📄 আল্লাহ নির্ভয়ে মৃত্যদানকারী, বিনাদ্বন্দ্বে পুনরুত্থানকারী
পৃথিবীর কোনো সৃষ্টি সহস্র বছর পরিশ্রমেও একটা ক্ষুদ্র মৃত বস্তুও জীবিত করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা সৃষ্টিকে কোনো কষ্ট ছাড়াই মুহূর্তে পুনরুত্থিত করবেন।
আল্লাহ অমুখাপেক্ষী সৃষ্টিকর্তা, ক্লান্তিহীন রিজিকদাতা: এ কারণেই কুরআন- সুন্নাহে আল্লাহর এসব গুণের দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ . مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ. إِنَّ اللهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ.
অর্থ: 'আর আমি মানুষ ও জিনকে আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে জীবিকা চাই না। আমি চাই না তারা আমার আহার্য জোগাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহই হলেন জীবিকাদাতা, শক্তির আধার, পরাক্রমশালী।' [জারিয়াত: ৫৬- ৫৮] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ অর্থ: 'হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহ তিনি অভাবমুক্ত প্রশংসিত।' [ফাতির: ১৫] আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন,
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ اتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ أَوَّلَ مَنْ أَسْلَمَ وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ. অর্থ: 'আপনি বলে দিন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা এবং যিনি সবাইকে আহার্য দান করেন এবং তাঁকে কেউ আহার্য দান করে না, অপরকে সাহায্যকারী স্থির করব? আপনি বলে দিন, আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, সর্বাগ্রে আমিই আজ্ঞাবহ হব। আপনি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।' [আনআম: ১৪] অপর একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَقَالَ مُوسَى إِنْ تَكْفُرُوا أَنْتُمْ وَ مَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ অর্থ: 'মুসা বললেন, তোমরা এবং পৃথিবীর সবাই যদি কুফরি করো, তথাপি আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। [ইবরাহিম: ৮]
সহিহ মুসলিমে একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ হাদিসে কুদসিতে এসেছে, 'হে আমার বান্দাগণ, নিশ্চয় আমি আমার উপর জুলুম হারাম করেছি, আমি তোমাদের মাঝেও তা হারাম করেছি। অতএব, তোমরা জুলুম করো না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের প্রত্যেকেই পথচ্যুত, কেবল সে ছাড়া যাকে আমি পথ দেখাই। অতএব, তোমরা আমার কাছে পথের সন্ধান চাও, আমি তোমাদের (হিদায়াতের) সন্ধান দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা সকলে ক্ষুধার্ত। তবে আমি যাকে আহার দান করি সে ছাড়া। অতএব, তোমরা আমার নিকট আহার প্রার্থনা করো, তোমাদের আহার দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা সকলে বিবস্ত্র, তবে আমি যাকে বস্ত্র দান করি সে ছাড়া। অতএব, তোমরা আমার নিকট বস্ত্র চাও, আমি তোমাদের বস্ত্র দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা রাত-দিনই ভুল করতে থাকো, আমি তোমাদের সকল পাপ মোচন করতে থাকি। অতএব, আমার নিকট ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করব। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা আমার ক্ষতি পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না যে আমার ক্ষতি করবে। আর না তোমরা আমার উপকার পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে যে আমার উপকার করবে। যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষটির মতো হয়ে যাও, সেটা আমার রাজত্ব সামান্য বৃদ্ধি করবে না। হে আমার বান্দাগণ, যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লোকটির মতো হয়ে যাও, সেটা আমার রাজত্ব সামান্য হ্রাস করবে না। হে আমার বান্দাগণ, যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার নিকট প্রার্থনা করো, অতঃপর আমি প্রত্যেককে তার প্রার্থিত বস্তু প্রদান করি, তবে আমার কাছে যা আছে তা থেকে ততটুকু হ্রাস পাবে, যতটুকু একটা সুই সমুদ্র থেকে পানি নিলে হ্রাস পায়! হে আমার বান্দাগণ, এ তো তোমাদের আমল, যা আমি তোমাদের জন্য সংরক্ষণ করি, অতঃপর তোমাদের তা পূর্ণ করে দেবো। অতএব, যে ভালো কিছু পেল, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে, যে অন্য কিছু পেল, সে যেন কেবল নিজেকেই দোষারোপ করে।'¹
আল্লাহ নির্ভয়ে মৃত্যুদানকারী, বিনাক্লেশে পুনরুত্থানকারী: এই দুটো গুণ আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতার নির্দেশক। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাদের ভয়ে মৃত্যু দান করেন না। কারণ, মানুষ জীবিত থাকলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আবার জীবিত থেকে যদি সবাই মিলে আল্লাহর কুফরি করতে থাকে, তাতেও আল্লাহর কিছু আসবে-যাবে না, নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পিছনের হাদিসে যা স্পষ্ট হয়েছে। তা ছাড়া ভয় এক ধরনের ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা। আর আল্লাহ সব ধরনের ত্রুটি থেকে পবিত্র।
টিকাঃ
¹. মুসলিম (২৫৭৭); মুসতাদরাকে হাকেম (৭৭০১)।
📄 একটি প্রশ্ন ও উত্তর
তবে যেহেতু আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর জীবনকে চিরস্থায়ী বানাননি; বরং পরকালকে চিরস্থায়ী বানিয়েছেন, তাই নিয়ম অনুযায়ীই সকল সৃষ্টিকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হয়। বাকি থাকবেন একমাত্র তিনি সুবহানাহু ওয়া তায়ালা। ¹
পুনরut্থান আল্লাহ তায়ালার এমন একটি গুণ, যা মানুষের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে কিংবা নামের ক্ষেত্রেও সাদৃশ্য রাখে না। কারণ, এটা কেবল আল্লাহ তায়ালারই গুণ। বরং আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ একটি গুণ। জগতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব মানুষ, জিন, পশু-পাখি যখন মরে, পচে, গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে, আল্লাহ তায়ালা বিনা ক্লেশে তাদের সবাইকে পুনরায় জীবিত করবেন! এটা আল্লাহর জন্য খুব সহজ ব্যাপার। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এই চিরসত্যের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
مَا خَلْقَكُمْ وَلَا بَعْثُكُمْ إِلَّا كَنَفْسٍ وَاحِدَةٍ
অর্থ: 'তোমাদের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান তো কেবল একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের মতোই।' [লুকমান: ২৮] আরেক জায়গায় তিনি বলেন,
وَهُوَ الَّذِي يَبْدَوُا الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ
অর্থ: 'তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর পুনরায় সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্য সহজ।' [রুম: ২৭] সুরা ইয়াসিনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ ضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ . قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمُ . الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ مِّنَ الشَّجَرِ الْأَخْضَرِ نَارًا فَإِذَا أَنْتُمْ مِّنْهُ تُوقِدُونَ . أَوَ لَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَدِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ مُ بَلَى وَهُوَ الْخَلْقُ الْعَلِيمُ . إِنَّمَا أَمْرُةً إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ.
অর্থ: “সে আমার ব্যাপারে এক অদ্ভুত কথা বর্ণনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টি ভুলে যায়। সে বলে, কে জীবিত করবে অস্থিসমূহকে যখন সেগুলো পচে-গলে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত। যিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ থেকে আগুন উৎপন্ন করেন। তখন তোমরা তা থেকে প্রজ্বলিত করো। যিনি আকাশসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ, বরং তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তিনি যখন কোনোকিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, 'হও', তখনই তা হয়ে যায়”। [ইয়াসিন: ৭৮-৮২]
এখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছেন। যিনি সবুজ গাছ থেকে আগুন বের করতে পারেন, তিনি কেন মৃতকে জীবিত করতে পারবেন না? যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, মানুষের মতো ক্ষুদ্র জীবকে একবার সৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তাঁর কাছে কোনো ব্যাপার? আল্লাহ তায়ালা আরেক জায়গায় বলেন,
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَّنْ نَّجْمَعَ عِظَامَهُ: بَلَى قُدِرِينَ عَلَى أَنْ نُّسَوِّىَ بَنَانَهُ.
অর্থ: 'মানুষ কি মনে করে যে আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করব না? অবশ্যই। বরং আমি তার আঙুলগুলো পর্যন্ত সঠিকভাবে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম।' [কিয়ামাহ: ৩-৪]
আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে শরীরের বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাদ দিয়ে 'আঙুল'-এর কথা কেন বলেছেন? অনেক আলিমের মতে, এটার মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত এবং কুরআনের সত্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। আজ আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের আঙুলের ছাপ (fingerprint) আবিষ্কার করেছে, যার মাধ্যমে জগতের প্রত্যেক মানুষকে আলাদা করা যায়। একজনের আঙুলের ছাপ অন্য জনের সঙ্গে মেলে না। আল্লাহ তায়ালা সেটা ১৪০০ বছর আগে পুনরুত্থান অস্বীকারকারী কাফেরদের খণ্ডনে বলে দিয়েছেন যে, তিনি আঙুলগুলোকে বিন্যস্ত করতে সক্ষম এবং এর মাধ্যমে প্রত্যেকটা সৃষ্টিকে পুনরুত্থিত করতে সক্ষম!
একটি প্রশ্ন ও উত্তর: মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
অর্থ: “তিনি যখন কোনোকিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, 'হও', তখনই তা হয়ে যায়।” [ইয়াসিন: ৮২] এখানে মূল আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দটি হচ্ছে 'কুন' (كُنْ - ك+ن)। পবিত্র কুরআনের আট জায়গায় আল্লাহ তায়ালা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। প্রশ্ন হলো, এই কথার অর্থ কী? এটা কি শাব্দিকভাবে গ্রহণ করব, নাকি রূপক অর্থে? অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো কাজের ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর 'কুন' শব্দটি বলতে হয় এবং এটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ হয়ে যায়, নাকি এটা দ্বারা বলার উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ যখনই কিছু করতে চান মুহূর্তে সেটা হয়ে যায়। এর জন্য আলাদা করে তাঁর 'কুন' বলতে হয় না?
উলামায়ে কেরাম বিভিন্নভাবে কথাটি ব্যাখ্যা করেছেন। একদল উলামায়ে কেরাম আয়াতের বাহ্যিক শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করেন এবং বলেন, আল্লাহ কোনো কাজ করতে চাইলে 'কুন' বলেন, ফলে তা সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায়। তাদের কাছে বিষয়টি এতই প্রসিদ্ধ যে, তারা নিয়মিতই বলে থাকেন, يا من أمره بين الكاف والنون / بعد الكاف والنون -এর মাঝে। তাদের কেউ কেউ এটাকে বলেন, কাফ ও নুনের পরে। অর্থাৎ আল্লাহর সকল কাজ 'কুন' শব্দের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এটাকে তারা 'আল্লাহর কালাম' সাব্যস্তের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেক হানাফি ইমামও উক্ত মতের প্রবক্তা। যেমন: ইমাম সারাখসি রাহি. বলেন, 'এখানে উদ্দেশ্য হাকিকি কালিমা; রূপক নয়'।²
বিপরীতে উম্মাহর অন্য একদল আলিম মনে করেন, এটার শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা বিশুদ্ধ নয়; বরং রূপক অর্থ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, শাব্দিক অর্থ দ্বারা মনে হয়, আল্লাহর যেকোনো ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য 'কুন' শব্দ উচ্চারণ করা জরুরি। 'কুন' না বললে তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। অন্য কথায়, এটা জরুরি হয় যে, 'কুন' শব্দ বলার উপর তাঁর ইচ্ছার বাস্তবায়ন নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছা করলেই বাস্তবায়িত হয় না। অথচ এটা ভুল কথা। কারণ, তাতে আল্লাহর অক্ষমতা ও মুখাপেক্ষিতা বোঝায়। বরং আল্লাহ কোনো কিছু ইচ্ছা করলেই সেটা সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়ে যায়। কোনো শব্দ উচ্চারণ কিংবা নির্দেশ দেওয়ার উপর সেটা নির্ভরশীল নয়। এখানে 'কুন' শব্দটি উদাহরণ হিসেবে আনা হয়েছে। কারণ, এটিই আরবিতে উক্ত উদ্দেশ্য বোঝানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য শব্দ।³
আর-তাদের মতে-এর মাধ্যমে আল্লাহর 'কালাম' অস্বীকার করা হয় না, যেমনটা প্রথম দলের আলিমগণ মনে করে থাকেন; বরং আল্লাহর 'কালাম' কুরআনের অন্যান্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত, সামনে যেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
¹. তুর্কিস্তানি (৬৬); সালেহ ফাওজান (৩২); সাইদ ফুদাহ (২১২)।
². উসুলুস সারাখসি (১/১৮)।
³. তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ (৮/৫৪১-৫৪२); তাফসিরে নাসাফি (২১৩); তাফসিরে কাবির (৬/৪৯৬-৪৯৭); তাফসিরে বাইজাবি (৩/২২৭)।
📄 আরেকটি সন্দেহের অপনোদন
আরেকটি সন্দেহের অপonোदन: মৃত্যু কি কোনো অস্তিত্বশীল স্বতন্ত্র (শরীরী/মূর্ত) বস্তু, নাকি অস্তিত্বহীন (অশরীরী/বিমূর্ত) বিষয়? দার্শনিকরা মনে করেন, মৃত্যু অস্তিত্বহীন বিষয়। অর্থাৎ জীবন একটি বিশেষণ। এই জীবনের অনুপস্থিতিই মৃত্যু। আলাদা করে মৃত্যুর স্বতন্ত্র উপস্থিতি নেই। মুতাজিলা ও আহলে সুন্নাতের কোনো কোনো আলিমও উক্ত আকিদা রাখেন। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মতে, মৃত্যু অস্তিত্বহীন সৃষ্টি নয়; বরং অস্তিত্বধারী সৃষ্টি। এটা জীবনের অনুপস্থিতি নয়; বরং এটা এমন একটি বিশেষণ যা জীবনের বিপরীত। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষ শেষ হয়ে যায় না। বরং এক জীবন থেকে আরেক জীবনে স্থানান্তরিত হয়। মৃত্যু সেই স্থানান্তরের মাধ্যম মাত্র।'কুরআন ও হাদিসে এর প্রমাণ রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَ الْحَيُوةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
অর্থ: 'যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ।' [মুলক: ২]
বুখারি ও মুসলিমের একটি বিশুদ্ধ হাদিসে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকৃতিতে আনা হবে। তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসী! তখন তারা মাথা উঁচু করে তাকাবে। ঘোষক বলবে, তোমরা কি একে চেনো? তারা বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা প্রত্যেকেই তাকে দেখেছে। তারপর ঘোষক আবার ঘোষণা করবে, হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামিরা মাথা উঁচু করে তাকাবে। তখন ঘোষক বলবে, তোমরা কি একে চেনো? তারা বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা প্রত্যেকেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটি) জবেহ করা হবে। এরপর ঘোষক বলবে, 'হে জান্নাতবাসী, চিরদিন এখানে থাকো। তোমাদের আর মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামবাসী, চিরস্থায়ীভাবে এখানে থাকো। তোমাদের আর মৃত্যু নেই।' এই হাদিস দ্বারা মৃত্যুর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি সুস্পষ্ট।²
মৃত্যুর স্বতন্ত্র বিষয়টি নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই, অবিশ্বাস করার সুযোগ নেই। বিশুদ্ধ হাদিসে পাওয়া গেলে আত্মসমর্পণই একজন প্রকৃত মুমিনের ঈমানের নিদর্শন। অস্বীকার করতে থাকলে অস্বীকারের সীমা নেই। মানুষের বোধ-বুদ্ধির উর্ধ্বের এমন বক্তব্য কেবল মৃত্যুর ক্ষেত্রে নয়, আরও অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রেই এসেছে। যেমন: বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আমলকে দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে। অথচ আমল আমাদের কাছে ওজনযোগ্য শরীরী বস্তু নয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'দুটি বাক্য এমন, যা মুখে উচ্চারণ অতি সহজ, কিন্তু মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী, আর আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। তা হলো: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।'¹ একইভাবে আরেকটি হাদিসে এসেছে, 'তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো। কারণ কিয়ামতের দিন তা তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই আলোকিত সুরা বাকারা ও আলে ইমরান তিলাওয়াত করো। কারণ, এ দুটি কিয়ামতের দিন ছায়া বিস্তারকারী মেঘ কিংবা ডানামেলা পাখির মতো এসে উপস্থিত হবে এবং তাদের তিলাওয়াতকারীদের পক্ষে সাহায্যকারী হবে।'² এভাবে প্রত্যেকটা বিষয় কুরআন-সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত। ফলে অস্বীকারের সুযোগ নেই। তা ছাড়া সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্য এগুলো কঠিন কিছুই নয়। তিনি যা ইচ্ছা, শুধু বলেন 'হয়ে যাও', ফলে তা হয়ে যায়।
টিকাঃ
¹. আল-বাহরুর রায়েক (১/১১৬); ইবনে আবিল ইজ (৭৯); সাইদ ফুদাহ (২১৩)।
². বুখারি (৪৭৩০); মুসলিম (২৮৪৯)।
¹. বুখারি (৭৫৬৩)।
². মুসলিম (৮০৪); ইবনে হিব্বান (১১৬)।
📄 আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি দুটোই ‘কাদিম’
আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি দুটোই 'কাদিম': অর্থাৎ আল্লাহর সত্তার যেমন কোনো শুরু ও শেষ নেই, তেমনইভাবে তাঁর গুণাবলিরও শুরু নেই, শেষও নেই; হ্রাস-বৃদ্ধি নেই, পরিবর্তন-পরিবর্ধন নেই। এমন কোনো সময় ছিল না, যখন আল্লাহর কোনো গুণ অবিদ্যমান ছিল, পরে তা অস্তিত্বে এসেছে। বরং তাঁর গুণ তাঁর সত্তার মতোই সর্বদাই ছিল, সর্বদাই থাকবে। যখন সৃষ্টির কিছুই ছিল না, তখনও আল্লাহ তায়ালা তাঁর সকল গুণ-সহ বিদ্যমান ছিলেন। সৃষ্টির মতো তাঁর কোনো গুণ নতুন করে তৈরি হয় না। কারণ, তাঁর গুণগুলো তাঁর পূর্ণতা (কামাল)। ফলে নতুন কোনো গুণ অস্তিত্বে এলে এর অর্থ দাঁড়াবে, পূর্ণতার আগে তিনি অপূর্ণ ছিলেন যা অসম্ভব।১এখানে আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে 'খালিক' এবং 'বারী' দুটো নাম ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম আবু মানসুর আল-মাতুরিদি মনে করেন, এই দুটো সমার্থক শব্দ।২
এটুকু পর্যন্ত সকল আলিম একমত পোষণ করেন। অর্থাৎ আল্লাহর সিফাতগুলোও তাঁর মতো শুরু থেকেই রয়েছে। কিন্তু এর পরে তারা দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে যান। এক
টিকাঃ
১. গজনবি (৫৬); ইবনে আবিল ইজ (৭৯); সালেহ ফাওজান (৩৪)।
২. তুর্কিস্তনি (৭০)।