📄 আল্লাহ ‘কাদিম’ ও ‘দায়িম’
আল্লাহ 'কাদিম' ও 'দায়িম': শব্দ দুটোর কাছাকাছি বাংলা প্রতিশব্দ হলো অনাদি ও অনন্ত। অর্থাৎ যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই। আল্লাহ তায়ালা সর্বদাই ছিলেন, এমন কোনো সময় ছিল না যখন তিনি ছিলেন না। আবার তিনি সর্বদাই থাকবেন, এমন কোনো সময় আসবে না যখন তিনি থাকবেন না। ফলে তাঁর শুরু ও শেষ নেই, তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই; বরং তিনিই শুরু তিনিই শেষ। তিনি সময় ও কালের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো 'কাদিম' ও 'দায়িম' কি আল্লাহর নাম? এই দুটো শব্দ কি শরয়ি পরিভাষা? আল্লাহর ক্ষেত্রে এসব শব্দ কুরআন ও সুন্নাহে ব্যবহৃত হয়েছে? একদল উলামায়ে কেরাম মনে করেন 'কাদিম' ও 'দায়িম' আল্লাহর নাম নয়। কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহে এই নাম দুটো উল্লেখ করা হয়নি। যেহেতু আল্লাহ তায়ালার নাম 'তাওকিফি' তথা কুরআন-সুন্নাহ-নির্ভর আর এই নাম দুটো কুরআন-সুন্নাহে নেই, সুতরাং এই দুটোকে আল্লাহর নাম হিসেবে আখ্যা দেওয়া যাবে না। কিন্তু তারা আল্লাহর ক্ষেত্রে এই শব্দদুটো ব্যবহার অবৈধ কিংবা গলদ মনে করেন না। এক্ষেত্রে তাদের মূলনীতি হলো, যদি কোনো শব্দের অর্থ অসুন্দর না হয় এবং সেটা আল্লাহর নাম না হলেও তাঁর সম্পর্কে 'ইখবার' তথা কোনো বক্তব্য কিংবা বর্ণনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে এ ধরনের শব্দ আল্লাহর শানে ব্যবহার করা হারাম নয়। যেমন 'শাইউন' (বস্তু), 'মাওজুদ' (বিদ্যমান), 'জাত' (সত্তা), 'আজালি' (অনাদি), 'আবাদি' (অনন্ত), 'মুরিদ' (ইচ্ছাকারী), 'মুতাকাল্লিম' (কথক/বক্তা) ইত্যাদি। 'কাদিম' ও 'দায়িম'-এর ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। কারণ, এ দুটোর অর্থ হলো, যার কোনো শুরু নেই এবং যার কোনো শেষ নেই। এ ধরনের বিশেষণ যেহেতু আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সুতরাং শব্দদুটো আল্লাহর শানে ব্যবহার করা যাবে। তবে না করাই উত্তম।¹
কিন্তু ইমাম বাইহাকি, গাজালি-সহ অসংখ্য মুহাক্কিক আলেম মনে করেন, 'কাদিম' ও 'দায়িম' আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা কেবল বৈধই নয়; বরং এগুলো আল্লাহর নাম। যারা এ দুটোকে আল্লাহর নাম হিসেবে নাকচ করেছেন, তারা রাসুলুল্লাহর সুন্নাহকে সামগ্রিকভাবে দেখার (ইসতিকরা) আগেই অনুমান এবং অনুসরণভিত্তিক নাকচ করেছেন।² এক্ষেত্রে তারা যেসব দলিল পেশ করেন, আমরা উদাহরণস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উল্লেখ করব:
এক. সুনানে আবু দাউদে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাজি.-এর হাদিস, যেখানে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়তেন: أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: 'আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে মহান আল্লাহর, তাঁর পবিত্র চেহারার এবং অনাদি রাজত্বের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' হাদিসটি বিশুদ্ধ। কিন্তু জটিলতা হলো উক্ত হাদিসটি তাদের পক্ষের শক্তিশালী দলিল নয়। কারণ, এখানে 'কাদিম' আল্লাহর নাম কিংবা বিশেষণ নয়, বরং তাঁর রাজত্ব কিংবা ক্ষমতার বিশেষণ। ফলে এ হাদিসের ভিত্তিতে এটাকে আল্লাহর নাম সাব্যস্ত করা যায় না। হ্যাঁ, এটুকু অবশ্যই বলা যায় যে, আল্লাহর রাজত্ব কাদিম হলে তাঁর কাদিম হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত।
দুই. মুসতাদরাকে হাকেমে আবু হুরাইরা রাজি.-এর সূত্রে বর্ণিত লম্বা হাদিস, যাতে আল্লাহর অনেকগুলো নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে 'আল-কাদিম' এবং 'আদ দায়িম' নামদুটোও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জটিলতা হলো, হাদিসটির একজন বর্ণনাকারীকে (আবদুল আজিজ ইবনুল হুসাইন) বড় বড় ইমামগণ দুর্বল বলেছেন। যদিও হাকেম তাকে সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন।⁴
তিন. সুনানে ইবনে মাজাতে আবু হুরাইরা রাজি. থেকে দ্বিতীয় আরেক সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিস। সেখানেও আল্লাহ তায়ালার নাম হিসেবে 'কাদিম' এবং 'দায়িম' উল্লেখ করা হয়েছে।¹ আকহাসারি এটার উপর নির্ভর করে এ দুটোকে আল্লাহর নাম হিসেবে গণ্য করেছেন।² কিন্তু সিন্ধি-সহ অনেকের মতে এ হাদিসটিও জয়িফ। ইমাম বাইhaki রাহি. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-আসমা ওয়াস-সিফাত'-এ 'কাদিম' আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় মত দিয়েছেন। কিন্তু সেটাও সমালোচিত বর্ণনাকারী আবদুল আজিজ ইবনুল হুসাইন সূত্রে। ফলে বর্ণনার দুর্বলতা প্রশ্নাতীত নয়।
দেখা যাচ্ছে, যারা বলেছেন এ দুটো আল্লাহর নাম নয়; কারণ সুন্নাহে এগুলো বর্ণিতই হয়নি, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, আলোচ্য হাদিসগুলোর সনদের বিশুদ্ধতা যদিও প্রশ্নাতীত নয়, তথাপি এগুলোর মাধ্যমে নামদুটোর 'আসল' তথা মূল অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। ফলে এ দুটো যেমন আল্লাহর নাম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, একইভাবে অর্থের বিশুদ্ধতার দিকে তাকিয়ে 'বিশেষণ' হিসেবেও আল্লাহর উপর এগুলো প্রয়োগ করা যাবে। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে উভয় ধারার আলিমগণই একমত। কারণ, এ দুটোর অর্থের মাঝে অসুন্দর কিংবা নিষিদ্ধ কিছু নেই। আরবিতে সাধারণভাবে 'কাদিম' অর্থ পুরোনো। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে এটার অর্থ হবে: 'পুরোনো' নয়, বরং যিনি সর্বদাই ছিলেন, কখনও ছিলেন না এমন নয়।
তবে বৈধতা এবং উত্তম দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। যদিও 'কাদিম' এবং 'দায়িম' শব্দ দুটো আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহার বৈধ এবং দুর্বল সূত্রে সেগুলো আল্লাহর নাম বলেও প্রতীয়মান হয়, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহে আমরা একই অর্থে আরও উত্তম নাম পাই, যেগুলো আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুপরিমাণ সন্দেহ নেই। কুরআনের একাধিক আয়াতে সেসব নাম বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব নামের মাধ্যমে আল্লাহকে সর্বদা ডাকতেন। পাশাপাশি সেগুলো মর্ম ও তাৎপর্যের ক্ষেত্রেও এই দুটো শব্দের চেয়ে অনেক উত্তম। তন্মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে 'আল-আউয়াল' (শুরু/প্রথম) এবং 'আল-আখির' (শেষ)। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ: 'তিনিই শুরু, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য (উর্ধ্বে), তিনিই গোপন, তিনি সব বিষয় সম্পর্কে জানেন।' [হাদিদ: ৩]
কুরআনে উক্ত আয়াতে বর্ণিত আল্লাহ তায়ালার প্রথম চারটি নামের রাসুলুল্লাহ কৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আবু হুরাইরার সূত্রে বর্ণিত প্রসিদ্ধ একটি হাদিসে, যা মুসলিম- সহ কুতুবে সিত্তার বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে। হাদিসটির একটি অংশ হচ্ছে:
اللَّهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি শুরু, আপনার আগে কিছুই নেই। আপনি শেষ, আপনার পরে কিছুই নেই। আপনি উর্ধ্বে, আপনার উপরে কিছুই নেই। আপনি কাছে (বা গোপনে) আপনার সামনে (কিংবা পরে) আর কিছু নেই।'¹ তাই দোয়া এবং জিকিরের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত নামকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।²
টিকাঃ
১. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়াহ (৬/১৪২); বাদায়েউল ফাওয়ায়িদ, ইবনুল কাইয়িম (১/১৬২); ইবনে আবিল ইজ (৬৭); সালেহ ফাওজান (২৮); ইবনে বাজ (৮)।
২. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৬); তুর্কিস্তানি (৫৫); আকহাসারি (১১৩)।
৩. সুনানে আবু দাউদ (৪৬৬)।
৪. মুসতাদরাকে হাকেম (৪২)।
৫. সুনানে ইবনে মাজা (৩৮৬১)
৬. আকহাসারি (১১৫)
৭. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৬)
৮. মুসলিম (২৭১৩)। আবু দাউদ (৫০৫১)। তিরমিজি (৩৪০০)। তবে হাদিসে বর্ণিত 'যাহির' এবং 'বাতিন' নামের অর্থের ব্যাপারে আলিমদের একাধিক মতামত পাওয়া যায়। বিস্তারিত দেখুন: আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৯৮)
৯. আল-আকিদাহ আত-ত্বহাবিয়্যাহ, কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (৩৪)
📄 আল্লাহর জন্য ‘খোদা’ বা ‘গড’ শব্দের ব্যবহার
আল্লাহর জন্য 'খোদা' বা 'গড' শব্দের ব্যবহার: একই কথা অন্যান্য ভাষায় আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন নামের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। যেমন: ইংরেজি 'গড', বাংলা 'ঈশ্বর', ফারসি 'খোদা' ইত্যাদি। আল্লাহকে বোঝাতে প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে এসব শব্দ ব্যবহার করা যাবে। কারণ, আল্লাহ পৃথিবীর সকল গোত্রের কাছে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই অনুমিত যে, প্রত্যেক জাতি আল্লাহর বিভিন্ন নাম তাদের ভাষাতেই উচ্চারণ করত। আসমানি গ্রন্থগুলো সেসব ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছিল। 'সালাত', 'সাওম', 'জাকাত'-সহ ইসলামের বিভিন্ন ইবাদত, আল্লাহর বিভিন্ন গুণবাচক নাম প্রত্যেক উম্মাহ নিজস্ব ভাষাতেই চর্চা করত। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
অর্থ: 'আমি সকল রাসুলকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেন।' [ইবরাহিম: ৪]
ফলে প্রত্যেক ভাষার মানুষ সে ভাষাতেই আল্লাহকে ডাকতেন, আল্লাহর ইবাদত করতেন এটা সুস্পষ্ট ও সতঃসিদ্ধ বিষয়।
যেহেতু শরিয়তে মুহাম্মাদির ভাষা হিসেবে আল্লাহ আরবিকে মনোনীত করেছেন, ফলে এ শরিয়াহর কিছু নির্দিষ্ট মৌলিক ইবাদত আরবিতেই করতে হবে। তবে এর বাইরে যেকোনো ভাষায় শরয়ি পরিভাষাগুলোর আরবি প্রতিশব্দের ব্যবহার বৈধ হবে (যেমন নামাজ, রোজা) এবং সেসব ভাষায় আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত নামে তাঁকে বোঝানো (যেমন খোদা হাফেজ) এবং সেসব নামে কসম খাওয়াও জায়েজ হবে (যেমন খোদার কসম)।¹ ইমাম আহমদ রাহি, আল্লাহকে 'হে পেরেশানদের পথপ্রদর্শনকারী' (یا دلیل الحیاری) বলে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ এটা আল্লাহর নাম নয়; বরং তাঁর গুণ এবং তাঁর শানে শোভনীয় বিশেষণ। ² সুতরাং ফারসিতে 'হে খোদা', ইংরেজিতে 'ও গড' কিংবা বাংলাতে 'হে প্রভু' এমনকি 'ঈশ্বর' নামে আল্লাহকে ডাকাও বৈধ হবে। কারণ, 'খোদা', 'গড', 'ঈশ্বর' কিংবা 'প্রভু' নামের মাঝে ইসলামের আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অর্থ নেই, কিংবা এগুলো অন্য কোনো বিশেষ ধর্মের বিশেষ উপাস্যের নাম হিসেবে নির্ধারিতও নয়। শাইখ ইবনে তাইমিয়া প্রয়োজনে অন্য ভাষায় আল্লাহর নাম ব্যবহারকে মুস্তাহাব এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াজিব বলেছেন এবং এটাকে আলিমদের 'সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।³
এটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। জগতের সকল ভাষা আল্লাহরই সৃষ্টি, তাঁর নিদর্শন। ফলে আরবি বাদ দিয়ে অন্য কোনো ভাষায় তাঁকে ডাকলে, তাঁর আরবি নামগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ করে ব্যবহার করলে তিনি শুনবেন না, তিনি অসন্তুষ্ট হবেন এটা হতে পারে না। যেমন 'খোদা', 'গড', 'ঈশ্বর' এসব শব্দ আরবি 'রব', 'খালিক', 'মালিক' এ-জাতীয় নামের সমার্থক কিংবা কাছাকাছি অর্থবোধক। ফলে এসব শব্দে আল্লাহকে ডাকা নিষিদ্ধ নয়। বরং পৃথিবীর অনেক ভূখণ্ডের অনেক মানুষ আল্লাহর আরবি নামগুলো যথাযথভাবে উচ্চারণও করতে পারবে না। নিজস্ব ভাষাই তাদের কাছে সহজ হবে। মাতৃভাষাতে আল্লাহকে ডাকতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এ কারণে এগুলো ব্যবহারের বৈধতার ব্যাপারে সকল ধারার প্রাজ্ঞ আলিমগণ একমত, যেমনটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষ এগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং আল্লাহকে 'খোদা', 'গড' ইত্যাদি নামে ডাকাকে 'নাজায়েজ' প্রমাণ করতে চাচ্ছে। তাদের কথা অসঠিক, অনুমাননির্ভর এবং দলিলবিহীন।
হ্যাঁ, আল্লাহর জন্য কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আরবি নামগুলো ব্যবহার করাই উত্তম। আল্লাহ বলেছেন,
وَلِلَّهِ أَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَئِهِ سَيَجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
অর্থ: 'আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০]
এটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সালাফের সুন্নাহ। পাশাপাশি সমকালীন বিভিন্ন ফিতনারও খণ্ডন। ইদানীং তথাকথিত অনেক প্রগতিশীল মুসলিম 'আল্লাহ' নাম উচ্চারণ করতে লজ্জা পায়। ফলে তারা আল্লাহকে 'সৃষ্টিকর্তা', 'উপরওয়ালা' ইত্যাদি বিশেষণে বোঝায়। শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ হলেও এমন আচরণ এক ভয়ংকর বিচ্যুতির নির্দেশক। আত্মপরিচয় সংকট ও হীনম্মন্যতাবোধের পরিচায়ক। আর ইসলাম ও আরবি নিয়ে হীনম্মন্যতাবোধ একজন মুসলিমকে সময়ের ব্যবধানে দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহকে তাঁর আরবি নামগুলোতেই ডাকার উপর জোর দেওয়া উচিত।
টিকাঃ
১. দেখুন: আল-মুহাল্লা, ইবনে হাজাম (৬/২৮১); ফাতহুল কাদির, ইবনুল হুমাম (৫/৭৫); ফাতাওয়া কুবরা, ইবনে তাইমিয়া (৬/৫৬৮)।
২. দেখুন: শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৯/২৭১)।
৩. দেখুন: বায়ানু তালবিসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৩৮৯-৩৯০)।
📄 আল্লাহর কোনো ক্ষয় নেই, লয় নেই
আল্লাহর কোনো ক্ষয় নেই, লয় নেই; অর্থাৎ আল্লাহ কোনো দিন শেষ হয়ে যাবেন না। কোনো দিন তাঁর শক্তিতে অণু পরিমাণ কমতি আসবে না। তিনি সর্বদা যেমন ছিলেন সর্বদাই তেমন থাকবেন। কুরআনের একটি আয়াতে উপরের বাক্যের মর্ম তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ. وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَالِ وَالْإِكْرَامِ .
অর্থ: 'ভূপৃষ্ঠে বিদ্যমান সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশিষ্ট থাকবেন কেবল আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তা।' [আর-রহমান: ২৬-২৭] কুরআনে আরও এসেছে:
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وَسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَكَفَى بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا
অর্থ: 'আপনি নির্ভর করুন সেই চিরঞ্জীব সত্তার উপর, যিনি কখনও মৃত্যুবরণ করবেন না।' [ফুরকান: ৫৮] আল্লাহ অন্যত্র বলেন,
كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ
অর্থ: 'তিনি ব্যতীত সবকিছু ধ্বংসশীল।' [কাসাস: ৮৮]
📄 আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না
আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না: কারণ তিনিই জগতের সবকিছু নিজ ইচ্ছায় যেভাবে চেয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন। ফলে গোটা সৃষ্টি তাঁর অনুগত থাকবে, তাঁর সৃষ্টি করা জগতে তাঁর ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছু হবে না এটাই স্বাভাবিক। এটা ঈমানের ছয়টি মৌলিক রুকনের একটি তাকদিরের উপর ঈমানের অংশ। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
অর্থ: 'তিনি যখন কোনোকিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, 'হও', তখনই তা হয়ে যায়।' [ইয়াসিন: ৮২] আরও বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ
অর্থ: 'আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ দেন।' [মায়িদা: ১] অন্যত্র বলেন,
كَذلِكَ اللَّهُ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ
অর্থ: 'এভাবেই আল্লাহ যা চান, করেন।' [আলে ইমরান: ৪০] মানুষের হিদায়াত প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَانَّمَا يَصَّعَدُ فِي السَّمَاءِ كَذَلِكَ يَجْعَلُ اللَّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ.
অর্থ: 'অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। এমনইভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, আল্লাহ তাদের উপর আজাব বর্ষণ করেন।' [আনআম: ১২৫] নুহ আলাইহিস সালামের ভাষায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدْتُ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللَّهُ يُرِيدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
অর্থ: 'আর আমি তোমাদের নসিহত করতে চাইলেও তা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের গোমরাহ করতে চান; তিনিই তোমাদের পালনকর্তা এবং তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।' [হুদ: ৩৪] আল্লাহ আরও বলেন,
وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
অর্থ: 'আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।' [ইবরাহিম: ২৭] মানুষের ইচ্ছাকে আল্লাহ তাঁর ইচ্ছার অধীন ঘোষণা করে বলেন,
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ
অর্থ: 'আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তোমরা কোনো ইচ্ছা করতে পারো না।' [ইনসান: ৩০] একই কথা আরেক জায়গায় তাগিদ করেন,
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: 'বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তোমাদের কোনো ইচ্ছা নেই।' [তাকভির: ২৯]
উল্লিখিত প্রত্যেকটি আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, পৃথিবীতে যা-কিছু হচ্ছে, সব আল্লাহর ইচ্ছায় হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না। কিন্তু কয়েকটি ফিরকা এই বিষয়ে বিভ্রান্তি ও গোমরাহির শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কাদারিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ ও মুতাজিলাহ ফিরকা। কাদারিয়্যাহ ফিরকা তাকদিরকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তাদের ধারণা, মানুষ যার ইচ্ছা মুমিন হয়, আবার যার ইচ্ছা কাফের হয়; তাতে আল্লাহর কোনো ইচ্ছা নেই। বরং আল্লাহ সবার জন্য ঈমান চেয়েছেন, কিন্তু কাফেররা ঈমান আনেনি। আর মুতাজিলারা বলেছে, আল্লাহর প্রকৃত অর্থে ইচ্ছা নেই; রূপক ইচ্ছা রয়েছে। কারণ, ইচ্ছার অন্য নাম-তাদের ধারণামতে ‘শাহওয়াহ’ বা প্রবৃত্তি। আর আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত। তাই আল্লাহর উপর হাকিকি অর্থে ইচ্ছা শব্দ প্রয়োগ করা যায় না, রূপক অর্থে যেতে পারে। এটা তাদের অজ্ঞতা। কারণ, ইচ্ছা (ইরাদা) মানেই প্রবৃত্তি (শাহওয়াহ) নয়; বরং ইচ্ছা হলো, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বিষয় ঘটানোর প্রক্রিয়া। সৃষ্টির শৃঙ্খলা ও বিন্যাসের জন্য ইচ্ছা আবশ্যক।¹
টিকাঃ
১. দেখুন: গজনবি (৪৮-৪৯); আকহাসারি (১১৬); শাইবানি (১০); ইবনে আবিল ইজ (৬৮)।