📄 সৃষ্টির কোনোকিছুই আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না
সৃষ্টির কোনোকিছুই আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না: পিছনে 'তাঁর মতো কিছুই নেই' শিরোনামে এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান বাক্যটি সেই কথাকেই তাগিদ দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে। আল্লাহ সৃষ্টির সঙ্গে সব ধরনের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত। তাঁর সত্তা ও সিফাত (গুণাবলি) সকল ক্ষেত্রে তিনি সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র। কিন্তু যুগে যুগে বিভিন্ন কওম এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা আল্লাহকে মানুষের মতো কল্পনা করেছে। আসমানি শরিয়তধারীদের মাঝে সর্বপ্রথম এই বিচ্যুতির শিকার হয়েছে ইহুদিরা। ফলে তারা মুজাসসিমাহ (দেহবাদী) হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছে।¹ এর পর পথভ্রষ্ট হয়েছে খ্রিষ্টানরা। তারা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র কল্পনা করেছে। আর পুত্র তো পিতার মতোই হয়, এটাই স্বাভাবিক। এভাবে আল্লাহ তায়ালাকে মানুষের মতো কল্পনা করে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। সবশেষে গোমরাহ হয়েছে মুসলিম উম্মাহর মুশাববিহাহ ও মুজাসসিমাহ সম্প্রদায়। তারাও আগের কওমগুলোর মতো আল্লাহকে মানুষরূপে কল্পনা করেছে।²
কিন্তু এই সাদৃশ্যের ভয়ে কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আল্লাহর সিফাতগুলো অস্বীকার করা যাবে না; যেহেতু সেগুলো কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে, তাই অর্থহীন নয়। ফলে এগুলোকে সালাফের মানহাজের আলোকে স্বীকার করতে হবে। কারণ, আল্লাহর সত্তা বান্দার সত্তার মতো নয়। তাঁর গুণাবলি বান্দার গুণাবলির মতো নয়। হ্যাঁ, সাদৃশ্য রয়েছে কেবল শব্দ ও নামের ক্ষেত্রে। যেমন: জীবন, জানা, শোনা, দেখা ইত্যাদি; কিন্তু এগুলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য বোঝানোর জন্য নয়; বরং মানুষ যেন এসব বিশেষণ বুঝতে পারে সেজন্য বলা হয়েছে। নতুবা আল্লাহর জীবন, তাঁর জ্ঞান, তাঁর দর্শন ও শ্রবণ সবকিছু সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।³
টিকাঃ
¹. দেখুন: আকহাসারি (১১৮)।
². দেখুন: গজনবি (৫০); শাইবানি (১১)।
³. ইবনে আবিল ইজ (৭৩); সালেহ ফাওজান (৩০)।
📄 আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চির বিদ্যমান রক্ষাকর্তা
তিনি সদা জীবিত, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা, নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না।
ব্যাখ্যা
আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চির বিদ্যমান রক্ষাকর্তা: আল্লাহ তায়ালা সর্বদাই ছিলেন, সর্বদাই থাকবেন। তাঁর শুরু নেই, শেষ নেই। তাঁর জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। তাঁর ঘুম নেই, নিদ্রা নেই। এগুলো সৃষ্টি এবং সৃষ্টির গুণাবলি। আর আল্লাহ তায়ালা জন্ম-মৃত্যুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি ঘুম ও জাগরণের সৃষ্টিকর্তা। তিনি পৃথিবীর রক্ষাকর্তা। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন না। তিনি নিদ্রামগ্ন হন না। বরং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে না। তিনি সবকিছুর অমুখাপেক্ষী। কুরআনের বিখ্যাত আয়াত 'আয়াতুল কুরসিতে' আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَةً إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ .
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি সদা জীবিত, সবকিছুর রক্ষাকর্তা। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা-কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তাদের দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা-কিছু রয়েছে, সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনোকিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোর সুরক্ষা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।' [বাকারা: ২৫৫] অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
টিকাঃ
¹. গজনবি (৫৪)।
². আকহাসারি (১১৯)।
³. মুসলিম (১৭৯); ইবনে হিব্বান (২৬৬)।
📄 আল্লাহ অনুগ্রহে পক্ষী সৃষ্টিকর্তা, ক্লান্তিহীন রিজিকদাতা
তিনি সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি রিজিকদাতা, রিজিকদানে কোনো কষ্ট- ক্লান্তি নেই তাঁর। তিনি মৃত্যু দানকারী, নির্ভয়ে মৃত্যু দান করেন। তিনি পুনরুত্থানকারী, বিনাক্লেশে পুনরুত্থিত করেন।
ব্যাখ্যা
এসব গুণাবলি আল্লাহ তায়ালার সর্বোচ্চ ক্ষমতা, মর্যাদা ও বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশ। সকল দিক থেকে সৃষ্টির সকলের উর্ধ্বে হওয়ার প্রমাণ। কারণ, পৃথিবীতেও অনেক সৃষ্টিকর্তা আছে। কেউ ঘর তৈরি করে, কেউ বাড়ি তৈরি করে, কেউ প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। কিন্তু এই তৈরি করার পিছনে নিজের উদ্দেশ্য থাকে। অপরদিকে আল্লাহ তায়ালা গোটা জগৎ সৃষ্টি করেছেন নিজের কোনো প্রয়োজন ছাড়াই। তিনি মহান 'খালিক' (সৃষ্টিকর্তা)। এ কারণে প্রাচীন ভাষা-বিশেষজ্ঞ আজহারি মনে করেন, 'খালিক' নামটি আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়। কারণ, 'খালক' হলো সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সৃষ্টি। মানুষ যেভাবে পাঁচটা বস্তু মিশ্রিত করে নতুন একটা বস্তু তৈরি করে তেমন নয়।¹
পৃথিবীর মানুষ নিজ পরিবারের ভরণ-পোষণ যোগাতে ক্লান্ত হয়ে ওঠে, কিংবা ভরণপোষণে টান পড়ে। আল্লাহ তায়ালা গোটা পৃথিবীর সবার সব ধরনের প্রয়োজন পূর্ণ করেন, এটা তাঁর জন্য কষ্টকর নয় কিংবা তাঁর ভান্ডার হ্রাস করে না; বরং আল্লাহ তো কোনো জিনিস 'হও' বললেই হয়ে যায়। [ইয়াসিন: ৮২]
মানুষ নিজেকে বাঁচাতে কিংবা নিজের স্বার্থ উদ্ধারে একজন আরেকজনকে মেরে ফেলে। অনেক সময় নিজের বানানো সৃষ্টিকেও গুঁড়িয়ে দেয়, যখন সেটা তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। আল্লাহ তায়ালাও নিজের বানানো সৃষ্টিকে মৃত্যু দান করেন, কিন্তু ভয়ে মৃত্যু দেন না।
টিকাঃ
¹. তাহজিবুল লুগাহ, আজহারি (৭/১৬)।
📄 আল্লাহ নির্ভয়ে মৃত্যদানকারী, বিনাদ্বন্দ্বে পুনরুত্থানকারী
পৃথিবীর কোনো সৃষ্টি সহস্র বছর পরিশ্রমেও একটা ক্ষুদ্র মৃত বস্তুও জীবিত করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা সৃষ্টিকে কোনো কষ্ট ছাড়াই মুহূর্তে পুনরুত্থিত করবেন।
আল্লাহ অমুখাপেক্ষী সৃষ্টিকর্তা, ক্লান্তিহীন রিজিকদাতা: এ কারণেই কুরআন- সুন্নাহে আল্লাহর এসব গুণের দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ . مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ. إِنَّ اللهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ.
অর্থ: 'আর আমি মানুষ ও জিনকে আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে জীবিকা চাই না। আমি চাই না তারা আমার আহার্য জোগাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহই হলেন জীবিকাদাতা, শক্তির আধার, পরাক্রমশালী।' [জারিয়াত: ৫৬- ৫৮] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ অর্থ: 'হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহ তিনি অভাবমুক্ত প্রশংসিত।' [ফাতির: ১৫] আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন,
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ اتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ أَوَّلَ مَنْ أَسْلَمَ وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ. অর্থ: 'আপনি বলে দিন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা এবং যিনি সবাইকে আহার্য দান করেন এবং তাঁকে কেউ আহার্য দান করে না, অপরকে সাহায্যকারী স্থির করব? আপনি বলে দিন, আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, সর্বাগ্রে আমিই আজ্ঞাবহ হব। আপনি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।' [আনআম: ১৪] অপর একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَقَالَ مُوسَى إِنْ تَكْفُرُوا أَنْتُمْ وَ مَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ অর্থ: 'মুসা বললেন, তোমরা এবং পৃথিবীর সবাই যদি কুফরি করো, তথাপি আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। [ইবরাহিম: ৮]
সহিহ মুসলিমে একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ হাদিসে কুদসিতে এসেছে, 'হে আমার বান্দাগণ, নিশ্চয় আমি আমার উপর জুলুম হারাম করেছি, আমি তোমাদের মাঝেও তা হারাম করেছি। অতএব, তোমরা জুলুম করো না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের প্রত্যেকেই পথচ্যুত, কেবল সে ছাড়া যাকে আমি পথ দেখাই। অতএব, তোমরা আমার কাছে পথের সন্ধান চাও, আমি তোমাদের (হিদায়াতের) সন্ধান দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা সকলে ক্ষুধার্ত। তবে আমি যাকে আহার দান করি সে ছাড়া। অতএব, তোমরা আমার নিকট আহার প্রার্থনা করো, তোমাদের আহার দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা সকলে বিবস্ত্র, তবে আমি যাকে বস্ত্র দান করি সে ছাড়া। অতএব, তোমরা আমার নিকট বস্ত্র চাও, আমি তোমাদের বস্ত্র দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা রাত-দিনই ভুল করতে থাকো, আমি তোমাদের সকল পাপ মোচন করতে থাকি। অতএব, আমার নিকট ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করব। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা আমার ক্ষতি পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না যে আমার ক্ষতি করবে। আর না তোমরা আমার উপকার পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে যে আমার উপকার করবে। যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষটির মতো হয়ে যাও, সেটা আমার রাজত্ব সামান্য বৃদ্ধি করবে না। হে আমার বান্দাগণ, যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লোকটির মতো হয়ে যাও, সেটা আমার রাজত্ব সামান্য হ্রাস করবে না। হে আমার বান্দাগণ, যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার নিকট প্রার্থনা করো, অতঃপর আমি প্রত্যেককে তার প্রার্থিত বস্তু প্রদান করি, তবে আমার কাছে যা আছে তা থেকে ততটুকু হ্রাস পাবে, যতটুকু একটা সুই সমুদ্র থেকে পানি নিলে হ্রাস পায়! হে আমার বান্দাগণ, এ তো তোমাদের আমল, যা আমি তোমাদের জন্য সংরক্ষণ করি, অতঃপর তোমাদের তা পূর্ণ করে দেবো। অতএব, যে ভালো কিছু পেল, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে, যে অন্য কিছু পেল, সে যেন কেবল নিজেকেই দোষারোপ করে।'¹
আল্লাহ নির্ভয়ে মৃত্যুদানকারী, বিনাক্লেশে পুনরুত্থানকারী: এই দুটো গুণ আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতার নির্দেশক। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাদের ভয়ে মৃত্যু দান করেন না। কারণ, মানুষ জীবিত থাকলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আবার জীবিত থেকে যদি সবাই মিলে আল্লাহর কুফরি করতে থাকে, তাতেও আল্লাহর কিছু আসবে-যাবে না, নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পিছনের হাদিসে যা স্পষ্ট হয়েছে। তা ছাড়া ভয় এক ধরনের ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা। আর আল্লাহ সব ধরনের ত্রুটি থেকে পবিত্র।
টিকাঃ
¹. মুসলিম (২৫৭৭); মুসতাদরাকে হাকেম (৭৭০১)।