📄 শিরকের ভয়াবহতা ও প্রকারভেদ
উলুহিয়্যাহর ক্ষেত্রেও বিচ্যুতির শিকার হয়েছে। ফলে নবিগণ তাওহিদুর রবুবিয়্যাহর জন্য আসেননি; বরং স্রেফ উলুহিয়্যাহর জন্য এসেছেন—এমন কথা সুস্পষ্ট ভুল।
ইহুদিরা বিশ্বাস করে, আল্লাহ জগৎ সৃষ্টি করার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তিনি সৃষ্টির সপ্তম দিন বিশ্রাম গ্রহণ করেছেন।¹ তারা বিশ্বাস করে, আল্লাহ দুঃখিত হন, মনে কষ্ট পান, কাঁদেন।² আল্লাহর দুই হাত বাঁধা [মায়িদা: ৬৪], আল্লাহ ফকির [আলে ইমরান: ১৮১] ইত্যাদি। অথচ তারা রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী হলে আল্লাহর ব্যাপারে কখনোই এই ধারণা করতে পারত না। আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمٰوَتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَّ مَا مَسَّنَا مِنْ لُغُوبٍ. অর্থ: 'আমি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছি এবং আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।' [কাফ: ৩৮]
খ্রিষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর ছেলে হিসেবে বিশ্বাস করে। অথচ তারা আল্লাহর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাস করলে বুঝত, আল্লাহর স্ত্রী-সন্তান নেই; তাঁর জন্য স্ত্রী-সন্তান শোভনীয় নয়। [মারইয়াম: ৩৫, আনআম: ১০১]³
মক্কার কাফেররা কি তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী ছিল? মক্কার কাফের- মুশরিকরা তাদের জীবনে তারকার প্রভাবকে বিশ্বাস করত।⁴ তাবিজ-কবচ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে মনে করত।⁵ অথচ আল্লাহ সকল ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া পৃথিবীতে কারও কিছু করার ক্ষমতা নেই। ফলে এটা রবুবিয়্যাহর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা পরকাল অস্বীকার করত [রা'দ: ২-৫, নাহল: ৩৮-৪০, ইয়াসিন: ৭৮-৭৯]। অথচ আল্লাহর রবুবিয়্যাহ স্বীকার করলে পরকাল অস্বীকার করা অসম্ভব। তারা ফেরেশতাদের আল্লাহর মেয়ে মনে করত [ইসরা: ৪০, নাহল: ৫৭, জুখরুফ: ১৯, নাজম: ৫৩]।⁶ অথচ এটা রবুবিয়্যাহর বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তারা আল্লাহর 'রহমান-রাহিম' নাম অস্বীকার করত। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লিখলে তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করে। বলে, আমরা রহমান ও রহিমকে চিনি না। তারা তাকদিরও অস্বীকার করত [আনআম: ১৪৮]।
টিকাঃ
১. বাইবেল (পুরাতন নিয়ম): পয়দায়েশ (২:২-৩); হিজরত (৩১:১৭)।
২. বাইবেল (পুরাতন নিয়ম): ইয়ারমিয়া (১৩:১৭)।
৩. বাইবেল (নতুন নিয়ম): মথি (৩:১৭), লুক (৩:২২)।
৪. মুসলিম (৭১); আবু দাউদ (৩৯০৬)।
৫. আবু দাউদ (৩৮৮৩); হাকেম (৭৬০৮); ইবনে মাজা (৩৫৩০)।
৬. সহিহ ইবনে হিব্বান (৪৮৭০); সুনানে কুবra, বাইহাকি (১৮৮৯৭); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৩৩২৩)।
📄 শিরকের ক্ষেত্রে প্রান্তিকতা বর্জন
এমন অসংখ্য দলিলের মাধ্যমে বোঝা যায় (এক.) মক্কার কাফের, ইহুদি-নাসারা- সহ আগেকার নবিদের উম্মতগুলো মোটেই তাওহিদে রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী ছিল না। হ্যাঁ, রবুবিয়্যাহর কিছু কিছু বিষয় তারা স্বীকার করত। কিন্তু এ কারণে তাদের কস্মিনকালেও তাওহিদে বিশ্বাসকারী বলা যায় না। (দুই) এর মাধ্যমে আরও একটা ভুল ধারণার অবসান ঘটে। তা হলো, রবুবিয়্যাহ এবং উলুহিয়্যাহ তাওহিদের অবিচ্ছেদ্য আরকান। দুটোকে আলাদা করা ভুল। কারণ, একজনকে রব মেনে অন্য জনের উপাসনা করা যায় না। মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা তখনই করে, যখন সে তার ব্যাপারে আল্লাহর কোনো গুণের বিশ্বাস রাখে। ফলে রবুবিয়্যাহ এবং উলুহিয়্যাহ একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রবুবিয়্যাহ প্রকৃত অর্থে স্বীকার করলে উলুহিয়্যাহ অস্বীকারের সুযোগ নেই। কেবল 'আল্লাহ আছেন' কিংবা 'আল্লাহ আকাশ ও মাটি সৃষ্টি করেছেন' এটাই তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ নয়, যেমনটা তারা বুঝেছেন। হিন্দুরাও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে, 'উপরওয়ালা'য় বিশ্বাস করে, তাই বলে তারা তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী একত্ববাদী? বরং যে ব্যক্তি উলুহিয়্যাহর ক্ষেত্রে শিরক করে, সে মূলত রবুবিয়্যাহর ক্ষেত্রেও শিরক করে। আর যে রবুবিয়্যাহর ক্ষেত্রে শিরক করে, সে উলুহিয়্যাহর ক্ষেত্রে একত্ববাদী হতে পারে না। একটা অপরটার জন্য অত্যাবশ্যক।
কুরআনে মুসা আলাইহিস সালাম এবং ফেরাউনের কথাবার্তার মাধ্যমেও স্পষ্ট হয়, রব এবং ইলাহ অবিচ্ছেদ্য বিষয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
قَالَ رَبُّكُمْ وَرَبُّ ابَائِكُمُ الْأَوَّلِينَ . قَالَ إِنَّ رَسُولَكُمُ الَّذِي أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ لَمَجْنُونَ. قَالَ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ . قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَهًا غَيْرِي لَاجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ.
অর্থ: 'মুসা বললেন, 'তিনি তোমাদের রব এবং তোমাদের পূর্ববর্তী মানুষদেরও রব। ফেরাউন বলল, তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রাসুল নিশ্চয়ই বদ্ধপাগল। মুসা বললেন, তিনি পূর্ব-পশ্চিম ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর রব, যদি তোমরা বুঝতে। ফেরাউন বলল, তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে 'ইলাহ'রূপে গ্রহণ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করব।' [শুআরা: ২৬-২৯]
রুহের জগতে আল্লাহ সবার কাছ থেকে রব হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, ইলাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি। আল্লাহ বলেন,