📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহ সম্যক উপলব্ধির ঊর্ধ্বে

📄 আল্লাহ সম্যক উপলব্ধির ঊর্ধ্বে


কোনো কল্পনাশক্তি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারে না। বোধ-বুদ্ধি তাঁকে পরিব্যাপ্ত করতে পারে না। সৃষ্টির কোনোকিছুই তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না।

ব্যাখ্যা
আল্লাহ সম্যক উপলব্ধির ঊর্ধ্বে। উপরের আরবি বাক্য অনুমান, ধারণা, কল্পনাশক্তি, মনে করা সবকিছুকে নাকচ করে দেয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্পনাশক্তি তৈরি করেছেন। সকল ইন্দ্রিয় সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সকল উপলব্ধি এবং উপলব্ধির উপকরণের স্রষ্টা। ফলে তাঁর সৃষ্টি করা কোনো উপায়-উপকরণের মাধ্যমে তাঁকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে, সবকিছুর চেয়ে বড় ও মহান। সৃষ্টির ছোট্ট বোধ-বুদ্ধি, সীমিত জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা তাঁকে সমাকীর্ণ করা সম্ভব নয়। মানুষ আল্লাহর ব্যাপারে যতই এবং যেভাবেই ভাবুক, তাঁকে সম্যকভাবে এবং স্বরূপে উপলব্ধি করতে পারবে না। এ জন্য এক্ষেত্রে মানুষের বিনয়ী হওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন,
يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا
অর্থ: 'তিনি জানেন যা কিছু তাদের সামনে ও পশ্চাতে আছে এবং তারা তাকে জ্ঞান দ্বারা পরিবেষ্টন করতে পারে না।' [ত্বহা: ১১০] অর্থাৎ তাঁর ব্যাপারে জানা সম্ভব, কিন্তু তাঁর সত্তা ও গুণাবলি পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তিনি সকল অনুমান, ধ্যান-ধারণা ও কল্পনা-জল্পনার উর্ধ্বে। সৃষ্টিকে সেসব উপকরণ দেওয়াই হয়নি। ফলে আল্লাহ নিজের ব্যাপারে যা বলেছেন, এর বাইরে কিছু বলা বৈধ নয়।¹
এ কারণেই মানুষকে আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে: 'রাসুল সাল্লাল্লাহু

টিকাঃ
¹. দেখুন: গজনবি (৪৯-৫০); গুনাইমি (৫৪); সালেহ ফাওজান (২৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 সৃষ্টির কোনোকিছুই আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না

📄 সৃষ্টির কোনোকিছুই আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না


সৃষ্টির কোনোকিছুই আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না: পিছনে 'তাঁর মতো কিছুই নেই' শিরোনামে এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান বাক্যটি সেই কথাকেই তাগিদ দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে। আল্লাহ সৃষ্টির সঙ্গে সব ধরনের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত। তাঁর সত্তা ও সিফাত (গুণাবলি) সকল ক্ষেত্রে তিনি সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র। কিন্তু যুগে যুগে বিভিন্ন কওম এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা আল্লাহকে মানুষের মতো কল্পনা করেছে। আসমানি শরিয়তধারীদের মাঝে সর্বপ্রথম এই বিচ্যুতির শিকার হয়েছে ইহুদিরা। ফলে তারা মুজাসসিমাহ (দেহবাদী) হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছে।¹ এর পর পথভ্রষ্ট হয়েছে খ্রিষ্টানরা। তারা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র কল্পনা করেছে। আর পুত্র তো পিতার মতোই হয়, এটাই স্বাভাবিক। এভাবে আল্লাহ তায়ালাকে মানুষের মতো কল্পনা করে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। সবশেষে গোমরাহ হয়েছে মুসলিম উম্মাহর মুশাববিহাহ ও মুজাসসিমাহ সম্প্রদায়। তারাও আগের কওমগুলোর মতো আল্লাহকে মানুষরূপে কল্পনা করেছে।²
কিন্তু এই সাদৃশ্যের ভয়ে কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আল্লাহর সিফাতগুলো অস্বীকার করা যাবে না; যেহেতু সেগুলো কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে, তাই অর্থহীন নয়। ফলে এগুলোকে সালাফের মানহাজের আলোকে স্বীকার করতে হবে। কারণ, আল্লাহর সত্তা বান্দার সত্তার মতো নয়। তাঁর গুণাবলি বান্দার গুণাবলির মতো নয়। হ্যাঁ, সাদৃশ্য রয়েছে কেবল শব্দ ও নামের ক্ষেত্রে। যেমন: জীবন, জানা, শোনা, দেখা ইত্যাদি; কিন্তু এগুলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য বোঝানোর জন্য নয়; বরং মানুষ যেন এসব বিশেষণ বুঝতে পারে সেজন্য বলা হয়েছে। নতুবা আল্লাহর জীবন, তাঁর জ্ঞান, তাঁর দর্শন ও শ্রবণ সবকিছু সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।³

টিকাঃ
¹. দেখুন: আকহাসারি (১১৮)।
². দেখুন: গজনবি (৫০); শাইবানি (১১)।
³. ইবনে আবিল ইজ (৭৩); সালেহ ফাওজান (৩০)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চির বিদ্যমান রক্ষাকর্তা

📄 আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চির বিদ্যমান রক্ষাকর্তা


তিনি সদা জীবিত, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা, নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না।

ব্যাখ্যা
আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চির বিদ্যমান রক্ষাকর্তা: আল্লাহ তায়ালা সর্বদাই ছিলেন, সর্বদাই থাকবেন। তাঁর শুরু নেই, শেষ নেই। তাঁর জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। তাঁর ঘুম নেই, নিদ্রা নেই। এগুলো সৃষ্টি এবং সৃষ্টির গুণাবলি। আর আল্লাহ তায়ালা জন্ম-মৃত্যুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি ঘুম ও জাগরণের সৃষ্টিকর্তা। তিনি পৃথিবীর রক্ষাকর্তা। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন না। তিনি নিদ্রামগ্ন হন না। বরং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে না। তিনি সবকিছুর অমুখাপেক্ষী। কুরআনের বিখ্যাত আয়াত 'আয়াতুল কুরসিতে' আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَةً إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ .
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি সদা জীবিত, সবকিছুর রক্ষাকর্তা। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা-কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তাদের দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা-কিছু রয়েছে, সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনোকিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোর সুরক্ষা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।' [বাকারা: ২৫৫] অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

টিকাঃ
¹. গজনবি (৫৪)।
². আকহাসারি (১১৯)।
³. মুসলিম (১৭৯); ইবনে হিব্বান (২৬৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহ অনুগ্রহে পক্ষী সৃষ্টিকর্তা, ক্লান্তিহীন রিজিকদাতা

📄 আল্লাহ অনুগ্রহে পক্ষী সৃষ্টিকর্তা, ক্লান্তিহীন রিজিকদাতা


তিনি সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি রিজিকদাতা, রিজিকদানে কোনো কষ্ট- ক্লান্তি নেই তাঁর। তিনি মৃত্যু দানকারী, নির্ভয়ে মৃত্যু দান করেন। তিনি পুনরুত্থানকারী, বিনাক্লেশে পুনরুত্থিত করেন।

ব্যাখ্যা
এসব গুণাবলি আল্লাহ তায়ালার সর্বোচ্চ ক্ষমতা, মর্যাদা ও বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশ। সকল দিক থেকে সৃষ্টির সকলের উর্ধ্বে হওয়ার প্রমাণ। কারণ, পৃথিবীতেও অনেক সৃষ্টিকর্তা আছে। কেউ ঘর তৈরি করে, কেউ বাড়ি তৈরি করে, কেউ প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। কিন্তু এই তৈরি করার পিছনে নিজের উদ্দেশ্য থাকে। অপরদিকে আল্লাহ তায়ালা গোটা জগৎ সৃষ্টি করেছেন নিজের কোনো প্রয়োজন ছাড়াই। তিনি মহান 'খালিক' (সৃষ্টিকর্তা)। এ কারণে প্রাচীন ভাষা-বিশেষজ্ঞ আজহারি মনে করেন, 'খালিক' নামটি আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়। কারণ, 'খালক' হলো সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সৃষ্টি। মানুষ যেভাবে পাঁচটা বস্তু মিশ্রিত করে নতুন একটা বস্তু তৈরি করে তেমন নয়।¹
পৃথিবীর মানুষ নিজ পরিবারের ভরণ-পোষণ যোগাতে ক্লান্ত হয়ে ওঠে, কিংবা ভরণপোষণে টান পড়ে। আল্লাহ তায়ালা গোটা পৃথিবীর সবার সব ধরনের প্রয়োজন পূর্ণ করেন, এটা তাঁর জন্য কষ্টকর নয় কিংবা তাঁর ভান্ডার হ্রাস করে না; বরং আল্লাহ তো কোনো জিনিস 'হও' বললেই হয়ে যায়। [ইয়াসিন: ৮২]
মানুষ নিজেকে বাঁচাতে কিংবা নিজের স্বার্থ উদ্ধারে একজন আরেকজনকে মেরে ফেলে। অনেক সময় নিজের বানানো সৃষ্টিকেও গুঁড়িয়ে দেয়, যখন সেটা তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। আল্লাহ তায়ালাও নিজের বানানো সৃষ্টিকে মৃত্যু দান করেন, কিন্তু ভয়ে মৃত্যু দেন না।

টিকাঃ
¹. তাহজিবুল লুগাহ, আজহারি (৭/১৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00