📄 আল্লাহর জন্য ‘খোদা’ বা ‘গড’ শব্দের ব্যবহার
আল্লাহর জন্য 'খোদা' বা 'গড' শব্দের ব্যবহার: একই কথা অন্যান্য ভাষায় আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন নামের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। যেমন: ইংরেজি 'গড', বাংলা 'ঈশ্বর', ফারসি 'খোদা' ইত্যাদি। আল্লাহকে বোঝাতে প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে এসব শব্দ ব্যবহার করা যাবে। কারণ, আল্লাহ পৃথিবীর সকল গোত্রের কাছে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই অনুমিত যে, প্রত্যেক জাতি আল্লাহর বিভিন্ন নাম তাদের ভাষাতেই উচ্চারণ করত। আসমানি গ্রন্থগুলো সেসব ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছিল। 'সালাত', 'সাওম', 'জাকাত'-সহ ইসলামের বিভিন্ন ইবাদত, আল্লাহর বিভিন্ন গুণবাচক নাম প্রত্যেক উম্মাহ নিজস্ব ভাষাতেই চর্চা করত। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
অর্থ: 'আমি সকল রাসুলকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেন।' [ইবরাহিম: ৪]
ফলে প্রত্যেক ভাষার মানুষ সে ভাষাতেই আল্লাহকে ডাকতেন, আল্লাহর ইবাদত করতেন এটা সুস্পষ্ট ও সতঃসিদ্ধ বিষয়।
যেহেতু শরিয়তে মুহাম্মাদির ভাষা হিসেবে আল্লাহ আরবিকে মনোনীত করেছেন, ফলে এ শরিয়াহর কিছু নির্দিষ্ট মৌলিক ইবাদত আরবিতেই করতে হবে। তবে এর বাইরে যেকোনো ভাষায় শরয়ি পরিভাষাগুলোর আরবি প্রতিশব্দের ব্যবহার বৈধ হবে (যেমন নামাজ, রোজা) এবং সেসব ভাষায় আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত নামে তাঁকে বোঝানো (যেমন খোদা হাফেজ) এবং সেসব নামে কসম খাওয়াও জায়েজ হবে (যেমন খোদার কসম)।¹ ইমাম আহমদ রাহি, আল্লাহকে 'হে পেরেশানদের পথপ্রদর্শনকারী' (یا دلیل الحیاری) বলে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ এটা আল্লাহর নাম নয়; বরং তাঁর গুণ এবং তাঁর শানে শোভনীয় বিশেষণ। ² সুতরাং ফারসিতে 'হে খোদা', ইংরেজিতে 'ও গড' কিংবা বাংলাতে 'হে প্রভু' এমনকি 'ঈশ্বর' নামে আল্লাহকে ডাকাও বৈধ হবে। কারণ, 'খোদা', 'গড', 'ঈশ্বর' কিংবা 'প্রভু' নামের মাঝে ইসলামের আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অর্থ নেই, কিংবা এগুলো অন্য কোনো বিশেষ ধর্মের বিশেষ উপাস্যের নাম হিসেবে নির্ধারিতও নয়। শাইখ ইবনে তাইমিয়া প্রয়োজনে অন্য ভাষায় আল্লাহর নাম ব্যবহারকে মুস্তাহাব এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াজিব বলেছেন এবং এটাকে আলিমদের 'সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।³
এটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। জগতের সকল ভাষা আল্লাহরই সৃষ্টি, তাঁর নিদর্শন। ফলে আরবি বাদ দিয়ে অন্য কোনো ভাষায় তাঁকে ডাকলে, তাঁর আরবি নামগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ করে ব্যবহার করলে তিনি শুনবেন না, তিনি অসন্তুষ্ট হবেন এটা হতে পারে না। যেমন 'খোদা', 'গড', 'ঈশ্বর' এসব শব্দ আরবি 'রব', 'খালিক', 'মালিক' এ-জাতীয় নামের সমার্থক কিংবা কাছাকাছি অর্থবোধক। ফলে এসব শব্দে আল্লাহকে ডাকা নিষিদ্ধ নয়। বরং পৃথিবীর অনেক ভূখণ্ডের অনেক মানুষ আল্লাহর আরবি নামগুলো যথাযথভাবে উচ্চারণও করতে পারবে না। নিজস্ব ভাষাই তাদের কাছে সহজ হবে। মাতৃভাষাতে আল্লাহকে ডাকতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এ কারণে এগুলো ব্যবহারের বৈধতার ব্যাপারে সকল ধারার প্রাজ্ঞ আলিমগণ একমত, যেমনটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষ এগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং আল্লাহকে 'খোদা', 'গড' ইত্যাদি নামে ডাকাকে 'নাজায়েজ' প্রমাণ করতে চাচ্ছে। তাদের কথা অসঠিক, অনুমাননির্ভর এবং দলিলবিহীন।
হ্যাঁ, আল্লাহর জন্য কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আরবি নামগুলো ব্যবহার করাই উত্তম। আল্লাহ বলেছেন,
وَلِلَّهِ أَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَئِهِ سَيَجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
অর্থ: 'আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০]
এটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সালাফের সুন্নাহ। পাশাপাশি সমকালীন বিভিন্ন ফিতনারও খণ্ডন। ইদানীং তথাকথিত অনেক প্রগতিশীল মুসলিম 'আল্লাহ' নাম উচ্চারণ করতে লজ্জা পায়। ফলে তারা আল্লাহকে 'সৃষ্টিকর্তা', 'উপরওয়ালা' ইত্যাদি বিশেষণে বোঝায়। শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ হলেও এমন আচরণ এক ভয়ংকর বিচ্যুতির নির্দেশক। আত্মপরিচয় সংকট ও হীনম্মন্যতাবোধের পরিচায়ক। আর ইসলাম ও আরবি নিয়ে হীনম্মন্যতাবোধ একজন মুসলিমকে সময়ের ব্যবধানে দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহকে তাঁর আরবি নামগুলোতেই ডাকার উপর জোর দেওয়া উচিত।
টিকাঃ
১. দেখুন: আল-মুহাল্লা, ইবনে হাজাম (৬/২৮১); ফাতহুল কাদির, ইবনুল হুমাম (৫/৭৫); ফাতাওয়া কুবরা, ইবনে তাইমিয়া (৬/৫৬৮)।
২. দেখুন: শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৯/২৭১)।
৩. দেখুন: বায়ানু তালবিসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৩৮৯-৩৯০)।
📄 আল্লাহর কোনো ক্ষয় নেই, লয় নেই
আল্লাহর কোনো ক্ষয় নেই, লয় নেই; অর্থাৎ আল্লাহ কোনো দিন শেষ হয়ে যাবেন না। কোনো দিন তাঁর শক্তিতে অণু পরিমাণ কমতি আসবে না। তিনি সর্বদা যেমন ছিলেন সর্বদাই তেমন থাকবেন। কুরআনের একটি আয়াতে উপরের বাক্যের মর্ম তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ. وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَالِ وَالْإِكْرَامِ .
অর্থ: 'ভূপৃষ্ঠে বিদ্যমান সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশিষ্ট থাকবেন কেবল আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তা।' [আর-রহমান: ২৬-২৭] কুরআনে আরও এসেছে:
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وَسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَكَفَى بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا
অর্থ: 'আপনি নির্ভর করুন সেই চিরঞ্জীব সত্তার উপর, যিনি কখনও মৃত্যুবরণ করবেন না।' [ফুরকান: ৫৮] আল্লাহ অন্যত্র বলেন,
كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ
অর্থ: 'তিনি ব্যতীত সবকিছু ধ্বংসশীল।' [কাসাস: ৮৮]
📄 আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না
আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না: কারণ তিনিই জগতের সবকিছু নিজ ইচ্ছায় যেভাবে চেয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন। ফলে গোটা সৃষ্টি তাঁর অনুগত থাকবে, তাঁর সৃষ্টি করা জগতে তাঁর ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছু হবে না এটাই স্বাভাবিক। এটা ঈমানের ছয়টি মৌলিক রুকনের একটি তাকদিরের উপর ঈমানের অংশ। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
অর্থ: 'তিনি যখন কোনোকিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, 'হও', তখনই তা হয়ে যায়।' [ইয়াসিন: ৮২] আরও বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ
অর্থ: 'আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ দেন।' [মায়িদা: ১] অন্যত্র বলেন,
كَذلِكَ اللَّهُ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ
অর্থ: 'এভাবেই আল্লাহ যা চান, করেন।' [আলে ইমরান: ৪০] মানুষের হিদায়াত প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَانَّمَا يَصَّعَدُ فِي السَّمَاءِ كَذَلِكَ يَجْعَلُ اللَّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ.
অর্থ: 'অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। এমনইভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, আল্লাহ তাদের উপর আজাব বর্ষণ করেন।' [আনআম: ১২৫] নুহ আলাইহিস সালামের ভাষায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدْتُ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللَّهُ يُرِيدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
অর্থ: 'আর আমি তোমাদের নসিহত করতে চাইলেও তা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের গোমরাহ করতে চান; তিনিই তোমাদের পালনকর্তা এবং তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।' [হুদ: ৩৪] আল্লাহ আরও বলেন,
وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
অর্থ: 'আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।' [ইবরাহিম: ২৭] মানুষের ইচ্ছাকে আল্লাহ তাঁর ইচ্ছার অধীন ঘোষণা করে বলেন,
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ
অর্থ: 'আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তোমরা কোনো ইচ্ছা করতে পারো না।' [ইনসান: ৩০] একই কথা আরেক জায়গায় তাগিদ করেন,
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: 'বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তোমাদের কোনো ইচ্ছা নেই।' [তাকভির: ২৯]
উল্লিখিত প্রত্যেকটি আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, পৃথিবীতে যা-কিছু হচ্ছে, সব আল্লাহর ইচ্ছায় হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না। কিন্তু কয়েকটি ফিরকা এই বিষয়ে বিভ্রান্তি ও গোমরাহির শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কাদারিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ ও মুতাজিলাহ ফিরকা। কাদারিয়্যাহ ফিরকা তাকদিরকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তাদের ধারণা, মানুষ যার ইচ্ছা মুমিন হয়, আবার যার ইচ্ছা কাফের হয়; তাতে আল্লাহর কোনো ইচ্ছা নেই। বরং আল্লাহ সবার জন্য ঈমান চেয়েছেন, কিন্তু কাফেররা ঈমান আনেনি। আর মুতাজিলারা বলেছে, আল্লাহর প্রকৃত অর্থে ইচ্ছা নেই; রূপক ইচ্ছা রয়েছে। কারণ, ইচ্ছার অন্য নাম-তাদের ধারণামতে ‘শাহওয়াহ’ বা প্রবৃত্তি। আর আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত। তাই আল্লাহর উপর হাকিকি অর্থে ইচ্ছা শব্দ প্রয়োগ করা যায় না, রূপক অর্থে যেতে পারে। এটা তাদের অজ্ঞতা। কারণ, ইচ্ছা (ইরাদা) মানেই প্রবৃত্তি (শাহওয়াহ) নয়; বরং ইচ্ছা হলো, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বিষয় ঘটানোর প্রক্রিয়া। সৃষ্টির শৃঙ্খলা ও বিন্যাসের জন্য ইচ্ছা আবশ্যক।¹
টিকাঃ
১. দেখুন: গজনবি (৪৮-৪৯); আকহাসারি (১১৬); শাইবানি (১০); ইবনে আবিল ইজ (৬৮)।
📄 একটি সন্দেহের অপনোদন
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা যদি পৃথিবীর সবার জন্য ঈমান কামনা করেন, তবে আবু বকর রাজি.-এর কপালে ঈমান লিখে থাকলে আবু লাহাবের কপালে কেন লিখলেন না? আবু বকর রাজি.-কে ঈমান গ্রহণে সহায়তা করেছেন, আবু লাহাবকে কেন করলেন না? উত্তর হলো:
এক. আল্লাহ তায়ালা তাঁর গায়েবি ইলমের মাধ্যমে প্রথমেই জেনেছেন যে, আবু লাহাবের ঈমান তার কোনো উপকারে আসবে না। অর্থাৎ সে গোমরাহির পথেই চলবে, ফলে তাকে মুমিন বানিয়ে সৃষ্টি করেননি, কিংবা তাকে ঈমান গ্রহণে সাহায্য করেননি।
দুই. আবু বকর রাজি.-কে আল্লাহ ঈমান গ্রহণে সহায়তা করে অনুগ্রহ করেছেন। কারণ, তিনি নিজের পুণ্য, উত্তম চরিত্র, হৃদয়ের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতার ফলে সেই অনুগ্রহ লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। অপরদিকে আবু লাহাব তার মন্দ গুণ ও মন্দ চরিত্র, হৃদয়ের অস্বচ্ছতার ফলে অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তিন. আল্লাহ তায়ালা হক ও বাতিল তৈরি করেছেন। মানুষকে এই দুটো থেকে যেকোনো একটা গ্রহণের স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতা দিয়েই ছেড়ে দেননি। বরং নিজ অনুগ্রহে তাদের হক ও বাতিল চিনিয়ে দিয়েছেন। হক গ্রহণ করতে এবং বাতিল বর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সতর্ক করার জন্য নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। এর পরেও আবু লাহাব কুফর করলে সেটার দায়ভার আল্লাহর উপর হতে পারে?।²
এ কারণে একটি বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবাদের বললেন, সকল মানুষের জন্মের আগেই জান্নাত কিংবা জাহান্নামে তার জন্য জায়গা নির্ধারিত হয়ে যায়। সে সৌভাগ্যবান হবে, নাকি দুর্ভাগা হবে, লেখা হয়ে যায়। তখন এক সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তা হলে তাকদিরের উপর নির্ভর করে বসে থাকলেই তো হয়। আমল করার কী দরকার? কারণ, যে সৌভাগ্যবান হওয়ার, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সৌভাগ্যের আমল করবে। আর যে দুর্ভাগা হওয়ার, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে পথে অগ্রসর হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং তোমরা কাজ করত থাকো। প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। যাকে সৌভাগ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেসব কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। আর যাকে দুর্ভাগ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেসব কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন,
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَ اتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى : وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى.
অর্থ: 'অতএব, যে দান করে, আল্লাহভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে, তার জন্য সুখের বিষয় সহজ করে দেবো। আর যে কৃপণতা করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেবো।'¹ [লাইল: ৫-১০]
দেখা যাচ্ছে, সৃষ্টির আগেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইলমের মাধ্যমে কে জান্নাতি হবে এবং কে জাহান্নামি হবে সেটা লিখে রাখলেও মানুষকে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন। ভালো ও মন্দ এখতিয়ার করার সুযোগ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকদিরের উপর নির্ভর করে বসে থাকতে নিষেধ করেছেন। কারণ, কেউই জানে না যে, তার তাকদিরে কী আছে। তা ছাড়া পার্থিব বিষয়ে মানুষ তাকদিরের উপর বসে না থেকে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে সে তাকদিরে যা আছে তা-ই হবে বলে বসে থাকে না। আখিরাতের ক্ষেত্রেও আমাদের তা-ই করতে হবে। হিদায়াতের জন্য চেষ্টা ব্যয় করলে আল্লাহ জান্নাতের পথ খুলে দেবেন বলেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বরং পার্থিব ব্যাপারেও তাকদির মানুষের সুখের অবলম্বন। বিপদ- আপদে মুমিন তাকদিরের কথা বলে প্রবোধ ও সান্ত্বনা লাভ করে। কারণ, সে জানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
মَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللهِ يَسِيرٌ . لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ.
অর্থ: 'পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের উপর যা-কিছু বিপদ আসে, তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা যা হারাও তার জন্য দুঃখিত না হও, আর তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তার জন্য উল্লসিত না হও। আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।' [হাদিদ: ২২-২৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যা তুমি পেয়েছ, তা কখনও হারানোরই ছিল না। আর যা হারিয়েছ, তা কখনও পাওয়ারই ছিল না।'¹ বিপরীতে নাস্তিক ও কাফেরের কাছে সান্ত্বনার এই দুর্গটা নেই। ফলে তাকে নিজের উপরই নিজের নির্ভর করতে হয়। যখন সে নিজের বোঝা আর বইতে পারে না, নিরাশার অন্ধকারে আত্মহননের পথে এগিয়ে যায়।
টিকাঃ
¹. বুখারি (৪৯৪৯); মুসলিম (২৬৪৭)।
². ঘুমাইয়িস (২১০-২১১)।
¹. এটা রাসুলুল্লাহর প্রসিদ্ধ হাদিস। তিরমিজি (২১৪৪); মুসনাদে আহমদ (২১৮৩৫); বাজ্জার (৪১০৭)-সহ বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।