📄 কোনোকিছু আল্লাহকে অক্ষম করতে পারে না
কোনোকিছু আল্লাহকে অক্ষম করতে পারে না: কারণ, আল্লাহই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং সৃষ্টি স্রষ্টার উপর বলীয়ান হবে এবং তাকে অক্ষম করবে, সেটা সম্ভব নয়। তিনি সর্বশক্তিমান, সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। তা ছাড়া অক্ষমতা হলো ত্রুটি। আর আল্লাহ তায়ালা সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কুরআনে একাধিক আয়াতে তিনি এর তাগিদ দিয়েছেন। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ عَلِيمًا قَدِيرًا.
অর্থ: 'আকাশ ও পৃথিবীতে কোনোকিছুই আল্লাহকে অপারগ করতে পারে না। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান' [ফাতির: ৪৪]।
আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
অর্থ: 'তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান' [বাকারা: ২৫৫]।
📄 আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই
আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই: এখানে আরবি (لا إله إلا الله) বাক্যটির শাব্দিক অনুবাদ হলো: 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ (উপাস্য) নেই।' কিন্তু কোনো কোনো আলিম মনে করেন, এমন অনুবাদ সঠিক নয়। তাদের বক্তব্য: এটার সঠিক অনুবাদ হলো, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত/সত্য উপাস্য নেই।' ফলে যদি স্রেফ বলা হয় 'আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই', তবে কথাটি গলদ। কারণ, আল্লাহ ছাড়া জগতে অসংখ্য উপাস্যের উপাসনা করা হয়। ফলে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই' কথাটির অর্থ দাঁড়াবে, জগতে যেসব মূর্তি-প্রতিমা এবং যা-কিছুর উপাসনা করা হয়, সবই আল্লাহ! ফলে এটা ওয়াহদাতুল উজুদ-এর মতো বিভ্রান্ত আকিদার পর্যায়ে চয়ে যাবে। তাই এটার অনুবাদ করতে হবে, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।' তাদের মতে, কুরআনেও বিষয়টির প্রমাণ মেলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
অর্থ: 'কারণ নিঃসন্দেহে আল্লাহই সত্য। আর তাঁর পরিবর্তে তারা যা ডাকে, তা অসত্য এবং আল্লাহই সবার উর্ধ্বে, তিনি মহান।' [হজ: ৬২]
তবে উপরের বক্তব্য সঠিক নয়। কেবল 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই' এটুকু বলাই যথেষ্ট। কারণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য অনেক উপাস্যের উপাসনা করা হলেও তারা সব মিথ্যা উপাস্য। আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সাদৃশ্য নেই। আল্লাহ স্রষ্টা, তারা সৃষ্টি। তা ছাড়া আল্লাহর উলুহিয়্যাহ চিরন্তন। বিশ্ব সৃষ্টির আগে যখন কেউ ছিল না, তখনও আল্লাহ উপাস্য ছিলেন। আবার যখন কেউ থাকবে না, তিনি উপাস্য থাকবেন। অর্থাৎ আল্লাহর উপাস্য হওয়ার জন্য উপাসনাকারী দরকার নেই। অথচ পৃথিবীতে যেসব মিথ্যা উপাস্য বিদ্যমান, তাদের ততক্ষণ পর্যন্ত উপাস্য বলা হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কেউ উপাসনা করে। ফলে 'আল্লাহ ছাড়া সত্য উপাস্য নেই' কিংবা 'আল্লাহ ছাড়া উপাসনার উপযুক্ত কেউ নেই'-এর চেয়ে বরং কেবল 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই' এটা বলাই উত্তম। কারণ, আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করা হয়, তাদের উপাস্য হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। ফলে তারা থেকেও না থাকার মতোই। কুরআনের আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থও তা-ই। সেখানে 'প্রকৃত' এমন শব্দ যোগ করা হয়নি। তারা যে আয়াতটি দিয়ে দলিল দিয়েছেন, সেটা এই শাহাদাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়।
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই ঘোষণা ইসলামের মূল ভিত্তি। পিছনে আমরা কুরআনের বেশ কিছু আয়াত উপস্থাপন করেছি, যেগুলোতে বিভিন্ন নবির মুখে তাওহিদের এই কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলো ছাড়াও কুরআনের অসংখ্য আয়াতে এই ঘোষণা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَالْهُكُمُ إِلَهُ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ
অর্থ: 'আর তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরম করুণাময়, দয়ালু।' [বাকারা: ১৬৩] তিনি আরও বলেন,
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি চির জীবিত, তিনি সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা।' [আলে ইমরান: ২] আল্লাহ আরও বলেন,
هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অর্থ: 'তিনি তোমাদের মায়ের গর্ভে যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [আলে ইমরান: ৬] অন্য আয়াতে আল্লাহ নিজে এই তাওহিদের সাক্ষ্য দিচ্ছেন,
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَئِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অর্থ: 'ন্যায়নিষ্ঠভাবে আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আরও সাক্ষ্য দিয়েছে ফেরেশতারা এবং জ্ঞানীগণ। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [আলে ইমরান: ১৮] সুরা নিসাতে আল্লাহ বলেন,
اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَيَجْمَعَنَّكُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি অবশ্যই তোমাদের কিয়ামতের দিন সমবেত করবেন যাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহর চেয়ে কে আছে সত্যভাষী?' [নিসা: ৮৭] অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
اَتَّبِعْ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَ أَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
অর্থ: 'আপনার কাছে যা প্রত্যাদেশ করা হয়েছে, তা অনুসরণ করুন। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর মুশরিকদের উপেক্ষা করুন।' [আনআম: ১০৬] আল্লাহ আরও বলেন,
فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
অর্থ: 'যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁর উপর নির্ভর করলাম। তিনি মহান আরশের প্রতিপালক।' [তাওবা: ১২৯] সুরা ত্বহাতে আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামকে লক্ষ্য করে বলেছেন,
إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِي
অর্থ: 'নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তাই আপনি আমার ইবাদত করুন। আমার স্মরণে নামাজ আদায় করুন।' [ত্বহা: ১৪]
প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ، وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ.
অর্থ: 'আমি মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল; আর নামাজ আদায় করে, জাকাত প্রদান করে। যখন তারা এগুলো করবে, তাদের রক্ত ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। তবে ইসলামের কোনো হক থাকলে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের হিসাব থাকবে আল্লাহর দায়িত্বে।'¹
টিকাঃ
১. বুখারি (২৫); মুসলিম (২২); দারাকুতনি (৮৯৮)।
📄 আল্লাহ ‘কাদিম’ ও ‘দায়িম’
আল্লাহ 'কাদিম' ও 'দায়িম': শব্দ দুটোর কাছাকাছি বাংলা প্রতিশব্দ হলো অনাদি ও অনন্ত। অর্থাৎ যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই। আল্লাহ তায়ালা সর্বদাই ছিলেন, এমন কোনো সময় ছিল না যখন তিনি ছিলেন না। আবার তিনি সর্বদাই থাকবেন, এমন কোনো সময় আসবে না যখন তিনি থাকবেন না। ফলে তাঁর শুরু ও শেষ নেই, তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই; বরং তিনিই শুরু তিনিই শেষ। তিনি সময় ও কালের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো 'কাদিম' ও 'দায়িম' কি আল্লাহর নাম? এই দুটো শব্দ কি শরয়ি পরিভাষা? আল্লাহর ক্ষেত্রে এসব শব্দ কুরআন ও সুন্নাহে ব্যবহৃত হয়েছে? একদল উলামায়ে কেরাম মনে করেন 'কাদিম' ও 'দায়িম' আল্লাহর নাম নয়। কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহে এই নাম দুটো উল্লেখ করা হয়নি। যেহেতু আল্লাহ তায়ালার নাম 'তাওকিফি' তথা কুরআন-সুন্নাহ-নির্ভর আর এই নাম দুটো কুরআন-সুন্নাহে নেই, সুতরাং এই দুটোকে আল্লাহর নাম হিসেবে আখ্যা দেওয়া যাবে না। কিন্তু তারা আল্লাহর ক্ষেত্রে এই শব্দদুটো ব্যবহার অবৈধ কিংবা গলদ মনে করেন না। এক্ষেত্রে তাদের মূলনীতি হলো, যদি কোনো শব্দের অর্থ অসুন্দর না হয় এবং সেটা আল্লাহর নাম না হলেও তাঁর সম্পর্কে 'ইখবার' তথা কোনো বক্তব্য কিংবা বর্ণনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে এ ধরনের শব্দ আল্লাহর শানে ব্যবহার করা হারাম নয়। যেমন 'শাইউন' (বস্তু), 'মাওজুদ' (বিদ্যমান), 'জাত' (সত্তা), 'আজালি' (অনাদি), 'আবাদি' (অনন্ত), 'মুরিদ' (ইচ্ছাকারী), 'মুতাকাল্লিম' (কথক/বক্তা) ইত্যাদি। 'কাদিম' ও 'দায়িম'-এর ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। কারণ, এ দুটোর অর্থ হলো, যার কোনো শুরু নেই এবং যার কোনো শেষ নেই। এ ধরনের বিশেষণ যেহেতু আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সুতরাং শব্দদুটো আল্লাহর শানে ব্যবহার করা যাবে। তবে না করাই উত্তম।¹
কিন্তু ইমাম বাইহাকি, গাজালি-সহ অসংখ্য মুহাক্কিক আলেম মনে করেন, 'কাদিম' ও 'দায়িম' আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা কেবল বৈধই নয়; বরং এগুলো আল্লাহর নাম। যারা এ দুটোকে আল্লাহর নাম হিসেবে নাকচ করেছেন, তারা রাসুলুল্লাহর সুন্নাহকে সামগ্রিকভাবে দেখার (ইসতিকরা) আগেই অনুমান এবং অনুসরণভিত্তিক নাকচ করেছেন।² এক্ষেত্রে তারা যেসব দলিল পেশ করেন, আমরা উদাহরণস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উল্লেখ করব:
এক. সুনানে আবু দাউদে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাজি.-এর হাদিস, যেখানে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়তেন: أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: 'আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে মহান আল্লাহর, তাঁর পবিত্র চেহারার এবং অনাদি রাজত্বের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' হাদিসটি বিশুদ্ধ। কিন্তু জটিলতা হলো উক্ত হাদিসটি তাদের পক্ষের শক্তিশালী দলিল নয়। কারণ, এখানে 'কাদিম' আল্লাহর নাম কিংবা বিশেষণ নয়, বরং তাঁর রাজত্ব কিংবা ক্ষমতার বিশেষণ। ফলে এ হাদিসের ভিত্তিতে এটাকে আল্লাহর নাম সাব্যস্ত করা যায় না। হ্যাঁ, এটুকু অবশ্যই বলা যায় যে, আল্লাহর রাজত্ব কাদিম হলে তাঁর কাদিম হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত।
দুই. মুসতাদরাকে হাকেমে আবু হুরাইরা রাজি.-এর সূত্রে বর্ণিত লম্বা হাদিস, যাতে আল্লাহর অনেকগুলো নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে 'আল-কাদিম' এবং 'আদ দায়িম' নামদুটোও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জটিলতা হলো, হাদিসটির একজন বর্ণনাকারীকে (আবদুল আজিজ ইবনুল হুসাইন) বড় বড় ইমামগণ দুর্বল বলেছেন। যদিও হাকেম তাকে সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন।⁴
তিন. সুনানে ইবনে মাজাতে আবু হুরাইরা রাজি. থেকে দ্বিতীয় আরেক সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিস। সেখানেও আল্লাহ তায়ালার নাম হিসেবে 'কাদিম' এবং 'দায়িম' উল্লেখ করা হয়েছে।¹ আকহাসারি এটার উপর নির্ভর করে এ দুটোকে আল্লাহর নাম হিসেবে গণ্য করেছেন।² কিন্তু সিন্ধি-সহ অনেকের মতে এ হাদিসটিও জয়িফ। ইমাম বাইhaki রাহি. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-আসমা ওয়াস-সিফাত'-এ 'কাদিম' আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় মত দিয়েছেন। কিন্তু সেটাও সমালোচিত বর্ণনাকারী আবদুল আজিজ ইবনুল হুসাইন সূত্রে। ফলে বর্ণনার দুর্বলতা প্রশ্নাতীত নয়।
দেখা যাচ্ছে, যারা বলেছেন এ দুটো আল্লাহর নাম নয়; কারণ সুন্নাহে এগুলো বর্ণিতই হয়নি, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, আলোচ্য হাদিসগুলোর সনদের বিশুদ্ধতা যদিও প্রশ্নাতীত নয়, তথাপি এগুলোর মাধ্যমে নামদুটোর 'আসল' তথা মূল অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। ফলে এ দুটো যেমন আল্লাহর নাম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, একইভাবে অর্থের বিশুদ্ধতার দিকে তাকিয়ে 'বিশেষণ' হিসেবেও আল্লাহর উপর এগুলো প্রয়োগ করা যাবে। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে উভয় ধারার আলিমগণই একমত। কারণ, এ দুটোর অর্থের মাঝে অসুন্দর কিংবা নিষিদ্ধ কিছু নেই। আরবিতে সাধারণভাবে 'কাদিম' অর্থ পুরোনো। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে এটার অর্থ হবে: 'পুরোনো' নয়, বরং যিনি সর্বদাই ছিলেন, কখনও ছিলেন না এমন নয়।
তবে বৈধতা এবং উত্তম দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। যদিও 'কাদিম' এবং 'দায়িম' শব্দ দুটো আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহার বৈধ এবং দুর্বল সূত্রে সেগুলো আল্লাহর নাম বলেও প্রতীয়মান হয়, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহে আমরা একই অর্থে আরও উত্তম নাম পাই, যেগুলো আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুপরিমাণ সন্দেহ নেই। কুরআনের একাধিক আয়াতে সেসব নাম বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব নামের মাধ্যমে আল্লাহকে সর্বদা ডাকতেন। পাশাপাশি সেগুলো মর্ম ও তাৎপর্যের ক্ষেত্রেও এই দুটো শব্দের চেয়ে অনেক উত্তম। তন্মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে 'আল-আউয়াল' (শুরু/প্রথম) এবং 'আল-আখির' (শেষ)। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ: 'তিনিই শুরু, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য (উর্ধ্বে), তিনিই গোপন, তিনি সব বিষয় সম্পর্কে জানেন।' [হাদিদ: ৩]
কুরআনে উক্ত আয়াতে বর্ণিত আল্লাহ তায়ালার প্রথম চারটি নামের রাসুলুল্লাহ কৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আবু হুরাইরার সূত্রে বর্ণিত প্রসিদ্ধ একটি হাদিসে, যা মুসলিম- সহ কুতুবে সিত্তার বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে। হাদিসটির একটি অংশ হচ্ছে:
اللَّهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি শুরু, আপনার আগে কিছুই নেই। আপনি শেষ, আপনার পরে কিছুই নেই। আপনি উর্ধ্বে, আপনার উপরে কিছুই নেই। আপনি কাছে (বা গোপনে) আপনার সামনে (কিংবা পরে) আর কিছু নেই।'¹ তাই দোয়া এবং জিকিরের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত নামকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।²
টিকাঃ
১. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়াহ (৬/১৪২); বাদায়েউল ফাওয়ায়িদ, ইবনুল কাইয়িম (১/১৬২); ইবনে আবিল ইজ (৬৭); সালেহ ফাওজান (২৮); ইবনে বাজ (৮)।
২. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৬); তুর্কিস্তানি (৫৫); আকহাসারি (১১৩)।
৩. সুনানে আবু দাউদ (৪৬৬)।
৪. মুসতাদরাকে হাকেম (৪২)।
৫. সুনানে ইবনে মাজা (৩৮৬১)
৬. আকহাসারি (১১৫)
৭. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৬)
৮. মুসলিম (২৭১৩)। আবু দাউদ (৫০৫১)। তিরমিজি (৩৪০০)। তবে হাদিসে বর্ণিত 'যাহির' এবং 'বাতিন' নামের অর্থের ব্যাপারে আলিমদের একাধিক মতামত পাওয়া যায়। বিস্তারিত দেখুন: আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৯৮)
৯. আল-আকিদাহ আত-ত্বহাবিয়্যাহ, কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (৩৪)
📄 আল্লাহর জন্য ‘খোদা’ বা ‘গড’ শব্দের ব্যবহার
আল্লাহর জন্য 'খোদা' বা 'গড' শব্দের ব্যবহার: একই কথা অন্যান্য ভাষায় আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন নামের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। যেমন: ইংরেজি 'গড', বাংলা 'ঈশ্বর', ফারসি 'খোদা' ইত্যাদি। আল্লাহকে বোঝাতে প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে এসব শব্দ ব্যবহার করা যাবে। কারণ, আল্লাহ পৃথিবীর সকল গোত্রের কাছে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই অনুমিত যে, প্রত্যেক জাতি আল্লাহর বিভিন্ন নাম তাদের ভাষাতেই উচ্চারণ করত। আসমানি গ্রন্থগুলো সেসব ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছিল। 'সালাত', 'সাওম', 'জাকাত'-সহ ইসলামের বিভিন্ন ইবাদত, আল্লাহর বিভিন্ন গুণবাচক নাম প্রত্যেক উম্মাহ নিজস্ব ভাষাতেই চর্চা করত। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
অর্থ: 'আমি সকল রাসুলকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেন।' [ইবরাহিম: ৪]
ফলে প্রত্যেক ভাষার মানুষ সে ভাষাতেই আল্লাহকে ডাকতেন, আল্লাহর ইবাদত করতেন এটা সুস্পষ্ট ও সতঃসিদ্ধ বিষয়।
যেহেতু শরিয়তে মুহাম্মাদির ভাষা হিসেবে আল্লাহ আরবিকে মনোনীত করেছেন, ফলে এ শরিয়াহর কিছু নির্দিষ্ট মৌলিক ইবাদত আরবিতেই করতে হবে। তবে এর বাইরে যেকোনো ভাষায় শরয়ি পরিভাষাগুলোর আরবি প্রতিশব্দের ব্যবহার বৈধ হবে (যেমন নামাজ, রোজা) এবং সেসব ভাষায় আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত নামে তাঁকে বোঝানো (যেমন খোদা হাফেজ) এবং সেসব নামে কসম খাওয়াও জায়েজ হবে (যেমন খোদার কসম)।¹ ইমাম আহমদ রাহি, আল্লাহকে 'হে পেরেশানদের পথপ্রদর্শনকারী' (یا دلیل الحیاری) বলে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ এটা আল্লাহর নাম নয়; বরং তাঁর গুণ এবং তাঁর শানে শোভনীয় বিশেষণ। ² সুতরাং ফারসিতে 'হে খোদা', ইংরেজিতে 'ও গড' কিংবা বাংলাতে 'হে প্রভু' এমনকি 'ঈশ্বর' নামে আল্লাহকে ডাকাও বৈধ হবে। কারণ, 'খোদা', 'গড', 'ঈশ্বর' কিংবা 'প্রভু' নামের মাঝে ইসলামের আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অর্থ নেই, কিংবা এগুলো অন্য কোনো বিশেষ ধর্মের বিশেষ উপাস্যের নাম হিসেবে নির্ধারিতও নয়। শাইখ ইবনে তাইমিয়া প্রয়োজনে অন্য ভাষায় আল্লাহর নাম ব্যবহারকে মুস্তাহাব এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াজিব বলেছেন এবং এটাকে আলিমদের 'সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।³
এটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। জগতের সকল ভাষা আল্লাহরই সৃষ্টি, তাঁর নিদর্শন। ফলে আরবি বাদ দিয়ে অন্য কোনো ভাষায় তাঁকে ডাকলে, তাঁর আরবি নামগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ করে ব্যবহার করলে তিনি শুনবেন না, তিনি অসন্তুষ্ট হবেন এটা হতে পারে না। যেমন 'খোদা', 'গড', 'ঈশ্বর' এসব শব্দ আরবি 'রব', 'খালিক', 'মালিক' এ-জাতীয় নামের সমার্থক কিংবা কাছাকাছি অর্থবোধক। ফলে এসব শব্দে আল্লাহকে ডাকা নিষিদ্ধ নয়। বরং পৃথিবীর অনেক ভূখণ্ডের অনেক মানুষ আল্লাহর আরবি নামগুলো যথাযথভাবে উচ্চারণও করতে পারবে না। নিজস্ব ভাষাই তাদের কাছে সহজ হবে। মাতৃভাষাতে আল্লাহকে ডাকতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এ কারণে এগুলো ব্যবহারের বৈধতার ব্যাপারে সকল ধারার প্রাজ্ঞ আলিমগণ একমত, যেমনটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষ এগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং আল্লাহকে 'খোদা', 'গড' ইত্যাদি নামে ডাকাকে 'নাজায়েজ' প্রমাণ করতে চাচ্ছে। তাদের কথা অসঠিক, অনুমাননির্ভর এবং দলিলবিহীন।
হ্যাঁ, আল্লাহর জন্য কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আরবি নামগুলো ব্যবহার করাই উত্তম। আল্লাহ বলেছেন,
وَلِلَّهِ أَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَئِهِ سَيَجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
অর্থ: 'আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০]
এটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সালাফের সুন্নাহ। পাশাপাশি সমকালীন বিভিন্ন ফিতনারও খণ্ডন। ইদানীং তথাকথিত অনেক প্রগতিশীল মুসলিম 'আল্লাহ' নাম উচ্চারণ করতে লজ্জা পায়। ফলে তারা আল্লাহকে 'সৃষ্টিকর্তা', 'উপরওয়ালা' ইত্যাদি বিশেষণে বোঝায়। শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ হলেও এমন আচরণ এক ভয়ংকর বিচ্যুতির নির্দেশক। আত্মপরিচয় সংকট ও হীনম্মন্যতাবোধের পরিচায়ক। আর ইসলাম ও আরবি নিয়ে হীনম্মন্যতাবোধ একজন মুসলিমকে সময়ের ব্যবধানে দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহকে তাঁর আরবি নামগুলোতেই ডাকার উপর জোর দেওয়া উচিত।
টিকাঃ
১. দেখুন: আল-মুহাল্লা, ইবনে হাজাম (৬/২৮১); ফাতহুল কাদির, ইবনুল হুমাম (৫/৭৫); ফাতাওয়া কুবরা, ইবনে তাইমিয়া (৬/৫৬৮)।
২. দেখুন: শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৯/২৭১)।
৩. দেখুন: বায়ানু তালবিসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৩৮৯-৩৯০)।