি।' [হিজর: ২১] আল্লাহ আরও বলেন,
اللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَحْمِلُ كُلُّ انْثَى وَمَا تَغِيضُ الْأَرْحَامُ وَمَا تَزْدَادُ وَكُلُّ شَيْءٍ عِنْدَهُ بِمِقْدَارٍ
📄 সবার জীবনকাল সুনির্দিষ্ট করেছেন
সবার জীবৎকাল সুনির্দিষ্ট করেছেন: কারণ আল্লাহ ছাড়া সবাই মরণশীল। পবিত্র কুরআনে তিনি ঘোষণা করেছেন,
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ . وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَالِ وَالْإِكْرَامِ .
অর্থ: 'ভূপৃষ্ঠের উপর বিদ্যমান সকল প্রাণী ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তাই অবশিষ্ট থাকবেন।' [আর-রাহমান: ২৬-২৭] আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেন,
كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ অর্থ: 'আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু ধ্বংসশীল।' [কাসাস: ৮৮]
আল্লাহ সবার জীবনক্ষণ সুনির্ধারিত করে দিয়েছেন। ফলে যখন মৃত্যুর সময় এসে যায়, এক মহূর্তও অগ্রে-পশ্চাতে হয় না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ অর্থ: 'প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি মেয়াদ রয়েছে। যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহূর্ত পিছনে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে।' [আরাফ: ৩৪] আল্লাহ অন্যত্র বলেন,
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِمْ مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِنْ دَابَّةٍ وَلَكِنْ يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ. অর্থ: 'যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের অন্যায় কাজের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভূপৃষ্ঠে চলমান কোনোকিছুকেই ছাড়তেন না। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুত সময় পর্যন্ত তাদের অবকাশ দেন। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও বিলম্বিত কিংবা তরান্বিত করতে পারবে না।' [নাহল: ৬১] আল্লাহ আরেক জায়গায় বলেন,
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتْبًا مُؤَجَّلًا অর্থ: 'আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মৃত্যুবরণ করে না। সবার মৃত্যুর জন্য রয়েছে একটা নির্ধারিত সময়।' [আলে ইমরান: ১৪৫]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. থেকে বর্ণিত, নবিজির স্ত্রী উম্মে হাবিবা রাজি. দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমার স্বামী রাসুলুল্লাহ, আমার পিতা আবু সুফিয়ান ও আমার ভাই মুয়াবিয়ার দীর্ঘ হায়াত দান করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
📄 একটি সন্দেহের অপনোদন
আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: তুমি তো আল্লাহর কাছে নির্ধারিত বয়স, সীমাবদ্ধ সময় এবং বর্ণিত জীবিকার প্রার্থনা করলে, যার কিছুই তিনি তার নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কিংবা নির্ধারিত সময়ের পরে করবেন না। যদি তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে যেন তিনি তোমাকে জাহান্নামের শান্তি থেকে এবং কবরের শান্তি থেকে মুক্তি দান করেন, তা হলে তা তোমার জন্য খুবই কল্যাণকর ও উত্তম হতো।
এসব আয়াত ও হাদিস দ্বারা বোঝা গেল, পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এমনকি কোন ব্যক্তি কীভাবে মারা যাবে, জলে নাকি ডাঙায় মারা যাবে, বিছানায় নাকি ময়দানে মারা যাবে, বাড়িতে নাকি বিদেশে মারা যাবে, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবে নাকি পুড়ে বা পড়ে মরবে, আল্লাহ সবকিছু লিখে রেখেছেন।
একটি সন্দেহের অপনোদন: উপরে বর্ণিত কথাগুলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা। অপরদিকে তাকদির অস্বীকারকারী মুতাজিলাদের বিশ্বাস হলো, যদি কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তবে সে মৃত্যু আসার আগেই চলে যায়। যদি এভাবে নিহত না হতো, তবে তাঁর জীবনকাল পুরা করে মরত! এর ভিত্তিতে নিহত ব্যক্তির জন্য তারা দুটি জীবনকাল নির্ধারণ করে। একটি নিহত হওয়া পর্যন্ত, অন্যটি (তাদের ধারণায়) যখন স্বাভাবিক মৃত্যু লেখা ছিল। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা। এটা সর্বজ্ঞানের অধিকারী আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। এটা প্রযোজ্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে, যারা ভবিষ্যৎ-জ্ঞান রাখে না। অথবা এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যে জানে না ভবিষ্যতে কী কী হবে। ফলে দুটি মৃত্যুর সময় লিখে রাখে। কারণ নিহত ব্যক্তি সময়ের আগেই মৃত্যুবরণ করেছে বলার অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য এমন জীবন নির্ধারণ করে রেখেছেন, যে পর্যন্ত সে বাঁচলে না, অন্য একজন আল্লাহর নির্ধারিত সেই সময় আসার আগেই মৃত্যু দিয়ে দিলো। এভাবে তারা পৃথিবীতে স্রষ্টা ও সৃষ্টি দুজন খোদা নির্ধারণ করে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকদির অস্বীকারকারীদের এ উম্মতের ‘অগ্নিপূজক’ বলেছেন।
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৬৬০)।
২. আত্বহাবি (১২৮); হারারি (৪৫)।
৩. আবু দাউদ (৪৬৯১); মুসতাদরাকে হাকেম (২৬২)।
৪. আল-মু'জামুল আওসাত, তাবরানি (৯৪৭); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৪১০৪)।
📄 তাকদির বদলায় কি?
তাকদির বদলায় কি? একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা মানুষের জীবন বৃদ্ধি করে।’ যদি মানুষের জন্ম ও
মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে সূক্ষ্মভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের জীবন কীভাবে বৃদ্ধি করবে? উলামায়ে কেরাম বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। সবচেয়ে উত্তম উত্তর হলো: আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের জীবন বৃদ্ধির কারণ; স্বতন্ত্রভাবে এটা জীবন বৃদ্ধি করে এমন নয়। কারণ, জীবন বৃদ্ধির মালিক আল্লাহ তায়ালা। ফলে তিনি প্রত্যেকের তাকদিরে লিখেই দিয়েছেন কে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে জীবন বৃদ্ধি করবে এবং কতটুকু করবে আর কে করবে না। ফলে আর আপত্তির সুযোগ নেই।১ এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি হাদিস বুঝতে হবে, যেখানে তিনি বলেছেন, 'কেবল দোয়াই তাকদিরকে ফেরাতে পারে। সৎকর্ম হায়াত বৃদ্ধি করে। গুনাহ রিজিক হ্রাস করে ফেলে।'২ যেহেতু কে দোয়া করবে এবং কী দুআ করবে, কে সৎকর্ম করবে কে করবে না, কে গুনাহ করবে, কী গুনাহ করবে এবং কখন করবে, সবকিছু আল্লাহ তায়ালা জানেন, ফলে তিনি সেভাবেই তার জন্ম-মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছেন। আরও একটি হাদিস আছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি করতে চায় এবং মৃত্যু পেছাতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।'৩ আরেকটি হাদিসে বলেছেন, 'সদকা অপমৃত্যুকে দূর করে।'৪ সবগুলো ক্ষেত্রে উপরের মূলনীতি প্রযোজ্য হবে।
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (১০১); আকহাসারি (১২৯)।
২. তিরমিজি (২১৩৯); মুসনাদে বাজ্জার (২৫৪০)।
৩. বুখারি (৫৯৮৬); মুসলিম (২৫৫৭); ইবনে হিব্বান (৪৩৯); বাজ্জার (৬৩১৬)।
৪. তিরমিজি (৬৬৪); ইবনে হিব্বান (৩৩০৯)।